মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বিশ্ব রক্তদাতা দিবস ২০১৫ ॥ ‘আমার জীবন রক্ষার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ’

প্রকাশিত : ১৬ জুন ২০১৫

১৪ জুন, প্রতিবছর বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশ ‘বিশ্ব রক্তদাতা দিবস’ উদযাপন করে থাকেন। এই দিন ট্রান্সফিউশন মেডিসিনের জনক কার্ল ল্যান্ড স্টেনার্স ১৮৬৮ সালে বাডেন বিআই উইনে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম লিওপোল্ড ও মাতার নাম ফ্যান্নি হেজ। পিতা পেশায় একজন সাংবাদিক ও ডাই-প্রেসের প্রধান সম্পাদক ছিলেন; মাত্র ৬ বছর বয়সের কার্ল ল্যান্ড স্টেনার্সকে রেখে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ১৮৯১ সালে কার্ল ল্যান্ড স্টেনাস এমডি ডিগ্রী অর্জন করেন। ১৯১৬ সালে হেলেন ওয়ালাসটোকে বিবাহ করেন। তাদের একমাত্র সন্তান এমস্ট কার্ল।

কার্ল ল্যান্ড স্টেনার্স ১৯০০ সালে এবিও ব্লাড গ্রুপ আবিষ্কার করেন এবং একই ব্লাড গ্রুপের রক্ত কোন রোগীর দেহে পরিসঞ্চালন করলে কোন পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া দেখা যাবে না। কিন্তু ভিন্ন ব্লাড গ্রুপের রক্ত কোন রোগীর দেহে পরিসঞ্চালন করলে সুস্পষ্ট পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া দেখা যাবে এই তথ্য প্রদান করেন। রউবেন ওটেনবার্গ প্রথম এই তথ্যের ওপর নির্ভর করে ১৯০৭ সালে নিউইয়র্ক সিটির মাউন্ট সিনাই হসপিটালে মানব দেহে সফল রক্ত পরিসঞ্চালন করেন। ১৯১৪ সালে রিচার্ড লুইসন সাইট্রেট-এন্টিকোয়াগুলেন্ট রক্তের সঙ্গে মেশালে রক্ত জমাট বাঁধে না প্রকাশের পর সফল ব্লাড ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথে অনেক খানি এগিয়ে যায়। ১৯৩০ সালে কার্ল ল্যান্ড স্টেনার্স এবিও ব্লাড গ্রুপ আবিষ্কারের স্বীকৃতিস্বরূপ নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন। তিনি ১৯৩৭ সালে আরএইচ ফ্যাক্টর (ব্লাড গ্রুপ) আবিষ্কার করেন। ৭৫ বছর বয়সে ২৬ জুন, ১৯৪৩ সালে আমেরিকার নিউইয়র্ক সিটিতে তিনি মারা যান। ১৯৪৬ সালে মৃত্যু উত্তর লাসকার-ডিবাকি ক্লিনিক্যাল মেডিক্যাল রিসার্চ এ্যাওয়ার্ড লাভ করেন। তিনি পলিও ভাইরাসের জীবাণু আবিষ্কার করেন। ভিয়েনা ইউনির্ভাসিটিতে কর্মকালীন সময় সেখানে তাঁর ৭৫টি গবেষণা কর্ম প্রকাশিত হয় এগুলো সেরোলজি, ব্যাকটেরিয়োলজি, ভাইরোলজি এবং প্যাথলোজিক্যাল এ্যানাটমি সম্পর্কিত ছিল।

প্রতিবছরের মতো এ বছরে (১৪ জুন ২০১৫ সাল) বিশ্ব রক্তদাতা দিবসের সেøাগান হলো ‘আমার জীবন রক্ষার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।’ সকলকে নিয়মিত স্বেচ্ছায় রক্তদানে উৎসাহিত করার জন্য আহ্বান করা হচ্ছে ‘আপনি প্রায়শ মুক্তচিত্তে রক্ত ও রক্ত উপাদানসমূহ দান করুন।’ আজকের এই দিবসের মূল লক্ষ্য হলোÑ

ক. রক্তদাতাদের তাঁদের জীবন রক্ষাকারী রক্তদানের জন্য ধন্যবাদ জ্ঞাপন।

খ. প্রত্যেক সুস্থ ও সক্ষম ব্যক্তিকে স্বেচ্ছায় নিয়মিত রক্তদানে উৎসাহিত করা।

গ. নিয়মিত রক্তদানের প্রয়োজনীয়তা সমন্ধে ব্যাপক গণ-সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং নির্দিষ্ট সময় পর পর শারীরিকভাবে যোগ্য ও সাহসী রক্তদাতাদের উৎসাহ দান, কারণ রক্ত উপাদানসমূহের স্বল্পতম আয়ুষ্কাল।

ঘ. উন্নত স্বাস্থ্যসেবা ও মানসম্মত পরিবেশ সৃষ্টি করার মাধ্যমে একজন প্রথম বা অনিয়মিত রক্তদাতাকে স্বেচ্ছায় নিয়মিত রক্তদানে উৎসাহিত করা।

ঙ. মানসম্মত সেবাদানের সুব্যবস্থার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে স্বেচ্ছায় নিয়মিত রক্তদানে উৎসাহিত করবে।

বিশ্ব রক্তদাতা দিবস ২০১২ এর আহ্বান ছিল ‘প্রত্যেক রক্তদাতাই একজন নায়ক’ রক্ত কৃত্রিমভাবে ল্যাবরেটরিতে তৈরি করা সম্ভব নয়। সুতরাং স্বেচ্ছায় রক্তদাতারাই বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্যসেবা দানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। প্রচুর অনিয়মিত রক্তদাতারা তাঁদের মূল্যবান রক্ত দান করে মানুষের জীবন রক্ষা করে চলেছেন।

একটি পিপীলিকা বা মাকড়সার কামড় আপনাকে কখনও মহানায়ক না বানাতে পারলেও একটা ছোট সুই-এর একটু ব্যথা আর একটু সময় আপনাকে সেই মর্যদায় অধিষ্ঠিত করতে পারে।

আজ পর্যন্ত রক্তের উপযুক্ত কোন বিকল্প বৈজ্ঞানিক বা চিকিৎসকদের জানা নেই। বর্তমানে আপনার দানকৃত এক ইউনিট রক্ত থেকে রক্তের বিভিন্ন প্রকার উপাদান পৃথক ও সংরক্ষণ করা হয়ে থাকে এবং প্রতিটি উপাদান প্রয়োজন অনুসারে ৩/৪ জন রক্ত গ্রহীতাদের সরবরাহ করা সম্ভব হয়ে থাকে। এর মাধ্যমে যে শুধু একটি বা একাধিক জীবন মৃত্যুর দ্বারপ্রান্ত থেকে ফিরে আসে তাই নয়, বরং একজন রক্তদাতারও অনেক উপকার হয়ে থাকে যেমনÑ

হার্ট এ্যাটাক কমে যায় রক্তে দানে : এ্যামেরিকান জার্নাল অব ইপিডিমিওলোজিতে প্রকাশিত এক সমীক্ষায় দেখা যায় নিয়মিত রক্তদাতাগণের মধ্যে হার্ট এ্যাটাকের ঝুঁকি শতকরা ৮৮ ভাগ কম এবং কার্ডিও-ভাসকুলার ডিজিজ শতকরা ৩৩ ভাগ কম থাকে।

বিনামূল্যে স্বাস্থ্য ও রক্ত পরীক্ষা : প্রতিবার রক্ত দানের সময় আমাদের রক্ত চাপ, নাড়ির গতি, তাপমাত্রা, হিমোগ্লোবিনের মাত্রা, শরীরের ওজন ইত্যাদি ছাড়াও রক্তে হেপাটাইটিস-বি, হেপাটাইটিস-সি, এইচআইভি- ১ ও ২, সিফিলিস এবং ম্যালেরিয়ার জীবাণু আছে কিনা তা পরীক্ষা করে দেখা হয়। ফলে প্রতিবারই আমাদের শারীরিক সুস্থতা সমন্ধে আমরা আগাম জানতে পারি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারি।

রক্তে প্রচুর পরিমাণে লোহিত কনিকা উৎপন্ন করতে সাহায্য করে : রক্ত দানের ফলে তাৎক্ষণিক রক্তে লোহিত কনিকার পরিমাণ কমে গেলেও স্বল্পতম সময়ে আমাদের অস্থি মজ্জা প্রচুর পরিমাণে নতুন লোহিত রক্ত কনিকা তৈরি করে সে অভাব পূরণ করে নেয়। ফলে প্রতিবার রক্ত দানের পর আবার নতুন নতুন লোহিত রক্ত কনিকা তৈরি করে সে অভাব পূরণ এবং আরও বেশি কর্মশীল করে তোলে।

মানসিক প্রশান্তি : যখন একজন রক্তদাতা অনুভব করে তাঁর এক ঘণ্টা সময় ও এক ইউনিট রক্ত দানের ফলে একজন মুমূর্ষু রোগী তার জীবন ফিরে পেল, এমন কি কখনও কখনও ৩/৪ জন রোগী তার স্বাভাবিক জীবন ফিরে পেল তখন এটা তাঁকে একজন বিশাল কর্মের সফল নায়ক ভাবতে সাহায্য করে এবং এক বিরাট মানসিক প্রশান্তি এনে দেয়। একটি সমীক্ষায় দেখা যায় নিঃস্বার্থ ত্যাগ/দানে মনের মাঝে স্ব^র্গীয় যে আনন্দ অনুভূতির সৃষ্টি হয় সেটা একজন আত্মকেন্দ্রিক ব্যক্তির চেয়ে অন্তত ৪ বছর অধিককাল বেশি বাঁচতে সাহায্য করে।

শরীরে রক্তপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখে : নিয়মিত রক্ত দানে রক্তের ঘনত্ব ও প্রবাহ ঠিক থাকে। ফলে রক্তনালিতে প্রদাহের সৃষ্টি করতে এবং রক্ত জমাট বাঁধতে পারে না। ফলে স্ট্রোকের মতো ঘটনা ঘটতে পারে না।

শরীরে ক্যালরি খরচ হতে সাহায্য করে : এক ইউনিট রক্ত দান করলে শরীরে ৬৫০ কি.ক্যালরি শক্তি খরচ হয়। এভাবে এটা আপনাকে শরীরে ওজন কমাতেও সাহায্য করে থাকে।

ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায় : আয়রনের মাত্রা শরীরে বেশি হলে ক্যান্সারের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাত্ত্বিকভাবে শরীরে আয়রনের মাত্রা নিয়ন্ত্রিত থাকলে ক্যান্সারের ঝুঁকি কম থাকে।

বর্তমানে বিশ্বের ৬২টি দেশ তাদের জাতীয় রক্ত সরবরাহ কেন্দ্র থেকে প্রায় শতকরা ১০০ ভাগ স্বেচ্ছায় নিয়মিত (অ-পেশাদার) রক্তদাতাদের নিকট থেকে রক্ত সংগ্রহ করে তাদের প্রয়োজন মিটিয়ে থাকে এবং ৪০টি দেশ তাদের জাতীয় রক্ত সরবরাহ কেন্দ্র থেকে রোগীর পরিবারের রক্তদাতা (আত্মীয়-স্বজন/বন্ধু-বান্ধব) এমন কি নিয়মিত পেশাদার রক্তদাতাদের নিকট থেকে রক্ত সংগ্রহ করে তাদের প্রয়োজন মিটিয়ে থাকে। যাই হোক প্রতিনিয়ত রক্ত সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানসমূহকে মুখোমুখি হতে হয় প্রয়োজনের তুলনায় নিরাপদ ও গুণগত মানসম্পন্ন অপ্রতুল রক্তের ইউনিট হাতে নিয়ে। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র পথ স্বেচ্ছায় নিয়মিত (অ-পেশাদার) রক্তদাতাদের এগিয়ে আসা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০২০ সালের মধ্যে সারা বিশ্বে শতকরা ১০০ ভাগ স্বেচ্ছায় নিয়মিত (অ-পেশাদার) রক্তদাতাদের নিকট থেকে রক্ত সংগ্রহ করে তাদের প্রয়োজন মেটানোর লক্ষ্যে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। আমরা তাদের এই কাজের সঙ্গে নিজেদের সরাসরি সম্পৃৃক্ত করে এই মহৎ কাজকে এগিয়ে নিতে চাই।

ডা. মুহাম্মদ মাহবুব-উল আলম

সহযোগী অধ্যাপক, ব্লাড ট্রান্সফিউশন বিভাগ,রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ

ও হাসপাতাল

প্রকাশিত : ১৬ জুন ২০১৫

১৬/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: