মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

প্র জ ন্মে র গ ল্প ॥ জাহিদের বাবা

প্রকাশিত : ১৬ জুন ২০১৫
  • মাহবুব রেজা

॥ এক ॥

বাবারা কী এরকমই হয়!

জাহিদের মনে ঘুরে ফিরে এই এক প্রশ্নই ঘুরপাক খায়। সে যতবার একথা ভাবে ততবারই বিস্মিত হয়। জাহিদের মনে হয় সেও বুঝি বড় হয়ে বাবার মতো হবে। আর হবেই বা না কেনো? সবাই যে বলে জাহিদ দেখতে হয়েছে ওর বাবার জেরক্স কপি। শুধু দেখতে জেরক্স কপি হলে তো চলবে না, কাজে-কর্মে বাবার মতো হয়ে দেখিয়ে দিতে হবে। জাহিদ কী তা পারবে?

জাহিদ সত্যি সত্যি বড় হয়ে বাবার মতো হতে চায়। বাবার মতো না হলে তার চলবে না। মা জাহিদের এই ব্যাপারটা বোঝে। আর বোঝে বলেই মা জাহিদকে সবসময় বলেন, তুই বড় হলে এমনি এমনি তোর বাবার মতো হয়ে যাবি- এটা নিয়ে টেনশন করিস না।

এমনি এমনি বাবার মতো হয়ে যাবো, মানে কী!

মানে একদম সোজা। ভাল ছেলেরা বড় হয়ে বাবাদের মতো ভাল হয়ে যায়- এটা ভেরি সিম্পল কথা।

তার মানে আমি ভাল ছেলে!

তোর কোন সন্দেহ আছে?

না, মানে, আমি কী। জাহিদ তোতলাতে থাকে।

শোন, মনের মধ্যে কখনও সন্দেহ, কনফিউশন, দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকা উচিত নয়। মনের মধ্যে এসব থাকলে সে মানুষ ঠিক মতো বেড়ে উঠতে পারে না। আমি কী বললাম বুঝেছিস?

জাহিদ মাথা নেড়ে সায় জানাল।

জাহিদের বাবা প্রায় দশ বছর হয়ে গেল ইতালিতে থাকেন। বছরে দু’বছরে একবার দেশে আসেন। জাহিদকে নিয়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরে বেড়ান। সেই ঘোরাঘুরি থেকে মা-ও বাদ যান না, এত ঘুরে ফিরে কী হবে? শুধু শুধু টাকা-সময় নষ্ট।

বাবা মায়ের কথায় হেসে দেন, আরে, কিছু পেতে হলে তোমাকে তো কষ্ট করতে হবে নাকি? কথায় বলে না, কষ্ট করলে, কেষ্ট মেলে।

বাবার কথায় মা কিছু বলেন না। মা জানেন, বাবার সঙ্গে কথা বলে কোন সুবিধা করা যাবে না।

ঘোরাঘুরির মধ্যেও বাবা দাদা-দাদি, চাচা, ফুফু, খালা-মামা, আত্মীয়স্বজন সবার খোঁজ-খবর নেন। গরিব আত্মীয়দের টাকা-পয়সা দিয়ে সাহায্য করেন। বাবার এসব কা-কীর্তি দেখে মা মাঝে মধ্যে রেগে যান, তোর বাবা হলো দাতা হাতেম তাই-

মার কথা শুনে জাহিদ কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে বলে, মা, হাজী মুহম্মদ মহসীন বড় না দাতা হাতেম তাই?

তোর বাবা তিনাদের চেয়েও অ-নে-ক বড় বলে মা দু’হাত দু’দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বাবার বিশালত্ব প্রমাণ করার আপ্রাণ চেষ্টা করেন।

॥ দুই ॥

এ বছর তোর বাবা দেশে আসতে পারবে নাÑ মার মুখে একথা শুনে জাহিদের মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। বাবা আসবে একথা সে তার বন্ধুদের কাছে বলেছে। মামা-খালাদের বলেছে। চাচা-ফুফুদের বলেছে। বাবা আসবে এই খুশিতে কয়েকদিন ধরে জাহিদ আনন্দের সাগরে ভেসে বেড়াচ্ছিল।

দুপুরে ভাত খাবার সময় মা যখন একথা বলল তখন জাহিদের মুখ কালো হয়ে গেল।

বাবা না প্লেনের টিকিট কিনে ফেলেছে? তাহলে আসবে না কেন?

তোর বাপের নাকি কী একটা সমস্যা হয়ে গেছে।

সমস্যা?

জনসেবা- মা মুখ বাঁকা করে বললেন।

বাবা জনসেবা করবে করুক কিন্তু তার সঙ্গে দেশে না আসার সম্পর্ক কী?

আছে আছে। তুই বুঝবি না।

জাহিদ এটা নিয়ে মার সঙ্গে আর কথা বাড়ায় না। বাড়িয়ে লাভ কী! বিকেলের দিকে বাবা জাহিদকে ফোন করল। বাবা অনেক কথা বললেন জাহিদের সঙ্গে। জাহিদের মন খারাপ এটা কেমন করে জানল বাবা! বাবা জাহিদকে বললেন, মন খারাপ জরিস না বাবা। তারপর বাবা জাহিদকে সব খুলে বললেন, আমার দূর সম্পর্কের এক চাচাত ভাই গফুর। খুবই গরিব। এক ছেলে আর এক মেয়েকে নিয়ে খুব কষ্টে আছে। সেদিন ফোন করেছিলাম। গফুর বলল, ছেলেকে বিদেশে পাঠাতে শেষ সম্বল ভিটে-মাটিটুকু বিক্রি করে দেবে। আমি বললাম, ভিটে-মাটি বিক্রি করে দিলে তুই বউ-মেয়ে নিয়ে কই থাকবি? ওদের পড়াশোনার কী হবে? এক কাজ কর, বিদেশ পাঠাতে যা টাকা লাগে এখন আমি তোকে দিয়ে দেই ছেলেকে তুই পরে শোধ করে দিস।

কথাগুলো বলে বাবা কিছুক্ষণ নীরব থাকলেন। তারপর বললেন, বাবারে, আমি যদি এ বছর দেশে না আসি তাহলে একটা ছেলে বিদেশে আসতে পারে। ছেলেটা বিদেশে গেলে ওর পরিবারের অন্যরা ভালো থাকবে। জাহিদ, তুই মন খারাপ করিস না। তোকে একটা বছর দেখতে পাবো না, আমার কী মন খারাপ হয় না?

বাবার কথা শুনে জাহিদের মুখ দিয়ে আর কোন কথা বের হয় না।

কী বলবে সে!

athairidha15@yahoo.com

প্রকাশিত : ১৬ জুন ২০১৫

১৬/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: