রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

বিউটি বোর্ডিংয়ে জংশনের একদিন

প্রকাশিত : ১৬ জুন ২০১৫
  • অঞ্জন আচার্য, সুমিমা ইয়াসমিন

এই মেঘ, এই রোদ্দুর- দিনটি ছিল এমনই। বিউটি বোর্ডিংয়ে সেদিন তরুণ চিত্রকরদের শিল্পকর্ম যেন মেতে উঠেছিল মেঘ-রোদ্দুরের গল্পে, যাপিত জীবনের বিবিধ বোধে, স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের বিস্ময়ে। শিল্পীর ভাবনা যখন রেখায় মূর্ত, দর্শকের অনুভবে তখন জেগে ওঠে এক ‘স্মৃতির আলেখ্য’। স্মৃতির উঠোনে তখন কোন পুরাতনী সুর মনকে ভরিয়ে রাখে জানি না, তবে আবছায়াতেও ঠিকঠাক চেনা যায়, যা কিছু চিরন্তন সুন্দর।

পুরনো ঢাকার বাংলাবাজারের ১ নম্বর শ্রীশদাস লেনের পুরাতন দোতলা বাড়িটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঙালীর শিল্প-সংস্কৃতির ইতিহাস। এই বোর্ডিংটিকে মনে করা হয় বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির গুণী মানুষদের আড্ডার একটি কেন্দ্র বা ইতিহাসের ভিত্তিভূমি হিসেবে। বিউটি বোর্ডিংয়ের জন্মলগ্ন থেকেই সেখানে আড্ডা দিতেন প্রথিতযশা কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, সাংবাদিক, চিত্রপরিচালক, নৃত্যশিল্পী, গায়ক, অভিনেতাসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ। আড্ডার আসরে যাঁরা আসতেন তাঁদের মধ্যে শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, রণেশ দাশগুপ্ত, ফজলে লোহানী, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, আবুল হাসান, মহাদেব সাহা, দেবদাস চক্রবর্তী, সমরজিৎ রায় চৌধুরী, ব্রজেন দাস, হামিদুর রহমান, আহমেদ ছফা, হায়াৎ মামুদ, সত্য সাহা, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, মুনতাসীর মামুন, ফতেহ লোহানী, জহির রায়হান, খান আতাউর রহমান, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, সৈয়দ শামসুল হক, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, নির্মল সেন, ফয়েজ আহমদ, গোলাম মুস্তাফা, খালেদ চৌধুরী, সমর দাশ, ফজল শাহাবুদ্দিন, সন্তোষ গুপ্ত, আনিসুজ্জামান, নির্মলেন্দু গুণ, বেলাল চৌধুরী, শহীদ কাদরী, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, মহিউদ্দিন আহমেদ, আসাদ চৌধুরীসহ আরও কতশত নাম উল্লেখ করা যায়।

পুরনো সেই দিনের মতো তাই এই প্রজন্মের কয়েকজন মিলে তেমনই এক সম্মিলনীর আয়োজন করে ঐতিহ্যবাহী এ বোর্ডিং প্রাঙ্গণে। দিনটা ছিল গত ১২ জুন শুক্রবার। আর্টিস্ট গ্রুপ ‘জংশন’-এর উদ্যোগে আয়োজন করা হয় একটি চিত্রপ্রদর্শনী ও সম্মিলনীর। শিরোনাম রাখা হয় ‘স্মৃতির আলেখ্য’। পেন্সিলে আঁকা সাত চিত্রশিল্পীর কাজ নিয়ে এ আয়োজনে প্রদর্শিত হয় প্রায় শতাধিক চিত্রকর্ম। অংশগ্রহণকারী শিল্পীরা হলেনÑ রহিমা আফরোজ, আমজাদ আকাশ, ফাতেমা মুন্নী, আলমগীর হোসেন তানজীব, কামরুজ্জোহা, উম্মে সোহাগ, ইকবাল বাহার চৌধুরী। প্রদর্শিত চিত্রকর্মগুলোতে রেখায়-রেখায় যেন ফুটে ওঠে হাজারো কথা। বিবিধ থিমে চিত্রগুলোতে প্রকাশ পেয়েছে মূর্ত, বিমূর্ত ও অর্ধবিমূর্ত নানারূপ। এ কথা সত্য, রাজনীতি ও সমাজের নানা ইস্যু বরাবরই আন্দোলিত করে শিল্পীকে। আর তার রেশ পাওয়া যায় এ সব শিল্পকর্মেও। এসব ড্রয়িং যেন শুধু একেকটি শিল্পকর্ম নয়; একেকটি সময়ের সাক্ষী। মাধ্যমটা পেন্সিল হলেও প্রত্যেক শিল্পী কাজ করেছেন স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে। তাই সহজেই আলাদা করে বোঝা যাচ্ছিল কাজের বিবিধ ধারা। রেখাচিত্রে মূর্ত হওয়া ল্যান্ডস্কেপ যেমন মোহিত করে, তেমনি রেখার টানে চিত্রিত মুখাবয়বে ক্ষোভের ভাষা কখনও-বা জন্ম দেয় একাত্মবোধের। আয়োজকদের কথা, ‘অঙ্কনে পেন্সিল একটি অকৃত্রিম মাধ্যম। আমরা চেয়েছি, এই মাধ্যমটির চর্চা ভিন্নমাত্রা যোগ করুক আমাদের অঙ্কন শৈলিতে। প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গে পেন্সিলের যোগসূত্র প্রাচীন। প্রাত্যহিক জীবনের চিত্রকে তুলে আনতে চেয়েছি পেন্সিলের রেখায়।’ স্থান সঙ্কলনের পেছনের কারণ সম্পর্কে তাদের অভিমত, ‘বিউটি বোর্ডিং ঐতিহ্যের দিক থেকে সুপরিচিত। দেড়শ’ বছরের পুরনো এই ভবনটি এখনও জেগে আছে নবীন-প্রবীণের আড্ডার হুল্লোড়ে। এখানে যাঁরা আড্ডা দিতেন, প্রখ্যাত কবি, সাহিত্যিক, চিত্রকর, সাংবাদিক, তাঁদের অনেকেই এখন নেই। আছে শুধু তাঁদের স্মৃতি। তাই আমরা আমাদের কাজের সঙ্গে বিউটি বোর্ডিংয়ের ঐতিহ্যের সাদৃশ্য খুঁজতে এখানে প্রদর্শনীর আয়োজন করেছি। কারণ বিউটি বোর্ডিংও যুগে যুগে প্রাত্যহিক জীবনের নানা ঘটনার সাক্ষী। আর এটা প্রথাগত প্রদর্শনী শুধু নয়, এখানে উপস্থিত হওয়া নবীন-প্রবীণের আড্ডা ও আলোচনার মাধ্যমে আমরা আমাদের সৃজিত শিল্পকর্মের ভাল-মন্দ দিক সম্পর্কে জানতে চেষ্টা করেছি।’

আয়োজদের একজন শিল্পী আমজাদ আকাশের মুখ থেকে শুনতে পাই এ প্লাটফর্মের আদ্যাপ্রান্ত। তিনি বলেন, ‘জংশন মূলত সমসাময়িক শিল্পীদের একটি গ্রুপ। যেখানে তরুণ শিল্পীরা শিল্পের চর্চা করেন সম্মিলিত আলোচনা ও চর্চার ভিত্তিতে। মননে তরুণ যে কোন শিল্পী এখানে কাজ করতে পারেন গ্রুপের নীতিমালা মেনে। মুক্তচিন্তার মাধ্যমে শিল্পচর্চার একটি প্লাটফর্ম জংশন। এর যাত্রা শুরু হয় ২০১২ সালে। প্রথম দলীয় প্রদর্শনীর শিরোনাম ছিল ‘জংশন’। ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে ঢাকা আর্ট সেন্টারে অনুষ্ঠিত হয় এই প্রদর্শনী। এরপর আরেকটি দলীয় প্রদর্শনী ‘হুইসেল’। এটি ২০১৩ সালের জুনে শিল্পাঙ্গন গ্যালারিতে অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবিতে জেগে ওঠা শাহবাগ আন্দোলনকে সামনে রেখে শাহবাগে ইনস্টলেশন আর্ট উপস্থাপন করে জংশন।’

যাপিত জীবনের প্রাত্যহিক আনন্দ-বেদনার পাশাপাশি দ্রোহে-বিদ্রোহে জেগে ওঠা বোধের পরিচয় মেলে জংশন-এর এই আয়োজনে। কোন কোন চিত্রের সামনে একটু থমকে দাঁড়াতেই হয়, চিত্রের আকুতি যেন কিছুক্ষণ আবিষ্ট করে রাখে কোন এক মোহে। কোন চিত্র আবার মেলে ধরে দৈনন্দিন গল্পের ঝাঁপি। রেখার খেলায় জীবনকে মাতিয়ে তোলেন শিল্পী। নিখুঁত কাজের পেছনে শিল্পীর নিবিষ্ট মনোযোগ আর শ্রমের অতুলনীয় প্রয়োগ অস্বীকার করার অবকাশ নেই। বেশকিছু চিত্রে মিলল সেই মনোযোগ আর শ্রমের পরিচয়। নির্মাণ ও বিনির্মাণে এক একটি চিত্রপটে নানা বিচিত্র ভাবনার খেলা। কখনও মনে হয়, এই তো এখানেই জীবনের সুখের সুরধারা। কখনও মনে হয়, এখানেই বিদ্রোহের রূপ, এখানেই জীবনের নব সূচনা।

প্রকাশিত : ১৬ জুন ২০১৫

১৬/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: