কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

শিক্ষাঙ্গনে শাসন নাকি নির্যাতন

প্রকাশিত : ১৫ জুন ২০১৫
  • মো. আবু হাসান তালুকদার

থমথমে চেহারা টলটলে চোখে নওশীন স্কুল থেকে বাসায় ফিরল। মা ওকে দেখেই কোন দুঃসংবাদের পূর্বাভাস আঁচ করল। কি হয়েছে জিজ্ঞেস করতেই নওশীন মাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। বাঁধভাঙ্গা কান্না আর থামতেই চায় না। অনেক কষ্টে কান্না থামানোর পর মা মেয়ের কাছ থেকে যা শুনল, তা শুনে সে রাগে দুঃখে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেল। নওশীন ঢাকা শহরের স্থানীয় একটি স্কুলের পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্রী। মোটামুটি শান্ত স্বভাবের মেয়ে। প্রতিদিনের মতো আজকেও সে স্কুলে গিয়েছিল। গণিত ক্লাসে স্যার যে অংক করতে দিয়েছিল তা প্রায় শেষ করে ফেলেছে। এমন সময় পেছন থেকে তার এক সহপাঠী পিঠে খোঁচা দিয়ে বারবার অংকটি কিভাবে করবে জানতে চাচ্ছিল। নিজের অংক করা শেষ করে অগ্যতা বাধ্য হয়ে নওশীন পেছন ফিরে তার সহপাঠীকে অংকটি দেখিয়ে দিচ্ছিল। বিষয়টি শ্রেণী শিক্ষকের দৃষ্টি এড়ায়নি। দুজনকে দাঁড় করিয়ে সবার সামনে নিয়ে আসল। আর নওশীনকে বলতে লাগল প-িত হয়ে গেছ? দাঁড়াও পন্ডিতি দেখাচ্ছি। এরপর ওদের দুজনকে একে অপরের কান ধরে টানতে বলল। শিক্ষক বলল কান লাল করে দিবি। শত হলেও তারা বান্ধবী, তাই যাতে অন্যজন কষ্ট না পায় সেজন্য জোরে কান টানেনি। তাই শিক্ষক ক্ষিপ্ত হয়ে ওদের দুজনের হাতেই চারটি করে বেতের বাড়ি মেরেছে এবং নিজেই কান ডলে দিয়েছে। নওশীনের কান লাল হয়ে গেছে এবং হাতের তালুও লাল হয়ে ফুলে গেছে। একই অবস্থা ওর বান্ধবীরও।

কেন শিক্ষকদের এই শাসনের (নাকি নির্যাতনের) প্রবণতা? একটা সময় ছিল যখন অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের জ্ঞানার্জনের জন্য গুরুজী বা প-িত মশাই বা মৌলভী সাহেবের নিকট দিয়ে আসত তখন তাদের অভয় দিয়ে বলত, আমার সন্তানের চামড়া-মাংস আপনার আর হাড় আমার। অর্থাৎ তাদের সন্তানদের জ্ঞানার্জনের স্বার্থে নির্যাতনের ফ্রি লাইসেন্স। এতে কতটা লাভ হতো তা তখনকার অভিভাবকরাই জানেন। ‘মাইরের মধ্যে ভাইটামিন আছে।’ এটা অনেকদিন আগে প্রচারিত টিভি নাটকের একটি ডায়লগ। মূলত হাস্যরসের জন্যই ছিল এই ডায়ালগটি। কিন্তু মনে হয় কতিপয় শিক্ষক এই ডায়লগটি মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন। তাই তারা শিশুদের ওপর ‘মাইর’ নামক ভিটামিন প্রয়োগ করেন। যাতে তাদের মগজ ভাল হয় এবং পড়াশোনা শিখে। অনেক শিক্ষক দম্ভ করে বলেন, মাইরের ওপর ওষুধ নাই। দুষ্টুমি করবে আবার, মাইরের চোটে বাপ বাপ করে ডাকবে।

শিশুদের ওপর কেন এই শাস্তি বা নির্যাতন। তারা কি অপরাধী? শিশুরা অপরাধ করে না, ভুল করে। ভুলের শাস্তি এত? বড়দের ভুলের শাস্তি তো হয় না। কোন শিশু যদি অপরাধ করে তার জন্য দায়ী কে? আমি, আপনি, আমরা, শিক্ষাঙ্গন, পরিবার, সমাজ এর জন্য দায়ী। আমরাই তাদের অপরাধের দিকে ঠেলে দিয়েছি। কচি মনে অপরাধের জন্য বীজ বপন করে দিয়েছি। এজন্য তার শাস্তি হবে কেন? যদি ভুলপথে যায় তা সংশোধনের দায়িত্ব আমাদের।

শিশুদের ওপর এই শাসন বা শাস্তি কি এনে দেয়? যে শিশু মহাআনন্দে স্কুলে যাওয়া শুরু করে সে শাস্তির ভয়ে স্কুলে যাওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। শাস্তির ফলে দৈহিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। স্বাভাবিক মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। মনোবল হারিয়ে ফেলে। শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির বাইরেও শাস্তি শিশুকে হীনম্মন্য করে গড়ে তোলে। শিক্ষকদের প্রতি বিরক্তি ও অপরাধ প্রবণ করে তোলে। পাঠে অনীহা সৃষ্টি হয়। শিশুটি হয়ে ওঠে অসামাজিক।

শাস্তি প্রদান করে আর যাই হোক শিশুদের প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা যায় না। এই উপলদ্ধি থেকেই সারা বিশ্বসহ বাংলাদেশেও প্রণীত হয়েছে বিভিন্ন নীতিমালা ও আইন। গৃহীত হয়েছে বিভিন্ন সনদ। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২১ এপ্রিল ২০১১ সালে ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র-ছাত্রীদের শারীরিক ও মানসিক শাস্তি রহিত করা সংক্রান্ত নীতিমালা-২০১১’ প্রণয়ন করা হয়েছে। এই নীতিমালায় দৈহিক শাস্তি যথা- কোন ছাত্র-ছাত্রীকে হাত-পা বা কোনকিছু দিয়ে আঘাত করা/বেত্রাঘাত করা, শিক্ষার্থীর দিকে চক/ডাস্টার বা এ জাতীয় যে কোন বস্তু ছুড়ে মারা, আছাড় দেয়া ও চিমটি কাটা, শরীরের কোন স্থানে কামড় দেয়া, চুল ধরে টানা বা চুল কেটে দেয়া, হাতের আঙ্গুলের ফাঁকে পেন্সিল চাপা দিয়ে মোচড় দেয়া, ঘাড় ধরে ধাক্কা দেয়া, কান ধরে টানা বা উঠবস করানো, চেয়ার, টেবিল বা কোনকিছুর নিচে মাথা দিয়ে দাঁড় করানো বা হাঁটু গেড়ে দাঁড় করে রাখা, রোদে দাঁড় করে বা শুইয়ে রাখা কিংবা সূর্যের দিকে মুখ করে দাঁড় করে রাখা, ছাত্র-ছাত্রীদের দিয়ে এমন কোন কাজ করানো যা শ্রম আইনে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং মানসিক শাস্তি যথা- কোন শিক্ষার্থীকে শ্রেণী কক্ষে এমন কোন মন্তব্য করা যেমন- মা-বাবা/বংশ পরিচয়/গোত্র/বর্ণ/ধর্ম ইত্যাদি সম্পর্কে অশালীন মন্তব্য করা, অশোভন অঙ্গভঙ্গি করা বা এমন কোন আচরণ করা যা শিক্ষার্থীর মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করতে পারে, যা শাস্তি হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। উক্ত শাস্তি প্রদানে সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে ১৯৭৯ সালের সরকারী কর্মচারী আচরণ বিধিমালার পরিপন্থী হবে ও শাস্তিমূলক অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে এবং অভিযুক্তের বিরুদ্ধে সরকারী কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপীল) বিধিমালা, ১৯৮৫ এর আওতায় অসদাচরণের অভিযোগে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে। প্রয়োজনে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনেও ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে।

১৯৮৯ সালের ২০ নবেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বিশ্বের শিশুদের মৌলিক মানবাধিকার, মর্যাদা রক্ষা, জীবনমান উন্নয়ন, স্বাধীনতা, নিরাপত্তা, কল্যাণ এবং তাদের বিকাশের স্বার্থে ঐকমত্যের ভিত্তিতে গৃহীত হয়েছে শিশু অধিকার সনদ। অর্থাৎ শিশুদের সার্বিক বিকাশ বা রক্ষা করা শিশু অধিকার সনদের অংশ। বাংলাদেশেও সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে ১৯৯৯ সাল হতে সনদটি বলবৎ আছে। উক্ত সনদে সামাজিক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশুরা যাতে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, কোন অন্যায় সুবিধাভোগীর শিকার না হয়, সেজন্য উপযুক্ত সব ব্যবস্থা গ্রহণ করতে রাষ্ট্রকে বলা হয়েছে। শিশুদের রক্ষায় বাংলাদেশের সংবিধানে আইন আছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দৈহিক শাস্তি অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করে মহামান্য হাইকোর্টের রায় আছে।

সকল শিক্ষকদের প্রতি বিনীত শ্রদ্ধা রেখে বলতে চাই। আমাদের অভিযোগ সকল শিক্ষকদের বিরুদ্ধে নয়, কতিপয় শিক্ষকদের বিরুদ্ধে। অভিযোগের তীর সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দিকে নয়, কতিপয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দিকে। শিশুরা শুধু কি শিক্ষক দ্বারা নির্যাতিত হচ্ছে? মা-বাবা বা অভিভাবক এমনকি সমাজ দ্বারাও নির্যাতিত হচ্ছে। অনেক অভিভাবক আছেন যারা সন্তান পরীক্ষায় ভাল ফল না করলে বা কম নম্বর পেলে পুরো প্রতিষ্ঠান গরম করে ফেলেন। কেন তার সন্তান কম নম্বর পেল এ নিয়ে মনোকষ্ট আপসোস ও ক্ষোভের শেষ নেই অনেকের। অনেকেই আবার সন্তান ভাল ফল না করলে সামাজিকভাবে হেয় হয়ে যান এ রকম মনে করেন। ফলে তারা শিক্ষদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন। যেভাবেই হোক তার সন্তানকে ভাল রেজাল্ট করতেই হবে। তারা সন্তানের ওপর চাপ প্রয়োগ করেন, কেউ কেউ মারধরও করেন। ভাবখানা এমন যেন সন্তানের ভাল শিক্ষা, ভাল মানুষ হওয়া নয়, ভাল ফলই মুখ্য বিষয়।

বিজ্ঞানের দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিবর্তিত বিশ্ব প্রেক্ষাপটে যুগের প্রয়োজন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শাস্তি দেয়ার রীতিকে রোধ করতে হবে। উন্নত বিশ্বে বাবা-মা যেখানে সন্তানকে শাস্তি দেয়ার অধিকার সংরক্ষণ করে না সেখানে শিক্ষকরা শাসনের নামে নির্যাতন করবে এটা মেনে নেয়া যায় না। শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য প্রয়োজন শিক্ষার সুষ্ঠু, সুন্দর, বন্ধু বাৎসল ও ভয়হীন পরিবেশ।

প্রকাশিত : ১৫ জুন ২০১৫

১৫/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: