আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

রাঙ্গামাটিতে জেএসএসের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত তিন ইউপিডিএফ কর্মী

প্রকাশিত : ১৫ জুন ২০১৫
  • ইউপিডিএফের অন্তর্কোন্দলের পরিণতি : বলছে জনসংহতি
  • রাঙ্গামাটিতে মঙ্গলবার অর্ধদিবস হরতাল আহ্বান

মোহাম্মদ আলী, রাঙ্গামাটি, ১৪ জুন ॥ পার্বত্য জেলার রাঙ্গামাটির লংগদুতে জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) ক্যাডারদের সঙ্গে সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছে ইউপিডিএফের (ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট) তিন কর্মী। রবিবার ভোর রাতে উপজেলার ভাইবোন ছড়া যৌথ খামার এলাকায় এ ঘটনা ঘটেছে। নিহত তিন ইউপিডিএফ কর্মীরা হচ্ছে মনি চাকমা (৪০), অনিক চাকমা (৩০) সুমন চাকমা (৩৫)। সংঘর্ষের এ ঘটনায় সুজয় চাকমা নামের আরও এক ইউপিডিএফ কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছে বলে জানা গেলেও পুলিশ তা জানে না বলে জানিয়েছে। এ ঘটনার প্রতিবাদে ইউপিডিএফ আগামীকাল মঙ্গলবার রাঙ্গামাটিতে অর্ধদিবস হরতাল আহ্বান করেছে।

এদিকে, এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে জনসংহতি সমিতির পক্ষে বলা হয়েছে এ ঘটনা ইউপিডিএফের অন্তর্কোন্দলের জের। অপরদিকে, ইউপিডিএফের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে সরকারের সহযোগিতা নিয়ে জনসংহতি ক্যাডাররা পাহাড়ে এখন তাদের সংগঠনের নেতাকর্মীদের হত্যা, গুম, অপহরণের ঘটনায় লিপ্ত রয়েছে। তবে জনসংহতি সমিতি ইউপিডিএফের এ দাবি অস্বীকার করেছে। তবে জেলা ও পুলিশ প্রশাসন সূত্রে বেসরকারীভাবে বলা হয়েছে ঘটনাটি জনসংহতি সমিতি ও ইউপিডিএফের সশস্ত্র ক্যাডারদের মধ্যে সংঘটিত। বর্তমানে জনসংহতি সমিতি পার্বত্য অঞ্চল জুড়ে তাদের আধিপত্য বিস্তারে মরিয়া হয়ে উঠেছে বলে স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হচ্ছে।

সংঘর্ষের পর স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে জানানো হয়েছে, ইউপিডিএফের কয়েকজন কর্মী যৌথ খামারের গোল্লাছড়া গ্রামে একটি বাড়িতে অবস্থান নেয়। প্রতিপক্ষ পার্বত্য শান্তি চুক্তির পক্ষের একটি গ্রুপ এসে ভোররাতে ওই ঘরে থাকা যুবকদের লক্ষ্য করে ব্রাশফায়ার করে। এই সময়ে ইউপিডিএফের পক্ষ থেকেও পাল্টা গুলি করলে উভয়ের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। কিন্তু পুলিশ বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারেনি। সংঘর্ষের এক পর্যায়ে প্রতিপক্ষ গ্রুপের সন্ত্রাসীরা ওই ঘরটি আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। এই সময়ে ব্রাশফায়ারে নিহত ঋদুমনি চাকমা নামে একজনের লাশ ওইঘরে পুড়ে যায়। লংগদু থানার ওসি আবুল কালাম চৌধুরী পুলিশ দল নিয়ে বিকেলে নিহতদের লাশ উদ্ধার করে লংগদু থানায় নিয়ে আসেন। সুরতহাল শেষে ময়নাতদন্তের জন্য রাঙ্গামাটি জেনারেল হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করে । লাশে মধ্যে একটি পোড়া লাশ রয়েছে বলে তিনি জানান। এ ব্যাপারে লংগদু থানায় একটি হত্যা মামলা হয়েছে। ঘটনার খবর পেয়ে সেনা, বিজিবি ও পুলিশের একটি যৌথ দল ওই এলাকায় তল্লাশি অভিযান শুরু করেছে বলে রাঙ্গামাটির পুলিশ সুপার সাঈদ তারিকুল হাসান জানান।

এই ঘটনার জন্য ইউপিডিএফ তাদের প্রতিপক্ষ পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতিকে দায়ী করলেও জেএসএস এই ঘটনার সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা নেই বলে জানান। তারা এটিকে ইউপিডিএফের অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে দায়ী করেছেন। এই ঘটনার জন্য ইউপিডিএফের নেতা মাইকেল চাকমা জেএসএসের সন্ত্রাসী দলকে দায়ী করেছেন এবং নিহত সকলে ইউপিডিএফের কর্মী বলে জানিয়েছেন।

গোলাগুলির ঘটনার বিষয়ে লংগদু উপজেলার লংগদু ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সুকুমার চাকমা টেলিফোনে জানিয়েছেন, আমরা গোলাগুলির শব্দের কথা স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে জেনেছি এবং ৩ জনের মৃত্যুর খবর শুনেছি। লংগদু উপজেলা সদর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরবর্তী ওই গ্রামে পুলিশ গেছে বলে তিনি জানান। অপরদিকে, রাঙ্গামাটির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোঃ শহিদ উল্লাহ জানিয়েছেন তারা ও এই গোলাগুলির ঘটনা এবং ৩ জন নিহত হওয়ার কথা নিশ্চিত হয়েছেন। এই স্থানে গত বছর অনুরূপ এক সংঘর্ষে ৩ জন নিহত হয়। এলাকাটি কাঠের চাঁদা আদায়ে উর্বর স্থান হিসেবে খ্যাত। গত বছর ওই এলাকার পার্শ¦বর্তী এলাকা থেকে রাঙ্গামাটি বন সার্কেলের ২ কর্মকর্তা ও এক কাঠের জোত মালিককে সন্ত্রাসীরা অপহরণ করে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করে একমাস পর ছেড়ে দেয়। এসব কারণে এলাকাটা চাঁদাবাজদের জন্য স্বর্গ ভূমি। তাই এখানে এত হানা হানি হচ্ছে বলে ভিন্ন একটি সূত্রে জানা যায়।

এদিকে এই ঘটনার সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করে দলের সহ প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা জানিয়েছেন এটি ইউপিডিএফের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ফল। তারা এই ঘটনার সঙ্গে কোনভাবে জড়িত নয়।

১৯৯৮ সালের ২ ফেব্রুয়ারি শান্তি চুক্তির বিরোধিতা করে জনসংহতি সমিতি ভেঙ্গে ইউপিডিএফ জন্ম নেয়। তারা পার্বত্য চট্টগ্রামে পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসন চায়। সেই থেকে উভয় গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ-পাল্টা সংঘর্ষ চলতে থাকে। নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র মতে, গত ১৭ বছরে উভয়ের মধ্যে ১৭৫টি সংঘর্ষ হয়েছে। এসব সংঘর্ষে উভয় গ্রুফের অন্তত ৮শ’ নিহত ও আহত হয়েছে প্রায় এক হাজার লোক এবং উভয় গ্রুপের মধ্যে অপহৃত হয়েছে আরও দেড় হাজার লোক। যাদের অনেকের কোন হদিস নেই। পাহাড়ে মূলত এই সংঘর্ষ হচ্ছে এলাকার আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে। আর গাছ, বাঁশ, মাছ থেকে শুরু করে ঠিকাদারী ও চাকরিজীবী পর্যন্ত তাদের চাঁদার হাত সম্প্রসারিত রয়েছে। সূত্র মতে, যে গ্রুপ যত বেশি এলাকা দখল করে রাখতে পারবে ওই গ্রুপ তত বেশি চাঁদা আদায় করতে পারবে। এই সূত্র থেকে পাহাড়ে প্রতি নিয়ত সন্ত্রাসী গ্রুপের সংঘর্ষ ঘটেই চলেছে।

এদিকে রাঙ্গামাটির লংগদুতে সন্ত্রাসীদের ব্রাশফায়ারে ইউপি ডিএফের তিন কর্মী নিহত হওয়ার প্রতিবাদে আগামীকাল মঙ্গলবার রাঙ্গামাটিতে অর্ধদিবস সড়ক ও নৌপথ অবরোধের ডাক দিয়েছে ইউপিডিএফ। তারা রাঙ্গামাটির সদর উপজেলার কুতুকছড়ি, নানিয়ারচর ও কাউখালী উপজেলায় রবিবার বিকেলে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে। কুতুকছড়ির প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তব্য দেন ইউপিডিএফের রাঙ্গামাটি জেলা শাখার বাবলু চাকমা ও সাধারণ সম্পাদক অনিল চাকমা। তারা এই ন্যক্কারজনক ঘটনার তীব্র নিন্দা ও দোষী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। একই সঙ্গে সন্তু লারমাকে ভ্রাতৃঘাতি যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য আহ্বান জানান।

প্রকাশিত : ১৫ জুন ২০১৫

১৫/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: