মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

মামলাজট নিরসনে ৫ হাজার বিচারক নিয়োগের সুপারিশ

প্রকাশিত : ১৪ জুন ২০১৫
  • বিচারিক আদালতে ১৭ লাখ ৭ হাজার ৯৯৩, ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১ লাখ ৫ হাজার ৩৮ মামলা বিচারাধীন

আরাফাত মুন্না ॥ দেশের বিচারাঙ্গনে পাহাড় পরিমাণ মামলাজট নিরসনে পাঁচ হাজার বিচারক নিয়োগের সুপারিশ জানিয়েছে আইন কমিশন। রাজশাহী জেলা আদালত পরিদর্শনের পর সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এমন মতামত দিয়েছে আইন কমিশন। এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে বিরাজমান বিপুল মামলাজট বিষয়ক সঙ্কট থেকে উত্তরণের জন্য ন্যূনতম পাঁচ হাজার বিচারক এই মুহূর্তে নিয়োগ করা প্রয়োজন বলে আইন কমিশন মনে করে। এছাড়া দেশের বিচারিক আদালতসমূহে বিচারাধীন বিশাল মামলাজটের বেশকিছু কারণও চিহ্নিত করা হয়েছে এই প্রতিবেদেনে। একই সঙ্গে এসব সমস্যা সমাধানে সাত দফা সুপারিশও করেছে আইন কমিশন।

বর্তমানে বিচারিক আদালতে বিচারকের সংখ্যা এক হাজার সাত শ’ জন। অন্যদিকে এসব আদালতে (জেলা ও দায়রা জজ আদালতসহ সকল প্রকার ট্রাইব্যুনাল) ১৭ লাখ ৭ হাজার ৯শ’ ৯৩টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। আর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে রয়েছে ১০ লাখ ৫ হাজার ৩শ’ ৮০টি মামলা।

সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক আইন কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর ঢাকা, ময়মনসিংহ ও রাজশাহী জেলা জজ আদালত পরিদর্শনে যান। এসব আদালতের বিভিন্ন মামলার ওপর গবেষণা করে প্রতিবারই মামলাজট কমাতে সুপারিশসহ প্রতিবেদন তৈরি করেন। এসব প্রতিবেদনে বার বারই বিচারক সংখ্যা বাড়ানোর কথা বলেছেন তিনি। পাশাপাশি চুক্তিভিত্তিক বিচারক নিয়োগের কথাও উল্লেখ করেছেন। এমনকি তিনি প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাসহ সাবেক কয়েকজন প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে একটি আলোচনায় অংশ নিয়েও এ প্রস্তাব দেন।

সর্বশেষ রাজশাহী জেলা আদালত পরিদর্শনের পর প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে বিরাজমান বিপুল মামলাজট বিষয়ক সঙ্কট থেকে উত্তরণের জন্য ন্যূনতম পাঁচ হাজার বিচারক এই মুহূর্তে নিয়োগ করা প্রয়োজন বলে মনে করে আইন কমিশন। উল্লেখ্য, বর্তমানে নিম্ন আদালতে ফৌজদারি ও দেওয়ানি মোকদ্দমার সংখ্যা প্রায় ৩০ লাখ এবং নিষ্পত্তির তুলনায় নতুন মামলা দায়েরের আধিক্যের কারণে এ সংখ্যা প্রতিদিনই বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এই প্রতিবেদনে আদি এখতিয়ারসমৃদ্ধ দেওয়ানি আদালতসমূহে মামলার বিচারে দীর্ঘসূত্রতার ১৮টি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো হলোÑ সমন ও নোটিস জারিতে বিলম্ব, ভিন্ন জেলার সমন ও নোটিস জারি, বিবাদী কর্তৃক লিখিত জবাব দাখিলে অস্বাভাবিক বিলম্বের প্রবণতা, বাদীপক্ষ কর্তৃক পুনঃ পুনঃ আরজি সংশোধন, অন্তর্বর্তীকালীন দরখাস্ত দাখিলের প্রবণতা, বাদীপক্ষে প্রয়োজনীয় তদবির গ্রহণে সময়ক্ষেপণের প্রবণতা, কোর্ট গার্ডিয়ান নিয়োগে অস্বাভাবিক বিলম্ব, উচ্চ আদালত কর্তৃক নথি তলব, সংশ্লিষ্ট মামলার আদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিভিশন মোকদ্দমা নিষ্পত্তিতে বিলম্বজনিত দীর্ঘসূত্রতা, উচ্চ আদালত কর্তৃক স্থগিতাদেশ, বিচারকের অপ্রতুলতা, দেওয়ানি আদালতসমূহে মোকদ্দমার আধিক্য, আপীল আদালত কর্তৃক পুনর্বিচারে প্রেরণের প্রবণতা, পারিবারিক মামলাতে আপোসের অজুহাতে সময়ক্ষেপণ, সাক্ষ্য উপস্থাপনে অনীহা, এজলাস সঙ্কট, আদালত কর্তৃক তলবকৃত নথি/ভলিউম প্রেরণে বিলম্ব এবং সহকারী জজ এবং সিনিয়র সহকারী জজদের স্টেনোটাইপিস্ট ও কম্পিউটার না থাকা।

এই প্রতিবেদনে বলা হয়, দেওয়ানি আদালতে মামলা দায়েরের সময় সংশ্লিষ্ট বিচারকগণ বাদীপক্ষে আরজি পরীক্ষণ ও পর্যালোচনা করে ওই আরজির গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করলে কিংবা প্রয়োজন মনে করলে শুনানি করে প্রয়োজনীয় আদেশ দিলে দেওয়ানি মামলার দীর্ঘসূত্রতা অনেকাংশেই এড়ানো সম্ভব।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দেওয়ানি আদালতের বিচারকবৃন্দকে সাক্ষ্যগ্রহণ ও রায় প্রদানের পাশাপাশি নিয়মিতভাবে আদালত ব্যবস্থাপনা ও কেস ব্যবস্থাপনার দিকে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে। মামলার কোর্ট ফি ভালভাবে যাচাই করা, সমন জারির হার তদারকি করা, অন্তর্বর্তীকালীন দরখাস্তসমূহের আদেশ প্রদানের বিষয়ে প্রত্যেক বিচারককে অধিকতর সচেতনতার পরিচয় দিতে হবে।

আইন কমিশনের এই প্রতিবেদনে আপীল আদালতসমূহে দেওয়ানি আপীল ও রিভিশন মামলার বিচারে দীর্ঘসূত্রতার জন্য ১২টি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো হলোÑ নথিতে এলসিআর শামিল হতে দেরি হওয়া, ভিন্ন জেলার নোটিস বার বার গরজারি হওয়া বা নোটিস জারিতে অস্বাভাবিক বিলম্ব হওয়া, আপীলকারী পক্ষের প্রয়োজনীয় তদবিরের অভাব কিংবা তদবির গ্রহণে অস্বাভাবিক বিলম্ব করা, আপীলের মেমোতে নোটিস জারির ঠিকানা সঠিক না থাকা, রেসপন্ডেন্টের মৃত্যুতে প্রয়োজনীয় তদবিরের অভাব, আপীলের মেমোতে পুনঃ পুনঃ সংশোধন করা, বিশেষজ্ঞ মতামত বিষয়ক প্রতিবেদনের ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ সাক্ষ্যগ্রহণে অহেতুক সময়ক্ষেপণ, অতিরিক্ত সাক্ষ্যগ্রহণে মামলার পক্ষসমূহের সময়ক্ষেপণ, আপীলের বিভিন্ন পর্যায়ে পক্ষগণের অতিরিক্ত সময় গ্রহণ ও কালক্ষেপণ, তলবকৃত নথি প্রেরণে বিলম্ব, নানা কারণে মামলা পি-বোর্ড হতে উত্তোলন এবং হরতাল ও আইনজীবীর মৃত্যুর কারণে আদালত মুলতবির স্থানীয় নীতি।

এই প্রতিবেদনে ফৌজদারি মামলার বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো হলোÑ অপরাধের তদন্তে তদন্তকারী সংস্থাসমূহের অতিরিক্ত সময়ক্ষেপণের প্রবণতা, নারাজি দরখাস্ত শুনানিতে সময়ক্ষেপণ, আদালতে সাক্ষী উপস্থিতি নিশ্চিতকরণে পুলিশ প্রশাসনের ব্যর্থতা, মামলার নথিতে গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রের অনুপস্থিতি, একই বিচারকের ওপর একাধিক আদালতের ভার ন্যস্ত থাকা, উচ্চ আদালত কর্তৃক স্থগিতাদেশ, রিভিশন মামলায় ব্যবহারের জন্য নিম্ন আদালতের নথি উচ্চ আদালতে আটকে থাকা এবং আইনজীবীদের সময় প্রার্থনার প্রবণতা।

এই প্রতিবেদনে এসব সমস্যা সমাধনে আইন কমিশন সাতটি সুপারিশ করেছে। এগুলো হলোÑ বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধি করা, প্রয়োজনে চুক্তিভিত্তিক বিচারক নিয়োগ, এজলাসের অভাব নিরসনে জরুরী ভিত্তিতে বহুতল ভবন নির্মাণ, আপাতত জেলা প্রশাসকের অফিসে অবস্থিত ম্যাজিস্ট্রেটগণের এজলাসে জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের অস্থায়ী এজলাস স্থাপন করা যেতে পারে। প্রয়োজনীয় সংখ্যক কম্পিউটার, ইন্টারনেট সরঞ্জামাদি, স্টেনো টাইপিস্ট প্রসেস সার্ভার নিয়োগ। পর্যাপ্ত বই-পুস্তক সরবরাহপূর্বক প্রতিটি আদালতে লাইব্রেরির আধুনিকীকরণ। প্রতিটি জেলায় একটি কমিটি গঠনপূর্বক প্রতি তিন মাস অন্তর মাসের প্রথম সপ্তাহে জেলা জজ, চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, অন্যান্য বিচারক, জেলা প্রশাসক ও জেলা পুলিশ সুপারের উপস্থিতিতে বিচার প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন প্রস্তুত করে সুপ্রীমকোর্ট, জাতীয় সংসদের স্থায়ী কমিটি ও আইন মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ।

প্রকাশিত : ১৪ জুন ২০১৫

১৪/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: