মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

নরেন্দ্র মোদির সফর ॥ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সম্ভাবনা

প্রকাশিত : ১৪ জুন ২০১৫
  • ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির গত ৬ ও ৭ জুন বাংলাদেশ সফরকে একটি ঐতিহাসিক মাত্রা দিয়েছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার কূটনৈতিক ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে সাফল্য হিসেবে একে বিবেচনা করা যেতে পারে। শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদির যৌথ ইশতেহারে বর্ণিত ৬৫টি দফা যদি কার্যকর হয়, তবে উভয় দেশের মানুষের কল্যাণ হবে । ‘নতুন প্রজন্ম-নয়া দিশা’ শীর্ষক যৌথ ইশতেহারটি দ্বিপাক্ষিক ও আঞ্চলিক উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধকরণে একটি মাইলফলক হিসেবে বর্তমান প্রজন্মের কাছে উপস্থাপিত হয়েছে।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্থলসীমান্ত আইন, ১৯৭৪ গৃহীত হয় নয়াদিল্লীতে ১৬ মে, ১৯৭৪ সালে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শ্রীমতী ইন্ধিরা গান্ধী চুক্তি স্বাক্ষর করলেও ভারতের দিক থেকে চুক্তি বাস্তবায়নে সমস্যা ছিল। ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর থেকেই স্থল ও সমুদ্র সীমান্ত নিয়ে যে সমস্ত বিরোধ ছিল, তা দূর করার চেষ্টা করা হয়। বাংলাদেশের সমুদ্র বিজয় অর্জিত হলো এবং স্থলসীমান্ত চুক্তিও সফলভাবে সম্পাদিত হলো।

দু’টো দেশের মধ্যে ঐতিহাসিক বন্ধন থাকলেও কিছু সুযোগসন্ধানী নানা সময়ে ভারতবিরোধী বক্তব্যের মাধ্যমে জনগণকে বিভ্রান্ত করতে চেয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ভারতের যে অবদান, তা ভোলার নয়। স্থলসীমান্ত চুক্তির পাশাপাশি মৈত্রীর বন্ধন আবদ্ধ করতে হলে যে আস্থা অর্জন করা প্রয়োজন, সেটি মোদির এ সফরে সূচিত হয়েছে। অবশ্য মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময় যে নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছিল, তার শাখা-প্রশাখা মোদির এ সফরের মাধ্যমে আরও সুদৃঢ় হলো। এর ফলে দু’দেশের মধ্যকার প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক ব্যবসা-বাণিজ্য আরও বৃদ্ধি পাবে। ভূ-রাজনীতির কারণে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এদেশের গুরুত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় কূটনৈতিক সাফল্য নির্ভর করে থাকে মানুষের জীবনমান এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির বিকাশের মধ্য দিয়ে। এজন্যই দ্বিপাক্ষিক, আঞ্চলিক ও বহুপাক্ষিক সমঝোতা এবং তার সুষ্ঠু বাস্তবায়ন প্রয়োজন হয়। যৌথ ইশতেহারে নিরাপত্তাব্যবস্থা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুত ও জ্বালানি ক্ষেত্রে সহযোগিতা, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা, সামুদ্রিক অর্থনীতি, মানুষে-মানুষে যোগাযোগ, আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতায় নদী ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়।

নরেন্দ্র মোদি বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে গত ৭ জুন যে ভাষণ দিয়েছেন তাতে মনে হয় তিনি যেন এদেশের মানুষের হৃদয়ের কথা বলেছেন। এ মুগ্ধ আবেশ তখনই আরও বেগবান হবে যখন এদেশের মানুষ দেখবে যে, ভারতের সঙ্গে সাহায্য-সহযোগিতার মাধ্যমে উভয় দেশের জন্য প্যারেটো অপটিমালিটি তথা উইন-উইন সিচুয়েশন অর্জন করা সম্ভব হবে। দু’টো দেশই প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক ব্যবসা-বাণিজ্যের মধ্যে লাভবান হচ্ছে। রফতানি বাড়াতে পারলে এদেশের লাভ হবে। দু’দেশের সড়ক, রেল এবং নৌপথে মানুষের যাতায়াত ও পণ্য পরিবহন সহজ করার জন্য বিভিন্নমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। আঞ্চলিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে ভারতের ভূ-খণ্ড ব্যবহার করে ভুটান এবং নেপালে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এটি বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। মনমোহন সিংয়ের আমলে ভারত ১০০ কোটি ডলারের ঋণ চুক্তি করেছিল। পরবর্তীতে ২০ কোটি ডলার পদ্মা সেতুতে অনুদান হিসেবে দেয়া হয়েছে। এবার ভারত এদেশের যোগাযোগ ক্ষেত্র- সড়ক, রেলওয়ে, অভ্যন্তরীণ নৌপথে, তথ্যপ্রযুক্তি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নের জন্য ২০০ কোটি ডলারের ঋণ চুক্তি করেছে। ঋণের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য সুদের হার হচ্ছে ১%, যা ২০ বছর মেয়াদে পরিশোধযোগ্য এবং গ্রেস পিরিয়ড হচ্ছে ৫ বছর। ভারত থেকে মোট প্রকল্পের ৭৫% প্রোকিউরমেন্ট করতে হবে এবং সিভিল প্রকিউরমেল্ট হচ্ছে ৬৫%। প্রকল্পের ধারাসমূহ সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে উন্নয়ন ঘটবে। আমাদের ভৌত অবকাঠামো ও সামাজিক অবকাঠামো বিনির্মাণে যথেষ্ট মাত্রায় উদ্যোগী ভূমিকা পালন করতে হবে।

নদী ব্যবস্থাপনার ওপর গুরত্ব আরোপ করা হয়েছে এই সফরে। তিস্তা ও ফেনী নদীর চুক্তি সম্পাদিত হতে কিছু সময় লাগার কথা বলা হয়েছে। অন্য নদীগুলোর ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতার আশ্বাস রয়েছে। টিপাইমুখ জলবিদ্যুত প্রকল্প ভারত করবে না বলে মোদি আশ্বস্ত করেছেন। বস্তুত দু’দেশের অভিন্ন ৫৪টি নদীর পানিবন্টন ও পানি ব্যবস্থাপনার কথা উচ্চারিত হয়েছে। নদীমাতৃক বাংলাদেশের নৌপথে পণ্য পরিবহনের জন্য সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা দরকার। নদীর ওপর রয়েছে অর্থনীতির একটি বিশাল অংশ। নৌপথ বন্ধ হয়ে গেলে তা প্রাকৃতিক ভারসাম্য যেমন বিনষ্ট করে, তেমনি অর্থনৈতিতে অবদান কমে যায়। যৌথ নদী কমিশনের (জে আর সি) ৩৮তম বৈঠক অনুষ্ঠানের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। প্রস্তাব থাকবে, যারা বৈঠকে যাবেন তারা যেন যথেষ্ট হোমওয়ার্ক করে যান। গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়নসহ প্রধানমন্ত্রী ভারতের জন্য মংলা ও ভেড়ামারায় বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ গ্রহণ করার কথা বলেছেন। এটি যাতে এদেশের বৈদেশিক বিনিয়োগে সহায়তা করে, সেজন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

বিজিএমই নেতারা ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছে তার দেশে ৫০ একর জমি পোশাক খাতে ব্যবসা করার জন্য চেয়েছেন- যেখানে পোশাকের এক হাজার বিক্রয়কেন্দ্র স্থাপনে তারা আগ্রহী এবং মার্কিন ডলার ২.৫০ কোটি বিনিয়োগেও উৎসাহী। এছাড়া তারা বাংলাদেশ পোশাকের ওপর ভারতের কাউন্টার ভেলিং শুল্ক প্রত্যাহারের অনুরোধ জানিয়েছেন।

বাংলাদেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিদ্যুতের সরবরাহ বৃদ্ধি করা জরুরী হয়ে পড়েছে। ২০২১ সালের মধ্যে যাতে ২৪০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত বাংলাদেশে সরবরাহ নিশ্চিত করা যায় সেজন্য সরকার কাজ করে চলেছে। নরেন্দ্র মোদি বিদ্যুত উৎপাদন ও সঞ্চালন প্রক্রিয়ায় ভারতীয় প্রতিষ্ঠানসমূহকে বিনিয়োগে সুযোগ দিতে আগ্রহী। বাংলাদেশ, ভারত, ভুটান, নেপালের মধ্যকার আন্তঃদেশীয় বিদ্যুত গ্রিডের মাধ্যমে বিদ্যুত আমদানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বেশ আগ্রহী। ১০০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুত ভারত থেকে আমদানি পর্যায়ক্রমে করা যাবে। ভারতীয় রিলায়েন্স পাওয়ার লিমিডেট এবং আদানী পাওয়ার লিমিটেড বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের সঙ্গে চুক্তি করেছে, যাতে ৪৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত উৎপাদনের জন্য মার্কিন ডলার ৫.৫ বিলিয়ন বিনিয়োগ করবে। জ্বালানি সহযোগিতার আওতায় কয়লা, প্রাকৃতিক গ্যাস, এলএনজি, পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তেল, গ্যাস পাইপলাইনের ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে। জ্বালানি ক্ষেত্রে সহযোগিতার যথাযথ বাস্তবায়ন দেশের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারবে।

দু’দেশের জন্য জালনোট একটি বিশেষ সমস্যা। এ সমস্যা সমাধানে দু’দেশের প্রধানমন্ত্রী পারস্পরিক সহযোগিতা করতে আগ্রহী হয়েছেন। মানবপাচার রোধের ক্ষেত্রেও কঠোর অবস্থানে উভয় দেশের প্রধানমন্ত্রী সম্মত হয়েছেন। মানবপাচার একটি ঘৃণ্য অপরাধ। দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্র এবং শিক্ষিত-অশিক্ষিত মানুষের সমন্বয়ে এ মানবপাচারের চক্র কাজ করছে। মানবপাচার বন্ধ করতে হলে দেশী-বিদেশী গডফাদারদের খুঁজে বের করার জন্য বহুপাক্ষিক সাহায্য-সহযোগিতা প্রয়োজন।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যথার্থই বলেছেন যে, পানির তো কোন সীমানা নেই; এটি একটি মানবিক বিষয়, যা মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। তাঁর এ উদার বক্তব্য আসলে এখন বাস্তবায়নের প্রতীক্ষায়। তিস্তা চুক্তি নিশ্চয়ই হবে। ভারত এখন অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে পৃথিবীর মানচিত্রে তৃতীয় স্থান অধিকার করেছে। ভারতের অর্থনৈতিক উন্নয়নের যে গতি-প্রকৃতি তা আরও সম্প্রসারিত হবে। ভারত জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হতে ইচ্ছুক। ভারতের নিজের সমৃদ্ধির জন্যই বাংলাদেশের সঙ্গে সদ্ভাব সম্প্রসারিত করা প্রয়োজন। এজন্যই তিস্তা চুক্তি হবে বলে ধরে নেয়া যায়।

সামুদ্রিক অর্থনীতি নিয়ে এবারের সফরে আলোচনা হয়েছে। সামুদ্রিক অর্থনীতি পারে বাংলাদেশের জীবনমান উন্নত করতে। এজন্য প্রয়োজন একটি সঠিক রূপরেখা। সমুদ্র বিজয় অর্জনকে সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে আনতে হলে সমুদ্র সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার সুনিশ্চিত করতে হবে। এ ব্যাপারে জননেত্রী যেভাবে কাজ করে চলেছেন তা প্রশংসনীয়। বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার গত সাড়ে ছয় বছরে লুকিং এ্যাট দ্য ইস্ট পলিসি পরিলক্ষিত হচ্ছে। এটি প্রাচ্য দেশের ভৌগোলিক, সামাজিক, কৃষ্টিগত ক্রমবিকাশের ধারা। আমাদের গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের কাজ গ্রহণ করতে হবে। বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি করার মাধ্যমে এদেশের উন্নয়ন সম্ভব। ভারতের নামকরা হাসপাতালগুলো যদি জয়েন্ট ভেঞ্চারের ভিত্তিতে এদেশে হাসপাতাল খোলে, তবে স্বাস্থ্যসেবা ভাল হবে। স্বাস্থ্যের পাশাপাশি গুণগত মানসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, স্কুলের বিষয়টিও আসে। গুণগত মানসম্পন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যৌথ উদ্যোগে বেসরকারী খাতে প্রতিষ্ঠিত হলে তা এদেশের মানুষের উপকার করবে। শিক্ষায় বিনিয়োগ মানবসম্পদ সম্প্রসারণ এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিশাল ভূমিকা রাখে। আর যে গরু আনা-নেয়াকে কেন্দ্র করে সমস্যা হয় তা যদি বৈধতা পায় তবে সমস্যা মিটবে অনেকাংশে। মুক্তিযুদ্ধসহ বিভিন্ন সময়ে পরীক্ষিত বন্ধু ভারতের সঙ্গে আমাদের মৈত্রী ও বন্ধন বাড়ুক।

লেখক : ম্যাক্রো ও ফিন্যান্সিয়াল ইকোনমিস্ট ও শিক্ষাবিদ

প্রকাশিত : ১৪ জুন ২০১৫

১৪/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: