আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

চরাঞ্চলের রাখালদের খেলা বাঘ, হাতি, শেয়াল, কুকুর

প্রকাশিত : ১৩ জুন ২০১৫

দক্ষিণের সর্বশেষ ভাটির জেলা পটুয়াখালী। নদী প্রধান এ জেলায় এক সময়ে শিশু-কিশোর বয়সের ছেলেমেয়েদের মাঝে গোল্লাছুট, দাঁড়িয়াবান্ধা, ডাংগুলি, দোল্লা, ছিবুড়ি, চোর-পুলিশ, পাতাচিট, এক্কাদোক্কা, দড়িলাফ, বৌছি, মারবেল, চারা, লাটিম, ষোলগুটিসহ অজস্র খেলার প্রচলন ছিল। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে নানা কারণে এর অধিকাংশ খেলাই বিলুপ্ত হয়ে গেছে অথবা বিলুপ্তির প্রহর গুনছে। তাই বলে শিশু-কিশোরদের মাঝে খেলাধুলার মাধ্যমে বিনোদন একেবারে হারিয়ে যায়নি। তারা তাদের মতো করে নতুন নতুন খেলা আবিষ্কার করে নিয়েছে। বিশেষ করে চরাঞ্চলের বঞ্চিত শিশু-কিশোর, যাদের রুটি রুজির সংস্থান হয় মহাজনের গরু-মোষ পালন করে, তাদের মাঝে এ প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। বিচ্ছিন্ন কয়েকটি চর-দ্বীপ ঘুরে রাখাল শিশুদের কয়েকটি নতুন খেলার সন্ধান মিলেছে।

হাতি-হাতি, ঘোড়া-ঘোড়া, সিংহ-সিংহ, বাঘ-বাঘ। এগুলো বিভিন্ন প্রাণীর নাম। কিন্তু পটুয়াখালীর দুর্গম চরাঞ্চলের রাখাল শিশুদের কাছে নামগুলো পেয়েছে ভিন্নতর পরিচিতি। এগুলো সব খেলার নাম। সমাজের সুবিধাবঞ্চিত চরাঞ্চলের যেসব শিশু কখনই ক্রিকেট বা ফুটবলের মতো জনপ্রিয় খেলার চর্চা করতে পারছে না। পাচ্ছে না আধুনিক খেলাধুলার সরঞ্জাম বা অবসরে বিনোদনে অন্য কিছু। তারা নিজেদের মতো করে নতুন নতুন খেলা আবিষ্কার করে নিয়েছে। আর এসব খেলার নাম হয়েছে প্রাণীদের নামে। খালি হাত-পায়ে তারা সেসব খেলাধুলার মধ্যে দিয়ে অবসর সময়ের বিনোদনে নতুন মাত্রা যোগ করে নিয়েছে।

পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার দক্ষিণ প্রান্তের বিচ্ছিন্ন দ্বীপ আগুনমুখা চরে পা রাখতেই চোখে পড়ে রাখাল শিশু-কিশোরদের হৈ হুল্লোর। একবার দল বেঁধে আগুনমুখায় ঝাঁপ দিচ্ছে। পানিতে ভেজা শরীর নিয়ে মাঠের কচি ঘাষের বুকে শারীরিক কসরত করছে। পরক্ষণেই আরেকবার কাদা মাখামাখি করছে। প্রথম দেখায় মনে হবে এ শুধু পানিতে ভেজা আর আনন্দ-উল্লাসে মেতে ওঠা। কিন্তু না। এগুলোর সব কিছুতেই আছে ছন্দ। শিশু-কিশোরদের সঙ্গে আলাপ না হলে সাদা চোখে দেখে তা বোঝার কোনই উপায় নেই।

১৪ বছরের কিশোর মাসুদ রানা জানায়, এগুলো সবই ওদের খেলা। এগুলোর নামও বিচিত্র। যেমন বাঘ-বাঘ, কুমির-কুমির, শেয়াল-শেয়াল, সিংহ-সিংহ, ঘোড়া-ঘোড়া, হাতি-হাতি। বিভিন্ন প্রাণীর নামে এমন আরও বেশ কয়েকটি খেলা রয়েছে। এগুলোর নামকরণ ওরা নিজেরাই করে নিয়েছে। দল বেঁধে শেয়ালের মতো যে খেলাটি হয়, তার নাম শেয়াল-শেয়াল। কুকুর যে ভাবে চাল-চলন করে। ওরা খেলাতেও সে ভঙ্গি করে। তাই সে খেলার নাম কুকুর-কুকুর। মোরগ যেভাবে মাথা উঁচু করে চিৎকার করে। ওরা সেভাবে মাথা উঁচু করে। তাই সে খেলার নাম মোরগ-মোরগ। আরও বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে মাসুদ রানা জানায়, ওরা একে অপরের হাত ধরে সারি বেঁধে নদীতে ঝাঁপ দেয়। এ খেলাটির নাম কুমির-কুমির। ঝাঁপ দেয়ার সময়ে যার হাত সঙ্গীর কাছ থেকে ছুটে যাবে, সেই হবে কুমির। দলের অন্যেরা সবাই ডুব-সাঁতার দিয়ে অনেক দূরে চলে যায়। আর ‘কুমির’রূপি খেলোয়াড়ের দায়িত্ব কাউকে ছুঁয়ে দেয়া। যতক্ষণে কাউকে ছুঁতে না পারছে, ততক্ষণ তাকে কুমির হয়ে থাকতে হবে। বর্ষা আর নদীর পানিতে ভিজে চুপচুপে হয়ে যাওয়া আরেক রাখাল কিশোর ফারুক জানায়, ওরা দৌড় দিয়ে নদীতে ঝাঁপ দেবে। যে সবার থেকে পিছিয়ে পড়বে, সে তার শরীর বাঁকা করে বেশ কৌশলী হয়ে বসবে। তার পিঠে একের পর এক অন্যেরা উঠবে। দেখে মনে হবে যেন ওটা একটা পিরামিড। এ খেলাটির নাম হাতি-হাতি। যতক্ষণে নিচের কিশোরটি ক্ষমা না চাইবে, ততক্ষণ তাকে হাতি হয়ে বসে থাকতে হবে। বাঘ-বাঘ খেলাটিও বেশ মজার। একজন হবে বাঘ। অন্যেরা দল বেঁধে তার চারপাশে ঘুরবে। যেন খাঁচাবন্দী বাঘ। বাঘটি চারপাশের বেষ্টনীর ফাঁক দিয়ে বের হয়ে যেতে চাইবে। কিন্তু কঠোর সতর্কতার কারণে সে বাইরে যেতে পারবে না। বরং ছোটাছুটি করতে গিয়ে এক সময়ে তাকে ক্লান্ত হয়ে পড়তে হবে। ১৬ বছরের কিশোর রফিক জানায়, ঘোড়া-ঘোড়া খেলাটি আরও অদ্ভুত। এটিতে তিন-চারজন ঘোড়া সাজে। ঘোড়ারূপি কিশোর নির্বাচিত হয় দৌড়ের মাধ্যমে। যে বা যারা দৌড়ে সবার আগে নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছাতে পারবে, সে বা তারা ঘোড়া হতে পারবে। দলের অন্যেরা থাকবে নিচে। আর ঘোড়ারা থাকবে সবার ওপরে।

Ñশংকর লাল দাশ

গলাচিপা থেকে

প্রকাশিত : ১৩ জুন ২০১৫

১৩/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: