আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বাঙালী রেনেসাঁর অগ্রনায়ক

প্রকাশিত : ১২ জুন ২০১৫
  • মাহবুব রেজা

১৪ পৌষ, ১৩৪০ বঙ্গাব্দে মহাত্মা রাজা রামমোহনের মৃত্যুবার্ষিকীতে সভাপতির বক্তব্য দিতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলছেন, ‘তাঁর মৃত্যুর পর আজ একশত বৎসর অতীত হলো। সেদিনকার অনেক কিছুই আজ পুরাতন হয়ে গেছে, কিন্তু রামমোহন রায় পুরাতত্ত্বে¡র অস্পষ্টতায় আবৃত হয়ে যাননি। তিনি চিরকালের মতোই আধুনিক। কেননা তিনি যে কালকে অধিকার করে আছেন তার এক সীমা পুরাতন ভারতে, কিন্তু সেই অতীতকালেই তা আবদ্ধ হয়ে নেইÑতার অন্য দিক চলে গিয়েছে ভারতের সুদূর ভাবীকালের অভিমুখে। তিনি ভারতের সেই চিত্তের মধ্যে নিজের চিত্তকে মুক্তি দিতে পেরেছেন, যা জ্ঞানের পথে সর্বমানবের মধ্যে উন্মুক্ত। তিনি বিরাজ করছেন ভারতের সেই আগামীকালে, যে কালে ভারতের মহাইতিহাস আপন সত্যে সার্থক হয়েছে, হিন্দু মুসলমান খ্রিস্টান মিলিত হয়েছে অখ- মহাজাতীয়তায়।’ একই ভাষণে রবীন্দ্রনাথ আরও বলছেন, ‘রামমোহন যে কালে বিরাজ করেন সে কাল তেমনি অতীতে অনাগতে পরিব্যপ্ত, আমরা তার সেই কালকে আজও উত্তীর্ণ হতে পারিনি।’

মূলত রাজা রামমোহন রায় নিজেই নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী। বাঙালী রেনেসাঁস তথা নব জাগরণের অগ্রনায়ক বলা হয় তাঁকে। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে সম্বোধন করেছেন ভারত পথিক হিসেবে। সমাজবিজ্ঞানীরা ইউরোপের সমাজ সংস্কার (সড়ৎহরহম ংঃধৎ) আন্দোলনের অগ্রদূত জন উইক্লিফের সঙ্গে রামমোহন রায়ের তুলনা করেছেন। এই উপমহাদেশে রামমোহনই প্রথম প্রাচ্যের অতীত ঐতিহ্যের সঙ্গে পাশ্চাত্যের আধুনিক জ্ঞান ও মূল্যবোধের সমন্বয় ঘটিয়ে সূচনা করেছিলেন নতুন এক বিশ্ব সংস্কৃতির। সেই অর্থে রামমোহন রায় আধুনিকতার পথিকৃৎ।

রাজা রামমোহন রায় সর্বান্তকরণে ছিলেন মুক্তমনা। একই সঙ্গে সমাজ সংস্কারক ও প্রগতিশীল চিন্তার ধারক বাহক। ঊনবিংশ শতাব্দীতে ভারতবর্ষে যে মনোমুক্তি আন্দোলন তৎকালীন সমাজকে মধ্যযুগীয় সংস্কার থেকে আধুনিকতার চেতনায় নিয়ে এসেছিল তিনি তাদের অন্যতম অগ্রনায়ক। বাল্যকাল থেকেই অতি মেধার স্বাক্ষর রেখেছিলেন তিনি। রামমোহনের কৌলিক পদবী ছিল ‘বন্দ্যোপাধ্যায়’। মুর্শিদাবাদের নবাব সরকারে চাকরি করে তার পিতৃপুরুষগণ প্রচুর বিত্তবৈভব ও মর্যাদার অধিকারী হয়েছিলেন।

প্রচুর অধ্যয়ন ও ভ্রমণের ফলে ধর্ম ও সমাজ সম্পর্কে রাম মোহনের নিজস্ব মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠেছিল। যার ফলশ্রুতিতে রক্ষণশীল পিতার সঙ্গে মতবিরোধ দেখা দেয়। রামমোহন গ্রামের পাঠশালায় প্রাথমিক শিক্ষার পর সেখানেই সেকালের প্রথা অনুযায়ী ফার্সী শিক্ষা লাভ করেন। এরপর ইসলামী বিদ্যায় বিশেষ করে আরবী ভাষা ও মুসলিম শাস্ত্রে পড়াশোনার জন্য তৎকালীন ইসলামী বিদ্যাচর্চার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কেন্দ্র পাটনায় প্রেরিত হন। রামমোহন কলকাতায় সংস্কৃতি শিক্ষায় শিক্ষিত হন। রামমোহন মুসলিম ধর্মশাস্ত্রের বিভিন্ন শাখায় বিশেষ পা-িত্য অর্জন করেন। কোরান, হাদিস পুঙ্খানুপুঙ্খ অধ্যয়ন করার ফলে বিশুদ্ধ একেশ্বরবাদে তার গভীর বিশ্বাস জন্মায়। ইসলামের যুক্তিবাদী মুতাজিলা ও কট্টর বিশুদ্ধমার্গী মুত্তহাহিদিন সম্প্রদায়ের মতবাদও তাকে যথেষ্ট প্রভাবিত করে। একই সঙ্গে সুফী মরমীয়তাবাদের প্রতিও তার গভীর অনুরাগ জন্মায়। পাশাপাশি সংস্কৃতিচর্চা ও হিন্দু শাস্ত্র চর্চায় গভীর অভিনিবেশ করেন। এখানে তিনি অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে মোক্ষশাস্ত্র বেদান্তের প্রস্থানত্রয় উপনিষদ, ব্রহ্মসূত্র ও গীতা, ভাষ্যটীকা সমেত মনোযোগ দিয়ে অধ্যয়ন করেন। ধর্মচিন্তা তাঁর মধ্যে অন্য এক ধরনের বিশ্বাসের জন্ম দেয়।

কলকাতায় স্থায়ীভাবে বসবাস করার ফলে তিনি তৎকালীন জ্ঞানী, গুণী মহলের সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের কাজী ও মৌলভীবৃন্দ সংস্কৃতিবান ইউরোপীয় সমাজ, শাস্ত্রজ্ঞ ব্রাহ্মণ প-িতম-লীর সঙ্গে তার অন্তরঙ্গতা গড়ে ওঠে। ১৮০৩-০৪ সালে রামমোহনের প্রথম গ্রন্থ ‘তুহফাৎ-উল-মুত্তহাহিদিন’ প্রকাশিত হয়। ১৮১৪-১৫ সালে তাঁর বেদান্ত গ্রন্থ, বেদান্তসা প্রভৃতি মূল্যবান গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। তুহফাৎ-উল-মুত্তহাহিদিন গ্রন্থে রামমোহন সমস্ত শাস্ত্র পুরোহিত তন্ত্র, অনুবিশ্বাস, অর্থহীন সংস্কার, অনিষ্টকর ও অমানবিক আচার বর্জিত এবং ঈশ্বর বিশ্বাস মুক্তবুদ্ধি ও মানবপ্রীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত এক সর্বজনীন ধর্মস্থাপনের পরিকল্পনা প্রকাশ করেন।

সতীদাহ প্রথা শাস্ত্রবিরোধী এই মর্মে রামমোহন সোচ্চার তো ছিলেনই সেই সঙ্গে তৎকালীন সমাজের মানুষকে জাগ্রত করতে সম্ভাব্য সব কিছুই করেছেন। এ ব্যাপারে তিনি জনমত গঠন করেছিলেন। সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে তিনিই তিনটি মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করে সে সময় একই সঙ্গে আলোচিত ও সমালোচিত হন। সে সময় এই বিষয়টিকে রামমোহন রীতিমতো একটি আন্দোলনের জন্ম দেন, যার পরিপ্রেক্ষিতে ১৮২৯ সালে লর্ড বেন্টিংক সরকারী দ্বিধাদ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলে সতীদাহ প্রথা উচ্ছেদ আইন প্রবর্তনে বাধ্য হন।

শিক্ষা বিস্তার, সাংবাদিকতা, ব্রহ্মসমাজ আন্দোলন, যুক্তিবাদী সংস্কার চিন্তা, মুক্তবুদ্ধি চর্চার ক্ষেত্রে রামমোহন রায় তার সময়ে ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। ১৮০৪ সালে মুর্শিদাবাদের রেজিস্ট্রার উডফোর্ড সাহেবের মুন্সী হিসেবে নিযুক্ত হন তিনি। ধর্ম বিশ্বাসের ক্ষেত্রে শাস্ত্রনিরপেক্ষ যুক্তিবাদে তিনি তার চিন্তাভাবনা প্রকাশ করে সে সময়ে এক নবজাগরণের সৃষ্টি করেছিলেন। কর্মসূত্রে রামমোহন উডফোর্ড সাহেবের মুন্সীগিরির পদে ইস্তফা দিয়ে উত্তর বঙ্গের রংপুরে জন ডিগবীর অধীনে দেওয়ান হিসেবে যোগদান করেন। ১৮০৫ সাল থেকে ১৮১৪ সালÑ দীর্ঘ দশ বছর রংপুরে চাকরি করে সরকারী চাকরি ছেড়ে স্থায়ীভাবে কলকাতায় চলে যান। পারসী, আরবী, সংস্কৃত, গ্রীক, ল্যাটিন, ইংরেজী, উর্দু, হিন্দী, ফরাসী ভাষায় তিনি সুশিক্ষিত, শাস্ত্রজ্ঞানী, প্রচ- যুক্তিবাদী, ব্রহ্মজ্ঞানের পুরোধা ব্যক্তিত্ব ছিলেন। উনিশ শতকের চারের দশক থেকে উত্তরবঙ্গে বেদান্ত চর্চার গতি সঞ্চারিত হতে থাকে এবং রামমোহনই রংপুরে এই চর্চার প্রথম সূত্রপাত করেন।

রংপুরকে ঘিরে রয়েছে রামমোহনের নানা স্মৃতি, নানা ঘটনা। রংপুরবাসীও রামমোহন রায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতায় অবনত। তারই পথ ধরে রামমোহনের স্মৃতির স্মরণে ১৯২৬ সালে রংপুরে প্রতিষ্ঠিত হয় রামমোহন ক্লাব। এই ক্লাব প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতিবছর স্মৃতি উৎসব পালিত হয়ে আসছে। রামামোহন রায়কে নিয়ে নিরন্তর গবেষণা, প্রকাশনা অব্যাহত রয়েছে। রংপুর গবেষণা কেন্দ্র রাজা রামমোহন রায়কে নিয়ে একটি অসামান্য গ্রন্থ প্রকাশ করেছে। গ্রন্থের নাম মহাত্মা রাজা রামমোহন রায়। মোতাহার হোসেন সুফি, মোঃ মোজাম্মেল হক, মোস্তফা তোফায়েল হোসেন ও গীতিময় রায় সম্পাদিত এই গ্রন্থে রামমোহন রায়কে নিয়ে বেশ কিছু মূল্যবান প্রবন্ধ রয়েছে যা পাঠককে নতুন চিন্তায় আচ্ছন্ন করবে। রামমোহন রায়ের অনালোচিত অধ্যায় নতুন করে উন্মোচিত হবে এই গ্রন্থের প্রবন্ধে।

নির্মোহ সাক্ষ্য

সিরাজুল এহসান

প্রকাশিত : ১২ জুন ২০১৫

১২/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: