মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

সোনালি ডুমুর সময়, ঘটনা ও মানুষের কাহিনী স্বকৃত নোমান

প্রকাশিত : ১২ জুন ২০১৫

‘নোয়াখালীর জনৈক চিত্ত রায় মুসলিম দাঙ্গাকারীদের বাধা দেয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়ে শেষ পর্যন্ত নিজের মাকে নিজ হাতে হত্যা করে তারপর নিজে আত্মহত্যা করেন।’

সেলিনা হোসেনের ‘সোনালি ডুমুর’ উপন্যাসটি পড়তে পড়তে দাঙ্গার উপরোক্ত নিষ্ঠুরতাটা মনে পড়ে গেল। বেশ কিছুদিন আগে দাঙ্গার ইতিহাস পড়তে গিয়ে এমন নিষ্ঠুরতার কথা জেনেছিলাম। এটা তো মাত্র একটা ঘটনা, এমন শত শত নিষ্ঠুর ঘটনা ঘটেছিল দাঙ্গার সময়। সেসব পৈশাচিকতার বিশদ বিবরণ পড়তে গেলে স্নায়ু পীড়িত হয়। দাঙ্গার নেপথ্যে শুধু ধর্ম ছিল না, শুধু বৃটিশের স্বার্থ ছিল না; ছিল দেশীয় কায়েমী স্বার্থ, ছিল রাজনীতি, ছিল অর্থনীতি, ছিল সংস্কৃতি, আর ছিল আধিপত্য। হিন্দুরা মনে করেছিল বিজাতীয় মুসলিম স্পর্শে কলুষিত হয়েছে ভারতভূমি। এই ভূমির সম্মাান রক্ষার্থে ব্রতী হতে হবে হিন্দুদের। মসজিদের সামনে বাজনা বাজাতে দেয়নি মুসলমানরা, তাতে হিন্দুরা মনে করেছিল কোনো একদিন হয়ত নিষিদ্ধ করে দেয়া হবে প্রতিমা নিরঞ্জনের শোভাযাত্রাও। হিন্দুরা কি সহ্য করবে এই নিপীড়ন? হিন্দু মহাসভার এসব প্রচার স্বভাবতই স্পর্শ করেছিল হিন্দুদের মন। বিশেষত বাংলায়, যেখানে তখন চলছিল মুসলিম লীগের শাসন, হিন্দুদের ধারণা হয়, এই বিজাতীয় শাসনে নষ্ট হতে চলছে তাদের শিক্ষাদীক্ষা, ধর্ম-সংস্কৃতি। তাই ডাক দেয়া হয়, হিন্দু জাগো, হিন্দুকে রক্ষা কর। এই ডাকে উদ্দীপিত হয়ে হিন্দু যুবকরা নিজেদের সব্যসাচী অর্জুন ভাবতে শুরু করে এবং ভ্রাতৃহত্যা তাদের কাছে ধর্মের স্বার্থেই কর্তব্য হয়ে ওঠে।

অপরদিকে মুসলমানদের বোঝানো হয়েছিল, মুসলিম লীগের জয় মানে ইসলামের জয়, মুসলমানদের মুক্তি। লীগ ক্ষমতায় থাকলে জমিদারি উচ্ছেদ হবে, গ্রামে স্কুল হবে। এই প্রচার সাধারণ মুসলমান চাষিকেও উদ্দীপিত করে। কারণ, জন্মাবধি মুসলমানরা সহ্য করেছে হিন্দু জমিদারের অত্যাচার। আত্মগর্বী হিন্দু এক স্পর্ধিত উন্নাসিকতা নিয়ে ঘৃণা করেছিল মুসলমান সমাজকে। তাই লীগের প্রত্যক্ষ সংগ্রামের ডাক যখন আসে, তার জবাব মুসলমানরা দেয় এক পাশব হিংসা প্রয়োগ করে। যে জাত নিয়ে হিন্দুদের এত বড়াই, সে জাত নষ্ট করে দেয়ার বাসনাই তখন প্রবল হয়ে ওঠে মুসলমানের মনে। তাই তারা একেকজন হয়ে ওঠে সুলতান মাহমুদ, বখতিয়ার খিলজী।

এই ভারতীয় উপমহাদেশে দাঙ্গার ইতিহাস বড় ভয়ানক, বড় কঠিন, বড় নিষ্ঠুর। এ ইতিহাস পড়তে পড়তে মনে হয়, নিজের দু-হাতও বুঝি রক্তে-ক্লেদে ভরে গেছে। এত রক্ত, এত লাশ! অমৃতসর থেকে লাহোর বা লাহোর থেকে অমৃতসর...কখনো কখনো পুরো একটা ট্রেনই এসেছিল মৃতদেহ বোঝাই হয়ে। কী ভয়াবহ! দাঙ্গার এই ভয়াবহতা দেখে জীবনানন্দ দাশ বিমূঢ় হয়ে লিখেছিলেন, ‘পৃথিবীর পথে এই নিহত ভ্রাতার/ভাই আমি; আমাকে সে কনিষ্ঠের মতো জেনে তবু/হৃদয়ে কঠিন হয়ে বধ করে গেল; আমি রক্তাক্ত নদীর কল্লোলের কাছে শুয়ে অগ্রজপ্রতিম বিমূঢ়কে/বধ করে ঘুমাতেছি...।’

শুধু জীবনানন্দই নন, দাঙ্গার সেই ভয়াবহতা তৎকলীন বোধ সম্পন্ন মানুষদের মানসিকভাবে মারাত্মক পীড়িত করেছিল। পরবর্তী প্রজন্মও দাঙ্গার সেই ভয়াবহতা ইতিহাসে পড়ে আঁতকে উঠেছে, এখনো উঠছে, ভবিষ্যতেও উঠবে। দাঙ্গা নিয়ে পরবর্তীকালে লেখা হয়েছে বহু কবিতা, গল্প এবং উপন্যাস। এখনো লেখা হচ্ছে, ভবিষ্যতেও হবে। সেলিনা হোসেনের ‘সোনালি ডুমুর’ উপন্যাসটিও দাঙ্গাকে কেন্দ্র করেই। উপন্যাসটির উল্লেখযোগ্য অংশ দখল করে আছে নোয়াখালীতে হিন্দুদের উপর সেই কুখ্যাত হামলা। এই হামলা শুরু হয় ১৯৪৬ সালের ১০ অক্টোবর, কোজাগরী লক্ষীপুজোর রাতে। সেলিনা হোসেন এই হামলাকে তার উপন্যাসে দাঙ্গা বলেছেন। না, এটিকে দাঙ্গা বলা যায় না। দাঙ্গা মানে পারস্পরিক হানাহানি। নোয়াখালীতে পারস্পরিক হানাহানি হয়নি, হিন্দুরা এখানে একতরফা আক্রমণের শিকার হয়েছিল। একতরফা আক্রমণ আর যাই হোক, দাঙ্গা হতে পারে না। ‘সোনালি ডুমুর’ পড়তে গিয়ে শুরুতে আশা করেছিলাম সেলিনা হোসেন নোয়াখালীর সেই হামলাকে দাঙ্গা বলে অস্বীকার করবেন। কিন্তু না, তিনি তা করেননি, তিনিও দাঙ্গা লিখেছেন।

যাই হোক, নোয়াখালীর এই হামলায় খুনজখমের পাশাপাশি ছিল নারী ধর্ষণ, জোর করে বিয়ে, ধর্মান্তরণ। গোঁড়া মৌলবিদের প্ররোচনায় একটা সুপরিকল্পিত উদ্দেশ্য নিয়েই ঘটানো হয়েছিল এই হত্যাযজ্ঞ। নোয়াখালীতে মুসলমান মৌলবাদের একটা ঘাঁটি ছিল, এই মৌলবাদীরাই হত্যাযজ্ঞটা লাগায়। এই হত্যাযজ্ঞে কতজন মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল তার সংখ্যা নিয়ে মতভেদ আছে। প্রথমদিকের বিবরণে শত শত প্রাণহানির কথা বলা হলেও পরবর্তী হিসাবে মৃতের সংখ্যা দেখানো হয়েছে তিন শ। তবে নৃশংসতায় নোয়াখালী সম্ভত কলকাতাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

‘সোনালি ডুমুর’ উপন্যাস সেই নৃশংসতাকে ধারণ করেছে। উপন্যাসের নায়িকা মাধুরীলতা নোয়াখালীর ‘দাঙ্গা’য় নিহত স্বজনের রক্তে ডুবে বেঁচে গিয়েছিল। তারপর কাহিনি গড়ায় নানা দিকে। অনিমেষ ও মাধুরীলতা বিয়ের পর ঢাকায় আসে চাঁদপুর থেকে। এর আগে কখনো তারা ঢাকায় আসেনি। মাধুরীলতার ইচ্ছা ঢাকায় তাদের হানিমুন হবে। তারা ঢাকায় এসে দেখতে পায় ডাক্তার মম্মথনাথ নন্দীর বাড়িটি তার অবর্তমানে শত্রুসম্পত্তি আইনের জোরে দখল হয়ে গেছে। আর সেই বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষ চিৎকার করে বলছে, ‘ডাক্তারবাবু আপনি ফিরে আসুন।’ এভাবেই উপন্যাসের কাহিনি আবর্তিত হয় এবং একটা পরিণতির দিকে গড়ায়।

তার মানে ‘সোনালি ডুমুর’ গুরুত্বপূর্ণ একটা ইতিহাসকে ধারণ করেছে। এটি একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস। কিন্তু সমকালীন এত এত বিষয় থাকতে ঐতিহাসিক উপন্যাসের দিকে সেলিনা হোসেনের এত ঝোঁক কেন? সেলিনা হোসেন কী জবাব দেবেন জানি না, তবে এর একটা উত্তর আমার কাছে আছে : ইতিহাস হচ্ছে বর্তমানের ভিত বা ফাউন্ডেশন বা শেকড়। ফাউন্ডেশনকে কেউ অস্বীকার করতে পারে না। আমাদের ইতিহাস এত বেশি সমৃদ্ধ, বৈচিত্র্যময় এবং একইসঙ্গে এত ভয়াবহ ও নিষ্ঠুরতাপূর্ণ যে, ইতিহাসকে বিষয় হিসেবে নিয়ে শত শত উপন্যাস লেখা সম্ভব। সেই তুলনায় বাংলাদেশে ইতিহাস-ভিত্তিক কটি উপন্যাস লেখা হয়েছে? খুব বেশি হয়নি। হওয়ার দরকার ছিল। কেননা ইতিহাসের কাছে আমাদের দায়বদ্ধতা আছে। বর্তমানকে বুঝতে হলে ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকাতেই হবে। আমাদের তো এখনো ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকানোটা, ইতিহাসটাকে দেখে ওঠাটাই শেষ হয়নি, বর্তমানকে নিয়ে উপন্যাস লেখার কথা আমরা আশা করতে পারি কীভাবে? বর্তমানকে বুঝতে হলে ইতিহাসকে বোঝা জরুরি। ইতিহাসের পুনর্মূল্যায়ন ও পুনর্বিবেচনা করতে হবে। ইতিহাসের প্রচলিত মতকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে হবে। ইতিহাসের ফায়সালাটা আগে করতে হবে। ইতিহাসের ফায়সালা আমরা এখনো করে উঠতে পারিনি। এটি না করলে আমাদের মেরুদ-টা সিধা হবে না। যেদিন ইতিহাসের ফায়সালা শেষ হবে সেদিন রচিত হবে সমকালের ভিত এবং সেদিনই শুরু হবে আমাদের বর্তমানের জয়যাত্রা। তখন হয়ত আর ইতিহাস-ভিত্তিক উপন্যাস রচনার প্রয়োজন নাও থাকতে পারে। অতএব, ইতিহাসের প্রতি আলো ফেলার জন্য সেলিনা হোসেনকে আমরা ধন্যবাদ জানাতে পারি।

যদিও ‘সোনালি ডুমুর’ উপন্যাসের কোথাও গতানুগতিক ইতিহাস প্রশ্নবিদ্ধ হয়নি, তবু গতানুগতিকভাবে হলেও সেলিনা হোসেন ইতিহাসের দিকে আলো ফেলেছেন। আবার, পাঠক হিসেবে আমাদের আশা ছিল আলোটা তিনি ফেলবেন সামনে থেকে নয়, আলো ফেলবেন পেছন থেকে, উপর থেকে, নিচ থেকে, ডান থেকে, বাঁ থেকে। ইতিহাস যে বাজে বিষয়গুলোকে মহৎ করে তুলে ধরেছে, যে বিষয়গুলোকে গোপন করেছে বা এড়িয়ে গেছে, সেগুলোকে খুঁড়িয়ে বের করে আনবেন তিনি। কিন্তু না, সেলিনা হোসেন সেদিকে যাননি। গতানুগতিকভাবেই তিনি আলো ফেলেছেন। হোক। এটাই বা কম কিসে! দাঙ্গা এমন একটা বিষয়, এ বিষয় নিয়ে উপন্যাস তো খুব বেশি লেখা হয়নি। সেক্ষেত্রে সেলিনা হোসেন শূন্যস্থানটা কিছুটা হলেও পূরণ করতে সচেষ্ট হয়েছেন।

সেলিনা হোসেন লিখতে পারেন প্রচুর। নানা বিষয়ে। তার উপন্যাসের পাঠক যারা তারা খুব সহজেই তার লেখাকে আলাদা করে চিনতে পারে। তিনি সবসময় তার নিজস্ব পথে, নিজস্ব রীতিতে হাঁটেন। ‘সোনালি ডুমুর’ উপন্যাসেও আমরা দেখতে পাই তার সেই নিজস্ব পথ, নিজস্ব রীতি, পরিচিত ঢং।

উপন্যাসটি এর আগে কলকাতার আনন্দ পাবলিশার্স থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। এবারের বইমেলায় প্রকাশিত হলো ঢাকার ইত্যাদি গ্রন্থপ্রকাশ থেকে। প্রায় ৪০০ পৃষ্ঠার এ উপন্যাসটি প্রকাশ করেছে ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ। প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রুব এষ। দাম রাখা হয়েছে ৫০০ টাকা।

প্রকাশিত : ১২ জুন ২০১৫

১২/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: