কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

কলঙ্কমুক্ত শেরপুর সোহাগপুরের বিধবাপল্লীতে স্বস্তি

প্রকাশিত : ১২ জুন ২০১৫
  • রীনা আক্তার তুলি

ঢাকা বিভাগের সীমান্তবর্তী একটি ঐতিহ্যবাহী জেলা শেরপুর। বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার গারো পাহাড় এ জেলাতেই অবস্থিত। আছে গজনী, মধুটিলা ইকোপার্কসহ পুরনো ঐতিহ্যের মাই সাহেবা, বারোদুয়ারি, খানবাড়ি মসজিদ ও জরিপ শাহর মাজার, যা আজ থেকে ৬০০ বছর আগের ঐতিহ্য বহন করে দাঁড়িয়ে আছে এখনও। পা বাড়ালেই ভোগাই, কংশ, নিতাই, মালিঝি আর সোমেশ্বরীতে মেলে স্বচ্ছ ঝরনা। সব মিলিয়ে ১৩৬৩.৭৬ বর্গকিলোমিটার জায়গায় অবস্থিত শেরপুর সেজেছে অপরূপ সাজে।

শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলায় সোহাগপুর বিধবাপল্লী অবস্থিত। একাত্তরের ২৫ জুলাই ভোরবেলায় আলবদর বাহিনী ও পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সদস্যরা শেরপুরের সোহাগপুর গ্রাম ঘিরে ফেলে। এরপর বাড়ি বাড়ি গিয়ে তারা ১২০ জন পুরুষকে ধরে এনে হত্যা করে। ধর্ষণের শিকার হন গ্রামের অসংখ্য নারী। এক গ্রামে একসঙ্গে এতজন পুরুষ নিহত হওয়ায় গ্রামের অধিকাংশ নারীকে অকালে বৈধব্য বরণ করতে হয়েছিল বলে সোহাগপুরের নাম হয়ে যায় বিধবাদের গ্রাম।

সোহাগপুরের বিধবাপল্লীর সমলা বেওয়া (৬৪), কলফুলি বেওয়া (৬৭) ও জবেদা বেগম (৬৬) বলেন, চোখের সামনে স্বামীরে গুলি করছে। ছটফট কইরা স্বামীরে মরতে দেখছি। এই যন্ত্রণা ওরা বুঝবো কি? কথাগুলো বলতে বলতে চোখের পানি মুছতে থাকেন তাঁরা। এ অশ্রু যেন শুকাবার নয়।

সোহাগপুরের স্বজনহারা মানুষেরা জানান, ১৯৭১ সালের ২৫ জুলাই সকালে গ্রামবাসী প্রতিদিনের মতো স্বাভাবিক কাজে ব্যস্ত ছিলেন। কিন্তু কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাঁদের ওপর নেমে আসে এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন। মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা এই গ্রামে আশ্রয় নিয়েছে এবং এলাকার লোকজন মুক্তিবাহিনীকে সহযোগিতা করছেন- এমন কারণ দেখিয়ে শেরপুরের চিহ্নিত রাজাকার নেতা কামারুজ্জামানের নির্দেশে গ্রামটিকে তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলে হানাদার বাহিনী। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ শুরু করে তারা। প্রাণ হারায় ১৮৭ জন নারী-পুরুষ-শিশু। জ্বালিয়ে দেয়া হয় ঘরবাড়ি। ধর্ষিতা হন অনেক নারী। ওই দিনের হত্যাযজ্ঞে বিধবা হন ৪০ নারী, যাদের আটজন ইতোমধ্যে মারা গেছেন। মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে ঘটে যাওয়া সেদিনের সেই ভয়াবহ স্মৃতি এখনও ভুলতে পারেননি সোহাগপুরের স্বজনহারা হতভাগা নারীরা। স্বামীহারা হাপিজা বেওয়া (৬৫) বলেন, স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় কামারুজ্জামানের সেই পাশবিকতার শিকার হয়ে স্বামী ইব্রাহিমকে হারিয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, এ গ্রামের শহীদ রহিম উদ্দিনের স্ত্রী কুরফুলি বেওয়া (৭৫), শহীদ আবদুল লতিফের স্ত্রী হাছেন বানু (৭০), শহীদ ফজর আলীর স্ত্রী জবেদা বেওয়া (৬৫), শহীদ সিরাজ আলীর স্ত্রী সমলা বেওয়া (৬২), শহীদ বাবর আলীর স্ত্রী জবেদা বেওয়া (৭৫), শহীদ কাইফা দেওয়ানের স্ত্রী আছিয়া বেওয়াসহ (৭৫) বহু নারী সেদিন স্বামী হারানোর পাশাপাশি সম্ভ্রম হারান।

১৯৫২ সালে এই শেরপুরেরই সদর উপজেলার বাজিতখিলায় জন্ম নেন মুহাম্মদ কামারুজ্জামান। বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে একাত্তরে নিজের এলাকার মানুষের বিরুদ্ধে তিনি মেতে ওঠেন হত্যাযজ্ঞে। সেই অপরাধে তার মৃত্যুদ- দিয়ে সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে বলা হয়, আলবদর বাহিনী গঠন ও পরে সোহাগপুর গ্রামে গণহত্যা ও বিধবাদের ধর্ষণে কামারুজ্জামানের ভূমিকা ছিল অমানবিক ও বিভীষিকাময়। এই কুলাঙ্গার সন্তানের ফাঁসি কার্যকর হওয়ায় ৪৪ বছর পর কলঙ্কমুক্ত হয়েছে শেরপুর।

তবে অভিযোগ রয়েছে, এখনও এই হতভাগ্য মানুষগুলোর সঠিক ও যথাযথ পুনর্বাসন হয়নি। যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানী সেনা ও তাদের এ দেশীয় দোসরদের হাতে সর্বস্ব হারিয়েছেন, তাদের সঠিক মর্যাদার সঙ্গে পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় জনসাধারণ।

প্রকাশিত : ১২ জুন ২০১৫

১২/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: