কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বাজেট নারী ও শিশুবান্ধব

প্রকাশিত : ১২ জুন ২০১৫
  • আরিফুর সবুজ

নারীর ক্ষমতায়নের মধ্য দিয়ে সমাজে জেন্ডার ইক্যুইটি তথা সমতা আনা সম্ভব। নারীর ক্ষমতায়নের জন্য দরকার নারীকে বিভিন্ন সুযোগসুবিধা প্রদান করা। বিশেষ করে আর্থিক প্রণোদনা নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। বর্তমান সরকার নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়ে সচেষ্ট। এ জন্য প্রতিবছরের বাজেটে নারীর জন্য বিশেষ বরাদ্দ ও সুযোগ-সুবিধা দিয়ে যাচ্ছে। এবারের ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেটও এর ব্যতিক্রম দেখা যায়নি। বাজেট ঘোষণায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত জানিয়েছেন, ২০২১ সালের মধ্যে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকা-ে নারীর শতকরা পঞ্চাশ শতাংশ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে নারী উন্নয়ন ও কর্মসুুযোগ সংক্রান্ত প্রকল্প পুনর্বিন্যাস করা হচ্ছে।

নারীকে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকা-ে আরও বেশি সম্পৃক্ত করার জন্য তাদের করমুক্ত আয়ের সীমা দুই লাখ পঁচাত্তর হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে তিন লাখ টাকা করার প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। এই উদ্যোগকে অত্যন্ত প্রশংসনীয় বলা যায়। নারীকে আরও বেশি অর্থনৈতিক কর্মকা-ে সক্রিয় করতে এই ঘোষণা ভূমিকা রাখবে। তাছাড়া নারীর জন্য ঋণ গ্রহণে যে কোটা রয়েছে, তা বজায় থাকারও ঘোষণা ছিল এবারের বাজেটে। নারীকে এসএমই লোন প্রাপ্তির সহজলভ্যতা দিনকে দিন নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা বাড়িয়ে তুলছে। এছাড়া গ্রামাঞ্চলে দারিদ্র্য দূর করার জন্য নারীকে সুদমুক্ত ঋণদান কর্মসূচী পরিচালনার কথাও এবারের বাজেটে বলা হয়েছে। এটি যদি বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে গ্রামাঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত ও দারিদ্র্যপীড়িত নারী ঋণ নিয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসা শুরু করতে সক্ষম হবে। এতে একদিকে যেমন আত্মকর্র্মসংস্থানের মাধ্যমে দেশের দারিদ্র্য কমে যাবে, তেমনি নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রেও এগিয়ে যাবে রাষ্ট্র।

বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর মূল সুবিধাভোগী হচ্ছে সুবিধাবঞ্চিত নারী ও শিশু। এবারের বাজেট ঘোষণায় সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা বাড়ানো হয়েছে। আগামী অর্থবছরের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় বয়স্ক ভাতাভোগীর সংখ্যা ২৭ লাখ ২৩ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৩০ লাখ, বিধবা ও স্বামী নিগৃহিত নারী ভাতাভোগীর সংখ্যা ১০ লাখ ১২ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১১ লাখ ১৩ হাজার করার প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। তাছাড়া তিনি বাজেট অধিবেশনে মাতৃত্বকালীন ভাতাভোগীর সংখ্যা এবং কর্মজীবী দুগ্ধপ্রদানকারী মায়ের সংখ্যা শতকরা বিশ শতাংশ বৃদ্ধি করারও ঘোষণা দিয়েছেন। অর্থমন্ত্রীর এই ঘোষণা দেশের সুবিধাবঞ্চিত এবং মাতৃত্বকালীন ও কর্মজীবী মায়ের জন্য সুখবর বয়ে নিয়ে এসেছে।

বয়স্ক ভাতার নিয়ম অনুযায়ী দেশের সব উপজেলার সব ইউনিয়নের প্রতিটি ওয়ার্ডের সবচেয়ে বয়স্ক দশ ব্যক্তি এই ভাতা পেয়ে থাকেন। এদের মধ্যে কমপক্ষে পাঁচজন নারী থাকেন। বয়স্ক ভাতাভোগীরা মাসে দেড় শ’ টাকা করে বছরে আঠারো শ’ টাকা পেয়ে থাকেন। এবার আওতা বৃদ্ধি করায় সরকারকে এ খাতে ৪৯ কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ দিতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় বিধবা ও স্বামী নিগৃহিত নারীও মাসে দেড় শ’ টাকা করে ভাতা পান। এবার এর আওতা বৃদ্ধি করায় সরকারকে অতিরিক্ত ১৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দিতে হচ্ছে। এভাবে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা বৃদ্ধি করায় বাজেটে বরাদ্দও বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দেশের অধিক সংখ্যক সুবিধাবঞ্চিত নারীকে সুরক্ষার নিশ্চয়তার চেষ্টা করছে সরকার। শুধু সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা বাড়িয়েই সরকার নারীর কল্যাণ করছে না। কর্মজীবী নারীর বিভিন্ন সুযোগসুবিধা নিশ্চিত করারও চেষ্টা করা হয়েছে এবারের বাজেটে। এই যেমন গার্মেন্টসের নারী শ্রমিকের আবাসন সমস্যা সমাধানের জন্য প্রথমবারের মতো ঢাকার আশুলিয়ায় ৭৪৪ জনের বাসোপযোগী হোস্টেল নির্মাণের কথা বলা হয়েছে এবারের বাজেটে।

বাজেটে নারীর প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকা-কে পুরুষের সমকক্ষ করার জন্য উপযুক্ত নীতি ও কৌশল গ্রহণ করার প্রতিও গুরুত্বারোপ করা হয়। অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের মধ্য দিয়েই সরকারের নারীর ক্ষমতায়ন ও উন্নয়ন এবং অগ্রগতির প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির প্রমাণ পাওয়া যায়। বর্তমানে কর্মক্ষম নারীর ৩৩ দশমিক ৫ শতাংশ অর্থনৈতিক কর্মকা-ে অংশগ্রহণ করছে। ২০২১ সাল নাগাদ এই হার ৫০ শতাংশে উন্নীত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, বাল্যবিবাহ রোধ, নারীশিক্ষা, উপযুক্ত কর্মপরিবেশ সৃষ্টি, কর্মজীবী মহিলার জন্য আবাসন, শিশু-দিবাযতœ কেন্দ্র স্থাপন, যুব মহিলার বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, চাকরিতে কোটা সংরক্ষণসহ নানা ধরনের নারীবান্ধব কর্মসূচী অন্যান্য বছরের মতো এবারও অব্যাহত রাখা হয়েছে।

ইতোমধ্যে আমাদের দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষায় জেন্ডার ইক্যুইটি বা সমতা অনেকাংশেই নিশ্চিত হয়েছে। তবে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক এবং পেশাগত বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্য রয়ে গেছে। এই বৈষম্য দূরীকরণের উদ্যোগও এবারের বাজেটে নেয়া হয়েছে। চারটি বিভাগীয় শহরে চারটি মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করার ঘোষণা করা হয়েছে এবারের বাজেটে। তাছাড়া ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ, ক্যাটারিং প্রশিক্ষণ, নারী আইসিটি, ফ্রি ল্যান্সারসহ বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন শুরু করা হচ্ছে, যা নারীর ক্ষমতায়ন ও জেন্ডার ইক্যুইটির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবে।

বর্তমান সরকারের আমলে নারীর অগ্রযাত্রা, উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন দৃষ্টি কাড়ার মতো। অসহায়-অবহেলিত-প্রতিবন্ধী নারীকে সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের আওতায় আনা, নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ, আত্মকর্মসংস্থানে ক্ষুদ্র ঋণ ও দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা এবং জেন্ডার সংবেদনশীল আইনী কাঠামো, উন্নয়ন পরিকল্পনা ও বাজেট প্রণয়নের ফলে নারী ধীরে ধীরে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে উঠছে। কর্র্মরত নারীর সংখ্যা ২০০৬ এর ১১ দশমিক ৩ মিলিয়ন থেকে ২০১৩ সালে ১৬ দশমিক ৮ মিলিয়নে উন্নীত হয়েছে। এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে আমাদের দেশের নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে। সুখবর হলো, লিঙ্গ বৈষম্য হ্রাস তথা জেন্ডার ইক্যুইটি তৈরিতে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায়ে বর্তমানে শীর্ষ অবস্থানে আছে। দ্য গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশ বিশ্বের ১৪২ দেশের মধ্যে ৬৮ তম অবস্থান করে শ্রীলঙ্কা, ভারত ও পাকিস্তান থেকে এগিয়ে থাকলেও নারীকে এখনও অনেক দূর যেতে হবে। এখনও নারী পুরুষের তুলনায় পিছিয়ে। সমাজে জেন্ডার ইক্যুইটি আসেনি। এবারের বাজেট নারীর ক্ষমতায়নের পথকে আরও মসৃণ করবে এবং সমাজে জেন্ডার ইক্যুইটি তথা সমতা সৃষ্টিতে ভূমিকা পালন করবে।

এবারের বাজেটে নারীর পাশাপাশি শিশুর জন্য শিশু বাজেট করার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যত। অথচ এই শিশুই অবহেলায় বেড়ে উঠছে। বঞ্চিত হচ্ছে মৌলিক অধিকার থেকে। এদের কল্যাণের কথা বিবেচনায় এনে এদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য করা প্রথমবারের মতো করা হয়েছে শিশু বাজেট। এটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ বলা যায় নিঃসন্দেহে। সরকার ‘স্ট্রেনদেনিং ক্যাপাসিটি ফর চাইল্ড ফোকাসড বাজেটিং ইন বাংলাদেশ’ নামের একটি প্রকল্প গ্রহণ করতে যাচ্ছে, যার মাধ্যমে শিশুর কল্যাণে বরাদ্দকৃত সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার করা হবে। দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পথশিশু ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুর কল্যাণে সরকারের এই উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয়। মোদ্দা কথা, এবারের বাজেটকে নারী ও শিশুবান্ধব বাজেট বলা যায় নির্দ্বিধায়। এ বাজেটের মধ্য দিয়েই প্রকাশ পেয়েছে যে, সরকার শুধু দেশকে অর্থনৈতিক শক্ত ভিতের ওপরই শুধু দাঁড় করাতে চায় না, দেশে সামাজিক নিরাপত্তা সৃষ্টিসহ জেন্ডার ইক্যুইটি তথা সমতা তৈরি করতেও বদ্ধপরিকর।

প্রকাশিত : ১২ জুন ২০১৫

১২/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: