আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ঘাতক ফরমালিন

প্রকাশিত : ১২ জুন ২০১৫
  • ইয়াসিন আরাফাত

ফরমালিন কি

ফরমালডিহাইড হলো এলডিহাইড গ্রুপের সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম এলডিহাইড। ফরমালডিহাইডের ৩৭% জলীয় দ্রবণকে বলে ফরমালিন। এই ফরমালডিহাইড সাধারণ তাপমাত্রায় ধীরে ধীরে বাষ্প হয়ে উড়ে যায়। এতে একে আর কোন কাজে ব্যবহার করা যায় না। তাই ফরমালিন প্রস্তুতকারক উক্ত দ্রবণে ১০ থেকে ১৫% মিথানল মিশ্রিত করে দ্রবণটিকে স্থায়ী করে অর্থাৎ ফরমালডিহাইডের উদ্বায়ী ক্ষমতা হ্রাস করে দেয়। ফরমালডিহাইড ও মিথানল দুটিই বিষাক্ত। সেই বিষাক্ত মিশ্রণেই তৈরি হয় ফরমালিন।

ফরমালিনের ব্যবহার

ফরমালডিহাইড উচ্চমাত্রায় পলিমার গঠনে সক্ষম। এটি খুবই কার্যকরীভাবে এবং দ্রুততার সঙ্গে প্রোটিনের এমাইনো গ্রুপ এবং ফেনলের সঙ্গে লিংকেজ, ক্রস লিংকেজ বা বন্ড তৈরি করে। এই যৌগটি সাধারণত মৃত জীবদেহ সংরক্ষণ এবং জীবাণুনাশক হিসেবে সংরক্ষণাগার, হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ, লাশ কাটাঘর ও পরীক্ষাগারে ব্যবহার করা হয়। গ্লু, রং বা রেজিন, হার্ডবোর্ড, পার্টিকেল বোর্ড, যানবাহনের যন্ত্রাংশ, কাপড়ের ডাইং ইত্যাদি শিল্প কারখানায় পলিমার গঠনের জন্য প্রচুর পরিমাণে ফরমালিন ব্যবহার করা হয়। চামড়া শিল্পে সংগৃহীত চামড়া পচনের হাত থেকে রক্ষা করা এবং প্রক্রিয়াজাত করার পূর্বে ও পরে চামড়ার স্থায়িত্ব বৃদ্ধির জন্য উচ্চমাত্রায় ফরমালিন ব্যবহার করা হয়।

ফল, মাছ এবং সবজিতে ফরমালিন কেন ব্যবহার করা হয়

কোন দ্রব্য পচনের জন্য ব্যাকটেরিয়া, ফাঙ্গাস এবং বিভিন্ন অনুজীব দায়ী। ফরমালিন প্রয়োগ করলে এই সকল অনুজীব মারা যায়। ফলে পচন বিলম্বিত হয় এবং সংরক্ষণকাল বৃদ্ধি পায়। ফরমালডিহাইড অনুজীবের দেহাবরণের প্রোটিন এবং ডিএনএ-এর প্রোটিনে ক্রস লিংকেজ ঘটায়। ফলে ডিএনএ কার্যক্ষমতা হারিয়ে অনুজীব মারা যায়। আবার ফরমালিনে থাকা মিথানল বিভিন্ন এনজাইমের উপস্থিতিতে ফরমিক এসিডে রূপান্তরিত হয়। এই ফরমিক এসিড অনুজীব মেরে ফেলে এবং জন্মাতে বাধার সৃষ্টি করে। ফরমালিন ব্যবহার করলে ফল, মাছ ও সবজির পচনশীল অনুজীবগুলো মারা যায় ফলে এগুলো টিকে থাকে অনেকদিন।

ফরমালিন দেয়া খাদ্য কেন ক্ষতিকর

খাদ্যে ফরমালিন দেয়ার পরে ফরমালিন দ্রবণে থাকা ফরমালডিহাইড এবং মিথানল খুবই দ্রুত বিক্রিয়া করে স্থায়ী রূপ ধারণ করে। এগুলো ফল, মাছ ও সবজির কোষ কলার অভ্যন্তরে ও উপরিত্বক ভেদ করে ভেতরে অবস্থান করে বিধায় বাতাসে রেখে বা ভিনেগার/লবণ পানিতে ভিজিয়ে রাখলেও ফরমালডিহাইড দূর করা সম্ভব হয় না। এ সকল খাদ্য গ্রহণের পরে পাকস্থলিতে বিভিন্ন এনজাইম এবং এসিডের প্রভাবে ভেঙ্গে পুনরায় ফরমালডিহাইড ও বিভিন্ন ফরমালডিহাইডের জৈব যৌগ তৈরি হয়, যা রক্তের মাধ্যমে সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে পরে। যখন এ সকল উপাদান দেহের অভ্যন্তরের জীবিত কোষ কলার ডিএনএ বা প্রোটিনের সঙ্গে ক্রস লিংকেজ ঘটায়, তখন ডিএনএ-তে ক্ষতের সৃষ্টি হয়, মারা যায় কোষকলা। ফলে কিডনি, হৃদ্যন্ত্র, ফুসফুস, যকৃত ইত্যাদি বিকল হয়ে যায় কিংবা দীর্ঘমেয়াদি দূরারোগ্য রোগের সৃষ্টি হয়। ফরমালডিহাইড ভ্রƒণের গঠনকে প্রভাবিত করে বিধায় বিকলাঙ্গ, বুদ্ধি প্রতিবন্ধী শিশুর জন্ম হয় এবং অনেক শিশু মাতৃগর্ভেই মৃত্যুবরণ করে। দীর্ঘদিন ফরমালিনযুক্ত খাবার খেলে রক্তে ফরমিক এসিড ও ফরমালডিহাইডের দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতির কারণে স্নায়ু কোষের ক্ষতি ও কর্মক্ষমতা হ্রাস পায়। এতে স্নায়কোষ নির্ভর অঙ্গসমূহ বিকল হয় যায় কিংবা কর্মক্ষমতা কমে যায়।

ফরমালিন দেয়া ফল, মাছ এবং সবজি খেলে ফরমিক এসিডের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া স্বরূপ ঠোঁট, গলা এবং পাকস্থলি প্রদাহ অনুভূত হয়। যে সকল ব্যবসায়ী ফরমালিন/ফরমালডিহাইড দেয়া দ্রব্যাদির কাছে দীর্ঘক্ষণ থাকেন বা হাত দিয়ে নাড়াচাড়া করেন তাদের হাঁপানি, ফুসফুস ক্যান্সার, হাতে স্থায়ী ঘা, চর্ম রোগ এবং চোখের রোগসহ ক্যান্সার বেশি পরিলক্ষিত হয়। ফরমালিন মানবদেহের জন্য বিষাক্ত বিধায় আইনে খাদ্যে এর ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ফরমালিন খাদ্যে ব্যবহার করা, আর নীরবে মানুষ হত্যা করা সমান ঘৃণ্য কাজ।

বাজারে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী খাদ্যে ফরমালিন দেয়। তাই বলে সব খাদ্যেই যে ফরমালিন আছে, তা কিন্তু নয়। ফরমালিন আছে কি নেই তা শনাক্ত করা অত্যন্ত জরুরী। এই সমস্যা সমাধানের জন্য ফরমালিনবিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানী মো. ফারুক বিন হোসেন ইয়ামিন কর্তৃক উদ্ভাবিত ‘ফরমালিন টেস্টার’ যে কোন ফার্মেসীর দোকানে পাওয়া যায়। এ প্রযুক্তিটিতে ফরমালিন শনাক্তকরণ পদ্ধতিটিও অত্যন্ত সহজ। প্রতিটি পরীক্ষা মাত্র ১ টাকায় সম্ভব। ৩০০টি পরীক্ষা করা যায় এমন একটি কিট বক্স-এর মূল্য মাত্র ৩০০ টাকা। স্বল্পব্যয়ে ফরমালিন শনাক্তকরণের মাধ্যেমে ফরমালিনমুক্ত খাবার গ্রহণ করা যাচ্ছে বলে, দিনকে দিন এই প্রযুক্তিটি মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।

প্রকাশিত : ১২ জুন ২০১৫

১২/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: