মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

পপগুরু আজম খান ॥ শূন্যতার চার বছর

প্রকাশিত : ১১ জুন ২০১৫

‘২০ আগস্ট, ১৯৭১.. একটা তাঁবুতে আলো জ্বলছে, আর সেখান থেকে ভেসে আসছে গানের সুর : হিমালয় থেকে সুন্দরবন হঠাৎ বাংলাদেশ- বুঝলাম, আজম খান গাইছে। আজম খানের সুন্দর গলা। আবার অন্যদিকে ভীষণ সাহসী গেরিলা, দুর্ধর্ষ যোদ্ধা।’- লিখেছেন জাহানারা ইমাম, তাঁর ‘একাত্তরের দিনগুলি’ বইতে।

যুদ্ধে যাওয়ার আগে আজম খান বাবাকে জানাতে গিয়েছিলেন যুদ্ধ যাত্রার কথা। বাবা বলেছিলেনÑ ‘যুদ্ধে যাচ্ছিস ভাল কথা, কিন্তু দেশ স্বাধীন না করে ফিরতে পারবি না।’ বাধ্য ছেলে কথা রেখেছিলেন। সহযোদ্ধা শহীদ রুমিসহ আরও অনেকে মিলে দেশটাকে স্বাধীন করেই তবে ফিরেছিলেন গৃহে। কুমিল্লার সালদা, ঢাকার যাত্রাবাড়ী-গুলশান এলাকায় তিনি লড়েছিলেন হানাদারদের বিরুদ্ধে। শ্রবণশক্তি কমে গিয়েছিল সেই সময়ই। তাতে কী? কণ্ঠ তো ঠিক ছিল! সেটিকে ঠিকঠাক কাজে লাগানোর জন্য আবারও নিয়মিত চর্চা শুরু করলেন তিনি। ওস্তাদ মেজো ভাই আলম খান। তিনি জানালেন তখনকার কথা।

‘একদিন আজম বললÑ মেজ ভাই, আমি তো গান কিছু জানি না। না শিখেই গাই। আমি আপনার কাছে গান শিখতে চাই। পরে আমি তাঁকে বললামÑ ঠিক আছে, শেখাব। আমার আরেক ছোট ভাই ছিল। তখন সে অভিমান করে বলেছিলÑ ভাই, আমি গান শিখতে চাইলাম কিন্তু আপনি না বলেছিলেন। আর এখন আজমকে গান শেখাবেন! আমি তাঁকে বলেছিলামÑ আসলে আজম তো একটা গাধা। তুই তো আর গাধা না!’

সেই গাধা ছেলেটা পরবর্তী সময়ে বাংলা গানকে এবং নিজেকে এমন এক বিশাল উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, তা কবীর সুমনের এই কথাগুলোতেই স্পষ্ট। ‘দশ বারো বছর আজম খান ছিলেন বাংলাদেশের একচ্ছত্র রকসম্রাট। তারপর তিনি আর গান করেননি। কিন্তু আজও তিনি যদি গান করতে মঞ্চে উঠেন, তো দর্শক ও ভক্ত সমাগম যা হবে; তা দুই বাংলার অন্য কোন শিল্পীর ভাগ্যেই জুটবে না। তাঁর অসংখ্য ভক্তের কাছে তিনি আজও গুরু। লাখো লাখো বাঙালীর মনে তাঁর অদ্ভুত আবেদনের কারণে ক্ষীণকায়, লম্বা, আপনভোলা, প্রতিষ্ঠানবিমুখ, প্রচারনিস্পৃহ আজম খান সিরিয়াস গবেষণার বিষয় হতে পারেন। সঙ্গীত ও সমাজের সম্পর্ক বাংলার বিজ্ঞজনদের মস্তিষ্কে তেমন গুরুত্ব পায়নি (ফলে এই মস্তিষ্কটি আমার মতে গবেষণার বিষয় হওয়া উচিত)। আর আধুনিক সঙ্গীত ও তাঁর সামাজিক ভূমিকা বিষয় হিসেবে ব্রাত্যই থেকে গেল। তাই আজম খানের সঙ্গীত, পরিবেশনার আঙ্গিক ও তার গণআবেদন নিয়ে গবেষণাধর্মী তেমন কোন কাজই হলো না। অকল্পনীয়রকম জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও আজম খান বাংলাদেশের সমাজে প্রান্তবাসীই থেকে গিয়েছেন।’

আসলেই.. প্রান্তবাসীই ছিলেন আজম খান। নতুবা কেনইবা তাঁকে টাকার অভাবে চিকিৎসা অসমাপ্ত রেখে সিঙ্গাপুর থেকে ফেরত আসতে হলো? দেশে আসার পর টিভি ইন্টারভিউতে সাংবাদিক যখন জানতে চাইলেনÑ কারও কাছে অর্থ সাহায্য চাইবেন কিনা; তখন তিনি বললেনÑ ‘না, আমি কারও কাছে কিছু চাই না। এই গরিব দেশে কারও কাছে কিছু চাওয়া ঠিক না। আমি বরং দেশকে আরও কিছু দিতে চাই। যতদিন বেঁচে থাকবো, যেন দিয়ে যেতে পারি।’

কী দারুণ সাহসী আর মর্যাদাবোধসম্পন্ন উচ্চারণ! জীবনের এই চরম মুহূর্তেও কারও কাছে কোন প্রকার সাহায্য না চাওয়ার মানসিকতা ক’জনার আছে!

সেই ৫ জুন, সকাল ১০টা ২০ মিনিটের পর থেকে যা যা হলো তাঁর অন্তিম বিদায় লগ্নে; সেসব আয়োজনে খরচকৃত টাকার ক্ষুদ্র অংশও যদি চিকিৎসার সময় পাওয়া যেত, হয়ত আজকেও তিনি গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে পারতেন, ‘কত আশা ছিল তাঁর জীবনে, সব স্মৃতি রেখে গেল মরণে; মা তাঁর পাশে চেয়ে বসে আছে, হায়রে হায় বাংলাদেশ, বাংলাদেশ বাংলাদেশ..’

আজম খানের ক্যান্সার হয়েছিল। চলে গেছেন তিনি তাই। আমরা যারা সুস্থ আছি বলে মনে করছি, আমাদেরকেও একদিন চলে যেতে হবে। নিয়ম এটা। না মেনে উপায় নেই। তারপরও আমরা চেষ্টা করি সুস্থভাবে শান্তিতে থাকার, যতদিন বেঁচে আছি। আজম খানকে আমরা কি তার জীবনের শেষ সময়ে অন্তত সেই শান্তিটুকু দিতে পেরেছিলাম? অথবা, নিদেনপক্ষে সেই শান্তি দেয়ার জন্য চেষ্টা করতে পেরেছিলাম?

এটা অনেক বড় প্রশ্ন... অথচ, আজম খান কিন্তু নিজের জন্য তেমন কিছুই করেননি বেঁচে থাকার সময়টুকুতে। যা করেছেন, পুরোটাই এই দেশের জন্য, এই জাতির জন্য।

তাঁর চিকিৎসাটা শেষ করতে পারলেই যে তিনি বেঁচে যেতেন, সেটাও হয়ত না। তবে সেক্ষেত্রে অন্তত এতটুকু তৃপ্তি নিয়ে তিনি শেষবারের মতো চোখ বন্ধ করতে পারতেন যেÑ এই গরিব দেশের মানুষরা মনোজগতেও অতটা দরিদ্র নয়; অন্তত একজন শিল্পীকে তারা সম্মান জানাতে পারে, একজন মুক্তিযোদ্ধাকে তারা শ্রদ্ধা জানাতে পারে। সময়ের উড়ন্ত পাখায় ভর করে কেটে গেছে চারটি বছর। আজম খান নেই কোন স্টেজে, নেই কোন টিভির লাইভে। তাই মাতামাতিও হয় না আজকাল তাঁকে নিয়ে তেমন। গলির মোড়ের সিডির দোকানে আজকাল ভুল করেও বাজে না ‘ওরে সালেকা, ওরে মালেকা..’। তার মানে কি আমরা কাটিয়ে উঠতে পেরেছি পপগুরুর শোক? ভুলে যেতে পেরেছি তাঁকে? নাহ্। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, যতদিন থাকবে লাল-সবুজ; ততদিনই থাকবেন তিনি অমর হয়ে...।

প্রকাশিত : ১১ জুন ২০১৫

১১/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: