রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

তিনি ফারুক

প্রকাশিত : ১১ জুন ২০১৫

মূল ফিচার

১৯৭১-এ বাংলা চলচ্চিত্রের আকাশে এক নতুন তারার আবির্ভাব ঘটে। ছবির নাম ‘জলছবি’। তখনকার সুপারহিট নায়িকা কবরীর বিপরীতে দেখা গেল এক সুদর্শন যুবাকে। অভিষেকেই জানিয়ে দিলেন অনেকদিন থাকবেন তিনি। হঠাৎ যুদ্ধের ডামাডোল বেজে উঠলে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। ফিরে এসে আবার অভিনয়ে মনোনিবেশ এবং একের পর এক হিট ছবি উপহার। তখনকার নায়করাজ রাজ্জাকের ধারার বাইরে বাংলা সিনেমায় যিনি নতুনত্ব নিয়ে হাজির হয়েছিলেন, তিনি আর কেউ নন, নায়ক ফারুক, যার মাঝে তৎকালীন পরিচালকরা খুঁজে পেয়েছিলেন প্রতিবাদী চরিত্রের প্রতিরূপ।

সেই সময়ে বাংলা সিনেমার জগতে নির্মিত যেসব হিট এবং আলোচিত চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছে তার প্রায় সবকটিতে তিনি অভিনয় করেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ‘সুজনসখী’ সিনেমার কথা। বৈঠা হাতে ‘সব সখীরে পার করিতে নেবো আনা আনা’ গান গাইতে গাইতে কবরীর পাশ দিয়ে নৌকা বাওয়ার দৃশ্য বাংলা সিনেমার সেরা রোমান্টিক দৃশ্যগুলোর একটি। ছবিটি পরবর্তীতে সালমান শাহ ও শাবনূরের অভিনয়ে রিমেক হয়েছিল। শুধু সুজনসখীই নয়, তার অভিনীত ‘নয়নমনি’ সিনেমা এত বেশি হিট ছিল যে পরবর্তীতে এটি রিমেক হয়। এর বাইরেও তার অভিনীত আলোচিত ছবিগুলো হলো ‘সারেং বউ’, ‘আলোর মিছিল’, ‘আবার তোরা মানুষ হ’, ‘লাঠিয়াল’, ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘সূর্য সংগ্রাম’, ‘আশা’ ইত্যাদি। এর মাঝে ‘সারেং বউ’ ছবিতে ‘ওরে নীল দরিয়া’ গানটি বাংলাদেশের মানুষের মনের মাঝে গেঁথে থাকবে চিরকাল। এই গানের দৃশ্যে অভিনয় যেন শুধু অভিনয় নয়, বরং নিজের অভিব্যক্তিতে একটা প্রচ- হাহাকার প্রকাশ করেছিলেন নায়ক ফারুক, যা নাড়া দিয়েছিল দর্শকদের হৃদয়। অভিনয়ের স্বীকৃতিও মিলেছে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ‘লাঠিয়াল’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য।

গল্প ভাল লাগলে মাঝে মাঝে দু-একটা করে কাজ করলেও গত ২২ বছর ধরে নিয়মিত অভিনয় করা বন্ধ করে দিয়েছেন গুণী এ অভিনেতা। কারণ হিসেবে বললেন, সিনেমার গল্পের কথা, বাংলা সিনেমায় নায়কের বয়স হলে বাবা বা বড় ভাইয়ে রূপান্তরিত হওয়ার কথা, যা কিনা তার মতো হিরোর কাম্য ছিল না মোটেও। ‘আমি চাই এমন একটা ক্যারেক্টার যা কিনা চ্যালেঞ্জিং হবে, কাহিনী আমাকে কেন্দ্র করে ঘুরপাক খাবে। এখনকার বাবা বা বড় ভাইয়ের চরিত্রে কাজ করে কোন বৈচিত্র্য নেই, একটা নির্দিষ্ট প্যাটার্নে ঘুরপাক খাচ্ছে সবকিছু।’ এছাড়া এক আলাপচারিতায় কাজ থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখার পেছনে আরেকটি কারণ উল্লেখ করলেন। আর তা হলো নিজের ফিটনেসের অভাব। ফলে সব ধরনের দৃশ্যে অভিনয় করা সম্ভব হয়ে ওঠে না ইদানীং, বিশেষ করে হাই ড্রামা সিকোয়েন্সে। যদি সংলাপের সঙ্গে শারীরিক প্রকাশভঙ্গি না মিলে তাহলে ঠিক জমে নাÑ আর এটাও দূরে থাকার কারণ। তবে মজার বিষয় লোকজন তাকে দেখলে এখনও বলে ‘আপনি তো সেই রকমই আছেন, অভিনয় করেন না কেন’ হাসতে হাসতে যোগ করলেন তিনি।

কবরীকে দিয়ে প্রথম সিনেমা শুরু। এরপর একে একে অভিনয় করে গেছেন ববিতা, সুচরিতা, শাবানা, রোজিনা, অঞ্জু, নূতনসহ অনেকের সঙ্গে। প্রিয় সহ অভিনেত্রী কে? এমন প্রশ্নের জবাবে ফারুক জানালেন, ‘আসলে আমি এমন এক পেশায় ছিলাম যে, সহ-অভিনেত্রীর সঙ্গে আমার কো অপারেশন না থাকলে দর্শক সিনেমা দেখে আমাকে মনে রাখবে না। আমি যদি রোমান্টিক সংলাপ চোখের এবং কথা বলার এক্সপ্রেশনে ফুটিয়ে তুলতে না পারি, তাহলে নারী দর্শকদের মাঝে আমি স্থান পাব না। সুতরাং সবার সঙ্গেই আমি মন দিয়ে কাজ করেছি, ফ্রেন্ডলি স¤পর্ক ছিল সবার সঙ্গেই, এখনও আছে।’ তবে এই ব্যাপারে মিডিয়ার প্রতি খানিক ক্ষোভ প্রকাশ করলেন তিনি। বিশেষ করে মিডিয়া তার নামে প্রচুর গসিপ নিউজ ও স্ক্যান্ডাল ছড়িয়েছে সেই সময়। ফলে তিনি ববিতার সঙ্গে বেশ কিছু ছবি করেননি। অবশ্য এতে তিনি তার কিংবা ববিতার কোন ক্ষতি হয়েছে বলে মনে করছেন না। দর্শক আরও কিছু ভাল কাজ পেত তাদের মাধ্যমে। সে ক্ষেত্রে দর্শক অবশ্যই বঞ্চিত হয়েছে।

নিজের অভিনীত ‘আলোর মিছিল’ তাঁর উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র, যদিও লিড রোলে ছিলেন না তিনি। মুক্তিযুদ্ধপরবর্তী বিভিন্ন জটিলতা নিয়ে নির্মিত এ ছবি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আলোর মিছিল অপূর্ব এক সাবজেক্ট যা আমাদের শিক্ষা দেয় যুদ্ধক্ষেত্রে সরাসরি অংশ নেয়া। কারা দেশের শত্রু, কারা ঘাপটি মেরে আছে, কারা স্বাধীনতার বিপক্ষের অপশক্তি তা খুঁজে বের করা সবার পক্ষে বেশ সহজ।’

তার অভিনীত আরেকটি সিনেমার কথা উঠতেই তিনি সেটাকে বর্তমান সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে নিলেন খুব সহজেই। আর তা হলো ‘এখনো অনেক রাত’ যে ছবির প্রেক্ষাপট মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের এক-দু’মাসের মধ্যকার কোন ঘটনা। যুদ্ধের বিভীষিকাময় পরিস্থিতি সহ্য করতে না পেরে একজন মুক্তিযোদ্ধার মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলা এবং মানসিক হাসপাতালে বসে চিৎকার করা ‘যুদ্ধ শেষ হয়নি, আমার আর্মস কোথায়? এখনও অনেক রাত’। ফারুক জানালেন, ‘আসলেই কি যুদ্ধ শেষ হয়েছে? অপশক্তি কি এখনও সক্রিয় নয়? এখনও কি গ্রেনেড, পেট্রোল ছুড়ে মানুষ মারা হচ্ছে না?’

চলচ্চিত্রে অভিনয়জীবন শেষে ফারুক এখন একজন সফল ব্যবসায়ী। গড়ে তুলেছেন নিজের টেক্সটাইল ফ্যাক্টরি। অবদান রাখছেন দেশের বস্ত্রশিল্পে। তবে সেখানেও বেশ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে তাঁকে। ফ্যাক্টরি স্থাপনের জন্য ব্যাংকে লোন চাইতে গেলে ব্যাংক কর্মকর্তা তাকে সামনে বসিয়ে রেখে অন্যদের বলেন, ফারুক সাহেবকে কেটে শত শত টুকরা করলেও প্রতিটি টুকরা থেকে বঙ্গবন্ধুকে পাওয়া যাবে। উল্লেখ্য, সে সময় স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি ক্ষমতায় ছিল না। ফলে নিজের উদ্যোক্তা জীবন শুরু করতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। তবে সরকারের কাছে বস্ত্র খাতে আরও বেশি পৃষ্ঠপোষকতা আশা করেন তিনি।

এখনকার বাংলা সিনেমা নিয়ে জানতে চাইলে ফারুক জানান, ‘গল্পে কোন চেঞ্জ আসছে না, একই ধরনের গল্পে সব কিছু ঘুরপাক খাচ্ছে। তবে হ্যাঁ দু-একজন নির্মাতা ডিফারেন্ট ফ্লেভারের গল্প নিয়ে হাজির হচ্ছে এটা আশাব্যাঞ্জক। আমি হয়ত সময়ে সময়ে অনেকের সমালোচনা করেছি, অনেককে বকে দিয়েছি। কিন্তু সেসব অবশ্যই তাদের ভালর জন্য, তাদের ধ্বংস করার জন্য নয় বরং তাদের সৃষ্টিশীলতা বৃদ্ধি করার জন্য।’ ‘আর বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার স্বপ্নের বর্তমান রূপ ডিজিটাল বাংলাদেশ। সবকিছুর সঙ্গে সঙ্গে চলচ্চিত্রকেও এগুতে হবে। আমার কেন জানি মনে হয় বিশ্ব বা আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলো যেভাবে এগিয়ে গেছে আমরা খানিক পিছয়ে পড়েছি’, যোগ করলেন তিনি। তবে বাংলা চলচ্চিত্র নিয়ে তিনি তেমনই আশাবাদী, যেমন আশাবাদী তিনি বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে। স্বপ্ন দেখেন একদিন বাংলা সিনেমা তার সোনালি গৌরব ফিরে পাবে এবং বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেটের মতো এগিয়ে যাবে অচিরেই। নায়ক ফারুকের এ স্বপ্ন সঞ্চারিত হোক বাংলা সিনেমার সকল কলাকুশলীদের মাঝে, আগামী প্রজন্মের সকল সম্ভাবনার মাঝে।

ছবি : আরিফ আহমেদ

প্রকাশিত : ১১ জুন ২০১৫

১১/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: