মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

দুই শতাধিক স্কুল-কলেজকে গোপনে পাঠদানের অনুমতি ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের

প্রকাশিত : ১১ জুন ২০১৫
  • গোটা শিক্ষা প্রশাসনে তোলপাড়, তদন্তে নেমেছে দুদক

বিভাষ বাড়ৈ ॥ এবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন না নিয়ে গোপনে দুই শতাধিক স্কুল, কলেজকে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পাঠদানের অনুমতি প্রদানের ঘটনা নিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে পুরো শিক্ষা প্রশাসনে। ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত অব্যাহতভাবে চলা গুরুতর অনিয়মের এ ঘটনা খতিয়ে দেখতে মাঠে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। কমিশনের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যেই ঘটনার ব্যাখ্যা চেয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে বোর্ডকে। অন্যদিকে শর্ত শিথিল করে পাঠদানের অনুমতির কোন এখতিয়ার বোর্ডের নেই বলে জানিয়ে ঘটনা খতিয়ে দেখার ঘোষণা দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ঘটনা কিভাবে হলো? এর পেছনের নায়করাই বা কারা? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তৎপর হয়ে উঠেছেন কর্মকর্তারা। অভিযোগ উঠেছে, বোর্ডের কর্তাব্যক্তিরা নামসর্বস্ব ও মানহীন শয়ে শয়ে প্রতিষ্ঠানকে সম্পূর্ণ বেআইনীভাবে পাঠদানের অনুমতি দিয়েছে। একই অভিযোগ মাধ্যমিক স্তর থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তরের স্কীকৃতিতেও। একটি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে এসব অনুমোদন পাইয়ে দেয়ার বিনিময়ে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের খবরে চলছে তোলপাড়।

জানা গেছে, শিক্ষা বোর্ডের অসচ্ছ এ কর্মকা-ের বিষয়ে ইতোমধ্যেই অভিযোগ এসেছে শিক্ষামন্ত্রীর দফতরে। ঘটনায় উদ্বিগ্ন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তারা। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেছেন, নীতিমালা ভঙ্গ করে কেউ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন দিলে অবশ্যই তাদের শনাক্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে খোঁজখবর নেয়া হবে বলেও তিনি জানান। মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব রুহী রহমান জনকণ্ঠকে বলেছেন, মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া পাঠদানের অনুমতির কোন এখতিয়ার শিক্ষা বোর্ডের নেই। এটা কোনভাবেই বোর্ড করতে পারে না। অনুমতির জন্য মন্ত্রণালয়ের একটি কমিটিও আছে। যে কমিটি নির্দিষ্ট সময় পর পর বৈঠকে বসে অনুমতির কাজ করে। এ কমিটির আমিও একজন সদস্য মন্তব্য করে রুহী রহমান বলেন, অবশ্যই বোর্ড এটা করতে পারে না। এই ক্ষমতা বা এখতিয়ার নেই বোর্ডের। মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখার অধিকাংশ কর্মকর্তাই নিশ্চিত করেছেন, শিক্ষা বোর্ডের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়টি ইতোমধ্যেই তাদের নজরে এসেছে। তারা এ নিয়ে কাজও শুর করেছেন।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বোর্ড ও দুদকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোতি ছাড়া ঢাকা শিক্ষা বোর্ড অন্তত দুই শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে পাঠদানের অনুমতি দিয়েছে। এই ঘটনা নির্বিঘেœ ঘটানো হয়েছে ২০০৯ সাল থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে। এসব অনুমোদনে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ তুলেছেন শিক্ষা প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তাও। নিজস্ব জমি ও অবকাঠামোহীন এসব প্রতিষ্ঠান বর্তমানে ব্যবসা কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। নেই কোন অবকাঠামো। চলছে মানহীন শিক্ষাদান আর শিক্ষা ব্যবসা। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়া এবং নীতিমালাকে উপেক্ষা করেই একটি অসাধু সিন্ডিকেট লাখ লাখ টাকার বিনিময়ে এ অনিয়ম করেছে বলে ধারণা করছেন কর্মকর্তারা।

অসাধু চক্র বোর্ডের শীর্ষ ব্যক্তিদের যে কোনভাবে ম্যানেজ করে ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত নীতিমালার শর্ত ইচ্ছেমতো শিথিল করে এসব প্রতিষ্ঠান অনুমোদন দেয়। তার মধ্যে প্রায় দুই শতাধিক প্রতিষ্ঠানের খবর পাওয়া গেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বোর্ডের বড় কর্তা থেকে শুরু করে কর্মচারী ইউনিয়নের নেতারা এ সিন্ডিকেট চক্রের সঙ্গে জড়িত। তারা ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে নিজেরাই পাঠদানের অনুমোদন নিশ্চিত করেছেন। ঘটনার পেছনে ওই মেয়াদকালে থাকা সংশ্লিষ্ট প্রায় সকল কর্মকর্তাই এখন সন্দেহের তালিকায়। যাদের অনেকেরই এখন পদের পরিবর্তন হয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের নজরে এলেও এর পেছনে প্রভাবশালী অনেক কর্মকর্তা থাকায় ভয়ে কেউ মুখ খুলছেন না। তবে অপরাধ বন্ধসহ মন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত নীতিমালায় পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ পরিবর্তনের মাধ্যমে পাঠদান অনুমোদন আরও কড়াকড়ি করা হবে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব গৌতম কুমার সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, শর্ত শিথিল করে পাঠদান অনুমোদনের একমাত্র ক্ষমতা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের। বোর্ড বা অধিদফতরের এখানে কোন ক্ষমতা নেই। এ সকল অনিয়ম বন্ধ করতে বর্তমান আইন আরও কঠিন করা হচ্ছে। কোন প্রতিষ্ঠান যদি এমন অনিয়ম করে থাকে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জারিকৃত ২০০৩ সালের আইন অনুযায়ী কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা নেয়া হবে।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, শিক্ষা বোর্ডের জালিয়াতির তদন্ত করতে দুদকের উপ-পরিচালক আবদুছ ছাত্তার সরকারের স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া পাঠদানের অনুমোদন দেয়া হয়েছে এ রকম সব প্রতিষ্ঠানের ঠিকানাসহ সব কাগজপত্র জমা দিতে বলা হয়। দুদকের পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘অনুমোদন ব্যতীত পাঠদানের অনুমতি এবং পরবর্তীতে মাউশি কর্তৃক এমপিও প্রদানের অভিযোগের সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে সকল কাগজপত্র পর্যালোচনা করা একান্ত প্রয়োজন।’ এরপর শিক্ষা বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত সচিব শাহেদুল খবির চৌধুরীর স্বাক্ষরিত একটি ব্যাখ্যাও গেছে দুদকে। ওই ব্যাখ্যায় বলা হয়Ñ ‘বোর্ডের আওতাধীন নিম্নমাধ্যমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং কলেজের পাঠদানের অনুমতি ও স্বীকৃতি সংক্রান্ত যাবতীয় কাজ মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড সম্পাদন করে থাকে। এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমতির প্রয়োজন হয় না। তবে মাধ্যমিক স্তর থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তরের স্কীকৃতি প্রদানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। ব্যাখ্যার বিষয়ে তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, পাঠদানের স্বীকৃতি বোর্ড দিতে পারে। নীতিমালায় তো এটা বলা নেই যে বোর্ড এটা পারে, তাহলে? উত্তরে তিনি বলেন, পারা যাবে না তাওতো বলা নেই। তবে বোর্ডের এ ব্যাখ্যাকে গ্রহণ করতে রাজি নন বোর্ডের বাইরের শিক্ষা প্রশাসনের অন্য কেউই।

দুদকের উপ-পরিচালক (তদন্ত-১) আবদুছ ছাত্তার সরকার সাংবাদিকদের বলেছেন, অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর আমরা তাদের কাছে সকল নথি চেয়েছি। তারা নথি না পাঠিয়ে বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত সচিবের স্বাক্ষরিত একটি চিঠি দিয়েছেন। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালের সঙ্গে যোগাযোগ করে এখন পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। জানা গেছে, এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা চাচ্ছে দুদক।

এদিকে নীতিমালায় যা বলা হয়েছে, পাঠদানের অনুমতির জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্যের ডিও লেটারের মাধ্যমে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আবেদন করতে হবে। এরপর শিক্ষা বোর্ড সেই প্রতিষ্ঠান (স্কুল-কলেজ) সরেজমিনে পরিদর্শন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে একটি প্রতিবেদন প্রদাণ করবে। তাদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠান অনুমোদনের ১৩টি শর্ত (যার মধ্যে নিজস্ব জমি, অবকাঠামো, অবস্থান ইত্যাদি) পূরণ হলে পাঠদানের অনুমতি প্রদাণ করবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এজন্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কমিটি প্রতিষ্ঠানের সকল তথ্য খতিয়ে দেখবে। উল্লেখ্য, রাজধানীর অলিগলি, আবাসিক এলাকা বা বাড়ির ফ্ল্যাটে শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে নিম্নমাধ্যমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় ও একাধিক কলেজ। এসব প্রতিষ্ঠানকে পর্যায়ক্রমে দেয়া হচ্ছে এমপিও সুবিধাও। এতে বছরে সরকারের কয়েক শত কোটি টাকা গচ্চা যাচ্ছে বলে জানা গেছে।

এদিকে বোর্ডের বিরুদ্ধে অভিযোগের এখানেই শেষ নয়। বোর্ডে পক্ষ থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা কেন্দ্র দেয়া নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন শিক্ষকরা। চলতি এইচএসসি পরীক্ষাতেই ঢাকার বেশ কয়েকটি নামী প্রতিষ্ঠান অভিযোগ করেছে, তাদের কলেজে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোসহ সকল শর্ত পূরণ করার পরেও বোর্ডের কয়েক কর্মকর্তার কারণে স্বল্পসংখ্যক শিক্ষার্থীকে পরীক্ষার সুযোগ দিয়েছে। যেখানে এক হাজারের ওপর বেশি শিক্ষার্থীর পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ আছে বলে রিপোর্ট দিয়েছে জেলা প্রশাসকের অফিস সেখানে বোর্ড তিন শ’ শিক্ষার্থীকে পরীক্ষার জন্য পাঠিয়েছে। আবার যে কলেজে ৩শ’ শিক্ষার্থীর বসার জায়গা নেই সেখানে দেয়া হয়েছে এক হাজার শিক্ষার্থীকে। ফলে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান পরীক্ষার জন্য অন্য কলেজ ভাড়া করেছে অন্য কলেজ! এ ধরনের কিছু অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি অবশ্য স্বীকার করেছেন উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক রসময় কীর্তনিয়া। বলেছেন, তারা অবশ্যই বিষয়টি দেখবেন। অবিলম্বে এসব অস্বচ্ছ কর্মকা- খতিয়ে দেখতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন শিক্ষকরা।

প্রকাশিত : ১১ জুন ২০১৫

১১/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



ব্রেকিং নিউজ: