মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ॥ তীব্র দাবদাহে পুড়ছে সাতক্ষীরা, বৃষ্টি নেই টানা ২

প্রকাশিত : ১১ জুন ২০১৫
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ॥ তীব্র দাবদাহে পুড়ছে সাতক্ষীরা, বৃষ্টি নেই টানা ২
  • উপকূলের সবুজ বেষ্টনী শুকিয়ে খাক
  • বাস্তুচ্যুত মানুষ শহরমুখী

মিজানুর রহমান, সাতক্ষীরা থেকে ॥ বৈশ্বিক উষ্ণতার শিকার এখন সাতক্ষীরা। পুড়ছে তীব্র দাবদাহে। গত ২ মাস ধরে টানা খরা চলছে। আকাশে মেঘ দেখা দিলেও বৃষ্টি নেই। মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে বুধবার ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টি হলেও সাতক্ষীরায় বৃষ্টি হয়নি। গত ৫ বছরের মধ্যে মঙ্গলবার সাতক্ষীরায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৯ ডিগ্রী সেলসিয়াস। শীতে তীব্র ঠা-া আর গরমে অতিষ্ঠ জনজীবন অসহনীয় এ পরিবেশ থেকে বাঁচতে আর জীবন ও জীবিকার জন্য জেলার উপকূলীয় এলাকায় চলছে নীরব অভিবাসন।

২০০৫ সালের আইলাপরবর্তী সময়ে জেলাসহ উপকূলীয় জনপদজুড়ে আবহাওয়ার এই পরিবর্তনে জনজীবন হয়ে উঠেছে বিপর্যস্ত। শুকিয়ে গেছে খাল, বিল, পুকুর। কচুরিপানা (শ্যাওলা) পুড়ে মরে গেছে। আম, সুপারি নারিকেল, তালসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লবণাক্ততার প্রভাবে শুকিয়ে যাচ্ছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওযায় নিরাপদ পানির জন্য চলছে হাহাকার। পরিবেশ বিপর্যয়ে উপকূলীয় জনপদ থেকে মানুষ চলে যাচ্ছে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে। চলছে নীরব মাইগ্রেশন।

সাতক্ষীরা জেলার সাতটি উপজেলার জনসংখ্যা প্রায় ২০ লাখ। কলারোয়া, সাতক্ষীরা সদর ও তালা উপজেলা ছাড়া আশাশুনি, কালিগঞ্জ, দেবহাটা ও শ্যামনগর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে চলছে খাবার পানির তীব্র সঙ্কট। অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষে মিষ্টি পানির আবাদি জমিগুলো এখন লবনাক্ততায় আক্রান্ত। ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগের পানির উৎসগুলো হারিয়ে গেছে। উপকূলীয় জনপদের মানুষগুলো এখন মিষ্টি পানির জন্য বৃষ্টি আর পুকুরের পানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। সরকারী সহায়তায় বসানো গভীর নলকূপ আর বেসরকারী স্স্থংার খনন করা পুকুর আর বৃষ্টির পানি ধরা প্রকল্পের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে আগামী ৩০ থেকে ৫০ সালের মধ্যে উপকূলীয় জেলাগুলোর মধ্যে সাতক্ষীরা আগে পানিতে তলিয়ে যাবেÑপরিবেশবিদদের এমন আশঙ্কায় ইতোমধ্যে উপকূলীয় জনপদ থেকে নীরব অভিবাসন শুরু হয়েছে। আইলাপরবর্তী সময় থেকে সাতক্ষীরার উপকূলীয় আশাশুনি ও শ্যামনগর উপজেলার তিনটি ইউনিয়নের প্রায় ১০ হাজার পরিবার নিরাপদ আশ্রয় ও কাজের সন্ধানে অন্যত্র অভিবাসন গ্রহণ করেছে এমন তথ্য তুলে ধরা হয়েছে এনজিও ফোরাম ফর পাবলিক হেলথের আয়োজনে পরিবেশ রক্ষাবিষয়ক এক এডভোকেসি সভার মূল নিবন্ধে। সরকারের পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী আইলা ও সিডরপরবর্তী সময়ে সাতক্ষীরা জেলায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকারিলায় হতদরিদ্র মানুষের অসহায় অবস্থা, লবণাক্ততায় পরিবেশ বিপর্যয়, নদী ভাঙ্গনে বাড়ি ও জমি হারিয়ে নিঃস্ব হওয়া মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য তাদের এলাকা ছেড়ে পরিবার, স্বজন নিয়ে হচ্ছে শহরমুখী। গ্রাম ছেড়ে জেলা শহর, আবার জেলা শহর থেকে অন্য জেলায় তারা নীরবে অভিবাসিত হচ্ছে। ছিন্নমূল, বস্তিবাসী হয়ে ওরা নতুন জীবিকার সন্ধান করছে। পাশাপাশি উপকূলীয় এলাকার ধনী ও সচ্ছল পরিবারে প্রায় ৫০ ভাগ পরিবার গ্রাম ছেড়ে এখন জেলা শহরে নতুন করে আশ্রয় গড়ে তুলেছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিপর্যস্ত সাতক্ষীরার উপকূল এলাকা এখন পরিবেশবিদদের জন্য গবেষণার বিষয়। নদীর তলদেশ ভরাট, অপরিকল্পিত চিংড়িচাষ, নদী, খাল, পুকুরসহ নিরাপদ মিষ্টি পানির আধারগুলো দখল করে প্রভাবশালীদের লবণপানির মাছ চাষ, সাধারণ মানুষদের জীবন বিপন্ন করেছে। এসব সরকারী জমি প্রভাবশালীদের কাছে লিজ দেয়া হয়েছে। নদী শাসন, বন ধ্বংস করাসহ নানা কারণে প্রকৃতি এখন বিপন্ন ও বিপর্যস্ত। প্রকৃতির আচরণ এখন ভিন্ন। বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টি নেই। শীতের সময়কাল কমেছে। সব মিলিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় জেলা হিসেবে সাতক্ষীরা এখন প্রকৃতিগতভাবে বিপন্ন। প্রাকৃতিক বিপর্যয়, দুর্যোগ আর বৈরী আবহাওয়া সব মিলিয়ে সাতক্ষীরা এখন জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার।

প্রকাশিত : ১১ জুন ২০১৫

১১/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



ব্রেকিং নিউজ: