কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

এবার বিএনপি বুঝেছে খালেদাকে দিয়ে হবে না- বাকিরা কবে বুঝবেন?

প্রকাশিত : ১১ জুন ২০১৫
  • স্বদেশ রায়

খালেদা যখন মোদির দেখা পাচ্ছিলেন না তখন বিএনপি নেতা লে. জেনারেল মাহবুবুর রহমান ও শ্রমিক দল নেতা রইসউদ্দিনের একটি ফোনালাপ ফাঁস হয়। ওই ফোনালাপে শোনা যায়, তাঁরা দু’জনই বলেন, খালেদাকে দিয়ে আর রাজনীতি হবে না। তিনি ২০১৯-এর নির্বাচনেও কিছু করতে পারবেন না। এমনকি এখনও তিনি কিছুই করতে পারছেন না। তবে ওই ফোনালাপে রইসউদ্দিনের শেষ ভরসা ছিল মোদির সঙ্গে খালেদার দেখা হওয়া। তাঁর কথা ছিল, মোদির সঙ্গে দেখা না হলে খালেদা শেষ।

বিএনপির শ্রমিক দল নেতা রইসউদ্দিনের মতো খালেদাও মনে করেছিলেন, মোদির সঙ্গে দেখা না হলে তিনি ও তাঁর দলের রাজনীতি শেষ। তাই দেখা করার জন্য তিনি মরিয়া হয়ে ওঠেন। বিজেপিতে আগত একজন বহু দল বদলকারী নেতা এবং বাংলাদেশের একটি ইন্টেলেকচুয়াল গ্রুপও বেশ সক্রিয় হয়ে ওঠে কিভাবে খালেদার জন্য একটি সাক্ষাতের ব্যবস্থা করা যায় মোদির সঙ্গে। তাদেরও চিন্তার মিল ছিল ওই শ্রমিক দল নেতা বা মাঠকর্মীর মতো যে, মোদির সঙ্গে দেখা না পেলে বিএনপি শেষ।

আওয়ামী লীগের কর্মীদের ভেতরও অনেকে এমনটি বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন যে মোদির সঙ্গে দেখা পেলে মরা বিএনপি একটা প্রাণ পাবে। কিন্তু বিজেপিতে যিনি আগত তিনি তাদের হাতের পুতুল। তাঁর সুতোর টানে নাচা থেকে খুব বেশি কিছু করার নেই। বিজেপি দলটির একটি কট্টরপন্থী মাদার অর্গানাইজেশান আছে। যেখানে এসব পুতুলদের কোন প্রবেশাধিকার নেই। অন্যদিকে দিল্লীর চানক্যপুরি যে এখানে বেশ খেলাধুলা করেছে তা বাইরের থেকে বোঝা যায়। তারা বিএনপিকে সময় দেয়ার জন্য শেষ সময় পর্যন্ত বিষয়টি ধোঁয়াশার ভেতর রাখে। যার ফলে প্রতি মুহূর্তে বিএনপি নার্ভাস হয়ে পড়তে থাকে- সঙ্গে খালেদাও। তাদের এই নার্ভাসনেস প্রতি মুহূর্তে বিএনপিকে ভারতের কাছে নতজানু করতে থাকে। এক পর্যায়ে এসে তারা অঙ্গীকারনামা দেয়। যা অনেকটা আগের দিনে দেড় টাকার স্ট্যাম্পে অঙ্গীকারনামা দেয়ার মতো।

কিন্তু খেলা এখানেই শেষ হয় না। মোদির সঙ্গে সাক্ষাতের ভেতর দিয়ে বলা যায় খালেদার রাজনীতির সমাপ্তি রেখা টানা হয়ে যায়। এই সমাপ্তি রেখার নিউজটি করেছেন কলকাতার স্টেটসম্যানের বাংলা সংস্করণের সম্পাদক মানস ঘোষ। তিনি তাঁর পত্রিকায় নিজ নামে করা লিড আইটেমে খালেদার সঙ্গে মোদির একান্ত বৈঠকের তথ্য ফাঁস করেছেন। মোদি খালেদাকে একান্তে তিনটি প্রশ্ন করেছেন। তাঁর প্রথম প্রশ্ন ছিল, ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জী যেদিন ঢাকায় আসেন ওই দিন হরতাল আহ্বান কারা করেছিল? খালেদা আমতা আমতা করে উত্তর দিয়েছেন, ওটা জোটের কর্মসূচী ছিল। কিন্তু মোদির বাকি দুটি প্রশ্নের উত্তর খালেদা দিতে পারেননি। মানস ঘোষের নিউজ অনুযায়ী, খালেদার প্রতি মোদির দ্বিতীয় প্রশ্ন ছিল- তিনি প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় ২০০৪ সালে চট্টগ্রাম বন্দরে দশ ট্রাক অবৈধ অস্ত্র খালাস হয় উত্তর-পূর্ব ভারতের সন্ত্রাসীদের কাছে নিয়ে যাবার জন্য। তাঁর দুই মন্ত্রী এর সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদার কাছে এ বিষয়ে নিঃসন্দেহে অনেক তথ্য আছে। তিনি কি সে সব তথ্য দিয়ে এই মামলায় সহযোগিতা করবেন? আর তৃতীয় প্রশ্ন ছিল, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান বোমা ও অবৈধ অস্ত্র সম্পর্কিত মামলার তদন্তে দেখা যাচ্ছে সেখানে খালেদার দলের ও তাঁর জোটের জঙ্গীরা জড়িত। তাদেরকে আইনের আওতায় নেয়ার বিষয়ে খালেদা সর্বাত্মক সহযোগিতা করবেন কিনা? মানস ঘোষের নিউজে জানা যাচ্ছে, শেষের দুই প্রশ্নে খালেদা লা জবাব ছিলেন।

ভারত এখানে তেমন কোন লুকোচুরির কূটনীতি কিন্তু করেনি। কারণ, মোদি যে খালেদাকে এ ধরনের কিছু বলেছেন তারও ইঙ্গিত তাদের পররাষ্ট্র সচিব জয়শঙ্কর তাঁর প্রেস ব্রিফিংয়ে দিয়ে গেছেন। তিনি বলেছেন, খালেদাকে বলা হয়েছে, ভারত যেমন গণতন্ত্রের পক্ষে তেমনি জঙ্গী ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে। জয়শঙ্করের এক লাইনের বক্তব্যের শেষের অংশটুকু মোদি-খালেদা একান্ত বৈঠকের সারমর্ম। প্রথম অংশটুকু অনেকেই জানেন। সেখানে খালেদা ও তাঁর দলের নেতারা যা করেছেন, তা শুধু নতজানু নয়, চরম লজ্জারও। এ লজ্জাকর ঘটনা জানা থাকলেও তার বিবরণ না লেখাই শোভনীয়। শুধু একটা তথ্যই প্রমাণ করে নতজানুর কোন পর্যায়ে গিয়েছিলেন বিএনপি নেতারা ওই বৈঠকে যে, মান-সম্মানের খাতিরে মোদির পক্ষের অনেকে বৈঠকের সমাপ্তি টানতে ব্যস্ত হন। কারণ, তারাও তো মানুষ, মানুষের কাছে মানুষ এতটা নতজানু হোক- এ কোন ভদ্রলোক চায় না!

মোদি-খালেদা বৈঠকের প্রথম অধ্যায়ের ওই লজ্জাকর অবস্থা ও দ্বিতীয় অধ্যায় মানস ঘোষের রিপোর্ট থেকে পাওয়া খালেদার লা জবাব অবস্থা। এর পরে খালেদার রাজনীতির আর অস্তিত্ব আছে এটা কোন আন্তঃ এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলবেন বলে মনে করলে ভুল হবে। সকলেই জানেন, এই অঞ্চলের জঙ্গী নেটওয়ার্ক, অস্ত্র চোরাচালান, মানব পাচার এ ধরনের আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীদের কর্মকা- প্রতিরোধে ভারত, বাংলাদেশ ও আমেরিকা একযোগে কাজ করছে। এমনকি বাংলাদেশ সম্প্রতি কিছু গুরুত্বপূর্ণ জঙ্গীকে ডিটেক্ট করতে এবং ধরতে পেরেছে; কিন্তু এফবিআই-এর দেয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে। এদের সম্পর্কে এফবিআই তথ্য পায় আল কায়েদা ও আইএস জঙ্গীদের দেয়া তথ্য থেকে। ওরা আইএস জঙ্গী হিসেবে বর্তমানে ধরা পড়লেও তাদের রাজনৈতিক সম্পর্ক ও আশ্রয়স্থল বিএনপি ও জামায়াত। তাই জামায়াত ও বিএনপি যেখানে এ এলাকার আন্তর্জাতিক আইএস জঙ্গীর মূল শিকড় সেখানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী যখন সরাসরি খালেদাকে বলেন, তাঁর দলের লোকেরা বর্ধমানের খাগড়াগড়ের কর্মকা-ের সঙ্গে জড়িত বলে তার দেশের তদন্তে প্রমাণ মিলছে। এর পরে কি খালেদাকে নিয়ে আর ভাবার কোন অবকাশ আছে? বরং খালেদার রাজনীতির কফিনের শেষ পেরেকটি ৭ জুন সোনারগাঁও হোটেলেই ঠোকা হলো।

কিন্তু একটি আশ্চর্য বিষয় হলো, খালেদার কিছু অন্ধ সমর্থক খালেদা যখন তাঁর কফিনে একটি একটি করে পেরেক মারার দ্বার উন্মুক্ত করছেন আর তারা প্রতিটি দ্বার খোলার সঙ্গে সঙ্গে উচ্ছ্বসিত হচ্ছেন। যেমন গত ছয় মাসে খালেদা তার শেষ পেরেকগুলো মারার দ্বার উন্মোচন করেছেন। প্রথমে তিনি তথাকথিত অবরোধের নামে পেট্রোল বোমা দিয়ে মানুষ পুড়িয়ে হত্যা শুরু করেন। তার ওই অন্ধ ভক্তরা এর ভেতর সরকার পতনের ইঙ্গিত খুঁজে পায়। এ অধ্যায়ে খালেদার কী হলো, এ নিয়ে নিশ্চয়ই মন্তব্য করার প্রয়োজন নেই। এর পরে ওই অন্ধরা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের ভেতর দিয়ে ফিনিক্স পাখির মতো খালেদার উত্থানের স্বপ্ন দেখেছিল। ওই অধ্যায় শেষে একটি মৃত বিএনপি বাংলাদেশে আছে। তাই মৃত বিএনপি নেতা খালেদা শেষ জীবনী শক্তি চেয়েছিলেন মোদির কাছে। কী পেলেন, তার প্রমাণ মানস ঘোষের রিপোর্ট।

এ কথা ঠিক, কোন দেশে একটি রাজনৈতিক জোট বা দল থাকতে পারে না। তার অর্থ এ নয় যে, কোন একটি রাজনৈতিক শক্তির বিপরীতে খালেদার মতো একটি জঙ্গী শক্তি থাকবে! আর এ কারণেই আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিকভাবে একটি দ্বিতীয় শক্তি খোঁজা হচ্ছে। কিন্তু এই দ্বিতীয় শক্তির ক্ষেত্রে সব থেকে বড় ভুল করছেন বাংলাদেশের এক শ্রেণীর ব্যবসায়ী। বাংলাদেশের অন্যতম বড় স্টেকহোল্ডার এখন ব্যবসায়ীরা। অনেক ধনী অর্থনীতির দেশের মতো বাংলাদেশেরও রাজনীতিতে এখন তারা অনেক বড় ফ্যাক্টর। তবে একটি বিষয় এখানে মনে রাখতে হয়, কোন দেশেই ব্যবসায়ীরা যত বড় শক্তিশালী স্টেকহোল্ডার হোক না কেন, যখন কোন দেশে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রভাবশালী কোন শক্তিশালী রাজনৈতিক নেতা দাঁড়িয়ে যান, তখন তার বিপরীতে কারোরই কিছু করার থাকে না। বাংলাদেশে শেখ হাসিনা এখন সে মাপের নেতা। তাই তাঁর সূর্য যতক্ষণ মধ্য গগনে ততক্ষণ কারও কিছু করার নেই।

তবে তারপরেও ব্যবসায়ীদের একটা অসুবিধা থাকে। কারণ সকলে মিলে একই পাত্রে দুধ পান করতে পারেন না। এটা সব দেশেই। তাই সাধারণত স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক দেশে দুটি শিবিরে তারা বিভক্ত হয়। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা যারা শেখ হাসিনার পাত্রে স্থান পাচ্ছেন না তাদেরকে খালেদার পিছনে শক্তি ও অর্থ নষ্ট করে ভুল পথে হাঁটার সময় বুঝি আর নেই। কারণ, বাংলাদেশ অর্থনীতির আরেক অধ্যায়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। এ সময়ে তাদেরকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যেমন বাংলাদেশে প্রায় শতাব্দী প্রাচীন ব্যবসায়ী পরিবারের উত্তরাধিকার লতিফুর রহমান। তিনি তার দুটি পত্রিকা দিয়ে খালেদাকে বাঁচিয়ে রাখার মরণপণ চেষ্টা করছেন। আবদুল আউয়াল মিন্টু তাঁর ছেলেকেও উৎসর্গ করেছেন খালেদার নামে। এ সব ব্যবসায়ীর মনে হয় এখন লে. জেনারেল মাহবুবুর রহমানের মতো উপলব্ধির সময় এসেছে, ‘খালেদাকে দিয়ে আর হবে না’। অতএব, এখানে আর শক্তি ক্ষয় নয়। অবশ্য তাদের ক্ষীণ আশা শুধু একটাইÑ হাসিনার পাত্র যতই বড় হোক, আন্তর্জাতিক বলয় সব ডিম এক পাত্রে রাখবে না। তাদের হিসাব অমূলক নয়। তবে মনে রাখা দরকার, সাপের গর্তে কেউ ডিম রাখবে না। তাই নতুন পাত্র তাদের তৈরি করতে হবে। সেখানে তাঁরা আন্তর্জাতিক সমর্থন পাবেন।

swadeshroy@gmail.com

প্রকাশিত : ১১ জুন ২০১৫

১১/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: