আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বিশ্বরেকর্ডের অপেক্ষায় মুমিনুল

প্রকাশিত : ১০ জুন ২০১৫
  • মোঃ মামুন রশীদ

টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশ দলের অভিযানটা তেমন সুখকর নয়। দীর্ঘ ১৫ বছর কেটে গেলেও দীর্ঘ পরিসরের এ ফরমেটে শক্তিমত্তায় নিজেদের ভয়ঙ্কর দল হিসেবে গড়ে তুলতে পারেনি বাংলাদেশ। অন্য কোন টেস্ট খেলুড়ে দেশের কাছেও তেমন সমীহ আদায় করতে পারেনি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতিটায় অনেক পরিবর্তন এসেছে। ধারাবাহিকভাবে প্রতিপক্ষকে সমস্যায় না ফেলতে পারলেও মাঝে মধ্যেই তাদের কাঁপিয়ে দেয় টাইগাররা। এর পেছনে অনেক বড় ভূমিকা আছে বেশ কয়েকজন ক্রিকেটারের। বর্তমান সময়ে অধিনায়ক মুশফিকুর রহীম আর মুমিনুল হক সৌরভ তাঁদের ব্যাটের ঝলকানিতে অব্যাহতভাবেই প্রতিপক্ষের জন্য ভীতির কারণ হয়ে উঠেছেন। সর্বশেষ ১১ টেস্টে মুমিনুল অন্তত একটি করে পঞ্চাশোর্ধ ইনিংস উপহার দিয়ে এখন একটি বিশ্বরেকর্ডের সামনে। ভারতের বিরুদ্ধে একমাত্র টেস্টে একটি অর্ধশতক হাঁকাতে পারলেই দক্ষিণ আফ্রিকার এবি ডি ভিলিয়ার্সের বিশ্বরেকর্ডে ভাগ বসাবেন তিনি। টানা ১২ টেস্টে অর্ধশতক হাঁকিয়েছেন ভিলিয়ার্স। যদিও রেকর্ড নিয়ে চিন্তা করে বাড়তি কোন চাপ নিতে চান না মুমিনুল, খেলতে চান নিজের স্বাভাবিক খেলাটা।

বিস্ময় সৃষ্টি থেকে আর এক ধাপ দূরে! ফতুল্লায় ভারতের বিরুদ্ধে একমাত্র টেস্টে একটিমাত্র অর্ধশতক প্রয়োজন। তাহলেই টেস্ট ক্রিকেটে বিশ্বরেকর্ড গড়ে ফেলবেন মুমিনুল। দীর্ঘ পরিসরের ক্রিকেটে যাত্রা শুরুর পর থেকেই সৌরভ ছড়িয়ে যাচ্ছে তাঁর ব্যাট। আর ব্যাটিং অর্ডারে তিন নম্বর স্থানটায় বাংলাদেশ দলে পাকাপোক্ত করে ফেলেছেন নিজের অবস্থান। অনেকটাই ধীরস্থির স্বভাবের বলে অবশ্য কিছুটা দোষ দিয়ে থাকেন অনেকে। কিন্তু সেভাবেই তিনি আজ অন্যরকম এক উচ্চতায় পৌঁছে গেছেন। ছাড়িয়ে গেছেন ভারতের শচীন টেন্ডুলকরকে আর কিংবদন্তি ক্রিকেটার ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্যার ভিভিয়ান রিচার্ডসকে ছুঁয়ে ফেলেছেন। এমনকি তাঁর পেছনে পড়ে গেছেন স্যার ডন ব্র্যাডম্যান, স্যার গ্যারি সোবার্স, স্যার ক্লাইড ওয়ালকট, জ্যাক ক্যালিস, আলভিন কালিচরণ, রাহুল দ্রাবিড়, এ্যালান বোর্ডার, মার্ক টেলর, কুমার সাঙ্গাকারা, জন এডরিচ, মাইক গ্যাটিং, ইয়ান চ্যাপেল, গ্রাহাম গুচ, ওয়ালি হ্যামন্ড ও এড উইকসদের মতো বিশ্বনন্দিত টেস্ট ক্রিকেটাররা। মাত্র ২৩ বছর বয়সেই কি অসম্ভব কীর্তিই না গড়েছেন মুমিনুল? তাঁর বয়সে তালিকায় থাকারা সেটা করতে পারেননি। টানা ১১ টেস্টেই অর্ধ-শতাধিক রানের ইনিংস খেলে বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছেন যা ভিভ রিচার্ডসেরও আছে। টেস্ট ইতিহাসে সর্বাধিক সেঞ্চুরি ও রানের রেকর্ডধারী টেন্ডুলকরের আছে টানা ১০ টেস্টে। এখন অবিস্মরণীয় এক কীর্তি গড়ার সামনে দাঁড়িয়ে মুমিনুল। ফতুল্লা টেস্টের যে কোন এক ইনিংসে শুধু একটি হাফসেঞ্চুরি করলেই হবে। টানা ১২ টেস্টে অর্ধ-শতাধিক রানের ইনিংস খেলে এককভাবে বিশ্বরেকর্ডের মালিক ভিলিয়ার্স। ভিলিয়ার্সের বিশ্বরেকর্ডে ভাগ বসানোর দারুণ সুযোগ মুমিনুলের।

মুমিনুল যা করেছেন সেটার শুরু ২০১৩ সালের ৯ অক্টোবর সফরকারী নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে। ১৮১ রানের দুর্দান্ত এক ইনিংস খেলে হৈচৈ ফেলে দেন তিনি। ‘লিটল মাস্টার’ ফিরে এসেছেন। এ উপাধিটি বিশ্ব ক্রিকেটে তাঁর নামের সঙ্গেজুড়ে যায়। ২০১২ সালেই ওয়ানডে ক্রিকেটকে বিদায় জানানো ‘লিটল মাস্টার’ ভারতের ক্রিকেট ঈশ্বর খ্যাত শচীন টেন্ডুলকর টেস্ট ক্রিকেটেও বিদায়ের ঘোষণা দিয়ে ফেলেছিলেন। এ কারণে বাংলাদেশের তরুণ টপঅর্ডার মুমিনুল হক সৌরভকে নিয়ে ভারতীয়রাই গণমাধ্যমে ফলাও করে লিখেছিলেন বিশ্ব ক্রিকেটে নতুন লিটল মাস্টারের উদয় হয়েছে। ক্যারিয়ারের চতুর্থ টেস্টেই দুর্দান্ত কিউইদের বিরুদ্ধে ওই ইনিংস খেলেছিলেন তিনি। সেটি ছিল টেস্ট ক্যারিয়ারে নিজের মাত্র ষষ্ঠ ইনিংস। তখন মাত্র ২১ বছর বয়স। এ কারণেই ক্যারিয়ারের শুরুতেই পেয়ে যান এমন সম্মান! টানা ১১ টেস্টে পঞ্চাশোর্ধ ইনিংস খেলে এখন মুমিনুল ঠাঁই নিয়েছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের কিংবদন্তি স্যার ভিভিয়ান রিচার্ডসের পাশে। সঙ্গে আছেন আরও দুই ভারতীয় ক্রিকেটার বীরেন্দর শেবাগ ও গৌতম গাম্ভীর। এখন তাঁদের ছাড়িয়ে নতুন উচ্চতায় ওঠার সুযোগ তাঁদেরই উত্তরসূরিদের বিরুদ্ধে।

শচীনের টেস্ট অভিষেক হয়েছিল ভিনদেশে। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তিনি আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শুরু করেন টেস্ট ম্যাচ দিয়ে। মুমিনুল ওয়ানডে দিয়ে শুরু করলেও টেস্ট ক্রিকেটে যাত্রা শুরু করেন শ্রীলঙ্কা সফরে। অভিষেক টেস্টেই ৫৫ রানের একটি অর্ধশতক দিয়ে শুরু হয়েছে তাঁর ক্যারিয়ার। যেটা শচীন পারেননি। ভিভ রিচার্ডসেরও টেস্ট ক্যারিয়ার দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে যাত্রা শুরু হয় ভিনদেশ ভারতের মাটিতে। তিনিও পারেননি অভিষেকেই অর্ধশতক হাঁকাতে। পরের টেস্টেও অর্ধশতক হাঁকান মুমিনুল। ধারাবাহিকতার প্রতীক হয়ে ওঠেন নিয়মিত রানের মধ্যে থেকে। অবশেষে ২০১৩ সালের অক্টোবরে সফরকারী কিউইদের বিরুদ্ধে ক্যারিয়ারের চতুর্থ টেস্টে খেলতে নেমেই অবিস্মরণীয় এক কীর্তি গড়ে ফেলেন মুমিনুল। ১৮১ রানের দারুণ এক ইনিংস খেলে দেশের মাটিতে কোন বাংলাদেশী ক্রিকেটারের মধ্যে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস খেলেন তিনি। সেটি অবশ্য এবার খুলনা টেস্টে ছাড়িয়ে গিয়ে তামিম ইকবাল খেলেছেন ২০৬ রানের ইনিংস। তবে ওই ইনিংসটির পরই মুমিনুল বহির্বিশ্বে নয়া ‘লিটল মাস্টার’ খেতাব পেয়ে যান।

এত বড় খেতাব যার নামের পাশে তাঁকে চিনতে ভুল করেননি দেশ-বিদেশের ক্রিকেটবোদ্ধারা। ধারাবাহিকভাবেই তাঁর ব্যাটে রান এসেছে। ১৪ টেস্টে তাঁর রান ১৩৮০। ব্যাটিং গড় ৬০! আছে চারটি সেঞ্চুরি ও ৯টি হাফসেঞ্চুরি। গত মাসের প্রথমদিকে মিরপুরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে তিনি বাংলাদেশের পক্ষে সর্বোচ্চ ইনিংসটি খেলেছেন বিপদের মুহূর্তে একাই লড়ে সাবলীল ভঙ্গিতে ব্যাট চালিয়ে। ১০২ বলে ৯ চারে তিনি ৬৮ রান করে ফিরে যান। এর আগেই দেশের মাটিতে পূর্ণ করেন ১ হাজার রান। মুমিনুলের আগে অবশ্য অনেক বেশি ম্যাচ খেলে হাবিবুল বাশার (২২ টেস্ট), মোহাম্মদ আশরাফুল (২৮ টেস্ট), তামিম ইকবাল (২৫ টেস্ট), মুশফিকুর রহীম (২৬ টেস্ট) ও সাকিব আল হাসান (২৭ টেস্ট) দেশের মাটিতে এই কীর্তি গড়েছেন। অথচ মাত্র ৯ টেস্টে মুমিনুলের রান ৭৫ গড়ে ১০৫০! ব্যাটিং গড়ে দেশের মাটিতে তিনিই সবার ওপরে। সেটাকে আরও বাড়িয়ে নেয়ার সুযোগ তাঁর সামনে। সর্বশেষ ১১ টেস্টে তাঁর ব্যাট থেকে এসেছে- ১৮১, ২২*, ৪৭, ১২৬*, ৮, ৫০, ১৩, ১০০*, ৫১, ১২, ৩, ৫৬, ৫৩, ০, ৩৫, ৫৪, ৪৮, ১৩১*, ৮০, ২১, ১৩ ও ৬৮।

কোন ব্যাটসম্যানই ক্যারিয়ার শুরুর দুই বছর হওয়ার আগেই এমনটা করতে পারেননি। বাকিরা করেছেন টেস্ট ক্রিকেটে দীর্ঘদিন বিচরণ করে যথেষ্ট অভিজ্ঞ হওয়ার পর। সেটা মুমিনুল মাত্র ক্যারিয়ারের চতুর্থ থেকে শুরু করে ১৪তম টেস্ট পর্যন্ত টানা ১১ টেস্টে করে দেখালেন। মুমিনুলের আগে বাংলাদেশের পক্ষে টানা অর্ধশতক পাওয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে ছিলেন তামিম। তিনি ২০১০ সালে টানা ৭ টেস্টে খেলেছিলেন পঞ্চাশোর্ধ ইনিংস। মুমিনুলের সামনে এবার হাতছানি ভিলিয়ার্সের বিশ্বরেকর্ডের সঙ্গী হওয়ার। তবে এসব নিয়ে কোন চিন্তাই নেই মুমিনুলের। এমনটাই জানিয়েছেন তিনি। মুমিনুল বলেন, ‘আমিতো উনার (ভিলিয়ার্স) আশপাশে নেই। আপনারাই জানেন উনি সব ফরমেটেরই রাজা। আমি মনে করি না যে আমি তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী। আসলে সেটা নিয়ে চিন্তা করছি না, কার পাশে বসব কি বসব না। আমি আগের ম্যাচগুলোতে যেভাবে খেলে আসছিলাম এখনও চিন্তা করব সেভাবে খেলার। যেভাবে প্রস্তুতি নিয়েছি এবং আপনারা যেমন প্রত্যাশা করেন, দেশের মানুষ যেভাবে প্রত্যাশা করে এবং আমার যেটা টার্গেট সেটা অর্জন করার চেষ্টা করব। কারও পাশে বসার জন্য নয়। আপনারা যখন বলেন তখন একটু মনে পড়ে। এরপর আবার ভুলে যাই। কোন চাপ অনুভব হয় না। আপনারা চলে গেলে আর মনে থাকবে না। চেষ্টা করব পরবর্তীতে যেন মনে না থাকে।’

প্রকাশিত : ১০ জুন ২০১৫

১০/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: