মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

মুদ্রা বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে মধ্যপ্রাচ্যের তেল

প্রকাশিত : ১০ জুন ২০১৫

অর্থনৈতিক রিপোর্টার ॥ অধিকাংশ বিনিয়োগকারীই প্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি-হ্রাসের কারণ হিসেবে মার্কিন ডলারকে দায়ী করেন। যদিও এক্ষেত্রে ডলার এবং পণ্যের মূল্যের ক্ষেত্রে খুব কমই শক্তিশালী সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু সত্যিই কি বিনিয়োগকারীদের এই দাবির পক্ষে জোরালো কোন যুক্তি আছে? বিভিন্ন তথ্য এবং উপাত্ত বিশ্লেষণে জানা যায়, বিশ্ববাজার অর্থনীতি বাস্তবে কিছুটা ভিন্ন কায়দায় গতিশীল হয়। উদাহরণস্বরূপ, ডলারের মান নির্ধারণে তেলের রয়েছে শক্তিশালী প্রভাবক ভূমিকা, যা কিনা বাস্তবে বৃহদার্থে সকল পণ্যের মূল্যের ওপর চাপ বৃদ্ধি করে।

ডলার আর তেলের সম্পর্কের যে দিকগুলো তুলে ধরা হয় বাস্তবে এই সম্পর্ক ঠিক অতটাই কম গতিশীল। কিন্তু একটু ভাল করে বিবেচনা করলে দেখা যায়, তেলের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক রয়েছে ইউরোর।

প্রতিবছর অপরিশোধিত তেল মারফত বিশ্বে প্রায় এক দশমিক সাত ট্রিলিয়ন ডলারের লেনদেন হয়। অন্য কোন খাতে এই পরিমাণ অর্থ লেনদেন না হওয়ায় খুব সহজেই তেল সার্বিক বাজারের উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে। অপরিশোধিত তেলের দামে নিম্নগতি হলেও খুব অল্প সময়েই তা ডলারের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছে। কিন্তু আমরা দেখতে পাই ডলারের মূল্য যখন বৃদ্ধি পায় তখন ইউরোর মূল্য কমে যায়।

অর্থনীতিবিদ রবার্ট গ্যাব্রিয়েল লুতার গবেষণা অনুযায়ী সৌদি আরব এবং ইরানের মতো তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো তেল ডলারে বিক্রি করলেও বিনিয়োগের প্রশ্নে তারা ইউরো ব্যবহার করে। তাই যখন তেলের দাম কমে যায় তখন তাদের বাৎসরিক আয়ও কমে যায়। আর ঠিক তখনই তারা তাদের রিজার্ভ অর্থ ডলার থেকে ইউরোতে নিয়ে যায়। সম্প্রতি সৌদিআরবের তেলমন্ত্রী আলী আল নাইমি জানান, ‘কেউই তেলের দাম ঠিক করতে পারে না। এটা নির্ভর করে শুধু আল্লাহর ওপর।’ তেলের প্রশ্নে বিশ্ব মুদ্রাবাজার নিয়ে ঠিক কোন রাজনীতি প্রতিনিয়ত হচ্ছে তা কেবল একটি দেশই পুরোপুরি বলতে পারবে।

বিশ্বের তেল সরবরাহ এবং চাহিদা বিশ্লেষক করে দেখা যায়, ওপেক গত সেপ্টেম্বরে গত দেড় বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো তেলের উৎপাদন বাড়িয়েছে এবং সেপ্টেম্বর পরবর্তী সময় থেকে ওপেক প্রতিদিন তেলের উৎপাদন কমিয়ে শূন্য দশমিক পাঁচ থেকে এক মিলিয়ন ব্যারেলে এনেছে। কিন্তু এই ঘটনার এক মাস পূর্বেই যে তেলের দাম কমতে শুরু করে সেটা কি শুধুই কাকতালীয় ব্যাপার? এটা নিশ্চয়ই সৌদি তেলমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী আল্লাহ করেননি। উপরন্তু বলা যায়, তেলের বাজারের কিছু প্রতিযোগী এই তেলের দাম হঠাৎ করে কমে যাওয়ার বিষয়টি জানত। প্রাপ্ত তথ্য থেকে এটা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে যে, তেল হলো সেই পণ্য যা সার্বিকভাবে মুদ্রাবাজারকে প্রভাবিত করে। এমনকি অর্থ ছাড়াও অন্যান্য বাজারের ওপরও প্রভাব বিস্তার করতে পারে তেল।

এটা তো পরিষ্কার যে তেলের বাজারে প্রতিযোগীদের মধ্যে সৌদি আরব অন্যতম। গত তিন দশকে তারা বেশ কয়েক দফা তেলের দাম বৃদ্ধি করে বাজার থেকে বিপুল পরিমাণ ডলার তুলে নিয়েছে। এর ফলে অন্যান্য বাজার ব্যবস্থাতেও এর প্রভাব সরাসরি পরিলক্ষিত হয়েছে। এখানে বলা প্রয়োজন, যুক্তরাষ্ট্রের রফতানিকারক ব্যবসায়ীরা অনেকদিন ধরেই পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন। যার বাস্তব চিত্র বিগত বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের বহির্দেশীয় বাণিজ্য হতে উপার্জিত আয়ের পরিমাণ দেখলেই বোঝা যায়।

এটা বললে মোটেও অতিরিক্ত বলা হবে না যে, সৌদি আরব এই মুহূর্তে বিশ্ব মুদ্রাবাজার নিয়ন্ত্রণের চূড়ান্ত অবস্থানে অবস্থান করছে। আমরা সঠিক জানি না, কি কারণে গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে সৌদি আরব প্রায় হঠাৎ করে তেলের উৎপাদন বাড়িয়েছিল। যদিও আমরা দুইটি যৌক্তিক ব্যাখ্যা দেখতে পাই। প্রথমত, দীর্ঘদিন ধরেই সৌদি আরব তাদের শক্তিমত্তা প্রমাণ করতে চাইছে। তারা বাস্তবেই এটা ভয়ঙ্করভাবে চাইছে যা যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত সৌদি আরবের কয়েকটি তেলক্ষেত্র বন্ধ করে দেয়ার মাধ্যমে টের পাওয়া যাচ্ছে। আমেরিকান অয়েল এ্যান্ড গ্যাস রিপোর্টারের মতে, গত বছরের মে মাসেও যুক্তরাষ্ট্রে সৌদি তেলের রিগের সংখ্যা ছিল ১৮৫৪টি, কিন্তু বর্তমানে সেই রিগের সংখ্যা মাত্র ৮৯৪টি। আর এই রিগ সংখ্যা কমিয়ে দেয়ার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে শেল তেল কোম্পানির ওপর।

চলতি বছরের এপ্রিলে শেল কোম্পানির চার্টে দেখা যায়, তেল উৎপাদন কমে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন এ্যাডমিনিস্ট্রেশনের মতে, এপ্রিলে শেল কোম্পানির দিন প্রতি উৎপাদন ছিল পাঁচ দশমিক বাষট্টি মিলিয়ন ব্যারেল, যা কিনা পরবর্তী মে-জুন মাসে গিয়ে দাঁড়ায় পাঁচ দশমিক পঞ্চান্ন মিলিয়ন ব্যারেল।

ভিন্ন দৃষ্টিকোণ দিয়ে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ডলারের মূল্য বৃদ্ধি করার জন্যই সৌদি আরবের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র আইএমএফে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে ডলারের মূল্য বাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য লাল সঙ্কেত এই জন্য যে, চীন সম্প্রতি তাদের জাতীয় মুদ্রা ইয়েনকে নিয়ে এসডিআর প্রকল্পে প্রবেশ করতে চাইছে। তাই আমেরিকানদের কাছে চীনের ইয়েন খুব শিগগিরই চরম হুমকি হিসেবে দেখা দেবে। আর তাই যদি হয় তাহলে খুব বেশি দেরি নেই যখন যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপের একটি অংশ অর্থনৈতিকভাবে কার্যত হুমকির মুখে পড়বে।

প্রকাশিত : ১০ জুন ২০১৫

১০/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: