কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

আমার মন কেমন করে

প্রকাশিত : ৯ জুন ২০১৫
  • মাহবুব রেজা

এয়ারপোর্টে ইমিগ্রেশনের ঝামেলা শেষ করতেই শোভনের মেজাজ বেশ বাড়াবাড়ি রকমের খিচাং হয়ে গেল। পাসপোর্ট, ভিসা সব হান্ড্রেড পার্সেন্ট ঠিক তারপরও ইমিগ্রেশনের লোকগুলো শোভনের দিকে তাকিয়ে এমনভাবে কথাবার্তা বলল, ওর পাসপোর্ট উল্টেপাল্টে দেখল যে তা দেখে সত্যি সত্যি শোভনের নিজেকে দাগী অপরাধী বলে মনে হয়।আসলেই কী সে তাই! এর কোন মানে হয়? শোভন নিজের মেজাজটা ধরে রাখল। ইমিগ্রেশনের লোকজনের এ সব কর্মকা- দেখে শোভনের মনে হলো এরা বুঝি সাক্ষাত শার্লক হোমস। না, না, শার্লক হোমস না, এরা কিরিটি রায়, ফেলুদা, ঘনা দা, টেনি দা জটায়ু, ব্যোমকেশÑ চাই কী তারও অধিক কিছু।

ইমিগ্রেশনের লোকটা শোভনের পাসপোর্টটা অনেকক্ষন ধরে দেখল। যেন ওটা দেখার বিষয়। তারপর ওর হাতে ফিরিয়ে দিয়ে লোকটা বেশ নাটুকে ঢঙে বলল, কতদিন ধরে থাকা হয় ইতালিতে?

এটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। পাসপোর্টের মধ্যেই সব তথ্য প্রমাণ লিপিবদ্ধ আছে। কোন দেশে, কবে থেকে শোভন আছে। শোভন কিন্তু তারপরও ইমিগ্রেশনের লোকগুলো কেন যে এসব অবান্তর প্রশ্ন করে?

হ্যাঁ, অবান্তর প্রশ্নই তো। শুধু শুধু সময় নষ্ট। মেজাজ খারাপ।

শোভনের চড়ে থাকা মেজাজটা তখনও আগের অবস্থানে। এটা কোন প্রশ্ন হলো? শোভন এ প্রশ্নের কী উত্তর দেবে?

কোন কথা না বলে শোভন পাসপোর্টটা হাতে দিয়ে ট্রলি ঠেলে সামনের দিকে এগুতে থাকল। ঠিক তখন পেছন থেকে লোকটা একই প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি করে উঠল ।

শোভন দাঁড়িয়ে পড়ল। পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখল লোকটা বেশ আগ্রহ দিয়ে শোভনের কথা শোনার জন্য দাঁড়িয়ে আছে।

শোভন বলল, আমাকে কিছু বললেন?

লোকটা অবাক হয়ে শোভনকে দেখতে থাকে।

এবার শোভন লোকটার দিকে তাকিয়ে বেশ শব্দ করে হো হো করে হেসে ফেলল, কতদিন ধরে থাকা হয় ইতালিতে এটাই তো আপনি জানতে চেয়েছেন তাই না? শোভন হাসিটা আগের মতো মুখে ধরে রেখে বলল, কোয়াজি নভে আননি। আই কাপিতো (প্রায় নয় বছর ধরে আছে। কি বলেছি বুঝেছেন)?

শোভনের কথা শুনে লোকটা থ’ মেরে গেল।

ছেলেটা বলে কী!

লোকটা যে শোভনের কথা বুঝতে পারে নি সেটা ও ভালো করেই বুঝল। তারপরও শোভন বলল, আপনার প্রশ্নের উত্তর পেয়েছেন?

লোকটা তখন বলল, কোয়াজি নভে আননি এর মানে কী?

মানে না বুঝলে আমি কী করব? শোভন কাঁধ ঝাঁকিয়ে উত্তর করল।

কী করব মানে? উত্তরটা বাংলায় দেবেন।

শোভন আবারও আগের মতো করে বলল, নন পোসো পর মেÑ (আমার পক্ষে সম্ভব নয়)।

লোকটা শোভনের দিকে তাকিয়ে রইল। তাকে বেশ অসহায় দেখাচ্ছে।

শোভন গট গট করে ভেতরে ঢুকে গেল। লোকটা দেখল তার সামনে দিয়ে একজন পঁচিশ বছরের টগবগে যুবক ট্রলি ঠেলতে ঠেলতে ইমিগ্রেশনের কাঁচের দরোজা দিয়ে ভেতরে চলে যাচ্ছে।

লোকটা তখন রাগ করা গলায় বলল, এরা যে কীভাবে দেশের বাইরে থাকে? এটিকেসি জানে না, বিহেভ জানে না। নর্ম জানে না। যত্তোসব এংরি ইয়াং জেনারেশন।

লোকটার কথা শুনে পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা শোভনের বয়েসী আরেকজন বলে উঠল, ভাই কিছু মনে করবেন না। আমি তো পেছনে থেকে পুরো ঘটনাটা দেখলাম। দোষটা তো আপনারÑ

আমার! লোকটার চোখ প্রায় কপালে উঠে যায়।

হ্যাঁ আপনার।

কীভাবে?

এই যে আপনি ওকে বললেন কতদিন ধরে ইতালিতে থাকা হয়। এই তথ্যটা ওর পাসপোর্টেই লেখা আছে। এটা তো ভেরি কমন থিংÑ

সেটা তো আমি জানিই। ইমিগ্রেশনের কাজই হলো প্যাসেঞ্জারকে যাবতীয় বিষয়ে প্রশ্ন করাÑ

প্রশ্ন আপনি করতেই পারেন প্যাসেঞ্জারকে কিন্তু তাই বলে তাকে অযথা, বিব্রত কিংবা বিরক্ত করতে পারেন না। এটা ইমিগ্রেশনের কাজ না।

তাহলে ইমিগ্রেশনের কাজটা কী?

শোনেন আমি নিজেও দশ বছর ধরে ইউরোপে থাকি। ওখানকার ইমিগ্রেশনের লোকজনদের দেখেছি। ওরা প্যাসেঞ্জারের জন্য অনেক হেল্পফুলÑ

তার মানে আমরা হেল্পফুল না?

এবসোলিউটলি না।

কী বলতে চাচ্ছেন আপনি?

ভাই আপনার সঙ্গে কথা বলে আমি নিজেও এখন বিরক্ত বোধ করছি।

ছেলেটা লোকটার সঙ্গে আর কথা বাড়াল না। শুধু বলল, ভাই বিদেশ থেকে মাস খানেকের জন্য দেশে বাবা-মা-ভাইবোন-প্রিয়জনের সঙ্গে দেখা করে বিদেশ বিভূঁইয়ে যাচ্ছি। এমনিতেই আমাদের মনটা খুব খারাপ থাকে। তারপরও যদি আপনারা বিমানবন্দরে এমন উদ্ভট, উল্টাপাল্টা প্রশ্ন করতে থাকেন তখন মেজাজটা সত্যি সত্যি বিগড়ে যায়। বলতে বলতে ছেলেটার গলার স্বর নেমে আসতে থাকে।

ইমিগ্রেশনের লোকটা তখন অন্য রকম দৃষ্টি মেলে ধরে ছেলেটার দিকে।

প্রকাশিত : ৯ জুন ২০১৫

০৯/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: