মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

বিএনপির ব্যর্থতায় সুসম্পর্কের নতুন উন্মোচন

প্রকাশিত : ৮ জুন ২০১৫
  • সিডনির মেলব্যাগ ॥ অজয় দাশগুপ্ত

বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে কথা বলার মানুষের অভাব নেই। আমরা থাকি বিদেশে। যতই দেশ দেশ করি আসলে আমাদের জীবন প্রবাহ গেছে বদলে। আমাদের জীবনে এখন যে বাস্তবতা তার নিরিখে দেশ ভাবনার ভেতর ক্রোধ নেই, আছে সহাবস্থান আর সম্প্রীতির আশাবাদ। দেশের মানুষের যে অংশটি প্রবাসেও ঝামেলা বাধায়, তার কাছ থেকে এখন দশ হাত দূরে থাকি। এদের প্রান্তিক সীমার কাহিনী এখন প্রকাশ্য। তবু এদের ভেতর জামায়াতী আর জাতীয়তাবাদীদের যে প্রভাব এবং আস্ফালন, তার একটা বিহিত দরকার। সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফর নিয়ে এরা যা বলছে, লজ্জা থাকলে আরেকবার উচ্চারণ করত না। আগেই বলেছি, এগুলো তাদের কথা নয়। তারা মানুষ হিসেবে কেউ খুব একটা মন্দ বা দেশপ্রেমী নয় এমন বলা যাবে না। জামায়াতীদের গোঁড়া অংশ বাদে বাকিরা দেশের মঙ্গল আর ভাল চায়। কিন্তু রাজনীতির কুটিল প্যাঁচে তাদের মতামত এখন পথহারা। অথচ তারা একবারও ভাবছে না যাদের কারণে এই অন্ধত্ব, তারা কি চায় বা কি বলছে?

একদা ভারতবিদ্বেষী বিএনপি যে কোন মূল্যে মোদিসঙ্গের জন্য দিশেহারা। এর মাজেজা না বোঝার কি কোন অর্থ আছে? যেদিন থেকে জনগণের পরিবর্তে ষড়যন্ত্র আর প্রভুবাদ আশ্রয় হয়েছে, সেদিন থেকে বিএনপির পতনের শুরু। মোদির চাইতে বড় বড় নেতারা যখন কোন দেশ সফরে যান তখন কী হয়? সে দেশের সরকার ও বিরোধী দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসে। এটাই শিষ্টাচার। ওবামা, ক্যামেরন বা পুতিনের বেলায়ও তাই হয়। আমাদের দেশে কেন হবে না? সে নিয়মে মোদির সঙ্গে সরকারী দল ছাড়া দেখা করার অধিকার রাখেন রওশন এরশাদ। এখন যারা এই নির্বাচন ও ফলাফলক গ্রাহ্য না করে দেশের বারোটা বাজিয়ে মানুষ মেরে ভেবেছিল কেল্লা ফতে, তাদের অধিকার তো বিলুপ্ত। আমরা ধরে নিলাম যে, নির্বাচন ঠিকমতো হয়নি বা ফলাফল অন্য ধরনের হতে পারত, সেটা কি জনগণ মেনেছে? না মানাতে পেরেছে তারা? যখন তারা তা পারল না, ভাংচুর আর ধ্বংসের রাস্তা বেছে নিয়ে এখন গণতন্ত্রের জন্য মায়াকান্না, এটা ভারত মানবে কোন্ দুঃখে?

বিএনপি তো আগাগোড়াই বলে আসছে, এ সরকার টিকে আছে দিল্লীর আশীর্বাদে। প্রবাসে একদল মানুষ গুজব ছড়ায়Ñ শাপলার ঘটনা শেখ হাসিনার নিরাপত্তা আর শত্রুদমনে নাকি ভারতের হাত স্পষ্ট। তাই যদি হয় আপনারা মোদির বিরোধিতা না করে তোষামোদিতে ব্যস্ত কেন?

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক তো সরলরেখার কিছু না। বরং জটিল। এই জটিলতা বাণিজ্যে, এই জটিলতা সীমান্তে, এই জটিলতা আরও নানা বিষয়ে। সেখানে বিরোধী দলের ভূমিকা কি? আমার মনে হয়, বিদেশে যারা বিএনপি করেন বা সমর্থক তারাও মওদুদের মতো এ দলটির ভাল বা মঙ্গলের পরিবর্তে এর ভেতরে ভাঙ্গনের বাঁশি আর সর্বনাশের রাস্তা প্রশস্ত করে চলেছেন। ভাল বুদ্ধি বা পরামর্শ দেয়ার লোক থাকলে দলটি এ জায়গায় এসে ঠেকত না। সব মানুষের মতো রাজনৈতিক দলের জীবনেও বিপর্যয় বা পরাজয় থাকে। আওয়ামী লীগের মতো দলের কথা চিন্তা করুন। স্বাধীনতার পর এত বড় নেতৃত্বদানকারী দলের অবস্থা এমন হতে পারে আমরা স্বপ্নেও ভাবিনি। নেতাদের মেরে ফেলে দলটিতে ভাঙ্গনের চেষ্টা করে শাসনকারীদের রক্তচোখের আইন বানিয়েও কিন্তু দমন করা যায়নি। এবেলায় আমরা আওয়ামী লীগকে ফিনিক্স পাখির সঙ্গে তুলনা করতে পারি। যার মৃত্যু নেই, বরং ছাইভস্ম থেকেও যে উঠে দাঁড়াতে জানে। জাতীয়তাবাদীরা আদর্শহীন গদিনির্ভর দল বলে ভাসমান মানুষ বা বুদবুদ ধারণার ভোটারদের ভোটের আশা থাকার পরও নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারছে না। কারণ তাদের আসলে কোন আদর্শ নেই। আপনি যে কোন বিএনপির মানুষকে প্রশ্ন করে দেখুন, তাদের উত্তর তিনটা। এক) জিয়াউর রহমান, দুই) বাকশাল, তিন) ভারতবিরোধিতা। এগুলো এখন মৃত ইস্যু। এগুলোর পায়ে ভর দিয়ে আর কাজ হবে না। গত এক দশকে বাংলাদেশের মানুষের জীবনে যে পরিবর্তন, যে আধুনিকতা তার সঙ্গে চলার উদ্যম বা গতি কোনটাই মনে হয় না আর আছে তাদের। যে কারণে আমরা দেখছি সিনিয়র নেতারা সুযোগ পেলেই ফোনে বা গোপনে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে বলছেন। এই বিরোধিতার খবর কি শুধু দেশেই সীমাবদ্ধ? আজকের যুগে মিডিয়ার এই খোলা দুনিয়ায় ভারত তো বটেই, খোদ আমেরিকা-ইউরোপেও এগুলো নিমিষে চাউড় হয়ে যায়। বিএনপি ভুলে যায় তাদের সালাহ উদ্দীন এখনও ভারতে। তার কাছ থেকে ভারত সরকার কী কী খবর আদায় করেছে সে কি আমরা জানি? সে জায়গাগুলোতে নজর না দিয়ে মোদিতুষ্টির চেষ্টা আসলেই কি কোন ফলাফল বয়ে আনতে পারবে?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন নির্লজ্জ ভারতপ্রীতি আগে দেখা যায়নি। বঙ্গবন্ধু স্বয়ং এমনটি দেখলে ভিরমি খেতেন। তিনি এত ঘটনা, এত ত্যাগ আর সাহায্যের পরও ভারতকে তার সেনা প্রত্যাহার থেকে নিজের সঠিক অবস্থানের ব্যাপারে সাফ কথা বলতে ছাড় দিতেন না। অন্যদিকে মওলানা ভাসানী তাঁর ব্যর্থ ভারত বিরোধিতার দায় নিয়ে বিদায় নিয়েছিলেন। মনে রাখা ভাল, ভৌগোলিক সীমান্ত বা প্রভাব কিছুটা প্রাকৃতিক, কিছুটা ভাগ্যনিয়ন্ত্রিত। সে জায়গা কি খালি আস্ফালন আর কথা দিয়ে মোকাবেলা সম্ভব? আমরা যত আস্ফালন করেছি, তত ভারতের জালে আটকা পড়েছি। ভারতীয়রা কিন্তু উল্টো। প্রতিবেশী দেশগুলো যত তাদের ওপর খেপেছে, তারা তত তাদের ভুল পথে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। পাকিস্তান, বাংলাদেশ, নেপাল সবার বেলায় এটা সত্য। এমনকি শ্রীলঙ্কার বেলায়ও।

বিএনপির একটাও আর অবশিষ্ট নেই। সবাই তাদের দিয়ে তাদের শক্তি ব্যবহার করে নিজেদের ভারত বিরোধিতার স্বার্থ হাসিল করে এখন পগার পার। বিএনপি তাই দিশেহারা হয়ে মোদি দর্শনে বেপরোয়া। তবে শেষ পর্যন্ত তারা মোদি দর্শনে সফল হয়েছেন। এখন দেখার বিষয় তাদের এই ভারতপ্রীতি কত দিন থাকে।

আমরা চাই বাংলাদেশ ও ভারত সত্যিকার বন্ধু ও সৎ প্রতিবেশী হিসেবে বসবাস করুক। আমাদের অনেক পথ যেতে হবে। আমাদের একসঙ্গে চলারও বিকল্প রাখেনি প্রকৃতি। নিয়তিনির্ভর সংশ্লিষ্টতা আর সম্পর্কের কারণেই ভাল সম্পর্ক দরকার। তবে এটা ঠিক আত্মসমর্পণ আর জি হুজুর পলিসি নয়, নিজের অধিকার আদায়ের মাঝেই আছে এর সমাধান। এ সরকার যেন তা করতে পারে।

প্রকাশিত : ৮ জুন ২০১৫

০৮/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: