কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

প্রাণ ফিরে পাচ্ছে ঘূর্ণায়মান রঙ্গমঞ্চ, যুগল মন্দির নান্দনিক স্থাপনা

প্রকাশিত : ৭ জুন ২০১৫
প্রাণ ফিরে পাচ্ছে ঘূর্ণায়মান রঙ্গমঞ্চ, যুগল মন্দির নান্দনিক স্থাপনা
  • মুক্তাগাছার রাজবাড়ি

বাবুল হোসেন ॥ মুক্তাগাছা জমিদারবাড়ির সবকিছুই সাজানোগোছানো হচ্ছে নতুন করে। সংস্কার ও মেরামতের মাধ্যমে আসল চেহারা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা। প্রতœতত্ত্ব অধিদফতরের তত্ত্বাবধানে চলছে এই সংস্কার। রাজবাড়ির প্রধান দালান ও রাজরাজেশ্বরী দেবি মন্দিরের প্রথম ধাপের কাজ শুরু হয়েছে বছরখানেক আগে। কাজ শেষ হলে আগের চেহারা ফিরে পাবে ‘জমিদার স্মৃতি’ এমন দাবি সংস্কার কাজের সঙ্গে জড়িত কর্মীদের।

পুরনো রাজবাড়ির ঠিক মাঝখানে শ্বেতপাথরের স্বয়ংক্রিয় ঘূর্ণায়মান রঙ্গমঞ্চের ধ্বংসাবশেষের চিহ্ন এখনও দৃশ্যমান। পাশে নান্দনিক কারুকার্যখচিত রাজরাজেশ্বরী মন্দির। পেছনে রাজ কোষাগার, টিন- কাঠের সুরম্য দ্বিতল রাজপ্রাসাধ। প্রাসাদ লাগোয়া রাজমাতার অন্দরমহল। রাজরক্ষী ও প্রহরীদের আস্তানা। রাজবাড়ির সম্মুখভাগের বিশাল লোহার ফটক পেরুতেই চোখে পড়বে সুউচ্চ করিডর। এর একপাশে রাজদরবার ও দ্বিতল কাছারিঘর। আরেকপাশে লাইব্রেরী। জনশ্রুতি রয়েছে, করিডরের দু’পাশে ছিল হাতির ছয়টি মাথার ওপর শিকার করা বাঘের নমুনা। রঙ্গমঞ্চ আর এই করিডরের মাঝখানে ছিল লক্ষ্মীপূজা, দুর্গাপুজোর ঘর। এসবের অনেক কিছুই এখন কালের সাক্ষী, হারিয়ে যেতে বসেছিল। প্রতœতত্ত্ব অধিদফতর দায়িত্ব নেয়ার পর প্রাণ ফিরে পেতে যাচ্ছে রাজবাড়িটি। দীর্ঘদিন সংস্কার না হলেও মুক্তাগাছার ষোলো হিস্যার জমিদার মহারাজ সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরীর রাজবাড়িটিতে এখনও দেখার আছে অনেক কিছু। রাজবাড়ি লাগোয়া বিশাল সব পুকুর, মন্দির ও যুগল মন্দিরসহ সুন্দর স্থাপত্যশৈলীর এই বাড়িটি ঘুরে দেখলে মন জুড়িয়ে যায়।

ময়মনসিংহ শহর থেকে মুক্তাগাছা জমিদারবাড়ির দূরত্ব মাত্র ১৬ কিলোমিটার। এই মুক্তাগাছায় ছিল ষোলো হিস্যার জমিদার। ১৬ জন জমিদার মুক্তাগাছা অঞ্চল শাসন করতেন। মহারাজ সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী ছিলেন অন্যতম জমিদার। তারই দত্তকপুত্র মহারাজ শশীকান্ত আচার্য চৌধুরী। মুক্তাগাছার দর্শনীয় স্থানসমূহের মধ্যে রাজপরিবারের বাড়িটি পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয়। প্রায় এক শ’ একর জমির ওপর রাজপরিবারের তিনটি বাড়ির অবস্থান। এক নম্বর বাড়িটি ছিল মহারাজ সূর্যকান্তের। সম্মুখভাগের একতলা ভবনটি বেশ উঁচু ও উপরিভাগ নানা কারুকার্য শোভিত। লোহার পাত ও কাঠের পাটাতনের ওপর এর ছাদ নির্মিত। এর চারপাশে ব্যবহৃত লোহার পাতেও রয়েছে নানা নকশাখচিত। বেশ চওড়া করিডর। হাতি অনায়াশে এই ভবনের নিচ দিয়ে যাতায়াত করতে পারত। মূল ভবনটির মেরামত ও সংস্কার কাজ শুরু পর্বে ঘষামাজার পর রং লাগানো হয়েছে। বহু কাজ বাকি এখনও। এই ভবনের একপাশে ছিল রাজদরবার, আরেকপাশে লাইব্রেরী। রাজদরবারের পেছনে দ্বিতল ভবনে ছিল কাছারি। লাইব্রেরীর পেছনের একতলা ভবনে ছিল মিউজিয়াম। এই মিউজিয়ামে শ্বেতপাথর ও কষ্টিপাথরের নানা মূর্তিসহ জমিদারদের ব্যবহৃত ঢাল, তলোয়ার ও নানা সামগ্রী ছিল। মিউজিয়াম ও কাছারি লাগোয়া ছিল চমৎকার ভেন্টিলেশনের লক্ষ্মীপূজা ও দুর্গাপূজার দৃষ্টিনন্দন ঘর। লক্ষ্মীপূজা ঘরের মূর্তি রাখার আসনটি মোড়ানো ছিল শামুক, ঝিনুক আর মূল্যবানসব ধাতব ও পাথর দিয়ে। দুর্গাপূজার ঘরটিও ছিল চমৎকার। এসবের পেছনে রাজবাড়ির ঠিক যেন মাঝখানে ছিল স্বয়ংক্রিয় ঘূর্ণায়মান রঙ্গমঞ্চ। এটি শ্বেতপাথরে নির্মিত। পরে এটি ময়মনসিংহ শহরের টাউন হলে স্থাপন করা হয়েছিল। এখন অবশ্য এর আর কোন অস্তিত্ব নেই। মুক্তাগাছা রাজবাড়ির এই রঙ্গমঞ্চের পাশেই ছিল রাজেশ্বরী মন্দির। এর মেঝে শ্বেতপাথরে মোড়ানো। দরজায় জোড়া সিংহ ও জোড়া ময়ূরসহ সিমেন্টের ওপর নানা কারুকার্য খচিত রয়েছে। এর সম্মুখভাগের সংস্কার কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। মেঝেতে বসানো হয়েছে দামী টাইলস। রং আর কারুকার্যের ব্যবহার এর আসল চেহারা ফুটিয়ে তুলছে। রঙ্গমঞ্চের পেছনে আছে গোপন রাজকোষের সুরক্ষিত লোহার পাঁচ কুঠুরি। রাজপরিবারের সোনাদানা, হীরা, মানিক-মুক্তাসহ নগদ অর্থকড়ি রাখা হতো সুরক্ষিত এই কুঠুরিতে। এর পেছনে রয়েছে টিন আর কাঠের দ্বিতল সুরম্য রাজপ্রাসাদ, মহারাজ শশীকান্তের শোয়ার ঘর। অপূর্ব স্থাপত্যশৈলীর এই ঘরের নিচতলায় চারপাশে করিডর দিয়ে ঘেরা চারটি পৃথক কক্ষ। এসব কক্ষের চারপাশ কাঁচ দিয়ে ঘেরা ছিল। তবে বাথরুম লাগোয়া উপরের চারটি কক্ষ ছিল লোহার পাত দিয়ে ঘেরা। শশীকান্তের শোয়ার ঘরের এক কোণায় ছিল রাজমাতার ঘর। এটিও টিন আর কাঠের দ্বিতল। আরেক কোণায় ছিল শশীকান্তের বোনের ঘর। শশীকান্তের শোয়ার ঘরের একপাশে ছিল রান্নাঘর। পুরো বাড়ির পেছনে রাজরক্ষী ও প্রহরীদের থাকার ব্যবস্থা। এর পেছনে গোপন সুড়ঙ্গ। জনশ্রুতি রয়েছে, এই সুড়ঙ্গপথে মুক্তাগাছা রাজবাড়ির সঙ্গে ময়মনসিংহ শহরের শশীলজের যোগাযোগ ছিল। চারপাশে দেয়াল দিয়ে ঘেরা বাড়ির পেছনে বিশাল পুকুর। মূলত এটিই ছিল মুক্তাগাছায় শশীকান্তের বসতবাড়ি। বর্তমানে রাজবাড়িটি প্রতœতত্ত্ব অধিদফতরের অধীনে। বাড়িটি দেখভাল করতে চারজন কর্মচারীও রয়েছে। সুন্দর স্থাপত্যশৈলীর এই বাড়িটি বিপন্ন হওয়া থেকে রক্ষার দায়িত্ব নিয়েছে প্রতœতত্ত্ব অধিদফতর।

এই রাজবাড়ির পাশে আরও দুটি রাজবাড়ি রয়েছে। একপাশের দু’নম্বর বাড়িটি ছিল শশীকান্তের এক ভাইয়ের। এটি বর্তমানে মুক্তাগাছা শহীদস্মৃতি ডিগ্রী কলেজ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আরেকপাশের তিন নম্বর বাড়িটিতে রাখা হতো রাজপরিবারের হাতি। কথিত আছে, এই পরিবারের ৯৯ হাতি ছিল। হাতিশালটি এখন আর্মড ব্যাটালিয়ন পুলিশ হেডকোয়ার্টার করা হয়েছে। এই তিনটি বাড়ির সামনে আরও আছে গোপাল মন্দির, শিব মন্দির। একটু দূরে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন যুগল মন্দির। এছাড়া মুক্তাগাছা শহরে ছড়িয়েছিটিয়ে আছে বিশাল বিশাল অনেক পুকুর। প্রজাসাধারণের পানীয়জলের সমস্যা মেটাতে জমিদাররা এসব পুকুর খনন করেছিলেন। মুক্তাগাছা রাজপরিবারের অনেক নিদর্শন খোয়া গেছে। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময়ও লুট হয়ে গেছে বাড়ির মূল্যবান অনেক সম্পদ। রাজপরিবারের ব্যবহার্য কিছু সামগ্রী রাখা হয়েছে ময়মনসিংহ পৌরসভা জাদুঘরে।

প্রকাশিত : ৭ জুন ২০১৫

০৭/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



ব্রেকিং নিউজ: