কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

এককালের ভারতবিরোধী বিএনপি এখন ব্যস্ত ভারত স্তুতিতে!

প্রকাশিত : ৭ জুন ২০১৫

শরীফুল ইসলাম ॥ এক সময় চরম ভারতবিরোধী অবস্থানে থাকলেও হঠাৎ বিএনপির উল্টো সুর। ভারতের সংসদে স্থল সীমান্ত চুক্তি পাস হওয়ার পর এটাকে ইতিবাচক বলে স্বাগত জানায়। এরপর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফর নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে। সেই সঙ্গে দলের নেতারা ভারতের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে বক্তব্য রাখার পাশাপাশি মোদির সঙ্গে সাক্ষাত পেতে তোড়জোড় শুরু করে। এ চেষ্টায় সফলও হয় তারা। এটা কি ভারতের বিষয়ে বিএনপির অবস্থান পরিবর্তন না ক্ষমতায় যাওয়ার পথ প্রশস্ত করতে সাময়িক রাজনৈতিক কৌশল এ নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দলের নেতাকর্মীরা ভারতবিরোধী প্রচারণা শুরু করেন। তারা বরাবরই বলে আসছেন স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবুর রহমান ভারতের সঙ্গে ২৫ বছরের গোলামী চুক্তি করে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছেন। মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি নিয়ে চালানো হয়েছে নানা উৎকট প্রচারণা। ১৯৭৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির পক্ষ থেকে ভারতবিরোধী প্রচারণা মাঠে ছড়ানো হয়। এই ভারত বিরোধিতাকে কাজে লাগিয়ে নির্বাচনী বৈতরণী পার হয়ে যায় বিএনপির। ১৯৮১ সালের ৩০ মে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর তার স্ত্রী খালেদা জিয়া বিএনপির দায়িত্ব নেন। তিনিও জিয়াউর রহমানের রেখে যাওয়া ভারতবিরোধী প্রচারণা অব্যাহত রাখেন।

১৯৯১ সালের নির্বাচনের আগে বিএনপি ভারতের বিরুদ্ধে প্রচার-প্রচারণার মাত্রা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়। নির্বাচনী প্রচার চালাতে গিয়ে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াসহ দলের নেতাকর্মীরা জোরেশোরে বলতে থাকেন, আওয়ামী লীগকে ভোট দিলে বিসমিল্লাহ চলে যাবে, ভারত দেশের অভ্যন্তরে ঢুকে যাবে, ২৫ বছরের গোলামী চুক্তি আবার অনুমোদন পাবে এবং ভারতের হাতে দেশের সার্বভৌমত্ব চলে যাবে। ভোটারদের একটি বড় অংশই বিএনপির এই অপপ্রচারকে সত্য বলে মনে করেছিল। আর এ কারণেই সেবার বিএনপি নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছিল।

১৯৯৬ সালের ১৫ জুনের একতরফা নির্বাচনে আবারও বিএনপি জয়লাভ করে। কিন্তু ওই বছর ১২ জুনের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগকে ঠেকাতে আবারও ভারতবিরোধী প্রচারণাকে সামনে নিয়ে আসে বিএনপি। দলের পক্ষ থেকে প্রচার করা হয় আওয়ামী লীগকে ভোট দিলে ফেনী পর্যন্ত ভারত হয়ে যাবে। এছাড়া আওয়ামী লীগ আবারও ভারতের সঙ্গে গোলামী চুক্তি করবে বলেও বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল। বিএনপির এ অপপ্রচার সামাল দিতে তখন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হয় তারা ক্ষমতায় গেলে ভারতের সঙ্গে ২৫ বছরের চুক্তি নবায়ন হবে না। তবে সে নির্বাচনে বিএনপির ভারতবিরোধী প্রচারণার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ শক্ত অবস্থানে থাকায় বিজয়ের ফসল ঘরে তুলতে সক্ষম হয়। কিন্তু আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যাওয়ার পরও বিএনপি ভারতবিরোধী প্রচার অব্যাহত রাখে। ’৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে ভারতের সঙ্গে গঙ্গা পানি চুক্তি করলে আবারও বিএনপি এবং তাদের রাজনৈতিক মিত্র জামায়াত সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা করতে থাকে।

১৯৯৬ সালের ১৫ মে কিশোরগঞ্জ স্টেডিয়ামে এক নির্বাচনী জনসভায় বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া ভারতের নাম উল্লেখ না করে বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে দেশের মানুষকে পরাধীনতার শৃঙ্খল পরাবে। ভোবে তারা স্বাধীনতার পর পরাধীনতার শৃঙ্খল পরিয়েছিল।

২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আবার বিএনপি-জামায়াত জোরেশোরে ভারতবিরোধী প্রচার চালাতে থাকে। আওয়ামী লীগকে ভোট দিলে ভারতের আধিপত্য বিস্তার হবে, মসজিদে মসজিদে উলুধ্বনি শোনা যাবে। সেবার ভিন্ন কৌশলে এমন প্রচারণা চালিয়ে বিএনপি সফলও হয়। কিন্তু ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির এ ধরনের প্রচার কাজে লাগেনি। ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর ২০১১ সাল পর্যন্ত ভারতের সঙ্গে ট্রানজিট, ট্রান্সশিপমেন্ট এবং টিপাইমুখ বাঁধ ও সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নিয়ে বিএনপি দেশের রাজনীতি উত্তপ্ত করার চেষ্টা করে। ২০১২ সালের ডিসেম্বরে ভারত সফর করেন খালেদা জিয়া। সে সময় রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি, প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং এবং কংগ্রেস ও বিজেপির সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ বৈঠক করেন তিনি। খালেদা জিয়ার ভারত সফরের পর কৌশল পরিবর্তন করে ভারতের গুণগান করতে শুরু করে বিএনপি।

২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফরে যান। তার আগে ২ জুন রাজধানীতে ছাত্রদলের এক সমাবেশে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া বলেন, ভারতের কাছ থেকে স্বার্থ আদায় করতে না হলে দেশে ফিরে এলে শেখ হাসিনার পথে কাঁটা দেয়া হবে, আন্দোলন শুরু করা হবে। আর শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পর ১৭ জুন সংবাদ সম্মেলন করে খালেদা জিয়া বলেন, ভারত গিয়ে প্রধানমন্ত্রী গোপন চুক্তি করেছেন। দেশবিরোধী এ চুক্তি আমরা প্রত্যাখ্যান করছি। প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে দুই দেশের মধ্যে যে যৌথ ইশতেহার হয় তাকে খালেদা জিয়া ভারত সরকারের ইশতেহার বলে আখ্যায়িত করেন। এছাড়া তিনি প্রধানমন্ত্রী ভারতের কাছে দেশ বিক্রি করে দিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন। পরদিন ১৮ জুন সংবাদ সম্মেলন করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেন, খালেদা জিয়া সংবাদ সম্মেলন করে অন্ধভাবে ভারতবিরোধিতা করেছেন। আর দেশ বিক্রির কথা তার মুখে মানায় না।

২০১০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি একটি পত্রিকায় দেয়া সাক্ষাতকারে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এমকে আনোয়ার বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের কাছে বাংলাদেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়েছেন। ২০১০ সালের ১৯ জানুয়ারি চারদলীয় জোটে বিএনপির শরিক দল জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী সংবাদ সম্মেলন করে বলেন, দেশটাকে চিরদিনের জন্য ভারতের উন্মুক্ত বাজারে পরিণত করেছে। একই বছর ১৩ জুন সংবাদ সম্মেলন করে বিএনপি মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফরের মধ্য দিয়ে দেশটাকে ভারতের হাতে তুলে দেয়ার চুক্তি করেছেন। ২০১০ সালের ১৪ জানুয়ারি একটি পত্রিকায় ‘দিল্লীর সঙ্গে শেখ হাসিার চুক্তি আত্মঘাতী বশ্যতা’ শীর্ষক মন্তব্য প্রতিবেদন লিখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের কঠোর সমালোচনা করেন।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যাপারে বিশ্বের বিভিন্ন প্রভাবশালী দেশের সহযোগিতা পেলেও ভারতের কাছ থেকে কোন সহায়তা পায়নি। তাই ২০১৩ সালের ৪ মার্চ বাংলাদেশ সফরের সময় ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জীর সঙ্গে সেনারগাঁও হোটেলে গিয়ে সাক্ষাত করার কথা থাকলেও বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া সেদিন ২০ দলীয় জোটে বিএনপির শরিক দল জামায়াতের ডাকা হরতালের অজুহাতে প্রণব মুখার্জীর সঙ্গে সাক্ষাত করতে যাননি। হরতালের মধ্যে গাড়িবহর নিয়ে গুলশানের বাসা থেকে সোনারগাঁও হোটেলে গেলে হরতাল ভঙ্গ করা হবে এবং এ জন্য দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্র জামায়াত নাখোশ হবে বলে সেদিন খালেদা জিয়া প্রণব মুখার্জীর সঙ্গে সাক্ষাত করতে না গিয়ে শিষ্টাচারবহির্ভূত কাজ করেন। প্রণব মুখার্জীর সঙ্গে পূর্বনির্ধারিত সাক্ষাত অনুষ্ঠানে না গিয়ে খালেদা জিয়া যে অসৌজন্যতা দেখিয়েছেন সে বিষয়টিকে ভালভাবে নেয়নি ভারত। তাই ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের ক’টি প্রভাবশালী দেশ বিএনপির পক্ষে অবস্থান নিলেও ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয় সাংবিধানিকভাবে নির্বাচন হলে সেক্ষেত্রে বলার কিছু নেই। নির্বাচনের পর আবার আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে ভারতের তৎকালীন কংগ্রেস সরকারের প্রতি নাখোশ হয় বিএনপি। তবে ভারতের নির্বাচনের আগেই বিজেপির সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি করে বিএনপি। কিন্তু বিজেপি ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারকে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথা বললে বিএনপি আশাহত হয়। দলটি এখন নতুন করে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করে। আর এরই অংশ হিসেবে বিএনপি নেতারা এখন ভারতের পক্ষে কথা বলতে শুরু করেছেন।

২০১৪ সালের মে মাসে ভারতের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের ভরাডুবি এবং বিজেপির জয়লাভে বিএনপি উল্লাস প্রকাশ করে। দলীয় কার্যালয়ে মিষ্টি বিতরণ করে দলের নেতাকর্মীরা। বিজেপি সরকার গঠনের পর থেকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টা করছে বিএনপি। বিজেপির একাধিক নীতিনির্ধারকের সঙ্গে বিএনপির হাইকমান্ডের যোগাযোগের ভিত্তিতেই বিজেপি ও মোদি সরকারের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টা করে বিএনপি। তবে টানা অবরোধ কর্মসূচী চলাকালে ৭ জানুয়ারি রাত সাড়ে ১০টায় বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ খালেদা জিয়াকে ফোন করেছেন বলে বিএনপির পক্ষ থেকে ফলাও করে যে প্রচার করা হয় তাতে এ দলটির প্রতি নাখোশ হয় বিজেপি। পরবর্তীতে অমিত শাহর পক্ষ থেকে এ খবর ডাহা মিথ্যা বলে জানালে খালেদা জিয়া ও বিএনপি রাজনৈতিকভাবে চরম বেকায়দায় পড়ে। খালেদা জিয়া ও বিএনপির পক্ষ থেকে অমিত শাহকে নিয়ে এভাবে মিথ্যাচার করার বিষয়টিকে বিজেপি, নরেন্দ্র মোদির সরকার এবং ভারতবাসীরা ভালভাবে নেয়নি। এবার নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সাক্ষাতকালে খালেদা জিয়া অতীতের ভুলগুলো শোধরে নেয়ার চেষ্টা করবেন। সেই সঙ্গে তিনি একটি লিখিত বক্তব্যে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিসহ সার্বিক বিষয় তুলে ধরবেন। এছাড়া বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমদকে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে ভারত সরকারের সহযোগিতা চাইবেন বলে জানা গেছে।

সম্প্রতি বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে দলের মুখপাত্র ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, বিএনপির রাজনীতি ভারত বিরোধিতার রাজনীতি নয়। আর ভারতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক আগেও ভাল ছিল, এখনও আছে এবং ভবিষ্যতেও ভারতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক ভাল থাকবে। আমরা আগেও বলেছি, আমাদের রাজনীতি দেশ, দেশের জনগণ, দেশের উন্নয়ন, মানবাধিকার কীভাবে উন্নত করা যায় তা নিয়ে। তাই আমরা চাই, ভারতের সঙ্গে আমাদের রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো মীমাংসার জন্য জাতীয় ঐকমত্য।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. মাহবুবুর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, ভারত আমাদের প্রতিবেশী দেশ তাই সে দেশের সঙ্গে ভাল সম্পর্ক রাখতেই হবে। বিএনপির পক্ষ থেকে আমরা সবসময়ই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করেছি। তবে বিভিন্ন কারণে তা হয়নি। আশা করি এখন আর ভারতের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের ক্ষেত্রে কোন প্রতিবন্ধকতা থাকবে না। নরেন্দ্র মোদির ভারত সফরকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, দেশের মানুষের কাছে বহুল প্রত্যাশিত এ সফর। আশা করি, মোদির এ সফরের মধ্য দিয়ে তিস্তা চুক্তি, ছিটমহলসহ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সব সমস্যা সমাধান হবে। দেশের মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করতে মোদি অঙ্গীকার করে যাবেন। বিশেষ করে দেশে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচনের ব্যাপারে আমাদের প্রত্যাশার পক্ষে অবস্থান নেবেন।

প্রকাশিত : ৭ জুন ২০১৫

০৭/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: