কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

একুশ শতক ॥ ডিজিটাল বাংলাদেশের বাজেট কিছু ভুল সংকেত

প্রকাশিত : ৭ জুন ২০১৫
  • মোস্তাফা জব্বার

(বাজেট এত বড় বিষয় যে, এটি নিয়ে আলোচনা করা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। ডিজিটাল বাংলাদেশ তার চাইতেও বড়। ফলে ডিজিটাল বাংলাদেশ ও বাজেট নিয়ে আলোচনা তার চাইতেও বড় বিষয়। বাজেট পেশ করার পর আমার হাতে খুব স্বল্প সময় ছিল শুধু তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সঙ্গে বাজেটের সম্পর্ক আলোচনা করার জন্য। আমার নিজের কাছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বড় বিষয় নয়, বড় বিষয়টি হচ্ছে ডিজিটাল বাংলাদেশ। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আমাদের হাতিয়ার। ফলে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সঙ্গে বাজেট নিয়ে যে আলোচনা সেটি ডিজিটাল বাংলাদেশ ধারণার কিঞ্চিৎ প্রেক্ষিত মাত্র। আমি বাজেটের আলোকে ডিজিটাল বাংলাদেশকে আরও বিস্তৃত করে দেখতে চাই। সেজন্যই শুরুতেই বলে রাখি, এটি বাজেট নিয়ে আমার প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া।)

॥ এক ॥

বাজেট নিয়ে আমার একটি লেখা ছিল-এই পত্রিকাতেই ছাপা হয়েছে। লেখাটির মূল প্রত্যাশাগুলো আমি এখানে উল্লেখ করতে চাই। আমার বাজেটপরবর্তী আলোচনার সঙ্গে বাজেটের আগের লেখাটির কথা মনে রাখা হবে বলে আমি আশা করি। বাজেট পেশ করার আগে আমি বাজেট কেমন হবে সেটি সম্পর্কে লিখেছিলাম :

১. ডিজিটাল বাংলাদেশ ঘোষণার ছয় বছরের বেশি সময় অতিক্রান্ত হলেও সরকারের কাজ করার পদ্ধতি এখনও পুরোপুরি ডিজিটাল হয়নি। জেলা-উপজেলা স্তরে প্রশাসনের কাজে ডিজিটাল ছোঁয়া লাগলেও বাংলাদেশ সচিবালয় এখনও আগের অবস্থায়। গত সপ্তাহে এটুআই-এর জনপ্রেক্ষিত বিশেষজ্ঞ বিটিভির এক অনুষ্ঠানে জানিয়েছেন যে, সরকার ৭টি মন্ত্রণালয়কে ডিজিটাল করার পদক্ষেপ নিয়েছে। এটির জন্য ধন্যবাদ। কিন্তু বাকিগুলোর জন্যও সময়সীমা থাকা উচিত এবং এই বাজেট থেকেই তার কাজ শুরু করা উচিত। সেজন্য বাজেটে সরকারের সকল কাজের পদ্ধতি ডিজিটাল করার জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ থাকতে হবে। এর মানে হচ্ছে সরকারের প্রচলিত কাগজের ফাইলের ব্যবস্থাপনার বদলে ডিজিটাল পদ্ধতিতে কাজ করার ব্যবস্থা করা।

২. ২০০৯ সাল থেকেই সরকার ভূমি ব্যবস্থাকে ডিজিটাইজ করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করে আসছে। অর্থমন্ত্রী নিজে এজন্য লড়াই করে যাচ্ছেন। কিন্তু কোন সুফল এখনও পাওয়া যায়নি। এবারের বাজেটে ভূমি ব্যবস্থাপনা ডিজিটাল করাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আমরা লক্ষ্য করেছি যে, সাম্প্রতিককালে গ্রামাঞ্চলের ভূমি অফিসগুলোতে আগুন লাগানো হয়েছে। এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক একটি কাজ। এর ফলে ভূমি সংক্রান্ত জটিলতা ব্যাপকভাবে বাড়বে। এজন্য বিদ্যমান ভূমি রেকর্ড জরুরী ভিত্তিতে ডিজিটাল করার জন্য এবারের বাজেটে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ থাকতে হবে।

৩. বাংলাদেশে ৩জি নেটওয়ার্ক চালু হবার পর এখনও গ্রামাঞ্চলে ৩জি নেটওয়ার্ক চালু হয়নি। গ্রামে গ্রামে ৩জি নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ থাকতে হবে। অন্যদিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিনামূল্যে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে। আমি খুব খুশি হবো যদি এই বাজেটে দেশের কোন কোন স্থানে ফ্রি ওয়াইফাই স্থাপনের জন্য বরাদ্দ থাকে বা যদি ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের কেবল লাইন স্থাপনের বরাদ্দ থাকে। এমন যদি হয় যে সরকার দেশের সকল সরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফ্রি ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট প্রদান করবে তবে আমরা আনন্দিত হবো। একই সঙ্গে নতুন সাবমেরিন কেবল স্থাপন, ৪জি নিলাম এবং কানেকটিভিটির কাজগুলো সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ থাকতে হবে।

৪. দেশের শিক্ষাকে ডিজিটাল করার অঙ্গীকার করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, তার সন্তানরা ল্যাপটপ নিয়ে যেন স্কুলে যায়। আমি প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা বাস্তবায়নের প্রতিফলন দেখতে চাই। আমি চাই, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্লাসরুম ডিজিটাল করার জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ থাকতে হবে।

৫. দেশের ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণী অবধি বাধ্যতামূলক তথ্য প্রযুক্তি শিক্ষা চালু করে যদি কম্পিউটার ল্যাব গড়ে তোলা না হয় তবে এই শিক্ষাব্যবস্থার কোন দাম থাকবে না। তাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার ল্যাব গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ থাকতে হবে।

৬. বাধ্যতামূলক তথ্য প্রযুক্তি শিক্ষা কর্মসূচী বাস্তবায়নের জন্য প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কমপক্ষে একজন করে কম্পিউটার শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে ও তাকে এমপিওভুক্ত করতে হবে। এজন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ থাকতে হবে।

৭. তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ে শিক্ষক প্রশিক্ষণের জন্য বরাদ্দ থাকতে হবে।

৮. শিশুশ্রেণী থেকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তর অবধি সকল পাঠ্য বইয়ের ইন্টারএ্যাকটিভ মাল্টিমিডিয়া সফটওয়্যার প্রস্তুত করার জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ থাকতে হবে। তবে কোন এনজিওকে ডেকে এসব কাজ করার হুকুম দিয়ে দেয়ার ব্যবস্থাটি কারও কাম্য নয়।

৯. কম্পিউটারের ওপর বিদ্যমান শুল্ক ও ভ্যাট অব্যাহতি বহাল রাখতে হবে। কম্পিউটার ও টেলিকম যন্ত্রপাতি আমদানির ক্ষেত্রে এইচএস কোড ও অন্যান্য জটিলতা নিরসন করতে হবে। মোবাইলের ওপর কোন করারোপ করা যাবে না-আমদানিতে ভ্যাটও থাকতে পারবে না। তবে এটি এমন হতে পারে যে যন্ত্রাংশের জন্য শুল্ক ও ভ্যাট থাকবে না-কিন্তু সম্পূর্ণ প্রস্তুত মোবাইলের ওপর কর ও ভ্যাট থাকবে। এটি কম্পিউটারের ওপরও প্রযোজ্য হতে পারে। আমাদের এখন সময় হয়েছে এটি ভাবার যে, আমরা নিজেরা ডিজিটাল যন্ত্র উৎপাদন করব কিনা। আমাদের সরকারকে নিজস্ব শিল্প খাতের সুরক্ষার ব্যবস্থাও করতে হবে।

১০. সফটওয়্যার ও আইটি সেবা খাতের কর ও ভ্যাট অব্যাহতি ২০২১ সাল অবধি বাড়াতে হবে।

১১. ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর থেকে শতকরা ১৫ ভাগ মূসক প্রত্যাহার করতে হবে।

১২. সরকারী-বেসরকারী উদ্যোগে দেশব্যাপী ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড ধরনের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মেলা আয়োজনে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ থাকতে হবে। এসব মেলায় সরকারী সেবার পাশাপাশি কম্পিউটারের হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার, টেলিকম যন্ত্রপাতি ও সেবা প্রদর্শনের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

১৩. দেশে উৎপাদিত হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারের জন্য ইনসেনটিভ দেবার ব্যবস্থা করতে হবে। দেশে উৎপাদিত হয় এমন সফটওয়্যারের ওপর উচ্চহারে করারোপ করতে হবে এবং এ্যাকাউন্টিং, ইআরপি, বাংলা সফটওয়্যার ও ব্যাঙ্কিং সফটওয়্যার আমদানি নিষিদ্ধ করতে হবে। বিসিএস-বেসিস-এর অনুমোদন ছাড়া এ ধরনের সফটওয়্যার আমদানি করা যাবে না।

১৪. যথাযথ মূল্যায়নের পর শিল্প খাতের সঙ্গে আলোচনা করে হাইটেক পার্ক স্থাপনে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দিতে হবে। কালিয়াকৈর, জনতা টাওয়ার ও মহাখালী আইটি ভিলেজ স্থাপনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

১৫. বাংলা ভাষার প্রযুক্তিগত উন্নয়নে, যেমন ওসিআর, টেক্সট টু স্পিচ, স্পিচ টু টেক্সট, ব্যাকরণ ও বানান শুদ্ধকরণ, অনুবাদ ইত্যাদি খাতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ থাকতে হবে। সরকারকে দেশে উৎপাদিত সফটওয্যারের লাইসেন্স কিনতে হবে।

১৬. তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক গবেষণা ও মেধাস্বত্ব সংরক্ষণ খাতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দিতে হবে। কপিরাইট অফিস ও ডিপিডিটিকে একটি আইপি অফিসে রূপান্তরের বরাদ্দ থাকতে হবে।

১৭. ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জামানতবিহীন ঋণ সুবিধা দিতে হবে।

১৮. শিক্ষা ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতসহ সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় থাকে এমন স্বল্পমূল্যে ডিজিটাল যন্ত্র সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে।

১৯. ডিজিটাল কমার্সের ওপর কোন ভ্যাট আরোপ করা যাবে না।

২০. ঢাকার সঙ্গে দেশের অন্য অঞ্চলের ই-১, এনটিটিএন চার্জ সরকারকে বহন করতে হবে এবং দেশের সকল অংশে কানেকটিভিটির দাম একই হতে হবে।

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ৪ জুন ২০১৫, জাতীয় সংসদে ২০১৫-১৬ সালের জন্য প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকার বাজেট পেশ করেছেন। এটি বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসে (এবং তার আগেরও) বৃহত্তম বাজেট। মাত্র ৭৮০ কোটি টাকার বাজেট দিয়ে যে দেশের যাত্রা সেই দেশ তলাহীন ঝুড়ির দেশ হিসেবেই চিহ্নিত হয়েছিল। আজ যখন এই দেশটিতে তিন লাখ কোটি টাকার বাজেট আমরা পেশ করতে দেখি তখন হেনরি কিসিঞ্জারকে বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানাতে ইচ্ছে করে। অভিনন্দন বাংলাদেশ!

বাজেটে অর্থমন্ত্রী ‘সমৃদ্ধির সোপানে বাংলাদেশ : উচ্চ প্রবৃদ্ধির পথ রচনা’ স্লোগান দিয়েছেন। এবার তিনি প্রবৃদ্ধির হার ৭ শতাংশে উন্নীত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। বস্তুত ৬ শতাংশের চক্রটি তিনি ভাঙতে চান। গত বাজেটে তিনি ‘সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ’ গড়ার যে স্বপ্ন দেখেছেন এবার তাকেই আরও একটু পরিমার্জিত করেছেন। তিনি সততার সঙ্গেই বাজেট বাস্তবায়নে সমস্যা ও সংকটসহ চ্যালেঞ্জগুলোর কথা স্বীকার করেছেন। জীবনের নবম বাজেট পেশ করার সময় তার মাঝে যে দৃঢ়তা ছিল সেটি অবশ্যই প্রশংসনীয়। এবারই প্রথম তিনি শিশু বাজেট দিয়েছেন। তবে জেলা বাজেট এখনও দিতে পারেননি। ৮৬ বছর বয়সে যেভাবে তিনি অর্থনীতির হালটা ধরে রেখেছেন তার জন্য ব্যক্তিগতভাবে আমি তাকে ধন্যবাদ দিই ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি।

ঢাকা, ৫ জুন, ২০১৫

লেখক : তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, দেশের প্রথম ডিজিটাল নিউজ সার্ভিস আবাস-এর চেয়ারম্যান, বিজয় কীবোর্ড ও সফটওয়্যারের জনক ॥

ই-মেইল : mustafajabbar@gmail.com, ওয়েবপেজ: ww w.bijoyekushe.net,ww w.bijoydigital.com

প্রকাশিত : ৭ জুন ২০১৫

০৭/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: