কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

শিক্ষার প্রদীপ হাতে এগিয়ে রাখাইন নারীরা

প্রকাশিত : ৬ জুন ২০১৫

দারিদ্রতাসহ নানা প্রতিকূলতা জয় করে ছাব্বিশ বছরের তরুণী ছানিসে রাখাইন এখন স্বপ্ন পূরণের প্রায় দ্বারপ্রান্তে। আর মাত্র বছর খানেকের মধ্যে বরিশাল সরকারী বিএম কলেজ থেকে মাস্টার্স পাস সম্পন্ন হবে। ছানিসে রাখাইনের এখন আশা-পুলিশ অফিসার হওয়া। আর এর মধ্যে দিয়ে তাদের মতো পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মানুষদের আইনী অধিকার দিয়ে সামনে এগিয়ে নেয়া। পটুয়াখালী সরকারী কলেজে অনার্স পড়ুয়া বাইশ বছরের তরুণী শ্রাবণী রাখাইন হতে চান শিক্ষিকা। প্রত্যন্ত গাঁয়ের নিরক্ষর শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেয়া তার অন্যতম লক্ষ্য। ঢাকার বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্সের ছাত্রী ফুয়ে রাখাইন হতে চান সরকারী কর্মকর্তা।

সাগরপাড়ের বড়বাইশদিয়া ইউনিয়নের অবহেলিত আদিবাসী রাখাইন সম্প্রদায়ের তরুণীরা এভাবেই এগিয়ে এসেছে শিক্ষার জগতে। হাজারও প্রতিকূলতা ডিঙ্গিয়ে এগিয়ে চলেছে স্বপ্ন পূরণের পথে। বড়বাইশদিয়া ইউনিয়নের অবস্থান পটুয়াখালী জেলার সর্বশেষ দক্ষিণ প্রান্তে। দূরত্ব এক শ’ কিলোমিটারের বেশি। পথটিও দুর্গম। যেতে হয় রামনাবাদ, আগুনমুখা, দাড়চিড়ার মতো উত্তাল কয়েকটি নদী আর সাগর পাড়ি দিয়ে। সেখানে পৌঁছাতে পুরো একটি দিন লেগে যায়। এখানকার রাখাইন জনগোষ্ঠীর মানুষরাই মূলত দক্ষিণাঞ্চলের একমাত্র আদিবাসী সম্প্রদায়। ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে সুদুর মিয়ানমার থেকে মানবিক ট্রাজেডির শিকার হয়ে ৫০ নৌকা যোগে দেড় শ’ রাখাইন পরিবার উত্তাল বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী দ্বীপে এসে আশ্রয় নিয়েছিল। সে সময় পুরো এ অঞ্চলটি সুন্দরবনের আওতাভুক্ত ছিল। পরিশ্রমী রাখাইনরা হিংস্র প্রাণী ও প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ নানা প্রতিকূলতাকে জয় করে জঙ্গলাকীর্ণ এ অঞ্চলকে বসবাস উপযোগী করে গড়ে তুলেছিল। কয়েক দশক আগেও এ অঞ্চলের রাখাইনরা ছিল জন ও ধন সম্পদে সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী। কিন্তু এখন বেশিরভাগ পরিবার হতদরিদ্র। যে সব কারণে রাখাইন সম্প্রদায়ের মানুষ পিছিয়ে পড়েছে, তার অন্যতম হচ্ছে শিক্ষার অভাব। নিরক্ষরতার সুযোগে প্রভাবশালী প্রতিবেশীরা হাতিয়ে নিয়েছে রাখাইন সম্প্রদায়ের যথাসর্বস্ব। সময়ের বিবর্তনে এবং প্রয়োজনীয়তার নিরিখে রাখাইন সম্প্রদায়ের বর্তমান প্রজন্ম এগিয়ে এসেছে শিক্ষা ক্ষেত্রে। বিশেষ করে তরুণীদের মাঝে শিক্ষাগ্রহণের এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে।

সরজমিনে খোঁজ খবর নিয়ে দেখা গেছে, বড়বাইশদিয়া ইউনিয়নের চারটি পাড়ায় বর্তমানে ৩০ রাখাইন পরিবার বসবাস করছে। এসব পরিবারের মোট লোকসংখ্যা আড়াই শ’য়ের কাছাকাছি। অধিকাংশ পরিবারই হতদরিদ্র। নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর মতো অবস্থা। এর মাঝেও হাজার সমস্যা মোকাবেলা করে ৬০ জনের মতো তরুণ-তরুণী ও শিশু-কিশোর পড়াশোনা করছে।। এর মধ্যে উচ্চমাধ্যমিক এবং তদুর্ধ স্তরের শিক্ষাগ্রহণ করছে ১৬ তরুণী। আর বেশির ভাগ তরুণী উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছে অনেকটা নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে। কানকুনিপাড়ার তরুণী ছানিসে রাখাইন বরিশাল বিএম কলেজে মাস্টার্স পড়ছেন সেখানে কয়েক ছাত্রছাত্রীকে পাইভেট পড়িয়ে। থানেছে রাখাইন বিবিএ পড়ছেন একইভাবে। শ্রাবণী রাখাইন নিজবাড়ির আঙ্গিনায় রীতিমতো স্কুল খুলে বসেছেন। গাঁয়ের যে সব শিশুরা কখনই স্কুলের চৌকাঠ মাড়ানোর সুযোগ পায়নি, সে সব শিশুদের ধরে এনে দিচ্ছেন প্রাথমিক পাঠ। তারা শ্রাবণীর উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। তারা যে যেমন পারছেন, শ্রাবণীকে অর্থ সহায়তা করছেন। এদিয়েই চলছে শ্রাবণীর উচ্চশিক্ষা। একই পাড়ার লাথানসো রাখাইন ও মোমো রাখাইন কলাপাড়া মোজাহারউদ্দিন বিশ্বাস ডিগ্রী কলেজে পড়ছেন নিজবাড়িতে শাড়ি, লুঙ্গি, চাদর, তোয়ালে বুনে যে মজুরি পান, তা দিয়ে। রাঙ্গাবালী কলেজে এইচএসসি পড়ছেন ৬ তরুণী। যারা সকলেই বাড়িতে কোন না কোন অর্থনৈতিক কাজের সঙ্গে জড়িত। যেমন সুমি রাখাইন বাড়ির তাঁতে কাপড় বুনে বিক্রি করেন।

Ñশংকর লাল দাশ, গলাচিপা থেকে

প্রকাশিত : ৬ জুন ২০১৫

০৬/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: