কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

পিছিয়ে নেই আদিবাসী নারী

প্রকাশিত : ৬ জুন ২০১৫

দারিদ্রতা তার কখনও বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। বরং নিজের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা আর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে তিনি দারিদ্রকে জয় করেছেন। হতদরিদ্র পরিবারে জন্ম নিয়েও অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে ¯œাতক পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন। এখন একটি এনজিও পরিচালিত স্কুলে শিক্ষকতা করছেন। প্রতিদিন বাইসাইকেলে ৯ কিলোমিটার রাস্তা পাড়ি দিয়ে স্কুলে যান। স্কুল শেষে আবার একই সমান রাস্তা পেরিয়ে বাড়ি ফেরেন। আত্মপ্রত্যয়ী এই নারীর নাম লক্ষ্মীমা হাজং। স্বামী কৃষ্ণ হাজং। বাড়ি কলমাকান্দার খারনৈ ইউনিয়নের বগাডুবি গ্রামে। কৃষ্ণ হাজং এক সময় এনজিওতে চাকরি করতেন। এখন বেকার। লক্ষ্মীমার আয়েই সংসার চলে। দুই মেয়ে পূজা হাজং ও দ্বীপা হাজং দুর্গাপুর সরকারী উচ্চবালিকা বিদ্যালয়ে নবম ও অষ্টম শ্রেণীতে পড়ে। দু’জনেই স্কুলের ভাল ছাত্রী। ভবিষ্যতে দু’মেয়েকেই প্রতিষ্ঠিত চাকরিজীবী হিসেবে দেখতে চান লক্ষ্মীমা। বলা যায়, লক্ষ্মীমা হচ্ছেন গারো পাহাড়ের পরিবেশ-প্রতিবেশের সঙ্গে সংগ্রাম করে এগিয়ে চলা হাজারো আদিবাসী নারীর প্রতিচ্ছবি মাত্র। নেত্রকোনার দুর্গাপুর-কলমাকান্দার গারো-হাজং অধ্যুষিত আদিবাসী পল্লীতে গেলে এমন আরও অনেক লক্ষ্মীমার সন্ধ্যা মেলে অনায়াসেই।

বলা চলে, আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলেছেন আজকের গারো-হাজং নারী। নানা প্রতিকূলতাকে পাশ কাটিয়ে অর্থনীতি, রাজনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতিÑ সব ক্ষেত্রেই অবদান রেখে চলেছেন তারা। আর এর মধ্য দিয়ে তারা নিজেদের অবস্থা ও অবস্থানের যেমন পরিবর্তন করে চলেছেন, তেমনি পাল্টে দিচ্ছেন আদিবাসী সম্পর্কে সমাজের মানুষের চিরায়ত ও তথাকথিত ধারণাগুলোকে।

মাতৃতান্ত্রিক গারো বা মান্দি সমাজের নারীরা আদিকাল থেকে সরাসরি কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত। পাহাড়ের গায়ে জুম চাষই ছিল তাদের জীবন-জীবিকার প্রধান অবলম্বন। পরবর্তীতে জীবিকার টানে তারা এপার-ওপারে (ভারত সীমান্তে) শ্রম বিক্রি, পাহাড়ের জঙ্গল থেকে লাকড়ি সংগ্রহ করে বিক্রি, চোরাই পণ্য পরিবহনসহ নানা ধরনের কায়িক পেশায় যুক্ত হন। আজ থেকে ১৫-২০ বছর আগেও দুর্গাপুর-কলমাকান্দার গহীন টিলাগুলোতে বসবাসরত গারো নারীদের এমন সব পেশায় ব্যস্ত থাকতে দেখা গেছে। হালে এ দৃশ্য বদলাতে শুরু করেছে। দিনে দিনে তারা আধুনিক পদ্ধতির চাষাবাদে ঝুঁকছেন। বাড়িতে আধুনিক পদ্ধতিতে শাক-সবজি চাষ করছেন। ক্ষুদ্র ব্যবসা করছেন। গরু, ছাগল, শুকর, হাঁস-মুরগি পালন করেও সংসারে স্বচ্ছলতা এনেছেন বহু আদিবাসী নারী। এ ক্ষেত্রে তাদের সহযোগিতা করে যাচ্ছে কিছু বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা। তারা বিভিন্ন প্রশিক্ষণ, পরামর্শ এবং ঋণ সহায়তা দিচ্ছে তাদের। এমনিভাবে এগিয়ে চলা এক আদিবাসী নারীর নাম জটিলা আড়েং। দুর্গাপুর উপজেলার কুল্লাগড়া এলাকায় ‘আশার আলো মহিলা উন্নয়ন সংগঠন’ নামে শতাধিক সদস্যবিশিষ্ট সমবায় ফেডারেশনের সভানেত্রী তিনি। তিনি জানান, বেসরকারী সংস্থার সহযোগিতায় গঠিত ওই ফেডারেশনের মধ্য দিয়ে তারা প্রত্যেকে সঞ্চয়ে অভ্যস্ত হয়েছেন। দশজন মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলতে শিখেছেন। বিভিন্ন প্রশিক্ষণ এবং আর্থিক সহায়তা নিয়ে অনেকে দাঁড়িয়ে গেছেন। এ ধরনের বহু সংগঠন গড়ে উঠেছে গারো-হাজং নারীদের নিয়ে। এদিকে শিক্ষিত আদিবাসী নারীরা জড়িত হচ্ছেন শিক্ষকতা, এনজিও’র চাকরি, নার্সিং, বিউটিশিয়ান প্রভৃতি পেশায়। ক্যাটরিনা নকরেক নামে এক আদিবাসী বিউটিশিয়ান জানালেন, খোদ রাজধানীতেই চার সহস্রাধিক গারো তরুণী বিউটি পার্লারে বিউটিশিয়ানের কাজ করছেন। এদের বাড়ি নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, শেরপুর ও জামালপুরের আদিবাসী এলাকায়। এ পেশায় ইতিমধ্যে তারা স্বতন্ত্র অবস্থান করে নিয়েছেন। ঝুঁকিমুক্ত এ পেশায় থেকে ভাল আয়ও করছেন তারা। একই চিত্র হাজং পল্লীতেও। আগে হাজং নারীরা ‘জাখা’ দিয়ে মাছ ধরতেন এবং কৃষি ও গৃহস্থালির কাজ করতেন। এখন গারোদের মতো তারাও একই ধরনের পেশা বেছে নিচ্ছেন। এভাবেই অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতার মুখ দেখতে শুরু করেছেন। পিছিয়ে পড়া পরিবারের কিছু আদিবাসী নারী এখনও আগের পেশায় যুক্ত, তবে তাদের সংখ্যা নিতান্তই কম।

অনেক এলাকায় বিদ্যুতের আলো পৌঁছায়নি, কিন্তু শিক্ষার আলো জ্বল জ্বল করে জ্বলছে গহীন পাহাড়ের কোনে লুকিয়ে থাকা প্রত্যন্ত আদিবাসী গ্রামগুলোতে। গারো-হাজং সব পরিবারেই নারী শিক্ষার প্রসার লক্ষণীয়। তাদের স্কুলবয়সী প্রায় প্রত্যেকটি মেয়ে লেখাপড়া শিখছে। ছুটির দিন বাদে যে কোন দিন এলাকায় গেলে দেখা মেলেÑ আদিবাসী বালিকাদের দল বেঁধে স্কুল-কলেজে যাতায়াতের দৃশ্য। ইতিমধ্যে এ অঞ্চলের বেশ কিছু আদিবাসী মেয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রেখেছে। যেমনÑ বিরিশিরির ডাঃ মেগডালী খকসি বর্তমানে দিনাজপুর মেডিক্যালে ইন্টার্নশিপ করছেন। একই এলাকার বিউলি প্রজ্ঞা সাংমা এলএলবিতে, উর্বশী চাম্বুগং মাস্টার্সে, দুর্গাপুরের রোজমেরী (টুকটুকি), আচকি রংদি ও নন্দেরগোপের অনা সাংমা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স পড়ছে। এছাড়া নার্সিংয়ে ডিপ্লোমা করছে বিরিশিরির ইস্টিলা রংদী ও এন্টিলা রংদী। এ রকম উদাহরণ আরও অনেক। বিরিশরির মেয়ে ডাঃ মেরী গ্রেইস এখন নেত্রকোনার স্বনামধন্য চক্ষু চিকিৎসক। শত অভাব-অনটনের মাঝেও আদিবাসীরা তাদের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছেন। আগের তুলনায় অনেক কমেছে স্কুল-কলেজ থেকে ঝরে পড়ার হার। কোন কোন নারী শিক্ষার্থী পাবলিক পরীক্ষায় ঈর্ষণীয় ফলাফল করছে। লেখাপড়ায় ক্ষেত্রে কিছু সংস্থা উপবৃত্তি দিয়েও সহায়তা করছে তাদের।

সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে গারো-হাজং নারীরা অনেক আগে থেকেই এগিয়ে। তাদের রয়েছে নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। গারোরা ধর্মান্তরিত হয়ে খ্রীস্টান ধর্ম গ্রহণ করলেও নিজ জাতিসত্তার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে এখনও ধরে রেখেছেন। অনেক কিশোরী মেয়ে বাড়িতে গান-নাচের চর্চা করছে। বিভিন্ন মেলা-উৎসব-অনুষ্ঠানে নিজেদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তুলে ধরছে। দুর্গাপুরের বিরিশিরি ক্ষুদ্র ও নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক একাডেমিতে এসব বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে বহু আদিবাসী তরুণী। তথ্য প্রযুক্তিতেও পিছিয়ে নেই তারা। বিশেষ করে স্কুল-কলেজ পড়ুয়া আদিবাসী তরুণীদের অনেকে কম্পিউটার বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। সেলফোন এখন তাদের হাতে হাতে। ইন্টারনেট-ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ নেটওয়ার্কেও প্রবেশ করছে তারা। গড়ে তুলছে আদিবাসী ইস্যু সংশ্লিষ্ট নানান গ্রুপ।

রাজনীতি ও অধিকার আদায়ের আন্দোলনে আদিবাসী নারীরা বরাবরই সোচ্চার। সুদূর অতীতেও হাজং নারীরা ঐতিহাসিক টঙ্ক আন্দোলনসহ ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে অবদান রেখেছেন। রক্ত দিয়েছেন। গারো নারীরাও ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছেন গারো বিদ্রোহসহ নানা আন্দোলন-সংগ্রামে। নিজেদের অধিকার আদায়ের প্রশ্নে এখনও তারা সোচ্চার। সর্বশেষ রাজধানীতে মাইক্রোবাসে গারো তরুণী ধর্ষণের ঘটনায়ও দেখা গেছে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেছেন এ অঞ্চলের আদিবাসী নারীরা। চিনামাটি আহরণের নামে ভূমি থেকে উচ্ছেদ, পাহাড় কেটে পরিবেশ ধ্বংসসহ যে কোন নির্যাতন বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় অদম্য সাহসিকতার সঙ্গে ব্যানার-ফেস্টুন হাতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে যেতে দেখা যায় তাদের। কুমদিনী হাজং, রনিলা বনোয়ারি, সন্ধ্যা রানী হাজংÑ এরকম আরও বহু আদিবাসী নেত্রীর নাম ছড়িয়ে আছে এলাকায়Ñ যারা অবদান রেখে চলেছেন স্থানীয় রাজনীতিতে। দুর্গাপুরের লুদিয়া রুমা সাংমা ওয়াইডব্লিওসিএ নামে আদিবাসী সংস্থার সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করছেন। প্রতিটি আদিবাসী আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন তিনি। স্থানীয় শিক্ষক সমিতিতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন স্বপ্নাদেবী হাজং। পশ্চিম উৎরাইলের সুভাষিণী রংদী বিপুল ভোটে দুর্গাপুর পৌরসভার কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়ে জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করছেন। উৎরাইলের বিশাখা রাংসা বিরিশিরি ইউনিয়নে এবং পাথারিয়ার দীপ্তি রানী হাজং চ-ীগড় ইউনিয়নে ইউপি সদস্যার দায়িত্ব পালন করছেন। এক কথায়, শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতিÑ সব ক্ষেত্রেই এগিয়ে যাচ্ছেন আজকের গারো-হাজং নারীরা। তাদের চোখেমুখে আত্মবিশ্বাসের ছাপ স্পষ্ট।

Ñসঞ্জয় সরকার/নিতাই সাহা

নেত্রকোনা থেকে

প্রকাশিত : ৬ জুন ২০১৫

০৬/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: