মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

মালয়েশিয়ায় গণকবর থেকে আরও ৩৫ লাশ উদ্ধার

প্রকাশিত : ৬ জুন ২০১৫
  • থাই উপকূলে এখনও ভাসছে বহু লাশ

মোয়াজ্জেমুল হক/এইচএম এরশাদ ॥ গণতন্ত্রে উত্তরণের কথিত লেবাসে মিয়ানমার সে দেশের রোহিঙ্গা মুসলিম নাগরিকদের নাগরিকত্বসহ রাষ্ট্রীয় কোনরূপ সুযোগ-সুবিধা না দিয়ে উল্টো দমন- নিপীড়নে তৎপর থেকে প্রকারান্তরে মানবতাকেই পদদলিত করে চলেছে। সহস্র বছরেরও বেশি সময় ধরে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশ জুড়ে রোহিঙ্গা মুসলমানদের গড়ে ওঠা বসতি। সে বসতিকে ইতোমধ্যেই প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুমড়েমুচড়ে দিয়েছে সে দেশের সামরিক জান্তা সরকার ও সাম্প্রদায়িকতায় বিশ্বাসী বৌদ্ধ জাতিগোষ্ঠীর মানবতাবিরোধী কিছু জনগোষ্ঠী। রোহিঙ্গারা দিনের পর দিন সে দেশে জ্বলেপুড়ে ছারখার। নিজ দেশে পরবাসী তারা বহু বছর ধরে। আন্তর্জাতিক আহ্বান বার বার মিয়ানমারের দুয়ারে কড়া নেড়েছে। কিন্তু সে আহ্বান তাদের কর্ণকুহরে পৌঁছছে না। উল্টো এমন অমানবিক আচরণ রোহিঙ্গাদের ওপর অব্যাহত রাখা হয়েছে যাতে তারা মরছে, বাস্তুভিটা হারাচ্ছে, শেষ পর্যন্ত দেশান্তরী হয়ে অবৈধ অভিবাসী হতে গিয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করছে। সাম্প্রতিক সময়ে সমুদ্রপথে দেশান্তরী হতে গিয়ে হতদরিদ্র রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিপুলসংখ্যক নারী-পুরুষ সাগরে দিনের পর দিন, কখনও মাসের পর মাস অনাহারে-অর্ধাহারে ভাসমান থেকে যে ঘটনা বিশ্ববাসীকে জানান দিয়েছে তাতে মিয়ানমারের তেমন কিছু যায় আসে না বলে প্রতীয়মান হলেও মানবতা লজ্জিত হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মিয়ানমারের সর্বশেষ আচরণও সে দেশে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাচ্ছে। বিশ্বের মহাশক্তিধর রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্বের দেশসমূহের অভিভাবক সংস্থা জাতিসংঘের এবারের আহ্বানও মিয়ানমার নাকচ করে দিয়েছে। রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সরকারের এহেন বর্বর আচরণের শেষ কোথায় তা জটিল সমীকরণের গোলক ধাঁধায় আটকা পড়েছে।

মাসাধিককালের বেশি সময় ধরে বঙ্গোপসাগর হয়ে আন্দামান সাগর রুটে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের পালানোর পথে যে পাচার ও মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনার পাশাপাশি বন্দীশিবির ও গণকবরের ঘটনা আবিষ্কৃত হয়েছে তাতে এ রোহিঙ্গারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্তের শিকার। দেখতে এরা মানুষ হলেও মানবতা এদের জন্য দৃশ্যমান নয় বলে আজ সকলের চোখে ভেসে উঠছে। গত ষোলো মাসে প্রায় দেড়লাখ রোহিঙ্গা নর, নারী ও শিশু তাদের বসতভিটা ছেড়ে সাগর পথে দেশান্তরী হয়েছে।

অপরদিকে, থাই সীমান্ত সংলগ্ন মালয়েশিয়ার পেরলিস প্রদেশে গণকবর থেকে আরও ৩৫টি লাশ উদ্ধার হয়েছে। ইতোপূর্বে তাদের ঘোষণা অনুযায়ী কবর থেকে উদ্ধার হয়েছে ৩১ লাশ। পাশাপাশি থাইল্যান্ডের শংখলা প্রদেশেও আবিষ্কৃত গণকবর থেকে কি পরিমাণ লাশ উদ্ধার হয়েছে তার কোন পরিসংখ্যান এখনও প্রকাশ করা হয়নি। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী থাইল্যান্ডের উপকূলবর্তী জলসীমার বিভিন্নস্থানে বহু লাশ ভাসছে। জোয়ারের টানে এসব লাশ একবার কূলে আসছে আবার ভাটার টানে গভীর সাগরে যাচ্ছে। এসব লাশ সাগর প্রাণীকুলের খাদ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। যদিও মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া যুগপৎভাবে আন্দামান সাগরে ও সন্নিহিত এলাকায় ভাসমান অভিবাসী প্রত্যাশীদের তল্লাশি ও উদ্ধার তৎপরতায় লিপ্ত থাকার ঘোষণা রয়েছে। কিন্তু এ পর্যন্ত মিয়ানমার ছাড়া এসব দেশের আর কোথাও নতুন করে অভিবাসী উদ্ধারের তথ্য মেলেনি।

এদিকে, মিয়ানমারে দু’দফায় উদ্ধারকৃত ৯৩৫ অভিবাসীকে বাংলাদেশী আখ্যা দিয়ে ঢেলে দেয়ার যে প্রয়াস চলেছে তা বিজিবির শক্ত অবস্থানের কারণে ব্যর্থ হয়ে গেছে। মিয়ানমার থেকে প্রাপ্ত শেষ খবর অনুযায়ী উদ্ধারকৃত অভিবাসী নারী, পুরুষ ও শিশুদের আলাদা করে রাখা হয়েছে। পুরুষদের পুশব্যাক করার একটি সম্ভাবনা রয়েছে বলে সীমান্তের ওপারে বসবাসরতদের বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। যদিও মিয়ানমার এসব উদ্ধারকৃত অভিবাসীকে নিয়ে তাদের ভবিষ্যত পরিকল্পনা কি তা এখনও অপ্রকাশিত রেখেছে। তবে শুক্রবার বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, সাগরে উদ্ধারকৃত ২শ’ বাংলাদেশীকে ৭ জুন ফেরত পাঠাবে মিয়ানমার। সে দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উনা মং লোয়ে একথা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, মিয়ানমার নৌবাহিনী সাগর থেকে প্রথমদফায় যাদের উদ্ধার করেছে তাদের মধ্যে ২শ’ জনই বাংলাদেশী। তাদের ফেরত নিতে বাংলাদেশ সরকার রাজি হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গত ২১ মে দেশটির নৌবাহিনী বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে সমুদ্রে ভাসমান নৌকায় আটকে থাকা এসব অভিবাসী প্রত্যাশীদের উদ্ধার করে তীরে নিয়ে যায়। দ্বিতীয় দফায় উদ্ধার হয়েছে ১৭শ’।

অপরদিকে, থাই প্রধানমন্ত্রী শুক্রবার বলেছেন, তার সরকার মানব পাচারের ঘটনায় কঠোর ব্যবস্থা নিতে বদ্ধপরিকর। তিনি তার দেশে ৫ জুনকে ন্যাশনাল এন্ট্রি হিউম্যান ট্রাফিকিং ডে হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। থাই প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা এ কাজে জড়িত তাদের কোন অবস্থাতেই ছাড় দেয়া হবে না। এরা ব্যবসায়ী হলেও আমরা তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেব।

রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেবে ইন্দোনেশিয়া ॥ ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, সে দেশে উদ্ধারকৃত রোহিঙ্গাদের জন্য আশ্রয় কেন্দ্র তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। সে দেশের উত্তরাঞ্চলে আচেহ প্রদেশ ও উত্তর সুমাত্রায় মানবেতর জীবনযাপন করা প্রায় ১৮শ’ রোহিঙ্গা ও সাগরে ভাসমান অভিবাসী প্রত্যাশীদের উদ্ধার করে ন্যূনতম মৌলিক অধিকার নিয়ে জীবনযাপনের সাধ্যমতো সুযোগ ও আইনী সুরক্ষা দিতে প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার সংবাদ মাধ্যম জানিয়েছে, আচেহ প্রদেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে এসব রোহিঙ্গা বসবাসের সুযোগ পাবে। এ ব্যাপারে বছরব্যাপী একটি কর্মতৎপরতার পরিকল্পনাও করছে ইন্দোনেশিয়া। সে দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক, বিচার, মানবাধিকার, মানব উন্নয়ন ও মানবতা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হবে বলে তিনি জানান।

আরও ৫ দালাল গ্রেফতার ॥ শুক্রবার কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত মিয়ানমারের দুই নাগরিকসহ আরও ৫ দালালকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এদের মধ্যে কক্সবাজারের উখিয়া, মহেষখালি ও রামু পুলিশ ৪ জনকে এবং চট্টগ্রামে র‌্যাব সেভেন ১ জনকে গ্রেফতার করেছে। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে একজন মহিলা দালালও রয়েছে। তার নাম হোসনে আরা বেগম। মহেষখালি থানা পুলিশ তাকে কুতুবজুম থেকে গ্রেফতার করে। চট্টগ্রামে র‌্যাবের হাতে গ্রেফতারকৃত দালালের নাম আবদুল হক। দুপুরে চান্দগাঁওয়ের বহদ্দারহাট এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। র‌্যাব জানিয়েছে, আবদুল হক শীর্ষ মানবপাচারকারী তালিকাভুক্ত।

নিখোঁজের সংখ্যা বাড়ছে ॥ কক্সবাজার অঞ্চলে নিখোঁজের সংখ্যা কেবলই বাড়ছে। এ পর্যন্ত নিখোঁজের যে তথ্য পাওয়া গেছে তা ৫ হাজার ছাড়িয়েছে। টেকনাফ সদর ইউনিয়নের হাতিয়ারঘোনার করাচিপাড়ার সুলতান আহমদ মিস্ত্রির তিন ছেলে মোহাম্মদ ইসমাইল, মোহাম্মদ তৈয়ব ও মোহাম্মদ সিদ্দিক দুই বছর পূর্বে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে ঘর ছাড়ে। এখন পর্যন্ত খোঁজ মেলেনি তাদের। একইভাবে খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না কক্সবাজার সদরের ঈদগাঁও কালীরছড়ার শিয়াপাড়া ও চান্দেরঘোনা এলাকার ১০ জনের। তাদের মধ্যে রয়েছে রিক্সাচালক ছৈয়দনুরের পুত্র ১২ বছরের শিশু সাইফুল ইসলামও। অনেকে দালালের নাম জানলেও তারা আবারও এলাকায় ফিরে এসে হয়রানি করবে ভয়ে মুখ খুলছে না।

পুলিশের তথ্য ॥ কক্সবাজার পুলিশের তথ্য মতে, ২০১২ সালে মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন পাস হওয়ার পর থেকে ৩০৬ টি মানবপাচার মামলা হয়েছে। যার মধ্যে আসামি হয়েছে ১৫৩১ জন। এর মধ্যে আদালতে পৌঁছেছে ১৬৬ টি মামলা। আর ১৪০টি মামলা রয়েছে পুলিশের তদন্তে। এছাড়াও মানবপাচারে জড়িত ৩৫০ দালালকে চিহ্নিত করেছে জেলা পুলিশ। এ তালিকা ধরে বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবি। এ সময় পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় ৬ দালাল মারা যায়। গ্রেফতার হয় অনেক দালাল। তবে গা-ঢাকা দিয়ে আছে মানবপাচারের গডফাদাররা।

প্রকাশিত : ৬ জুন ২০১৫

০৬/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: