মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

যেন একাত্তরের রণক্ষেত্র

প্রকাশিত : ৫ জুন ২০১৫
  • রাহাত রাব্বানী

ইজাজ আহমেদ মিলনের লেখা ‘১৯৭১ : বিস্মৃত সেই সব শহীদ’ একটি গবেষণাধর্মী গ্রন্থ। বইটি পড়তে পড়তে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ের হারিয়ে গিয়েছিলাম। এটা শুধু একটা বইই নয়, আমার মনে হয়েছে এটা ১৯৭১ সালের সেই রণক্ষেত্র। বইটি পড়তে গিয়ে বার বার অশ্রুসিক্ত হয়েছি। লেখক তার আবেগের সবটুকু ঢেলে দিয়ে মর্মস্পর্শী ভাষায় ২৫ জন শহীদের অজানা কথা লিপিবদ্ধ করেছেন। ইমপ্রেস টেলিফিল্ম (চ্যানেল আই) ও সিটি ব্যাংক প্রবর্তিত ‘সিটি আনন্দ আলো সাহিত্য পুরস্কার’প্রাপ্ত লেখক ইজাজ আহমেদ মিলনের লেখা গ্রন্থটির ভূমিকা লিখেছেন সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার। এরপর আর আমার কিছুই বলার থাকে না। সমকাল সম্পাদকই বইটির তাৎপর্য যতাযথ তুলে ধরেছেন। এছাড়া দেশের সেরা লেখক ও গুণীজনরা মিলনের লেখা কবিতার প্রশংসা করেছেন। এর মধ্যে আছেন জনপ্রিয় কলাম লেখক আবদুল গাফফার চৌধুরী, কবি নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা, প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদ, আনিসুল হক। সেখানে আমার আর বলার কী থাকে !

এই লেখকের বেশ কয়েকটি বই পড়ার সুযোগ আমার হয়েছে। যেমন ‘নষ্ট শরীর ভিজেনা রৌদ্রজলে’ ‘দেহারণ্যের ভাঁজে শূন্যতার বিলাপ’, পোড়া মাটির ক্যানভাসে বিরামহীন বেদনা, ছাতিম গাছের মৃত ছায়া’ ইত্যাদি। নির্মোহ দৃষ্টিতে বিচার করলেও মিলনের হাত যথার্থ কবিত্ব শক্তি আমি লক্ষ্য করেছি। কী পুরস্কার তিনি পেয়েছেন সেটা আমার কাছে বিচার্য বিষয় নয়। মিলন সমকালের সাংবাদিক। এতো কম বয়সে তার সাফল্য কম নয়। ১৯৮৭ সালে তার জন্ম। গদ্য চর্চাও তিনি করেন। বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর বিজ্ঞ আইনজ্ঞ ও আ’লীগের বর্ষীয়ান নেতা অ্যাডভোকেট রহমত আলীর পঞ্চাশ বছরের রাজনৈতিক জীবন নিয়ে ‘কালের আয়নায় রহমত আলী’ শীর্ষক একটি গ্রন্থ লিখে বছর পাঁচেক আগে হৈচৈ ফেলে দিয়েছিলেন। গ্রন্থটি পাঠ করে আবদুল গাফফার চৌধুরী বলেছেন ‘এটা রহমত আলীর জীবনীই শুধু নয় এটা বাংলাদেশের আত্মজীবনী।

ইজাজ মিলন চট করে একটি ব্যতিক্রমধর্মী, মহৎ সম্পন্ন করেছেন মনের তাগিদেই। চারদিকে রাজকারদের জয়ধ্বনি দেখে আমাদের দেশের প্রধান কবি শামসুর রাহমান ব্যঙ্গ করে বলেছেন ‘হে মা’বুদ আমি একজন রাজাকার হতে চাই’। সেই বিকট সময়ে মিলন হাত দিলেন তার মাতৃভূমি থেকে গড়িয়ে পড়া পবিত্র রক্তেভেজা জন্মস্থান শ্রীপুরের ২৫ জন বিস্মৃত শহীদের মর্মস্পর্শী ভাষায় খ- ইতিহাস তুলে ধরতে। সেই স্বপ্ন ও শ্রমের ফসল ‘১৯৭১ : বিস্মৃত সেই সব শহীদ’। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় নরপশুদের হাতে শহীদ হওয়া ২৫ জন নারী পুরুষের জন্ম, বেড়ে ওঠা, শৈশব-কৈশর, পড়াশোনা, বিয়ে, সংসার ইত্যাদি বিষয় তুলে এনেছেন গ্রন্থটিতে। শ্রীপুরের বিভিন্ন গ্রামে এই ২৫ জন শহীদের জন্ম। তাদের আত্মীয়স্বজনকে খুঁজে খুঁজে বের করে বিস্মৃত প্রায় সেই সব শহীদ সম্পর্কে জেনে এমন একটি গ্রন্থ রচনা করা বেশ কষ্টসাধ্য কাজ। কাজটি তিনি নিজের দায়িত্ববোধ থেকেই করেছেন।

বইয়ের ভূমিকায় গোলাম সারওয়ার লিখেছেন, ‘লেখাগুলো আমাকে অশ্রুসিক্ত করেছে। স্বামী ফিরে আসবেন বলে পথের দিকে আজও চেয়ে থাকা শহীদ জয়া আনোয়ারার কথা লিখতে গিয়েই নয়, অন্যদের গল্পেও আবেগ ও বেদনা মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে।’ ইজাজ মিলন প্রাক্ -কথনে মূল্যবান কিছু কথা বলেছেন, ‘আমি বিজয় দেখিনি। কিন্তু যারা অর্জন করেছেন... সেই সব বীর বাঙালীদেরকে দেখেছি এটাও কি কম সৌভাগ্যের! অনেক বীর যোদ্ধার সংস্পর্শ পেয়েছি, তাদের স্মৃতির অথৈ সাগরে অবগাহন করেছি, যুদ্ধকালীন ভয়াবহতার বাস্তব গল্প শুনেছি।’ অতিশয় সত্যি কথা। এই সত্য সামনে রেখে, এই মূল্যবোধ হৃদয়ে ধারণ করে ইজাজ চারণ সাংবাদিকের মতো নিজ এলাকার শহীদের বীরত্বগাথা সংগ্রহ করে বই আকারে পাঠকদের উপহার দিলেন। যদিও আমি মহান মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি তবুও ইজাজ মিলনের অশ্রুভেজা বইটি আমাকে সেই সময়কার নারকীয় নানা দৃশ্যের কথা মনে করিয়ে দিয়েছি। মিলনের বইটির মূল্যায়ন বা প্রশংসার কোন ভাষা খুঁজে পেলাম না। পড়তে পড়তে বাক রহিত হয়ে গেছি। পড়ার সময় মনে পড়ল পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের ‘কবর’ কবিতার কথা। বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণের একটা কথা মনে পড়লো, ‘প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সাহেব দেশে যান কী করে আমার মায়ের কোল খালি করা হয়েছে।’ এই সন্তানহারা মা, স্বামীহারা স্ত্রী, ভাইহারা বোনের কোল খালি করা, বুকফাটা কান্নার ইতিহাস লিখেছেন মিলন।

প্রকাশিত : ৫ জুন ২০১৫

০৫/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: