মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

পাতায়া সিটিতে একদিন

প্রকাশিত : ৫ জুন ২০১৫
  • রাজু মোস্তাফিজ

সবুজ-শ্যামল আর পাহাড় অরণ্যে ঘেরা এশিয়ার উত্তর-পূর্বের দেশ থাইল্যান্ড। ঠিক যেন বাংলাদেশের মতোই গাছ-গাছালি, পাখি আর আবাহাওয়া। রাজা ‘রানা’ থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংকক শহর নির্মাণ করেন। ব্যাংককের আসল নাম ক্রুং থেপ বা দেবদূতের শহর। এই শহরে ইতিহাস ও আধুনিক অংশের সংমিশ্রণ ঘটেছে। থাইবাসীদের পুরাতন ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ সেই সঙ্গে আধুনিক সমাজের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে চলার অনুপম দৃষ্টান্ত। থাই সরকার পর্যটকদের আকর্ষিত করার জন্য এত সুন্দর করে সাজিয়েছে পুরো দেশটিকে, চোখে না দেখলে বিশ্বাস করার কোন উপায় নেই। ব্যাংককের গগনচুম্বী অট্টালিকা, কনডোজ, হোটেল, দোকানপাট এবং আধুনিক শপিংমলের ছড়াছড়ি। এই শহর প্রাচ্যের একটি বিচিত্র শহর। উন্নত শহর হয়েও এখানকার জনগণ কখনও নিজেদের ঐতিহ্যের দিকটি ভুলতে পারেনি। প্রতিটি বৌদ্ধমন্দিরের গঠনশৈলী আপনাকে জানিয়ে দেবে এর শিল্পোৎকর্ষ। থাইল্যান্ডে সবুজ শ্যামল নীলিমায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের হাজারও অপরূপ দ্যুতি, যা উপমার অতীত। প্রত্যেকের নিজস্ব ভাষা, তাদের আকৃতি করেছে এক অনন্য বৈশিষ্ট্যম-িত। এখানকার মানুষ শান্তিপ্রিয়, মৈত্রীভাবাপন্ন, ধর্মসহিষ্ণু ও সাংস্কৃতিকভাবে উদার। এজন্য বিভিন্ন সম্প্রদায়ের উৎসবাদি সারাবছর লেগেই থাকে থাইল্যান্ডে।

এবারের থাইল্যান্ড ভ্রমণের সার্বিক আয়োজনে লাফার্জ সুরমা সিমেন্ট কর্তৃপক্ষ পূর্বাপর নিয়মিত যোগাযোগ, ভ্রমণের স্থান নির্ধারণ, সফরসূচী চূড়ান্তকরণ ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ কাজ বেশ যতœ নিয়েই করেছেন। এই কোম্পানির রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের মার্কেটিং বিভাগের উর্ধতন কর্মকর্তা মো. গোলাম নবী বিদেশ যাওয়ার ব্যাপারে আমাকে বিভিন্নভাবে উৎসাহিত করেন। এই কোম্পানির আন্তর্জাতিকমানের সিমেন্ট কারখানাটি সিলেটের হাওর পেরিয়ে পাহাড়ঘেরা ছাতক উপজেলায় অবস্থিত। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পাহাড় কেটে কিলিংকার তৈরি করে সিমেন্ট তৈরি করা হয়। এখান থেকেই সিমেন্ট চলে যায় সারাদেশের আনাচে-কানাচে। লাফার্জ সুরমা সিমেন্টের গুণগতমান আর্ন্তজাতিক মানের হওয়ায় সাধারণ ক্রেতাদের মাঝে এর ব্যাপক চাহিদা পরিলক্ষিত। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর ১২০টি দেশে এই সিমেন্ট দীর্ঘকাল ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে আস্থার সঙ্গে।

সারাদেশের ৪৪ জনের একটি দল ১৭ অক্টোবর শুক্রবার রাতে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রাত ৮টার মধ্যে পৌঁছলাম। ঢাকার সায়মন ট্রাভেল এজেন্সি আমাদের সব দায়িত্ব নিয়েছে। তাদের মাধ্যমেই আমরা যাচ্ছি। রাত ১১টার দিকে থাই এয়ারওয়েজে উঠে বসলাম। কিছুক্ষণের মধ্যে আমাদের প্লেন ছাড়ল। দুই ঘণ্টার জার্নি আমাদের। সারাদিনের ধকলে শরীর বেশ ক্লান্ত, প্লেনে একটু বিশ্রাম নিচ্ছি। কিছুক্ষণ পরেই এয়ার হোস্টেজরা নাস্তা দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। থাই এয়ার হোস্টেজরা বয়সে বেশ তরুণ। তাদের আচরণ আমাদের সবাইকে বিমোহিত করল। তবে থাই খাবার আমার কাছে বেশি মজা লাগেনি। রাতে আকাশের দৃশ্য কিছুই বোঝা যায় না। তাই প্লেনেই গল্প করছিলাম পাশের যাত্রীদের সঙ্গে। রাত ২টার দিকে আমাদের প্লেনটি ব্যাংককের ‘সুবর্ণভূমি’এয়ারপোর্টে পৌঁছল। এয়ারপোর্টের আনুষ্ঠানিকতা শেষে যখন আমরা এয়ারপোর্ট থেকে বের হলাম তখন ভোর ৪টা। এয়ারপোর্টের বাইরে আমাদের জন্য একটি এসি বাস অপেক্ষা করছে। আমরা বাসে উঠে পড়লাম। আমাদের বাঙালী গাইড মো. ইসাহাক। তিনি আমাদের বললেন, আমরা এখন থাইল্যান্ডের সমুদ্র সৈকত ‘পাতায়া সিটিতে’ রওনা দেব। কিছুক্ষণের মধ্যে বাস ছাড়ল। একটু পরেই ঘুমিয়ে পড়লাম। কিভাবে দুই ঘণ্টা পেরিয়ে গেল বুঝতে পারলাম না। পাতায়া সিটিতে যখন পৌঁছলাম তখন সকাল সাড়ে ৬টা। আমার ঘুম ভাঙ্গল। পাতায়ার ‘গ্র্যান্ডসোল’ হোটেলে আমারা উঠলাম। সকালের নাস্তা সেরে আমি ৩০৮ নম্বর কক্ষে উঠলাম। আমার রুমমেট হলেন নীলফামারীর দুলাল ভাই। দুলাল ভাই আমার চেয়ে বয়সে অনেক বড় হলেও খুবই মিশুক। হাসিখুশি মানুষ। কথা কম বললেও তার শিশুসুলভ মনটি আমাকে খুব আকৃষ্ট করে। রুমে গিয়ে আমারা এককভাবে বিভিন্ন জায়গায় যাওয়ার পরিকল্পনা করলাম। আমাদের হোটেলের পাশেই সমুদ্র সৈকত। রুমে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আমি আর দুলাল ভাই বেরিয়ে পড়লাম। পাতায়ার ‘গ্র্যান্ডসোল’ হোটেলের বেশ নামডাক আছে। হোটেলের খোলামেলা জায়গাজুড়ে সুইমিংপুল। পুরুষ আর নারীরা সাঁতার কাটছে সুইমিংপুলের স্বচ্ছ পানিতে। আমরা দ্রুত ফ্রেশ হয়ে বেলা ১১টার দিকে বেরিয়ে পড়লাম সী বিচের দিকে। হাঁটা পথ। আমাদের সঙ্গে লাফার্জ সুরমা সিমেন্টের কর্মকর্তা রিপনদাও বের হলেন। হোটেলের পাশে মেঠোপথ দিয়ে দ্রুত সী বিচের দিকে যাচ্ছি। পথে চোখে পড়ল বিভিন্ন ফল নিয়ে এক মধ্যবয়সী থাই মহিলা ফল বিক্রি করছেন। সেখানে আম দেখে খুব খেতে ইচ্ছা হলো। তিনি আমাদের জানালেন একটি আমের দাম ২৫ ‘বাথ’। থাই মুদ্রার নাম ‘বাথ’। বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ৬০ টাকার মতো। পরম যতেœ ওই মহিলা নিজেই আমাদের ফল কেটে দিলেন। স্বাদ নেয়া মাত্রই মন ভরে গেল। এর সঙ্গে থাই তরমুজও খেলাম আমরা।

পাতায়া সী বিচে যখন হাঁটছি তখন দুপুরের চড়া রোদ আমাদের মাথার উপর। জীবনের স্বাদ আস্বাদনে একবারের জন্য হলেও ভ্রমণপিপাসুদের এ শহরে আসা দরকার। পাতায়া সী বিচ বড় না হলেও সুন্দর করে সাজানো। এখানে দুটো বিচ রয়েছে। পাতায়া বিচ আর চমথিয়ান বিচ। এই দুটি সী বিচে পর্যটকদের আর্কষিত করার জন্য সবরকম ব্যবস্থা করেছে থাই সরকার। শত শত নারী-পুরুষ স্বল্পবসন অবস্থায় শুয়ে-বসে সমুদ্রের মনোরম দৃশ্য উপভোগ করছে। মানুষকে আনন্দ দেয়ার জন্য সবরকম ব্যবস্থা রয়েছে এখানে। পর্যটকরা নির্ভয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে সমুদ্রপারে। সমুদ্রের ঢেউ প্রবল নয় এখানে। পানির মধ্যে নির্দিষ্ট একটা সীমানা রয়েছে। এর বাইরে কোন পর্যটক যেতে পারেন না। প্রায় দুই ঘণ্টা আমরা পাতায়া সী বিচে অবস্থান করলাম। দুপুর ১২টার দিকে আমরা হোটেলে ফিরলাম। সবাই মিলে ভারতীয় রেস্টুরেন্টে খেতে গেলাম। দুপুরের খাবার সেরে আমরা তাড়াতাড়ি হোটেলে ফিরলাম। বিশ্রাম না নিয়েই পড়ন্ত বিকেলে বেরিয়ে পড়লাম।

আমি দুলাল ভাইসহ আরও দু’জন এখানকার বিশেষ আকর্ষণীয় ভ্রমণ স্পট ‘নমরুজ ভিলেজে’ রওনা দিলাম। শহর থেকে ৩০ মিনিটের পথ। থাইল্যান্ডের তরুণী খুকি হোটেলের লবিতে অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। খুকি আমাদের থাইল্যান্ডের গাইড। খুকি ব্যাংককের একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটারে মাস্টার্স পাস করেছে দুই বছর আগে। পাতায়া শহরের সুকবীর রোডে তার বাড়ি। সে জানায়, দুই বছর আগে তার বাবা-মা মারা গেছেন। তার বোন আর দুলাভাই দক্ষিণ কোরিয়াতে বসবাস করেন। এক ভাই বিয়ে করে আলাদা থাকেন। সংসারে সে একাই। খুকি দ্রুত ইংরেজী বলতে না পারলেও গুছিয়ে কথা বলে। গাড়ি নিজেই ড্রাইভ করছিল। চলতে চলতে পাতায়ার বিভন্ন শপিংমল, স্কুল, বড় বড় শিল্প-কারখানাগুলো আমাদের দেখাচ্ছে। ফাঁকে ফাঁকে বিভন্ন গল্প করছে। সে বলল, থাইল্যান্ডের শতকরা ৭০ ভাগ আয় হয় পর্যটন শিল্প থেকে। নবেম্বর থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত সারা পৃথিবীর লাখ লাখ পর্যটক আসে এখানে। তখন পর্যটকদের ভরা মৌসুম। এ সময় সবচেয়ে বেশি আসে রাশিয়ান পর্যটক। এখানকার মানুষ পর্যটকদের দেবতা মনে করে। তাদের মনোরঞ্জনের জন্য এখানে সব ব্যবস্থাই রয়েছে। তবে বিরক্তি করে নয়। খুকি বেশ মজা করে আমাদের বলছে, আমি সুন্দর নই বলে আমার কোন বন্ধু নেই। তাই আমার বিয়ে হয়নি এখনও। গাড়িতে গল্প করতে করতে এক সময় আমরা ‘নমরুজ ভিলেজে’ পৌঁছে গেলাম। এর আসল নাম ‘নংনুস ফুড গার্ডেন’। স্থানীয়রা এটিকে ‘নংনুস’ বলে ডাকে। দুই দশক আগে অস্ট্রিয়ার ‘বেলিবিক ব্রেস’ নামের এক নাগরিক পাহাড় কেটে এক হাজার ৫শ’ ফুট জায়গায় কাঁঠাল আর নারিকেল বাগান তৈরি করেন। রাস্তার দু’পাশেও বিভিন্ন গাছ এত মনোরম করে লাগানো হয়েছে যেন প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য। এখানকার পাহাড় কেটে ‘বাটারফ্লাই’ হিলে গাছপালা এত সুন্দর করে সাজিয়েছে যে, সারাবিশ্বের পর্যটকদের অন্তর জুড়িয়ে দেয়। বৈচিত্র্যময় এই শোভা প্রকৃতিপ্রেমীদের সহজেই আকৃষ্ট করে। থাই সরকার পর্যটকদের আকর্ষিত করার জন্য এখানে হাতির খেলা, থাইল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী লোকসঙ্গীতের নানা অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন বিনোদনের ব্যবস্থা করেছে। হাজার হাজার দেশী-বিদেশী পর্যটক এসব খেলা প্রতিদিন উপভোগ করে থাকেন।

প্রকাশিত : ৫ জুন ২০১৫

০৫/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: