কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

গণমাধ্যমে নারীর ভূমিকা

প্রকাশিত : ৫ জুন ২০১৫
  • রহিমা আক্তার

১৯৯১ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ২৬তম অধিবেশনে গৃহীত সুপারিশের প্রস্তাব অনুসারে ৩ মে-কে গণমাধ্যম দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সেই হিসেবে ১৯৯৩ সাল থেকে এই দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। আমাদের দেশের সংবিধানে স্বাধীনভাবে অভিব্যক্তি প্রকাশের বিষয়টিকে অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হলেও সাংবাদিকরা মনে করেন যে, বাংলাদেশে সাংবাদিকতায় নীতিগত মান সন্তোষজনক নয়। এ দিবসের গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার অঙ্গীকারের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের কথা সরকার ও সংবাদকর্মীদের স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্য। আর সংবাদকর্মীদের নিজেদের নীতিগত বৈশিষ্ট্যকে ঠিক রাখার জন্যও পালন করা। যেখানে গণমাধ্যমে প্রবেশের মূল লক্ষ্য থাকে সহমর্মিতা, আত্মবিশ্বাস, সত্য, স্বাধীনচেতনা, দলীয় মুক্তি, চিন্তা-চেতনা ইত্যাদিকে বেশি প্রাধান্য দেয়া।

দেশে গণমাধ্যমের পথ ২টি। তার এখনও নারী সংবাদকর্মীর সংখ্যা অনেক কম। বিশ্বের সংবাদ মাধ্যমগুলোর নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের চার ভাগের ৩ ভাগ কর্মীই পুরুষ। প্রতিবেদকদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা দুই-তৃতীয়াংশ। তবে উপস্থাপনা, সম্পাদনা ও প্রযোজনা বিভাগের সিনিয়র কর্মীদের ৪১ শতাংশ নারী। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনের ইন্টারন্যাশনাল উইমেন্স মিডিয়া ফাউন্ডেশন এক জরিপ চালিয়েছে সাংবাদিকদের মাঝে। সেই জরিপে দেখা গেছে, ইউরোপের সংবাদ মাধ্যমে নারীকর্মীর হার বেশি। আর সবচেয়ে কম এশিয়ায়। বিশ্বের প্রায় ৫২২টি সংবাদ মাধ্যমের ১ লাখ ৭০ হাজার কর্মীর ওপর এই জরিপ করা হয়। ১৯৯৫ সালে সীমিত পর্যায়ে পরিচালিত সমীক্ষায় নারী সংবাদকর্মীর যে উপস্থিতি ছিল, তারপর থেকে এখন ২০১০ পর্যন্ত তার অগ্রগতি চোখে পড়ার মতো হয়নি। মোট গণমাধ্যমের প্রায় ৬৫ শতাংশ পদ পুরুষের অধীনে। আর নারীরা আছে ৩৫ শতাংশ পদে। গণমাধ্যমে নারীর পদ সংখ্যা সমঝোতায় আনার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তুলে ধরে বিভিন্ন মানবাধিকার কর্মীরা অনেক কারণ খুঁজে বের করেছেন।

ইন্টারন্যাশনাল উইমেন্স মিডিয়া ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক লিজা গম বলেন, ‘সাংবাদিকতায় নারী-পুরুষের সম সংখ্যা আনতে আমাদেরই অনেক কাজ করতে হবে।’ পূর্ব ইউরোপের ৮৫টি গণমাধ্যমে নারীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। অন্যদিকে এশিয়া মহাসাগরীয় অঞ্চলের ১০টি দেশে সাংবাদিকের মধ্যে নারীর প্রতিনিধিত্ব সবচেয়ে কম। সেই ১০টি দেশের মাঝে বাংলাদেশও একটি। বাংলাদেশে বর্তমানে দেখা যায়, সংবাদপত্রের সাংবাদিকতার চেয়ে টেলিভিশনে নারীর সংখ্যা বেশি। আর সংবাদপত্রে মাঠপর্যায় এবং অফিসিয়াল দুই ক্ষেত্রেই কম। উপস্থাপনা ও সংবাদ পাঠে নারীর সুন্দর মাধুর্য আচরণ, দর্শকনন্দিত হওয়ায় টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে নারীদের বেশি চোখে পড়ে। এই ক্ষেত্রেও বিশেষ ব্যক্তিরা মনে করেন একজন পুরুষের চেয়ে একজন নারীর মধ্যে ধৈর্য, সুন্দর রুচি, উপস্থাপনার ভঙ্গিমা, শুদ্ধ উচ্চারণ ও শ্রুতি মাধুর্যের কারণে নারীরা এগিয়ে আছেন। আর সংবাদপত্রে ও সংবাদ সংগ্রহের ক্ষেত্রে নারীর জন্য এখনও অনেক বাধা রয়েছে। যা অতিক্রম করে একজন নারী নিজেকে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে উপযুক্ত আসনে আনতে সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে।

মুসলিম দেশ হিসেবে ধর্মের নামে গোঁড়ামিতার কারণেও নারীরা স্বাচ্ছন্দ্যে এই পেশাকে গ্রহণ করতে পারছেন না। ধর্মভীরু ধর্মীয় শাস্ত্রগুলোর বিধান দেখিয়েও নারীকে আবদ্ধ রাখা হয়। অনেক সময় নারী সংবাদকর্মীদের শুনতে হয় নানা কথা। নারী, তার আবার সাংবাদিক হওয়ার শখ! আজ থেকে ১৪ বছর আগে যখন টিভি চ্যানেল ১টা ছিল, তখনও সংবাদ পড়া ও উপস্থাপনায় নারীদের দেখা গেছে। চ্যানেলের সঙ্গে সঙ্গে এই ক্ষেত্রে নারীরা এগিয়ে এসেছে। সংবাদ সংগ্রহের জন্য সাংবাদিকদের সব সময় তৈরি থাকতে হয় সকাল-সন্ধ্যা, তাকে ছুটতে হবে সংবাদ সংগ্রহে। সেই ক্ষেত্রে একজন নারী সংবাদকর্মী হলে তার জন্য ভাবতে হয় বৈকি।

যখন-তখন নারী-কর্মীদের পাঠানো যাবে না বলেও প্রতিষ্ঠানগুলো নারীদের নিয়োগ দিতে অপরাগতা দেখায়। মেয়েরা রাত-বিরাতে ঘর থেকে বের হতে হবে বলেও অভিভাবকরা দিতে চায় না। এই দু’পক্ষের হীনমনভাবতার কারণে আজও গণমাধ্যমে নারীর সংখ্যা আশানুরূপ হচ্ছে না। সাংবাদিকতায় স্বাধীনতা নিয়েও রয়েছে অনেক প্রশ্ন। পেশার ওপর রয়েছে তাদের পূর্ণ স্বাধীনতা। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের ওপর অনেক ক্ষেত্রেই কর্মী এবং কর্মকর্তাদের সম্পর্ক সম্মানজনক না থাকায় গড়ে ওঠে না পারস্পারিক শ্রদ্ধাবোধ। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলগুলো যেমন বিচরণ করে এক স্বীকৃত সীমারেখার মধ্যে, সংবাদপত্রগুলোকেও চলতে হচ্ছে অনুমোদিত পন্থায়। তার মধ্যে গণমাধ্যমগুলোতে রাজনৈতিক প্রভাব ও দলীয়করণ তো রয়েছেই। নারীরা হাজার বাধার মাঝেও এগিয়ে যাচ্ছে। আজ নারীরা তাদের অভিজ্ঞতার কারণে যেভাবে সংবাদ পাঠ বা উপস্থাপনায় ভাল মর্যাদায় রয়েছে, তেমনি সাংবাদিকতায় রয়েছে তাদের কৃতিত্ব। একুশে টিভির সামিয়া জামান ও সামিয়া রহমান এই দুজনকে সবাই চেনে। সংবাদ পাঠে তাদের মাধুর্যই জনগণের কাছে তাদের ফুটিয়ে তুলেছে। এরপর এটিএন বাংলার শাহনাজ মুন্নি ও মুন্নি সাহা এই দু’জন অনেকটাই গণমাধ্যমের চেনা মুখ। ২০০৭ ও ২০০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে মুন্নি সাহার সাহসিকতা, বলিষ্ঠ চিন্তাচেতনা আজ তাকে গণমাধ্যমের তুখোড় জায়গায় দাঁড় করিয়েছে। দুই মিডিয়ায় যত সংখ্যা বাড়ছে, তার সঙ্গে বাড়ছে কর্মসংস্থানের পথ। গণমাধ্যমে উপযুক্ত সংবাদকর্মী উপহার দেয়ার জন্যও তাদের ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। সেই হিসাবে কখনও ক্যামেরার সামনে, কখনও পেছনে নিরলস কাজ করছে একসঙ্গে আমাদের নারী সাংবাদিকরা। তাদের কয়েকজন হলেনÑ এনটিভির সুলতানা রহমান, আরটিভির সামিমা আক্তার, বাংলাভিশনের নাদিরা কিরণ। গণমাধ্যমে নারীর কথা বলতে মনে পড়ে সাংবাদিক সেলিনা পারভীনের কথা। ১৯৬৯ সালে শিলালিপির সম্পাদনা করতেন। সাংবাদিকতায় তাঁর নিরলস কাজ আর পাক বাহিনীর বিভিন্ন অসামাজিক কাজের চিত্র তুলে ধরেছেন পত্রিকায়। সেই অপরাধে ১৯৭১-এর ৩ ডিসেম্বর নিজ বাসভবন (বর্তমান সাংবাদিক সেলিনা পারভিন সড়ক) মালিবাগের বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যায় এবং হত্যা করে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাঁর পরিবার তাঁর লাশ পায়। আজ বিশ্ব গণমাধ্যম দিবসে সেসব কৃতী নারীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই, যাঁরা দেশ ও দেশের মাটির মানুষের জন্য আন্দোলন করেছেন মনোবল নিয়ে অভিজ্ঞতা নিয়ে আর কলমের জোরে। সংবাদপত্রের ভূমিকা গৌরবোজ্জ্বল, তথাপি সঙ্কটের নানা রাহু গ্রাসে নিপতিত হয়ে সংবাদপত্র মাঝে মাঝে তার পবিত্র দায়িত্ব বহনে অসমর্থ হয়ে পড়ে। নীতির কথা ভেবে সংবাদপত্র ও সংবাদপত্র সেবীদের তাই আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।

প্রকাশিত : ৫ জুন ২০১৫

০৫/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: