রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

নারী ও শিশু পাচার

প্রকাশিত : ৫ জুন ২০১৫
  • মাহবুব রেজা

নারী পাচার বিষয়টি পরিষ্কার করে বলার আগে বুঝে নেয়া দরকার পাচার শব্দটি কী- পাচার বলতে কী বোঝায়? বিশ্বায়নের এই যুগে পুঁজি পণ্য ও প্রযুক্তির মতো শ্রমের অবাধ বিস্তার হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নানা জটিলতার কারণে তা আর সম্ভব হয়ে উঠছে না। শ্রম অভিবাসনের কঠোর নীতির কারণে শ্রমের অবাধ চলাচল বিশ্বজুড়ে শিথিল হয়ে পড়েছে। আর এ কারণে পৃথিবীর দেশে দেশে অবৈধভাবে মানুষ পাচার দিন দিন আশংকাজনক হারে বেড়ে যাচ্ছে। তবে এই মানুষ পাচারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো নারী ও শিশু পাচার। বাংলাদেশও নারী ও শিশু পাচারের দিক দিয়ে পিছিয়ে নেই। সামাজিক অস্থিরতা, শিক্ষায় পিছিয়ে পড়া ও পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে এ প্রবণতা বেড়েই চলেছে।

আইনি পরিভাষায় সাধারণত যে কোন ধরনের শোষণের উদ্দেশ্যে, জোর খাটিয়ে, মিথ্যা প্রলোভন কিংবা ছল-ছাতুরী, ভয়-ভীতি প্রদর্শন করে এবং চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে অথবা যাকে পাচার করতে চায়, তার ওপর কর্তৃত্ব রয়েছে, এমন ব্যক্তিকে আইন বহির্ভূত উপায়ে টাকা দেয়া-নেয়ার মাধ্যমে লোক সংগ্রহ, স্থানান্তর, আশ্রয়দান ও অর্থের বিনিময়ে গ্রহণ ইত্যাদি যে কোনো কর্মকান্ডকে পাচার বলে গণ্য করা হয়।

বাংলাদেশ থেকেও প্রতিবছর একটা নির্দিষ্ট পরিমাণে নারী ও শিশু পাচার হয়ে থাকে। বাংলাদেশ বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোর মধ্যে একটি। দারিদ্র্যের কারণে একটি সুবিধাবাদী শ্রেণীর (যাদের প্রতারক চক্রও বলা হয়) হাতে নিষ্পেষিত হয় সমাজের দরিদ্র মানুষ। এই প্রতারক চক্র নানারকমের লোভ, প্রলোভন দেখিয়ে অসহায় পিতামাতাকে ভুল বোঝায়। প্রতারক চক্রটি অর্থের বিনিময়ে দরিদ্র পিতামাতাকে বোঝায়, তাদের মেয়েদের শহরে চাকরি বা যৌতুকবিহীন বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে সুবিধাজনক জায়গায় পাচার করে দিচ্ছে। পাচার হওয়া এসব মেয়ের বেশিরভাগের পরিণতি হয় অত্যন্ত করুণ। পাচার হয়ে যাওয়া এসব নারীর ভাগ্য সুপ্রসন্ন না হলেও, এদের নিশ্চিত গন্তব্য হয়ে যায় অন্ধকার জগৎ। বাকি জীবন এরা অন্ধকার জীবনের বাসিন্দা হয়েই দিনাতিপাত করে। সাধারণত পাচারকারীদের প্রলোভনের শিকার হচ্ছে দেশের ছিন্নমূল, ভবঘুরে নারী ও শিশু, অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত, তালাকপ্রাপ্ত ও বিধবা নারী। মূলত প্রতারকচক্রের হাতে সুন্দরভাবে বাঁচার প্রতিশ্রুতি পেয়ে প্রতারিত হয় এসব অসহায় নারীরা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দরিদ্র, অশিক্ষিত মা-বাবা ভরণপোষণের দায়ভার মেটাতে না পেরে তাদের প্রিয় সন্তানকে টাকার বিনিময়ে তুলে নেয় পাচারকারীদের হাতে। আবার কখনো কখনো পাচারকারীরা মা-বাবার অসতর্কতার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তাদের উদ্দেশ্য চরিতার্থ করে।

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় জানা গেছে, মূলত পাঁচটি কারণে নারী ও শিশু পাচার সংঘটিত হয়ে থাকে। কারণগুলো হলো দারিদ্র্য, সীমান্ত অতিক্রমের সহজ প্রক্রিয়া, সমাজে মেয়েদের অবমূল্যায়ন, শিক্ষা ও সচেতনতার অভাব এবং পিতা-মাতার অসাবধানতা ও অসতর্কতা।দারিদ্র্য, বেকারত্ব, নারীর নিম্নমানের পেশা, চাকরির অভাব, মাথাপিছু নিম্ন আয়, সম্পদে নারীর অনধিকার, চাকরির ক্ষেত্রে সমান সুযোগের অভাব নারী ও শিশু পাচারের প্রধান কারণ। দারিদ্র্য ও বেকারত্বের কারণে দরিদ্র নারী এবং তাদের পরিবার বিয়ে ও চাকরির প্রস্তাবে প্রলুব্ধ হয়। সীমান্ত এলাকা অতিক্রম করে এক পরিবারের সদস্যরা অন্য পরিবারের সদস্যদের সাথে যুক্ত হওয়ার বাসনা অনেক সময় নারী ও শিশু পাচারের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে দেশের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে এ প্রবণতা বেশি দেখা যায়। পরিবারে নারীর অধঃস্তন অবস্থান, বা সমাজে প্রচলিত বিভিন্ন মূল্যবোধ, আচার-আচরণ ও সামাজিক রীতি ইত্যাদিও নারী ও শিশু পাচারকে দ্রুততর করে। সমাজে বৈবাহিক অবস্থা দিয়ে নারীর সামাজিক অবস্থান নির্ধারিত হয়ে থাকে।

নারী ও শিশু পাচার সমাজে কী ফল বয়ে আনতে পারে, তা নিয়ে অনেক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ আছে। তবে নেতিবাচক প্রভাবই বেশি। নারী ও শিশু পাচার একটি অবৈধ স্থানান্তর প্রক্রিয়া? নারী ও শিশুদের অপহরণ করে অথবা নানা রকম ছলচাতুরি ও প্রলোভনের আশ্রয় নিয়ে পাচার করা হয়? পাচারকৃত নারী ও শিশুদের নীতি বহির্ভূত ও অমানবিক কাজে নিয়োগ করা হয়? পাচারকৃত কোন নারী বা শিশু ফিরে এলে বিভিন্ন ধরণের সামাজিক সমস্যার সম্মূখীন হয়?

বাংলাদেশ নারী ও শিশু পাচারের একটি উৎস দেশ হিসেবে পরিচিত? এ কারণে এদেশে নারী ও শিশু পাচারের বিষয়ে আইনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে? স্বাধীনতার পর থেকে পাচার বিষয়ক বিচারের কাজ বিভিন্ন আইনের মধ্য দিয়ে করা হয়েছে? ২০০০ সাল পর্যন্ত পাচার সম্পকির্ত নিদির্ষ্ট কোন আইন ছিল না? ২০০০ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে আইন প্রণীত হয় এবং ২০০৩-এ এই আইনের কিছুটা সংশোধনী দেয়া হয়? এই আইনে বিভিন্ন ধরণের নারী নির্যাতনের মধ্যে পাচারকে বেশ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয় এবং পাচারকার্যে নিয়োজিতদের শাস্তি দেওয়া হয়?

সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, এশিয়ার মধ্যে নারী পাচারের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ হলো বাংলাদেশ। এক্ষেত্রে প্রথম স্থানকারী দেশ হলো নেপাল ? পাচারকারীরা বিভিন্ন পথে নারী ও শিশু পাচার করে থাকে, যথা- স্থল পথ, জল পথ অথবা বিমান পথ? বাংলাদেশ থেকে পাচারের যে উদাহরণগুলো পাওয়া যায়, তাতে দেখা যায় বিমান ও স্থল পথে সীমান্ত অতিক্রমের মাধ্যমেই বেশি সংখ্যক নারী ও শিশু পাচার হয়? দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম এবং উত্তর-বঙ্গ সীমানা দিয়েই পাচার হয় বেশি? বাংলাদেশের পাচারকারীরা ভারতের বিভিন্ন সীমান্ত ব্যবহার করে পাকিস্তান, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে নারীদের পাচার করে? দেশের উত্তরাঞ্চলের দিনাজপুর, পঞ্চগড়, কুড়িগ্রাম, রংপুর, রাজশাহী ও চাঁপাই নবাবগঞ্জ জেলার সীমান্ত পথ দিয়ে পণ্যসামগ্রী পাচারের পাশাপাশি নারী ও শিশু পাচার হয়ে থাকে? এসব অঞ্চলের ১১টি রুট পাচারের উদ্দ্যেশে ব্যবহৃত হয়? বেনাপোল ছাড়া যশোর থেকে পাচারকারীরা সাধারণত ভোমরা, কলারোয়া, দর্শনা, জীবননগর ও ঝাউডাঙ্গা সীমান্তু পয়েন্ট দিয়ে নারী ও শিশু পাচার করে থাকে? এছাড়াও কুষ্টিয়া ও সাতক্ষীরার বিভিন্ন বর্ডার এলাকা দিয়ে পাচার করা হয়। পাচারকারীরা এসব পথকে নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। তবে কোন কোন ক্ষেত্রে বৈধ পথেও নারী ও শিশুকে আকাশপথে বিদেশে পাচার করা হচ্ছে।

নারী পাচারকারী আসলে কারা? আইনী পরিভাষায় এর সংজ্ঞা দেয়া আছে। ২০০৪ সালের নারী ও শিশু নিযার্তন দমন আইন অনুযায়ী, পাচারকারী সেই ব্যক্তি, যে পতিতাবৃত্তি বা নীতিবহির্ভূত বেআইনী কাজে নিয়োজিত করার উদ্দেশ্যে কোন নারীকে বিদেশ থেকে আনয়ন করেন অথবা বিদেশে পাচার বা প্রেরণ করেন অথবা, বেচাকেনা করেন অথবা, ভাড়ায় বা অন্য কোনভাবে নির্যাতনের উদ্দেশ্যে হস্তান্তর করেন অথবা, একই উদ্দ্যেশে নারীকে তার দখলে, জিম্মায় বা হেফাজতে রাখেন? উল্লিখিত কাজগুলোর যে কোন একটির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি পাচারকারী হিসেবে অভিহিত হবেন পাচারকারী কোন বিশেষ ব্যক্তি নয়। পাচার কাজের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে একাধিক ব্যক্তি এই প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত থাকতে পারে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একজন মূল হোতা এবং দলাল থেকে শুরু করে আত্মীয়-পরিজনও সহযোগী হিসেবে এ কাজে যুক্ত থাকতে পারে? প্রকৃতি অনুযায়ী পাচারকারী চক্রকে চারটি ভাগে ভাগ করা যায়। এরা হলো- মূল হোতা, দালাল, সংগ্রহকারী ও সহযোগী।

নারী ও শিশু পাচার বিষয়ক প্রতিবেদনে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, নারী ও শিশুদের বিভিন্ন উদ্দেশ্য সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। পাচারের পর পাচারকৃতদের পতিতাবৃত্তি, পর্নোগ্রাফি সিনেমায় ব্যবহার, মধ্যপ্রাচ্যে উটের জকি হিসেবে ব্যবহার, ভিক্ষাবৃত্তি, শরীরের রক্ত বিক্রি করা, অঙ্গ-প্রতঙ্গ কেটে ব্যবসা, মাথার খুলি, কঙ্কাল রপ্তানিসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হয়। এসব কাজ নিঃসন্দেহে ঝুঁকিপূর্ণ এবং এ কাজে নিয়োজিতরা অনেক ক্ষেত্রে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে।

ইউনিসেফ ও সার্কের এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর প্রায় সাড়ে ৪ হাজার নারী-শিশু পাচার হয়ে যাচ্ছে? স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত এদেশ থেকে কমপক্ষে ১০ লক্ষ নারী ও শিশু পাচার হয়েছে? বিশ্ব জুড়েই রয়েছে পাচারকারীদের নেটওয়ার্ক? এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তারা গরীব ঘরের ছেলে, মেয়ে ও নারীদের পাচারের উদ্দেশ্যে সংগ্রহ করে? তারা নারী পাচারের জন্য কতিপয় কৌশল অবলম্বন করে? যেমন- দেশ ও বিদেশে চাকুরির মিথ্যা প্রলোভন দিয়ে, জোরর্প্বূক অপহরণ করে,খাবার-জামাকাপড় দেওয়ায় প্রলোভন দেখিয়ে পাচার করে থাকে? কখনো পাতানো বিয়ের মাধ্যমে দরিদ্র ও অশিক্ষিত কিশোরী ও যুবতীদের ফাঁদে ফেলে?এর ফলে তারা এক ভয়ঙ্কর অন্ধকার ও অনিশ্চিত জীবনের দিকে ধাবিত হয়। এসব কাজে প্রতিনিয়ত লঙ্ঘিত হয় মানবাধিকার।

প্রকাশিত : ৫ জুন ২০১৫

০৫/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: