আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

চাই পরিবেশ শিক্ষা

প্রকাশিত : ৫ জুন ২০১৫
  • কাজী আফরোজ জাহান আরা

মানুষের কর্মকা-ের ফলে পরিবেশের বিপর্যয়রোধে ১৯৭২ সালের ৫ জুন থেকে ১৬ জুন পর্যন্ত জাতিসংঘ আয়োজিত ‘মানব পরিবেশ’-এর ওপর প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। যার ফলে ১৯৭৩ সালের ৫ জুনই সমগ্র বিশ্বে প্রথম বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালন করা হয়। এরপর থেকে প্রতিবছর বিশ্বের অন্যান্য দেশ ও জাতির সঙ্গে বাংলাদেশেও ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালন করা হয়। জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচী (টঘঊচ) ১৯৭৩ সাল থেকেই প্রতিবছর বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে একটি করে সেøাগান নির্ধারণ করছে। প্রথম বিশ্ব পরিবেশ দিবসের সেøাগান ছিল ‘ঙহষু ঙহব ঊধৎঃয’, ঠিক একইভাবে ২০১৫ সালের বিশ্ব পরিবেশ দিবসের জন্য একটি সেøাগান নির্ধারণ করা হয়েছে। এ বছরের সেøøাগান হলো- ‘ঝবাবহ ইরষষরড়হ উৎবধসং, ঙহব চষধহবঃ.ঈড়হংঁসব রিঃয ঈধৎব.’

কেন এই বিশ্ব পরিবেশ দিবস?

আজকের বিশ্ব সবচেয়ে বড় যে সমস্যার সম্মুখীন তা হলো, পরিবেশের পরিবর্তন। বর্তমান বিশ্বের সর্বত্র আমরা পরিবেশের পরিবর্তন লক্ষ্য করছি। পরিবেশের এই পরিবর্তন ঘটবে, স্বাভাবিকভাবে। কিন্তু বর্তমানে বিশ্বে পরিবেশে যে সকল পরিবর্তন ঘটছে তা মোটেও কোন স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার ফল নয়। মানুষের বিভিন্ন কর্মকা-ের ফলেই বর্তমানে পরিবেশের এই পরিবর্তন ঘটছে।

তিন দশক আগেও বিশ্ববাসীকে পরিবেশ নিয়ে খুব একটা ভাবতে দেখা যায়নি। কিন্তু বর্তমানে বিশ্বে পরিবেশের পরিবর্তনের কারণে যে সকল সমস্যা এবং বিপর্যয় দেখা দিয়েছে, সেগুলো নিয়ে সমগ্র পৃথিবীর মানুষ শঙ্কিত।

পরিবেশের এই বিপর্যয় রোধে বিশ্বের সকল নেতত্ব থেকে আরম্ভ করে সকল জনগণকে পরিবেশের প্রতি সচেতন ও মনোযোগী করে তোলার জন্য এবং নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার্থে পরিবেশের প্রতি মানবজাতিকে সদয় আচরণ করার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্যই সমগ্র বিশ্বে প্রতিবছর ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস উদযাপন করা হয়।

বর্তমানে মানুষ তার জীবনকে সুখকর ও আরামদায়ক করার জন্য পরিবেশের সম্পদের যথেচ্ছ ব্যবহার করছে। ফলে বিশ্বে প্রাকৃতিক সম্পদ হয়ে পড়ছে সীমিত। পরিবেশে সামঞ্জস্যহীন উন্নয়ন কর্মকা-ের ফলে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অনেক দেশই আজ মহাবিপর্যয়ের সম্মুখীন। আমরা ইতোমধ্যেই দেখছি, কৃষিজমি হারাচ্ছে তার উর্বরতা, ভূগর্ভস্থ-পানির স্তর দ্রুত নেমে যাচ্ছে। পৃথিবীর অনেক স্থানেই দেখা দিয়েছে নিরাপদ পানির দুষ্প্রাপ্যতা। বিশ্বব্যাপী আমরা লক্ষ্য করছি জলবায়ুর আকস্মিক পরিবর্তন। সমগ্র পৃথিবীতেই মরুকরণ প্রবণতা বাড়ছে। বাংলাদেশেও বিশেষত: দেশের উত্তরাঞ্চলে ইতোমধ্যেই মরুময়তার সুনির্দিষ্ট লক্ষণ দেখা দিয়েছে। মরুময়তার প্রধান কারণগুলো হলো- অভিন্ন নদীর উজানে গতিপথ পরিবর্তন, অবকাঠামো নির্মাণ ও যথেচ্ছ পানি প্রত্যাহার, বিপুল পরিমাণ নদীবাহিত পলি, ভূগর্ভস্থ পানির অত্যধিক ব্যবহার, নির্বিচার বৃক্ষ নিধন, ব্যাপক জনসংখ্যা ইত্যাদি।

এরই মাঝে বিশ্ব পরিম-লের উষ্ণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। দক্ষিণ মেরুর বরফ অতি দ্রুততার সঙ্গে গলছে। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক পরিবেশেও এখন এসেছে পরিবর্তন। বৃষ্টির দিনে বৃষ্টি ঠিকমতো হচ্ছে না। আবার কখনও হচ্ছে অতিবৃষ্টি। কখনও দেশ কবলিত হচ্ছে খরায়। এককালের বাংলাদেশে যে ষড়ঋতু ছিল, তা আজ আর নেই। শীতকাল আর আগের মতো নেই। শীতকালেও গরম অনুভূত হয়। দেশ পড়ছে সিডর, আইলার মতো প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের কবলে। প্রকৃতির পরিবর্তনের কারণে ঝড়, ঝঞ্ঝা, খরা, বন্যা এগুলোর প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে।

পরিবেশের বিভিন্ন দূষণের কারণে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর সকল স্থানের জীববৈচিত্র্য আজ ধ্বংসের সম্মুখীন। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। কিন্তু আমরা দেখছি কীভাবে এই বনটি আজ ধ্বংসের সম্মুখীন। এটি একসময় ছিল বিশ্বের অন্যতম ম্যানগ্রোভ বন, যা ছিল উদ্ভিদ ও জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। অসংখ্য প্রজাতির ছোট ও বড় নানা জাতের উদ্ভিদ, বন্যপ্রাণী, বিভিন্ন জাতের সরীসৃপ, পাখি এবং স্তন্যপায়ী প্রাণীর আবাসস্থল ছিল এ বন। এছাড়া বিভিন্ন জাতের মাছ ও চিংড়ির প্রজনন ক্ষেত্র এই সুন্দরবন। কিন্তু মানুষের কর্মকা-ের ফলে এই সুন্দরবন হারাচ্ছে তার প্রাকৃতিক ঐতিহ্য। এ বন থেকে ইতোমধ্যেই অনেক উদ্ভিদ ও প্রাণী চিরতরে হারিয়ে গেছে। সমগ্র পৃথিবী কাঁপানো রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা এখন হাতে গোনা। পানির লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও বনজঙ্গল ধ্বংসের কারণে এদের সংখ্যাও এখন অনেক কমে গিয়েছে। সুন্দরবনের নামকরা উদ্ভিদ সুন্দরী, হিজল, তমাল, বাহরা, হরিতকি, সর্পগন্ধা ইত্যাদিও বিলুপ্তির পথে। বিভিন্ন কারণে সুন্দরবন হারাচ্ছে তার ঐতিহ্য।

২০১৪ সালের ৯ ডিসেম্বর দুর্ঘটনাকবলিত হয়ে একটি তেলবাহী ট্যাংকার ডুবে গিয়ে সুন্দরবনের শ্যালো নদী ও পশুর নদীর ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ এলাকা জুড়ে ৭৫০০০ গ্যালন তেল ছড়িয়ে পড়েছে। যা জীবের অস্তিত্বকে করে তুলেছে বিপন্ন।

একসময় পার্বত্য চট্টগ্রাম আর সিলেটের বনাঞ্চলে বনগরুর অবাধ বিচরণক্ষেত্র ছিল। আরও ছিল গ-ার, বারশিঙ্গা (বিশালদেহী হরিণ), রাজশকুন। এরা সবাই চিরতরে হারিয়ে গেছে। বর্তমানে বিপন্ন প্রাণীর মধ্যে যেগুলো রয়েছে সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সাম্বার (আকৃতিতে বড় এক জাতের হরিণ), রামকুত্তা, চিতাবাঘ, মেঘলানিতা, সোনালী বিড়াল।

এসবই ঘটেছে মানুষের সৃষ্ট পরিবেশ পরিবর্তনের কারণে। পরিবেশের এ ভয়ঙ্কর বিপর্যয় এড়াতে সমগ্র বিশ্ব আজ চিন্তিত। অনিবার্য ধ্বংস থেকে পৃথিবীর এই পরিবেশকে রক্ষা করতে হলে, বর্তমানসহ ভবিষ্যত প্রজন্মকে বাঁচাতে হলে এখনই পরিবেশের প্রতি ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। দেশের মানুষ যাতে পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন হয়, পরিবেশ দূষণ রোধসহ বনজঙ্গল কাটা বন্ধ করে তা নিশ্চিত করতে হবে। এটি সম্ভব বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালনের পাশাপাশি শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষা হতে সকল পর্যায়ের শিক্ষায় ‘পরিবেশ শিক্ষা’ বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করে, দেশের ভবিষ্যত প্রজন্মকে এ বিষয়ে অবগত করা। পরিবেশের বিপর্যয় ঠেকাতে এবং সর্বক্ষেত্রে টেকসই উন্নয়নের জন্য পরিবেশ শিক্ষার কোন বিকল্প নেই। এ কারণেই বিশ্বজুড়ে ‘পরিবেশ শিক্ষা’ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব পাচ্ছে।

পরিশেষে রেড ইন্ডিয়ান একটি প্রবাদ দিয়ে আমরা বলতে পারি- ‘যদি আমরা শেষ গাছটিও কেটে ফেলি, শেষ মাছটিও ধরে ফেলি, শেষ নদীটিও দূষিত করি, তখন থাকবে শুধু টাকা। কিন্তু তা দিয়ে আমরা গাছ, মাছ, পানি কিছুই পাব না।’

লেখক : অধ্যাপক, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশিত : ৫ জুন ২০১৫

০৫/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: