আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

‘খুব ডুব’ নিয়ে অর্ণব

প্রকাশিত : ৪ জুন ২০১৫

বুয়েট মিলনায়তনের করিডোর। এক কোণে ‘খুব ডুব’ এর অস্থায়ী স্টল। সারিবদ্ধ হয়ে সবাই এ্যালবাম কিনছে। সেই সারিতে তারুণ্যের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে মাঝ বয়সী এক মহিলা। লম্বা সারি। সময় লাগবে এ্যালবাম পেতে। তবুও বিরক্তি নেই তাঁর চোখেমুখে। সারির একমাথায় দাঁড়িয়ে সিডি ও স্মারক তুলে দিচ্ছেন অর্ণব। একটা সময় তাঁর কাছে পৌঁছে যান সে মহিলা। ক্রেতা-বিক্রেতা দুজনের মুখেই হাসি। ফিরতি চাহনিতে অর্ণব বললেন, ‘আম্মা, এই যে সিডি।’

আম্মা! হ্যাঁ.. অবাক হওয়ার কিছু নেই। সেই মহিলাটিই ছিলেন অর্ণবের মা সুরাইয়া চৌধুরী। নিজের টাকায় সন্তানের সিডি কিনলেন জনসম্মুখে। এ যে বিরটা পাওয়া একজন ছেলের জন্য। মা যে আসবেন সিডি কিনতে, এ ব্যাপারে আগে থেকে নিশ্চিত ছিলেন না ‘হোক কলরব’ শিল্পী। জানালেন, ‘মা বলেছেন, হয়ত আসতে পারেন..।’

এ্যালবাম বিক্রির অবস্থা ভাল। এটা সহজেই অনুমেয়। অর্ণব নিজেও তাই-ই বললেন। ‘খুব ভাল সাড়া পাচ্ছি। ছেলে-মেয়েরা লাইন ধরে ধরে এ্যালবাম নিচ্ছে।’

‘খুব ডুব’ এ্যালবামের পর সত্যি সত্যিই ডুব দেয়ার পরিকল্পনা আছে অর্ণবের। বললেন, ‘এভাবে ফুলটাইম হয়ত আর মিউজিক করব না। অন্যকিছু করবো। পাশাপাশি মিউজিকটা করবো, শখে। আগে যেমনটা করতাম।’

অর্ণব শুধু গানটাই ভাল করেন না, ছবিটাও আঁকেন দারুণ। সেজন্যই তিনি চাচ্ছেন কোথাও পড়াতে, ছবি আঁকা শেখাতে..

মাস কয়েক আগে তরুণ শিল্পী বুশরা জাবিনকে দেখেছি প্রি-অর্ডার অনুসারে শ্রোতাদের দ্বারে দ্বারে এ্যালবাম পৌঁছে দিতে। অর্ণবকে দেখছি এই প্রচ- রোদ্দুর ভেঙ্গে এ্যালবাম বিক্রি করছেন নিজে দাঁড়িয়ে থেকে। এই যে এত আয়োজন করতে হচ্ছে এ্যালবাম বিক্রি করার জন্য। কেন আসলে? এটা অনেক বড় প্রশ্ন। দায়টা কার? শ্রোতার নাকি মানহীন গান বা অন্যকিছুর? অর্ণব খুব সাপ্টা জবাব দিলেন। ‘শ্রোতাদের দায়ী বলব না, সচেতনতার অভাব আছে। আরেকটু আন্তরিকতার সঙ্গে নিতে হবে। অনলাইন থেকে ডাউনলোড না করে একজন-দুজন করে সবাই যদি নিয়মিত এ্যালবাম কেনে, তাহলে আর সমস্যাটা থাকে না। আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে, পুরো সিস্টেমটা পাল্টাচ্ছে আসলে। ডিজিটাল ডিস্ট্রিবিউশন শুরু হচ্ছে সব জায়গাতেই। আমাদের বাংলাদেশে থ্রিজি আসছে সবে। এছাড়া ক্রেডিট কার্ড দিয়ে অনলাইনে কিছু কেনা, এটাতেও আমরা খুব একটা অভ্যস্ত না। কিন্তু বিকাশ বা অন্য কোন কোম্পানি ব্যবহার করে একটা সিস্টেম চালু করা যায় অবশ্যই, যেটার মাধ্যমে সরাসরি শ্রোতারা টাকা দিয়ে এ্যালবাম পেয়ে যাবে এবং সেই টাকাটা শিল্পীর কাছে পৌঁছে যাবে। এ রকমভাবে যদি সরাসরি হয় ব্যাপারটা, তাহলে এই সমস্যাগুলো থাকে না।’

বাজার ছেয়ে গেছে গতানুগতিক গানে। শ্রোতারা সাময়িকের জন্য হলেও টানছে তা। এই সময়েও অর্ণব তাঁর নিজস্বতা ধরে রেখে ভিন্ন রকম গান করছেন। এটা বাণিজ্যিক দিক থেকে অবশ্যই ঝুঁকির। তবুও নিতে হচ্ছে ঝুঁকিটা। এই গানগুলো দিয়ে মোবাইল কোম্পানিগুলো বিভিন্ন রকমভাবে ব্যবসা করে। সেই ব্যবসার একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ তো অবশ্যই শিল্পীর পাওয়ার কথা! পাচ্ছে না দেশের অধিকাংশ শিল্পীরাই। অর্ণবও না। বললেন, ‘ওয়েলকাম টিউন, কলার ব্যাক টিউন ইত্যাদি বিভিন্ন কিছু দিয়ে লাখ লাখ টাকার ব্যবসা হয়। আমি মাত্র এক বছরের জন্য এক কন্টেন্ট প্রোভাইডারকে আমার গান দিয়েছিলাম। সেই চুক্তিটা এক বছর পরই শেষ হয়ে যাওয়ার কথা এবং সেটা আর রিনিউ করিনি। কিন্তু এখনও প্রত্যেকটা টেলকোর সিস্টেমে আমার গানগুলো আছে। তারা প্রতিনিয়ত ব্যবহার করে যাচ্ছে সেগুলো। একমাত্র রবি আমাকে কিছু টাকা দিয়েছে, তা-ও সাত-আট বছর আগের কথা।’ এটা নিয়ে অভিযোগ কিংবা আপত্তি তুলেও লাভ হয়নি কোন। ‘আমি গ্রামীণের কাছে আপত্তি করেছিলাম। জানতে চেয়েছিলাম এটার জন্য গত সাট-আট বছর ধরে তারা কাকে টাকা দিচ্ছে। তখন গ্রামীণ আমাকে বলল- পুরনো কথা ভুলে যান। আসেন আমরা নতুন করে ব্যবসা করি।’

খুবই দুঃখজনক এটা। কোন নীতিমালা নেই এই ব্যাপারে। থাকলেও তা শ্রীঘরে পড়ে আছে নাজুকভাবে। এভাবে চলতে থাকলে তো অর্ণবরা হারিয়ে যাবে ক্রমেই।

সেই অনেক আগে ‘মনপুরা’র জন্য গান বেঁধেছিলেন তিনি। তারপর কলকাতার সিনেমার জন্য গান করেছিলেন একটা। কিন্তু নিয়মিত কখনই সিনেমার গান করা হয়নি তাঁর। কারণ, ‘আসলে এখন তো সবাই সিনেমার হিটের কথা চিন্তা করে একেকটা গান একেকজন কম্পোজারকে দেয়, তারপর একটা এ্যলবাম বের করে। এইভাবে তো সিনেমার গান হয় না। পুরো সিনেমার মধ্যে যদি একটা গাঁথুনি না থাকে গানের; সিনেমার গল্পের যে প্রকৃতি থাকে, সেটার সঙ্গে যদি গানের প্রকৃতির মিল না থাকে, তাহলে কিছুই হয় না।’ হয়ত সেজন্যই অর্ণবেরও গান করা হয় না সিনেমায়..

কলকাতার প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী অনুপম রয় নাকি নকল করে অর্ণবকে! এটা অনেকেই বলে.. কিন্তু অর্ণব বললেন, ‘এইসব বাজে কথা। আমি যখন একবার কলকাতায় গিয়েছিলাম, তখন ও আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। খুব ভাল মানুষ ও। ও এটা বলেছিল- বাংলা গানের একটা সময় যখন খুব বাজে অবস্থা ছিল, তখন তোমার গান আমাদের অনেক সাহায্য করেছে.. এটা আমার জন্য অনেক বড় পাওয়া। ওই জায়গা থেকে আমার মনে হয় যে, একটা পথ পাওয়া গেছে হয়ত। একটা সময় আমাদের বাংলা গানের মধ্যে রোমান্টিসিজম ছিল, সেটা থেকে হঠাৎ জীবনমুখীতে চলে গেল, তারপর রক শুরু হলো.. যাই হোক, আমি হয়ত চেষ্টা করেছি বাংলা গানে ওই রোমান্টিসিজমটাকে ফেরত নিয়ে আসতে।’

গানের দুঃসময় চলছে। প্রচ- দুঃসময়। এটা পুরনো কথা। এই সময়ে প্রোফেশনাল ক্যারিয়ার হিসেবে গান কেমন? ভাববার বিষয়। অর্ণব জানালেন, ‘খুবই যদি আবেগপ্রবণ হয়ে থাকে গান নিয়ে, খুবই যদি লেগে থাকতে পারে কেউ; তাহলে হয়তো কিছু একটা হবে। স্রষ্টা প্রদত্ত মেধা দিয়ে একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব পর্যন্ত এগোনো যায়, কিন্তু তার পরবর্তী ধাপটা পেরোতে গেলে যে মেধা বা শ্রমের দরকার হয়; সেটা কিন্তু অনেক কঠিন, সময়ের ব্যাপার। সাধনা লাগে খুব। এটারই প্রচ- অভাব এখন। সবাই-ই শুধু তাড়াতাড়ি সফলতা পেতে চায়।’

‘খুব ডুব’ এ গান রয়েছে দশটি। অর্ণব, টোকন ঠাকুর, রাজিব আশরাফ ও সাহানা বাজপেয়ির লেখা গান ছাড়াও আছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান। উল্লেখযোগ্য গানগুলোর শিরোনাম হচ্ছে- ‘চাঁদের সিঁড়ি’, ‘খুব ডুব’, ‘এসো শ্যামল সুন্দর’, ‘তখন জোনাক ডাকে’, ‘অভিযান’, ‘পুলিশের ছিঁড়ে টুপি’, ‘ইট কাঠ পাথরের মুখোশ’ ও ‘সবুজ সবুজ ডায়েরি’

প্রকাশিত : ৪ জুন ২০১৫

০৪/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: