কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

এক কিংবদন্তির গল্প

প্রকাশিত : ৪ জুন ২০১৫

ছেলেটি বেশ ডানপিটে ছিল। স্থির থাকত না টানা ১০ মিনিট। পরিবারে সাংস্কৃতিক আবহ ছিল না তেমন একটা। সেই অর্থে ছেলেটির অভিনয় জগতে প্রবেশ বৈপ্লবিকই বটে। শুরু সেই ১৯৬৭-এ। ক্লাস নাইনে পড়ার সময়। বাবার চাকরীর সূত্রে তখন তারা থাকত মাদারীপুরে। সেখানেই মঞ্চে তথা অভিনয়ে প্রথম কাজ। আর বের হতে পারেনি অভিনয়ের জাল ছিঁড়ে। যার কাছে অভিনয় মানে প্রার্থনা তার পক্ষে, অভিনয় ছাড়া সম্ভবও নয়। এতক্ষণ যে কিশোর ছেলেটির কথা হচ্ছিল তিনি আর কেউ নন, আমাদের কিংবদন্তি অভিনেতা হুমায়ুন ফরীদি। অকালে চলে যাওয়া এক কিংবদন্তী, যার দেয়ার ছিল আরও অনেকটা।

যৌবনের প্রারম্ভে গিয়েছিলেন দেশ স্বাধীন করতে। তখন সবে এইচএসসি পাস করেছেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নানাবিধ হতাশায় বাউন্ডুলে জীবন ৫ বছরের। দেশের নানা প্রান্তে ঘুরে বেড়িয়েছেন। নানা পেশার মানুষের সঙ্গে মিশেছেন, এমনকি থেকেছেন শ্মশানেও। তারপর আবারও শিক্ষার পথে ফিরে আসা। গন্তব্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ।

আর এখানেই নিয়মিত মঞ্চ নাটক নির্দেশনা ও অভিনয় করে নিজেকে বিকশিত করে তোলেন আরও যতœ সহকারে। সূত্রপাত আন্তঃহল নাটক প্রতিযোগিতা, যেখানে বিচারক ছিলেন ঢাকা থিয়েটারের নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু। সে পরিচয়ের রেশ ধরেই একসময় ঢাকা থিয়েটারের মঞ্চ নাটকে নিজেকে মেলে ধরলেন পুরোদমে। একে একে করে গেছেন শকুন্তলা, কীত্তনখোলা, মুনতাসীর ফ্যান্টাসি, কেরামত মঙ্গল ইত্যাদি নাটকে। মঞ্চে কাজ করার ব্যাপারে দক্ষতা এমন একপর্যায়ে পৌঁছায় যে, তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সহকর্মী আফজাল হোসেন একবার স্মৃতিচারণ করছিলেন, ‘কেরামত মঙ্গল’ নাটকে অভিনয় করার সময়ের কথা। তার সঙ্গে সিকোয়েন্সের সময় ফরীদি এমন কিছু সংলাপ ব্যবহার করতেন যেগুলো মূল স্ক্রিপ্টে ছিল না। আফজাল হোসেন ঘাবড়ে না গিয়ে তার উত্তর দিয়ে ফেলতেন। ফরীদি পাল্টা উত্তর দিতেন। এভাবে দু’জন মিলে একবার ১০ মিনিটের সিকোয়েন্স টেনে নিয়েছিলেন ২০ মিনিটে। শত শত দর্শকের সামনে শুধু আত্মবিশ্বাসের মাত্রা উঁচু তে থাকলেই এমন সাহস করা সম্ভব। ১৯৮০ সালে যার হাত ধরে মঞ্চ থেকে টিভি নাটকে যাত্রা শুরু করেন তিনি সেই আতিকুল হক চৌধুরী তার সম্পর্কে বলতে যেয়ে বলেছিলেন, ‘ফরীদি বাংলাদেশের ফ্রেডেরিক মার্চ’। অবশ্য আতিকুল হক চৌধুরীর সঙ্গে প্রথম কাজ করা নিয়ে একটা মজার ঘটনা আছে। প্রথম টিভিতে অভিনীত নাটক ‘নিখোঁজ সংবাদ’ যদিও আতিকুল হক চৌধুরীকে তিনি সরাসরি না করেছিলেন। কেন? চরিত্র পছন্দ হয়নি। পরবর্তীতে অন্য চরিত্র পছন্দ করে কাজ করেন। সেই সময় অনেক জাঁদরেল শিল্পী আতিকুল হক চৌধুরীর নাটকে কাজ করার জন্য মুখিয়ে থাকতেন যেখানে একজন নবীন অভিনেতা ফরীদি তাকে সরাসরি না করে দিয়েছিলেন। অবশ্য সে যোগ্যতাও তার ছিল। ফলে একে একে অভিনয় করে গেলেন ভাঙ্গনের শব্দ শুনি, হঠাৎ একদিন, সংশপ্তক, কোথাও কেউ নেই ইত্যাদি নাটকে। অর্জন করলেন তুমুল জনপ্রিয়তা।

অভিনয়ের বাইরে ব্যক্তিজীবনে ছিলেন অকপট সরল একজন মানুষ। কোন লুকোছাপা নেই। ভাল কে ভাল মন্দ কে মন্দ বলে ফেলতে পারেন খুব সহজেই। আর ব্যক্তিজীবনে এমন বলেই নাটকে অভিনয় করার সময় সাবলীল থাকতে পারতেন তিনি। সংশপ্তক নাটকে তার ‘কান কাটা রমজান’ কিংবা কোথাও কেউ নেই নাটকে আইনজীবীর চরিত্র দর্শকদের মনে দাগ কেটে রাখবে অনেক দিন।

মঞ্চ থেকে টিভি হয়ে হঠাৎ চলচ্চিত্রে এলেন কেন? এমন প্রশ্নের একাধিক উত্তরে একটি কথাই বলেছেন, ফিল্মে অভিনয় করেছি টাকা কামাতে। শুধু মঞ্চ বা বিটিভিতে নাটক করে জীবন চালানো সম্ভব ছিল না। অভিনয়ের পাশাপাশি ছিল করোলা কর্পোরেশনের চাকরি। সেটা ছেড়ে দিয়েছিলেনও ব্যবসায় নেমে হলেন অসফল। সুতরাং চলচ্চিত্রই ভরসা। কিন্তু খল চরিত্রে কেন? এমন প্রশ্নেরও অকপট জবাব, ‘নায়ক হতে গেলে যে চেহারা বা বডি ফিটনেস দরকার হয় তা আমার নাই, আর আমি যা ইচ্ছা তা করতেও পারব না। তবে খল চরিত্রে আমি যা ইচ্ছা তাই করতে পারি।’ আর হ্যাঁ, বাংলা ছবিতে তখন খল চরিত্রে অভিনয় করতেন বা করেছেন এমন অনেকেই আছেন, কিন্তু হুমায়ুন ফরীদি প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন স্বতন্ত্র ধারা। তার খল চরিত্রে থাকত প্রচ বুদ্ধিদীপ্ত কৌশল যা দর্শকদের একই সঙ্গে শিহরিত করত আবার বিনোদনও দিতো।

প্রথম চলচ্চিত্র ১৯৮৫ সালে, সরকারী অনুদান প্রাপ্ত ছবি ‘দহন’। পরিচালনায় ছিলেন শেখ নিয়ামত আলী। তবে সেটি মূলধারার বাণিজ্যিক ছবির বাইরে ছিল। অবশ্য সমালোচকরা ঠিকই চিনতে পেরেছিলেন। প্রথম বাণিজ্যিক ছবি শহীদুল ইসলাম খোকনের ‘সন্ত্রাস’। যেখানে তার অভিনীত চরিত্র ছিল জুলমত আলী খান। সেই ১৯৯০/১৯৯১ এর কথা। পর্দায় যতবার তাকে দেখা গেছে দর্শক ততবার উল্লাসে ফেটে পড়েছে। খল চরিত্রে অভিনয় করে এমন জনপ্রিয়তা তিনি পেয়েছেন শুধু অভিনয় গুণে।

তবে শুধু যে বাণিজ্যিক ছবিতে অভিনয় করেছেন তা নয় কিন্তু। অভিনয় করেছেন শিল্পমান সম্মত ছবিতেও। যেমন একাত্তরের যীশু, শ্যামল ছায়া, মাতৃত্ব, জয়যাত্রা, আহা ইত্যাদি ছবিতে অভিনয় করেছেন নিজের মনের খোরাক মেটাতে। সর্বশেষ অভিনয় করার কথা ছিল রেদোয়ান রনির ‘চোরাবালি” ছবিতে। তবে হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ায় আর করা হয়ে ওঠেনি। এক সময় তো চলেই গেলেন না ফেরার দেশে।

চলচ্চিত্রে অভিনয় কমিয়ে একটা সময় ফিরে এসেছিলেন টিভি নাটকের জগতে। মজার বিষয় হলো অভিনেতা হিসেবে তার স্থান এতো উঁচুতে যে, তার চরিত্রায়নের জন্য পরিণত বয়সে বাবা বা মুরব্বী চরিত্রে অভিনয় করতে হয়নি বরং তাকে কেন্দ্র করে কাহিনী আবর্তিত হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০০১ সালে ইটিভিতে প্রচারিত আহীর আলম পরিচালিত ‘প্রেত’ নাটকের কথা যেখানে তিনি একাধারে তিনটি চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন তিনটি ভিন্ন লুকে এবং প্রতিটি চরিত্র কাহিনীর বাঁক ঘুরিয়ে দেয়। এ সময় কিছু নাটকও পরিচালনা করেছেন, যে অনুপ্রেরণা তিনি পেয়েছিলেন আবদুল্লাহ আল মামুনের কাছ থেকে। নাটকের পাশাপাশি ছিলেন ক্রিকেট পাগল এক ব্যক্তিত্ব। ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশের আইসিসি কাপ জয়ের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে মাঠে হাজির হয়েছিলেন। বিটিভিতে উপস্থাপনা করেছেন ‘ক্রিকেট ক্রিকেট’ নামক কুইজ শো, নিজেকে নিয়ে এতো পরীক্ষা-নিরীক্ষা অন্য কেউ করেছে বলে মনে হয় না।

তবে অভিনেতা-অভিনেত্রীরা একটা পর্যায়ে পৌঁছালে তাদের ব্যক্তিজীবন মাঝে মাঝে আমজনতার কৌতূহলে পরিণত হয়। প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে বিয়ে করেন গুনী অভিনেত্রী সুবর্ণা মুস্তাফাকে। যদিও ২০০৮ সালে সে সম্পর্কের ইতি ঘটে। তারপর থেকে শেষ সময় পর্যন্ত একাই ছিলেন। নিঃসঙ্গ সময় কাটানো ও জীবনযাপনে নানাবিধ অনিয়ম ঘটায় এক রকম অভিমান নিয়েই বিদায় নেন ২০১২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি। গত ২৯ মে ছিল এই ক্ষণজন্মা অভিনেতার জন্মবার্ষিকী। বেঁচে থাকতে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘উত্তরাধিকার’ কবিতা তিনি প্রায়ই আবৃত্তি করতেন। নবীন কিশোর, তোমায় দিলাম ভূবনডাঙার মেঘলা আকাশ/তোমাকে দিলাম বোতামবিহীন ছেঁড়া শার্ট আর ফুসফুস ভরা হাসি......ইচ্ছে হয় তো অঙ্গে জড়াও/অথবা ঘৃণায় ছুড়ে ফেলে দাও, যা খুশি তোমার/তোমাকে আমার তোমার বয়সী সব কিছু দিতে বড় সাধ হয়...যে স্বপ্ন নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন নিজে না করতে পারলেও পরের প্রজন্মের কাছে এভাবেই দিয়ে যেতে চেয়েছিলেন তিনি। আমাদের এই প্রজন্ম কি পারবে তার স্বপ্নগুলো পূরণ করতে?

প্রকাশিত : ৪ জুন ২০১৫

০৪/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: