মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

জামায়াত নিষিদ্ধের আইনী প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে

প্রকাশিত : ৪ জুন ২০১৫
  • সংগ্রাম পত্রিকাসহ জামায়াতের ১২৭ সংগঠন নিষিদ্ধ হবে

বিভাষ বাড়ৈ ॥ শীঘ্রই নিষিদ্ধ হতে যাচ্ছে দলগতভাবে গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত ও আদালতে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত জামায়াত-শিবির। জামায়াত ও তার অঙ্গ-সহযোগী সংগঠন নিষিদ্ধ করতে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইম ট্রাইব্যুনাল এ্যাক্টের সংশোধনী খসড়া চূড়ান্ত হয়ে এখন মন্ত্রিপরিষদের অনুমোদনের অপেক্ষায়। জানা গেছে, জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধে আইনী পথেই এগোচ্ছে সরকার, যার অধিকাংশ প্রক্রিয়াও শেষ। তাই জামায়াত-শিষিদ্ধ হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। সূত্রগুলো বলছে, সংগঠন হিসেবে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করতে আইন সংশোধনের খসড়া কয়েক মাস আগেই চূড়ান্ত করেছিল আইন মন্ত্রণালয়। দ্রুত জমাও হয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে। তবে সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিসহ বাস্তবতা বিবেচনায় সরকার কিছুটা ধিরে চলো নীতি গ্রহণ করেছিল। এদিকে রাজনীতি নিষিদ্ধ হতে পারে এমন শঙ্কায় ‘নিষিদ্ধ’ পরবর্তী করণীয় ঠিক করছে বিএনপির উগ্রবাদী এ রাজনৈতিক মিত্র। রাজনীতির মাঠে টিকে থাকতে বিকল্প নানা পথ খুঁজছে নেতারা।

আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন, ১৯৭৩-এ সংগঠনের শাস্তির বিধান ছিল না। এ বিষয়টিতে আনা হচ্ছে সংশোধনী। এটি পাস হলে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন অনুসারেই নিষিদ্ধ করা সম্ভব হবে জামায়াতকে। সংশোধনের খসড়া অনুযায়ী, মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সাজাপ্রাপ্ত নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন ওই নামে বা অন্য নামে কার্যক্রম চালাতে পারবে না। সরকারের বিভিন্ন মহল থেকে আগেই বলা হচ্ছিল, জামায়াত নিষিদ্ধ করতে আইনী পথ খুঁজছে সরকার। তবে বিষয়টি যে শীঘ্রই হতে যাচ্ছে মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে তার ইঙ্গিত দিলেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। একই দিন একটি অনুষ্ঠানেও প্রায় একই কথা জানিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আকম মোজাম্মেল হক। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সংসদকে জানিয়েছেন, জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল এ্যাক্ট সংশোধনের প্রস্তাবটি বর্তমানে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে জমা আছে। সরকার যখনই মনে করবে, তখন এই প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর বিলটি পাসের জন্য সংসদে উপস্থাপন করা হবে। সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে তরিকত ফেডারেশনের সভাপতি নজিবুল বশর মাইজভা-ারীর এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানান। নজিবুল বশর বলেন, জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করার জন্য তাঁরা একটি মামলা করেছেন। এ মামলা কবে নিষ্পত্তি হবে। আইনের মাধ্যমে জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে কিনা, তাও জানতে চান তিনি। জবাবে আনিসুল হক আরও বলেন, এ মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বাদীদের (তরিকত ফেডারেশন) দরখাস্ত করতে হবে। একই দিন রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আকম মোজাম্মেল হক বলেছেন, যুদ্ধাপরাধীদের দল হিসেবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে খুব শীঘ্রই নিষিদ্ধ করা হবে। বর্তমানে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার আইনী বিষয়টি মন্ত্রণালয়ে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার মামলাটিও প্রক্রিয়াধীন আছে। এদিকে চলীত সপ্তাহেই জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল নিয়ে দীর্ঘদিন পর অবস্থান স্পষ্ট করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। হাইকোর্টের আদেশের প্রায় দেড় বছর পর তারা জানালো, জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল হয়েছে। এর আগে শুধু নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেয়া রায়ের বিষয়টি উল্লেখ করে বারবার এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এমনকি ওয়েবসাইটেও এ বিষয়ে হাইকোর্টের রায়ের প্রসঙ্গটিই কেবল উল্লেখ করেছে ইসি। ২০১৩ সালে ১ আগস্ট রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করেন হাইকোর্ট।

সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত জামায়াত ও তার অঙ্গ-সহযোগী সংগঠন নিষিদ্ধ এবং তাদের ভবিষ্যত কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিধান রেখে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন সংশোধনের খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। শীঘ্রই আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন-২০১৪ সংশোধনী মন্ত্রিসভায় উঠছে। এই সংশোধনীর মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ ওঠা সংগঠন জামায়াত ও তার অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের বিচারের বাধা দূর হচ্ছে।

একাত্তরে গণহত্যাসহ ৭ ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী দল জামায়াতকে নিষিদ্ধ করতে তদন্ত সংস্থার পক্ষ থেকে প্রসিকিউশনে আবেদন করা হয়েছিল। তদন্ত সংস্থার তৈরি করা প্রতিবেদনে তৎকালীন জামায়াতের সহযোগী ১২৭টি সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি বাজেয়াফত করার আবেদন জানানো হয়। পাশাপাশি জামায়াতের সাংগঠনিক কর্মকা- এবং তাদের মুখপত্র দৈনিক সংগ্রামকে অপরাধী প্রতিষ্ঠান হিসেবে অভিযুক্ত করে নিষিদ্ধের সুপারিশও করা হয়। আইন মন্ত্রণালয়ের একজন উর্ধতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আইনের খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে বেশ আগেই। খসড়াটি অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভায় উত্থাপনের অপেক্ষায় আছে। এটি হবে এই আইনের চতুর্থ দফা সংশোধনী। এই সংশোধনের কার্যকারিতা দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে ২০০৯ সালের ১৪ জুলাই থেকে।

আইন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, খসড়ায় বিদ্যমান আইনের বেশ কয়েকটি ধারায় সংশোধনী আনা হয়েছে। এর মধ্যে ‘ব্যক্তি’ শব্দের পাশাপাশি ‘সংগঠন’ শব্দটি বসেছে। খসড়ায় বলা হয়েছে, ট্রাইব্যুনাল দোষী সাব্যস্ত সংগঠনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করবেন এবং এর নিজ নামে বা অন্য কোনো নামে ভবিষ্যৎ কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবেন। পাশাপাশি মামলার বিষয়বস্তু সাপেক্ষে সংগঠনটির সদস্যদেরও ট্রাইব্যুনাল সাজা দিতে পারবে। বলা হয়েছে, কোনো সংগঠনের কার্যনির্বাহী কমিটি অথবা কেন্দ্রীয়, আঞ্চলিক বা স্থানীয় কমিটির সদস্য যদি অপরাধ করেন, তবে ওই অপরাধের জন্য সদস্যের পাশাপাশি সংগঠনও দায়ী হবে।

এদিকে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে বেশিরভাগ শীর্ষ নেতা কারাগারে। দুজনের ফাঁসি ছাড়াও একের পর এক আসছে রায়। যুদ্ধাপরাধসহ সন্ত্রাসী কর্মকা- চালিয়ে বাকি অনেক নেতাও হয় আটক নয় পলাতক আন্ডারগ্রাউন্ডে। হাইকোর্টে বাতিল হয়েছে দলীয় নিবন্ধন। রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে পারে এমন শঙ্কাও নাকের ডগায়। এমন অবস্থায় সামনে চলে এসেছে একই প্রশ্ন, কোন পথে যাচ্ছে জামায়াতের রাজনীতি? প্রকাশ্যে নাকি আন্ডারগ্রাউন্ডে? জামায়াত নামেই থাককে, নাকি নতুন দল গঠন বা জোটে একীভূত হয়ে রাজনীতির মাঠে সরব হবেন নেতারা? বাইরে যতই হুঙ্কার দিক না কেন জানা গেছে, শীঘ্রই মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুডের ভাগ্যবরণ করতে হবে ধরে নিয়ে নিষিদ্ধ পরবর্তী করণীয় ঠিক করছে বিএনপির মিত্র উগ্রবাদী এ দলটি। নাম পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক জঙ্গী সংগঠনের ন্যায় আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যাওয়াসহ নানা পরিকল্পনা থাকলেও দলটির অধিকাংশ নেতা কর্মী দেখতে চায় আসলেই নিষিদ্ধ করা হয় কিনা?

জামায়াত সূত্রগুলো বলছে, রাজনীতির মাঠে টিকে থাকতে বিকল্প সব পথেই হাঁটছেন নেতারা। এ ক্ষেত্রে মুসলিম ব্রাদারহুড বা জাস্টিস পার্টি, একে পার্টির ইতিহাসকে সামনে রেখে এগোচ্ছেন তারা। মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে জামায়াতের আদর্শিক মিল রয়েছে। রয়েছে সাংগঠনিক যোগাযোগও। এই মুহূর্তে মিশনের ওই জঙ্গিবাদী দলটির বিরুদ্ধে তাদের সরকারের কঠোর অবস্থানও ভাবিয়ে তুলেছে জামায়াতকে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিদেশের এসব দল বেশ কয়েকবার নিষিদ্ধ হয়। এরপর নতুন নামে রাজনীতি করতে থাকে দলগুলো। মিশনে এখন ব্রাডারহুদ নিষিদ্ধ সংগঠন। নেতারা মৃত্যাদ-ের মুখে।

মিসর ও তুরস্ক বিশেষত মুসুলিম ব্রদারহুডের উত্থান-পতনের ঘটনা থেকে বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কটকাল অতিক্রম করতে জামায়াত নেতারা পথ বের করছেন বলে জানা গেছে। দলের নিবন্ধন শেষ পর্যন্ত ফিরে পাওয়ার পরিবর্তে নিষিদ্ধ হলে রাজনৈতিক মাঠে টিকে থাকতে বিকল্প সব প্রস্তুতিই নিচ্ছেন জামায়াতের শীর্ষ নেতারা। প্রথমে আপীল বিভাগ নিবন্ধনের বিষয়ে হাইকোর্টের রায় বহাল করলে ভিন্ন কোনো নামে রাজনীতি করার চিন্তা-ভাবনা রয়েছে নেতাদের। জামায়াত সমর্থিত কোনো ইসলামী-সমমনা দলের সঙ্গে নিজেদের একীভূত করারও চিন্তা-ভাবনা রয়েছে।

জানা গেছে, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করে। এ সময় তারা ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ (আইডিএল) নামে তাদের কার্যক্রম চালায়। পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমানের সরকার তথাকথিত বহুদলীয় গণতন্ত্র চালু করলে জামায়াতে ইসলামী আবারও রাজনীতি করার সুযোগ পায়। সূত্র জানিয়েছে, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জামায়াত নিষিদ্ধ হলে ভিন্ন কোনো নামে কার্যক্রম চালাতে চেষ্টা করবে দলটি। তবে তার করা সহজ হবে না বলে বলছে সরকারের সংশ্লিষ্টরা।

উল্লেখ্য, ২০১১ সালে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক পত্রিকায় লেখা এক কলামে নিজের রাজনৈতিক ভাবনা প্রকাশ করেছিলেন। ওই লেখায় তিনি লিখেছিলেন, ভারতে ৬০ বছরের জামায়াত তার নাম পরিবর্তন করে ওয়েলফেয়ার পার্টি অব ইন্ডিয়া নামে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেছে পুরনো জামায়াতের ব্যর্থতার কারণে। ভারতের নতুন দলটিতে ১৬ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটিতে ক্যাথলিক খ্রীস্টান সম্প্রদায়ের একজন ফাদারসহ ৫ জন অমুসলিমকে রাখা হয়। জামায়াতের আরেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান কারাগার থেকে লেখা এক চিঠিতে দলে সংস্কারের পরামর্শ দিয়েছিলেন। ওই চিঠিতে তিনি নতুন নামে দল গঠনের পরামর্শ দিয়েছিলেন। চিঠিতে গণতান্ত্রিক ধারায় রাজনীতি অব্যাহত রাখতে বর্তমানে কার্যকর নেতাদের পরামর্শ দেয়া হয়।

প্রকাশিত : ৪ জুন ২০১৫

০৪/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: