কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

নৈশকোচের ৭ যাত্রী অগ্নিদগ্ধ চান্দিনায় ॥ পেট্রোলবোমা হামলা

প্রকাশিত : ৪ জুন ২০১৫
নৈশকোচের ৭ যাত্রী অগ্নিদগ্ধ চান্দিনায় ॥ পেট্রোলবোমা হামলা
  • পুলিশ বলছে জামায়াত-শিবির এ হামলা চালিয়েছে
  • কামতা ইউনিয়ন জামায়াত আমির গ্রেফতার
  • যে কোন মুহূর্তে যৌথ অভিযান

মীর শাহ আলম, কুমিল্লা থেকে ॥ বিএনপির ডাকা টানা তিন মাসের অবরোধে চোরাগোপ্তা পেট্রোলবোমা হামলার রেশ কাটতে না কাটতেই আবারও একই কায়দায় পেট্রোলবোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে। মঙ্গলবার পবিত্র শব-ই-বরাতের গভীররাতে কুমিল্লা জেলার চান্দিনায় ইউনিক পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী নৈশকোচে হামলার ঘটনাটি ঘটে। এতে ৭ জন দগ্ধ হয়েছেন। গুরুতর দগ্ধ অঞ্জন কুমার দে ও রঞ্জিত শর্মাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক। কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে ৫ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আটক করা হয়েছে কামতা ইউনিয়নের জামায়াতে আমির রফিকুল ইসলামকে। বুধবার বিকেলে তাকে আটক করেছে পুলিশ।

কুমিল্লা জেলার পুলিশ সুপার শাহ মোঃ আবিদ হোসেন জনকণ্ঠকে বলেন, যে জায়গায় চোরাগোপ্তা, পেট্রোলবোমা হামলার ঘটনাটি ঘটেছে, সে জায়গাটি জামায়াত-শিবির অধ্যুষিত। বিএনপির ডাকা টানা তিন মাসের অবরোধ-আর খ- খ- হরতালেও একই জায়গায় তিনটি যাত্রীবাহী বাসে একই কায়দায় পেট্রোলবোমা হামলার ঘটনা ঘটেছিল। ওই তিন হামলার আসামিদের সবাই জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী। যুদ্ধাপরাধীদের দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামকে নিষিদ্ধের বিষয়ে জাতীয় সংসদে আলোচনা চলছে। এর প্রতিবাদে হামলার ঘটনাটি ঘটতে পারে। এছাড়া সামনে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদের রায় উপলক্ষে আগাম আতঙ্ক সৃষ্টি করতেও জামায়াত-শিবিরের পক্ষে এমন ঘটনা ঘটানো বিচিত্র নয়। পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, শীঘ্র এ এলাকায় যৌথ অভিযান শুরু হবে।

মঙ্গলবার রাত ১২টা। স্থান ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা চান্দিনা উপজেলার কাঠেরপুল এলাকা। ঢাকা-মেট্রো-ব-১৪-৭৬৪৮ নম্বরের ইউনিক পরিবহনের ঢাকা-চট্টগ্রামগামী নৈশকোচটি চান্দিনা উপজেলা গেট ও পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের সামনে কাঠেরপুল পার হওয়ার সময় আচমকা পেট্রোলবোমা হামলার শিকার হয়। হামলাকারীরা পর পর দুইটি বড় আকারের পেট্রোলবোমা ছুড়ে মারে। মুহূর্তেই চলন্ত গাড়িতে আগুন ধরে যায়। গাড়ি থেকে কেউ নামার সুযোগ পর্যন্ত পাননি।

ঘটনার সময় বাসযাত্রীরা পবিত্র শব-ই-বরাতের রাত উপলক্ষে বাসের ভেতরেই ইবাদত-বন্দেগী করছিলেন। আবার কেউ কেউ গভীর ঘুমে ছিলেন। পেট্রোলবোমায় আগুন ধরে গেলে ইবাদত-বন্দেগী বিষাদে রূপ নেয়। বাসযাত্রীদের শরীরে তাৎক্ষণিক আগুন ধরে যায়। যাত্রীদের চিৎকারে আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে আসে।

খবর পেয়ে আশপাশের লোকজন, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে হাজির হন। বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পাশেই গাছের সঙ্গে ধাক্কা খায়। চালকও দ্রুত গাড়ি থামাতে সক্ষম হন।

পরে ফায়ার সার্ভিস আহতদের উদ্ধার করে। প্রথমে তাদের কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আহত ময়মনসিংহের এনভয় টেক্সটাইলস্ মিলের টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার রাঙ্গামাটি জেলার সদর উপজেলার বনরূপা এলাকার বাসিন্দা সুনীল চন্দ্রনাথের পুত্র সুমন চন্দ্রনাথ (৪০) জানান, বাসটির চালকের পেছনের সিটে তিনি বসা ছিলেন। রাত বারোটার দিকে হঠাৎ বাসটিতে বিকট আওয়াজ শুনতে পাই। আমার হাতে-মুখেসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে তরল দাহ্য পদার্থ পড়ে আগুন ধরে যায়। এ সময় পাশের সিটের আরও কয়েক যাত্রীর শরীরেও আমি আগুনের লেলিহান শিখা দেখতে পাই। হামলাকারীরা বাসটির বাম পাশ দিয়ে পেট্রোলবোমা নিক্ষেপ করে।

দগ্ধ অন্যরা হচ্ছেন, রাঙ্গামাটি সদরের বন্ধনা এলাকার বুদ্ধ চাকমার পুত্র খোকন চাকমা (৪৫), গোপালগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার সাইদুর রহমানের পুত্র ইমরান (২৬), রাঙ্গামাটি সদর উপজেলার কালিন্দপুর এলাকার যোগেন্দ্র চন্দ্র দেবনাথের পুত্র ও বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের উপদেষ্টা অঞ্জন চন্দ্র দেবনাথ (৪৮), একই জেলার কালিগঞ্জ এলাকার হরিপদের পুত্র রঞ্জিত (৩৫), নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ সদর এলাকার আবু হোসেনের পুত্র জহিরুল ইসলাম (৩০), তার স্ত্রী লাভলী আক্তার (২১)।

আহতদের রাত একটার দিকে প্রথমে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালটির বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের প্রধান ডাঃ মির্জা তাইয়েবুর রহমান ও সহকারী রেজিস্ট্রার ডাঃ আবু শাদাত মোহাম্মদ সায়েম খান জানান, দগ্ধদের মধ্যে গুরুতর অঞ্জন চন্দ্র দেবনাথের বুক ও ২ হাতের ২৬ শতাংশ এবং রঞ্জিতের মুখ-বুক, ২ হাত ও পিঠের ৪৪ শতাংশ পুড়ে গেছে। তাদের বুধবার ভোরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে স্থানান্তর করা হয়েছে।

এছাড়া কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সুমন চন্দ্রনাথের ২ হাত ও মুখের ১৫ শতাংশ, খোকন চাকমার মুখ ও ডান হাতের ১৮ শতাংশ, ইমরানের মুখ ও দুই হাতের ১৫ শতাংশ এবং শরীরের ২ ও ৩ শতাংশ পুড়ে যাওয়া লাভলী ও জহিরুল ইসলাম প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে বাড়ি পাঠানো হয়েছে।

বাসটির চালক সিরাজুল ইসলাম জানান, ঢাকা থেকে ছেড়ে আসার পর চান্দিনা বাসস্টেশন অতিক্রম করে কাঠেরপুল এলাকায় আসার পর হঠাৎ গাড়িতে বিকট শব্দ হয় এবং আগুন জ্বলতে শুরু করে। আমি তাৎক্ষণিকভাবে গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ করি এবং আমার হেলপারদের সহযোগিতায় আগুন নেভাতে সক্ষম হই। তারপরও বাসটি খানিকটা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছের সঙ্গে সামান্য ধাক্কা খায়।

এ ঘটনায় বুধবার ভোরে কুমিল্লার জেলা প্রশাসক মোঃ হাসানুজ্জামান কল্লোল, পুলিশ সুপার শাহ মোঃ আবিদ হোসেন, হাইওয়ে পূর্বাঞ্চলের পুলিশ সুপার রেজাউল করিম, কুমিল্লার র‌্যাব-১১ এর কোম্পানি কমান্ডার খুরশিদ আলম, কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডাঃ হাবিব আবদুল্লাহ সোহেল, জেলার আদর্শ সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ হেলাল উদ্দিনসহ জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের কর্মকর্তারা কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ছুটে যান। তাঁরা আহতদের খোঁজখবর নেন। পরে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার, চান্দিনা উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুমন চৌধুরীসহ কর্মকর্তারা চান্দিনায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।

কুমিল্লার জেলা প্রশাসক মোঃ হাসানুজ্জামান কল্লোল জানান, দুর্বৃত্তরা বাসটিতে পর পর ২টি পেট্রোলবোমা নিক্ষেপ করেছে। ঘটনা তদন্তে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট গোলামুর রহমানকে প্রধান করে ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী ৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য বলা হয়েছে। এদিকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গুরুতর আহত অঞ্জন ও রঞ্জিতের চিকিৎসার জন্য ১৫ হাজার টাকা করে এবং আহত সুমন চন্দ্রনাথ, খোকন চাকমা ও ইমরানের চিকিৎসার জন্য ১০ হাজার টাকা করে দেয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষে আদর্শ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ হেলাল উদ্দিন আহতদের স্বজনদের হাতে বুধবার চিকিৎসার টাকা প্রদান করেন।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে কুমিল্লার পুলিশ সুপার শাহ মোঃ আবিদ হোসেন জানান, জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসীরা বাসটির বাম পার্শ্ব দিয়ে পর পর ২টি পেট্রোলবোমা নিক্ষেপ করে। পূর্বের আন্দোলনের ধারাবাহিকতা অনুযায়ী এ ঘটনাকে নাশকতা বলে ধারণা করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, এ ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করে গ্রেফতার করতে পুলিশ, র‌্যাবসহ আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার যৌথ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কেউ গ্রেফতার হয়নি।

প্রসঙ্গত, চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি নিরাপত্তাজনিত কারণে মহাসমাবেশ করার অনুমতি না পেয়ে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া দেশব্যাপী লাগাতার অবরোধের ডাক দেন। এমন কর্মসূচীর ডাক দিলেও নেতাকর্মীরা মাঠে ছিল না। কর্মসূচীর আড়ালে সারাদেশে একের পর এক চোরাগোপ্তা হামলা হতে থাকে। টানা অবরোধের মধ্যেই অজ্ঞাতস্থান থেকে সদ্য ভারতে হদিস মেলা সালাহউদ্দিন আহমেদের নামে অবরোধ-হরতাল কর্মসূচী সফল করার জন্য বিবৃতি আসছিল। চলমান অবরোধ-হরতালে শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে অধিকাংশজনেরই মৃত্যু হয়েছে পেট্রোলবোমায় দগ্ধ হয়ে। এছাড়া কয়েক হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে অন্তত পাঁচ শতাধিক মানুষকে চিরতরে পঙ্গুত্ববরণ করতে হয়েছে। ভাংচুর ও আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে অন্তত দুই হাজার যানবাহন। রাষ্ট্রের ক্ষতি হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকা। বিএনপির হাইকমান্ডের নির্দেশেই আত্মগোপনে থেকে কর্মকা- পরিচালনা করা হচ্ছে বলে দলটির একাধিক শীর্ষ নেতা বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমের কাছে দাবি করেছেন।

বিএনপি জামায়াতের, নিন্দা দোষীদের শাস্তি দাবি

স্টাফ রিপোর্টার ॥ পবিত্র শব-ই-বরাতের রাতে কুমিল্লার চান্দিনা এলাকায় বাসে পেট্রোলবোমা হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বিএনপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। বুধবার রাতে উভয় সংগঠনের পৃথক বিবৃতিতে এই নিন্দা জানানো হয়।

বিএনপির সহ-দফতর সম্পাদক আবদুল লতিফ জনির পাঠানো এক বিবৃতিতে এ নিন্দা জানান আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন। বিবৃতিতে ড. রিপন বলেন, বিএনপি এ ঘটনার উচ্চপর্যায়ের তদন্ত দাবি করছে এবং দোষীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছে।

অন্যদিকে জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান বিবৃতিতে নিন্দা জানিয়ে বলেন, এ নারকীয় নৃশংসতার নিন্দা জানানোর কোন ভাষা নেই। যারা এ হামলা চালিয়েছে তারা মানুষ নামের পশু। ‘নাশকতা লক্ষ্যে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা এ হামলা চালাতে পারে’ কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের এমন বক্তব্যে কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, তদন্ত করে দোষীদের শনাক্ত করার আগেই এ ধরনের বক্তব্য রেখে তিনি প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা করছেন।

প্রকাশিত : ৪ জুন ২০১৫

০৪/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: