মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

গ্রীষ্মের ফলাহার

প্রকাশিত : ১ জুন ২০১৫

ছোট বেলায় একটা জনপ্রিয় কবিতার লাইন আমরা সবাই পড়েছি, ‘পাকা জামের শাখায় উঠি রঙ্গিন করি মুখ’- পাকা ফলের রসে মুখ রঙ্গিন করার সময় এখন- গ্রীষ্মকাল। গ্রীষ্মকালই আমাদের দেশের একমাত্র সময়, যেসময় বিভিন্ন ফল সহজলভ্য হয়ে ওঠে হাতের কাছেই। এই গরমে নিজের তৃঞ্চা মেটাতেই পানীয়র সঙ্গে আজকাল অনেকেই বেছে নিচ্ছেন মৌসুমি ফলকে। মূলত পুষ্টির অন্যতম প্রধান উৎস হচ্ছে এই ফল। আমাদের শরীর সুস্থ রাখার জন্য ফল সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। চিকিৎসকদের মতে একজন মানুষের দিনে কমপক্ষে ১১৫ গ্রাম ফল খাওয়া উচিত। অনেক সময় বিভিন্ন ফলের শরবত ও শরীরের অনেক পুষ্টি মেটাতে সাহায্য করে। শরীরের ভিটামিন, মিনারেল, কার্বোহাইড্রেট, ক্যালসিয়াম, আয়রন ইত্যাদির চাহিদা মেটাতে ফল বিশেষ ভূমিকা রাখে। বাজারে রসালো ফলের সমাহার। সামনে আসছে আরও ফলের মেলা। এ সময়ের ফলগুলো যে শুধু মুখরচক ও সুস্বাদু তাই নয় বরং এর উপকারিতাও কম নয়। আমাদের দেশের জনপ্রিয় ফলগুলোর মধ্যে আম, কাঁঠাল, লিচু, তরমুজ, পেঁপে, আমলকি, জাম্বুরা, মালটা, আনারস, কামরাঙ্গা, ফুটি, স্ট্রবেরি অন্যতম।

আম : গ্রীষ্মকালের গরম সবাই যতই অপছন্দ করুক না কেন, এই মৌসুমের ফলমূলকে অপছন্দ করার ক্ষমতা কারও নেই। গ্রীষ্মে সকলের সব চাইতে প্রিয় এবং সহজলভ্য ফল হচ্ছে আম। এখনই বাজারে উঠা শুরু“করেছে কাঁচা আম। আমাদের অতি প্রিয় এই ফল আম, কাঁচা বা পাকা যেভাবেই খাওয়া হোক না কেন তা আমাদের দেহের জন্য খুবই উপকারী। এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে পাকা আমের তুলনায় কাঁচা আমের গুণ আরও অনেক বেশি। ফলের এই মৌসুমে ফলের রাজা হিসেবে আম বেশ পরিচিত। ফজলি, লেংরা, গোপালভোগ, মোহনভোগ, হিমসাগর, বিভিন্ন প্রজাতির আম পাওয়া যায়। সুস্বাদু এই ফলটিতে আছে পটাশিয়াম, ভিটামিন এ, সি, সেই সঙ্গে এর এন্টিঅক্সিডেন্ট যেমনÑ ভিটা ক্যারোটিন ক্যান্সার ও হৃদরোগ থেকে রক্ষা করে, ব্লাড প্রেসার স্বাভাবিক রাখে এবং সেই সঙ্গে ত্বকের উজ্জ্বলতাও বৃদ্ধি করে। কাঁচা আমে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ক্যারোটিন ও ভিটামিন এ যা আমাদের চোখের স্বাস্থ্য রক্ষায় কাজ করে। প্রতিদিন সামান্য পরিমাণে কাঁচা আম আমাদের চোখের নানা সমস্যা এবং ভিটামিন এ-এর অভাবজনিত সমস্যা থেকে রক্ষা করে। অনেকের খাওয়ার সময়ের হেরফের হলে, ভাজাপোড়া জাতীয় কিছু খেলে পরে এ্যাসিডিটির সমস্যা দেখা দেয়। কাঁচা আম এই সমস্যা থেকে মুক্তি দেয়। এ্যাসিডিটি শুরু হলে খানিকটা কাঁচা আম খেলে এ্যাসিডিটির সমস্যা থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব।

লিচু : আমের পরের স্থানটি দখল করে আছে লিচু। লিচুতে প্রধানত থাকে কার্বোহাইড্রেট (চিনি), প্রোটিন, ফ্যাট, ভিটামিন বি ও সি, পটাশিয়াম, এবং আয়রন।

স্ট্রবেরি : স্ট্রবেরি দূর দেশের এক ফল। মোহনীয় রূপ, রস ও স্বাদের জন্য স্ট্রবেরির চাহিদা তুঙ্গে। আর এখন তো এ দেশেই চাষ হয় ফলটির। দামও চলে এসেছে হাতের নাগালে। স্ট্রবেরি শুধু রূপে অনন্য নয়, তার মিষ্টি গন্ধও জগতজোড়া। এই ফলটি সম্পর্কে ঢাকার বারডেম জেনারেল হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ পুষ্টিবিদ শামছুন্নাহার নাহিদ বলেন, ‘হাইপোথাইরয়েডিজমে আক্রান্ত রোগীদের ফলটি খাওয়ায় খানিকটা বিধিনিষেধ আছে। এ ছাড়া ছেলে-বুড়ো সবার জন্যই ফলটি খুব উপকারী। একদিকে রোগ প্রতিরোধ করে অন্যদিকে নিরাময়েও কাজ করে।’ ত্বকের সুরক্ষায় স্ট্রবেরির জুড়ি নেই। ত্বকের আর্দ্রতা যেমন রক্ষা করে সেইসঙ্গে সৌন্দর্য বর্ধনেও অংশ নেয়। এ ছাড়া নিয়মিত খেলে ত্বকে সহজে বার্ধক্যের ছাপ পড়ে না। স্ট্রবেরিতে থাকা ফ্ল্যাভনয়েড ও এ্যান্টি-অক্সিডেন্ট শরীরে খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রাকে সহনীয় পর্যায় রাখে। তাই হৃৎস্বাস্থ্যও ভাল থাকে। এছাড়া স্ট্রবেরি রক্তনালিতে রক্তের প্রবাহকে সচল রাখে এবং অনাবশ্যক রক্ত জমাট বাঁধতে বাধা দেয় না। স্ট্রবেরি ওজন কমাতে সহায়ক। এতে ক্যালরির পরিমাণ থাকে খুবই কম। খেলে পেট ভরে থাকে কিন্তু শরীরে চর্বি জমে না। এই ফলে আছে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন সি। তাই রোগ-প্রতিরোধ করার অসাধারণ এক প্রাকৃতিক ক্ষমতা আছে স্ট্রবেরিতে। এ ছাড়া বিভিন্ন রকম সংক্রমণ থেকেও শরীরকে রক্ষা করতে পারে।

আনারস : প্রচণ্ড গরমে স্বস্তি দেয় আরেকটি ফলÑ আনারস। এই ফলে আছে ভিটামিন বি, সি১ ও ফাইবার। হজমশক্তি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শরীরের এনার্জি বৃদ্ধিতেও সাহায্য করে এই ফল। তরকারি হিসেবেও এই সোনালি রঙ্গা ফলের কদর নেহায়েতই কম নয়।

কাঁঠাল : বাংলাদেশের জাতীয় ফল কাঁঠাল। কাঁঠালের অনন্য আকার, আকৃতি ও সুস্বাদু গন্ধের জন্য অনেক সুপরিচিত। কাঁঠাল একটি স্বীকৃত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ফল। এটি একটি সুস্বাদু মিষ্টি ফল। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অন্যান্য ফলের মতো এর মাঝেও অনেক ফাইবার, খনিজ পদার্থ ও ভিটামিন রয়েছে। এছাড়াও গরমে স্বাস্থ্যের বিভিন্ন উপকারে এর অবদান রয়েছে। কাঁঠালের বৈজ্ঞানিক নাম হল ‘আরটোকারপাস হিটেরোফিলাস।’ উদ্ভিদবিদ্যা অনুযায়ী এই জনপ্রিয় এশিয়ান গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ফলটি ‘মরাসিয়া’ পরিবারের এবং ‘আরটোকারপাস’ মহাজাতির অন্তর্ভুক্ত। ডুমুর ও তুঁত একই প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত। সুস্বাদু, মিষ্টি, রসালো আমাদের জাতীয় এই ফলে আছে ভিটামিন এ, সি। কাঁঠালের বিচিতে রয়েছে ভিটামিন বি১ ও বি২। আয়রন ও ক্যালশিয়াম পরিমাণে একটু কম থাকলেও প্রচুর স্টার্চ সমৃদ্ধ এই ফলটি তরকারি হিসেবেই যথেষ্ট সমাদৃত বাঙালী সমাজে। ১০০ গ্রাম কাঁঠালের মধ্যে রয়েছে ৯৫ ক্যালরি। কাঁঠালে ফ্রুক্টোজ ও সুক্রোজের ন্যায় চিনি রয়েছে। যা কাঁঠালকে তাড়াতাড়ি হজম করার শক্তি প্রদান করে। এতে খুব সহজেই কাঁঠাল হজম হয়ে যায়।

তরমুজ : রসালো এই ফলটি প্রচণ্ড গরমে দেয় স্বস্তি। কাল, সবুজ বিভিন্ন রঙ্গের এই ফলটির ৯২% ই পানি। শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী এই ফলে কন ফ্যাট বা কোলেস্টেরল নেই বরং এতি ভিটামিন এ, বি ও সি এর এক চমৎকার উৎস। গ্রীষ্মের তীব্র গরমে তরমুজ এই সময়ের জন্য উপযুক্ত ফল। তাই ডায়রিয়ার পরে, বমি করার পরে বা যাঁরা অতিরিক্ত রোদে থাকেন, তাঁদের জন্য তরমুজ জরুরী উপকরণ। এতে নিম্ন মাত্রার ক্যালরি, অতি উচ্চমাত্রার পটাশিয়াম রয়েছে, যা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। প্রচুর পরিমাণে রসাল ফল হওয়ায় কিডনির জন্য বয়ে আনে সুফল। তরমুজ রক্তে ইউরিক এসিডের পরিমাণ কমিয়ে দেয়। ফলে কিডনিতে পাথর, ইনফেকশনসহ যাবতীয় অসুখগুলো তুলনামূলক কম হয়। আর কিডনি ভালভাবে কাজ করার জন্য দেহের বর্জ্যগুলো সঠিকভাবে বের হয়ে যায়। আর উপকারী ভিটামিন ‘সি’র বসতি এই ফলে। ভিটামিন ‘সি’ প্রতিরোধ করে এ্যাজমা বা হাঁপানি, ঋতুজনিত সর্দি, টনসিল, গরম-ঠা-ার জ্বর, নাক দিয়ে পানি পড়া অর্থাৎ শরীরের প্রতিটি জয়েন্টে ব্যথা। গরমজনিত ঘা, ফোঁড়া দূর করে তরমুজ। অনেকের ধারণা, তরমুজ মিষ্টি, তাই ডায়াবেটিসের রোগীরা খেতে পারবেন না। কিন্তু ধারণাটি পুরোপুরি সত্য নয়। তরমুজের পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম রক্তেরইনসুলিনকে সুষ্ঠুভাবে কাজ করার শক্তি জোগায়। তাই ডায়াবেটিসের রোগীরাও এই ফল খেতে পারবেন। তবে পরিমিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। রসাল ফল হওয়ার জন্য তরমুজ ত্বককে করে উজ্জ্বল, মসৃণ। ত্বকে সঠিকভাবে রক্ত চলাচল বাড়িয়ে ত্বককে করে শক্তিশালী।

পেঁপে : পেঁপে এমন একটি সহজলভ্য ফল যেটাকে কাঁচা বা রান্না করে উভয়ভাবেই খাওয়া যায়। গরমে এর উপকারিতাটাও একটু বেশি। মজার বিষয় হচ্ছে কাঁচা বা রান্না করে যেভাবেই খাওয়া হোক না কেন এর পুষ্টিগুণ থাকে একই। মিষ্টি এই ফলটি ফাইবার সমৃদ্ধ হলেও এতে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল নেই। উপরন্তু আয়রন, পটাশিয়াম, ভিটামিন এ, সি এবিং প্রচুর এনজাইম আছে এতে। প্রচলিত আছে এনজাইমই অতিরিক্ত ওজন কমাতে দ্রুত সাহায্য করে। হজমশক্তি ও হৃদরোগের জন্যও ভীষণ উপকারী এই ফলটি।

ফলের এই সমাহারে পরিমিত ও পর্যাপ্ত ফলাহার আপনার রসনা মেটাক, সেইসঙ্গে আপনাকে রাখুক সুস্থ। তবে কারও কারও চিকিৎসকের বারণ থাকতে পারে কোন কোন ফলের ক্ষেত্রে, সেইক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চলাই বাঞ্ছনীয়।

মাহমুদা সিদ্দিকা সুমি

ছবি : অপূর্ব

মডেল : ডেভিড

প্রকাশিত : ১ জুন ২০১৫

০১/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: