কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

শৃঙ্খলিত শৈশব

প্রকাশিত : ১ জুন ২০১৫
  • মো: আবু হাসান তালুকদার

মা নাছোড়বান্দা। ডাকাডাকি করছে তো করছেই। অগত্যা মাহিরকে বিছানা ছেড়ে উঠতেই হলো। কিন্তু কিছুতেই ঘুম যাচ্ছে না। মা ওকে টানতে টানতে ওয়াশরুমে নিয়ে গেল। তাড়াতাড়ি ওয়াশরুমের কাজ সেরে হালকা কিছু মুখে দিয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যে স্কুলে যাওয়ার জন্য তাকে প্রস্তুত হতে হলো। তারপর একগাদা বই পিঠে চাপিয়ে মায়ের সঙ্গে স্কুলের পথে রওনা হলো। সে এবার পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ে। এবার তাকে বোর্ড পরীক্ষা মানে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা দিতে হবে। তাই এ বছর নাকি তাকে পড়াশোনায় খুব সিরিয়াস হতে হবে। এত তাড়াতাড়ি করল, তারপরও স্কুলে পৌঁছতে দেরি হয়ে গেল। এ্যাসেম্বলি ক্লাস শুরু হয়ে গেছে। তাকে এ্যাসেম্বলিতে অংশগ্রহণ করতে দিল না। একপাশে দাঁড় করিয়ে রাখা হলো। দেরিতে আসার জন্য এটা তার শাস্তি। বন্ধুদের সামনে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে তার খুব লজ্জা করতে লাগল।

আধা ঘণ্টার টিফিন বিরতি বাদে একটানা আটটি ক্লাস করার পর ক্লান্ত অবসন্ন দেহে দুপুরে মাহির বাসায় ফিরল। বেশিক্ষণ আরাম করা যাবে না। তাড়াতাড়ি গোসল সেরে খাওয়া-দাওয়া করতে হবে। কারণ যোহরের নামাজের পর হুজুর আরবী পড়াতে আসবে। হুজুর যাওয়ার পর প্রায় দুই ঘণ্টা সে স্বাধীন। এ সময়টাই মাহিরের সবচেয়ে আনন্দের সময়। মাও এ সময়টা ঘুমিয়ে পড়ে। সে ইচ্ছামতো টিভিতে কার্টুন দেখতে পারে। কম্পিউটারে গেম খেলতে পারে। বিকেলে আবার কোচিংয়ে যেতে হবে। কোচিং শেষ করে বাসায় ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা সাতটা সাড়ে সাতটা বেজে যায়। একগাদা বইয়ের চাপ, পড়াশোনার চাপ, সময় মেইনটেইন করার চাপ, বাবা-মার প্রত্যাশার চাপ। তার চারদিকে শুধু চাপ আর চাপ। একজন পূর্ণবয়স্ক কর্মজীবী মানুষের চেয়েও সে বেশি ব্যস্ত। শিশুসুলভ নিজস্ব চাওয়া-পাওয়া বা চিন্তা-ভাবনা করার সুযোগ নেই তার। তার প্রতিটি দিন অতিবাহিত হয় রুটিনের চক্রে। এ তো গেল স্কুল পড়ুয়া শিশুর কথা। চারপাশে ভালভাবে তাকিয়ে দেখুন। কত শিশু-কিশোর প্রতিদিন কিভাবে দিন অতিবাহিত করছে। কেউ কল-কারখানায়, কেউ গার্মেন্টসে, কেউ লেদ মেশিন-গ্রিল কারখানা, ঝি-চাকর, কেউবা দিনমজুর। তাদের শৈশব এখনও কাটেনি অথচ তারা একেকজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ। কখন-কিভাবে হারিয়ে যাচ্ছে তাদের দিনের প্রথম প্রহরের হাসিমাখা সকাল, সোনালি বিকেল, রোদেলা নিঃশব্দ দুপুর, তা তারা টেরই পাচ্ছে না। তাদের শৈশব তো শৃঙ্খলিত, কারারুদ্ধ।

আকাশ আমায় শিক্ষা দিল, উদার হতে ভাইরে। কর্মী হওয়ার মন্ত্র আমি বাযুর কাছে পাইরে..., চাঁদ আমায় শেখায়..., এই কবিতাটি হয়ত বড়দের অনেকেরই মনে আছে। আমরা সুকৌশলে এই কবিতাটি লুকিয়ে রেখেছি। কারণ আমরা আমাদের শিশুদের ওই কবিতার পরিবেশ দিতে ব্যর্থ হচ্ছি। শিশুরা শুধু পাঠ্যবই নয়, প্রকৃত শিক্ষা তো পায় পরিবেশ থেকেই। আকাশ থেকে উদারতার শিক্ষা কিভাবে নেবে, আজকের শিশুদের বিশেষ করে ঢাকা শহরের শিশুদের আকাশ তো মাত্র কয়েক বর্গমিটার বা বড়জোড় কয়েক বর্গকিলোমিটার। তার তো আকাশই দেখা হয় না। বাযুর কাছ থেকে মন্ত্র শোনার সময় কোথায় তার? সে তো ব্যস্ত। চাঁদের হাসিমাখা মুখ দেখে হাসতে শিখবে সে সময় কোথায়? সে তো তখন ক্লান্ত। একটি গাছের চারার উপর ইটচাপা বা ঢাকনা দিলে তা কিছুদিনের মধ্যে সাদা লিকলিকে দুর্বল হয়ে পড়ে। পাশাপাশি খোলামেলা পরিবেশে বড় হওয়া গাছ কেমন সবুজ সতেজ হয়ে ওঠে। আমরা তো আমাদের শিশুদের বিভিন্ন অদৃশ্য চাপে চাপা দিয়ে রেখেছি। তারা সবুজ সতেজ হবে কিভাবে?

শহরের স্কুলে নেই খেলার মাঠ। থাকলেও নামমাত্র। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একটা বিল্ডিংই হচ্ছে তার শিক্ষাঙ্গন। অথচ চিরায়ত দৃশ্য হচ্ছে স্কুলের সামনেই বিশাল খেলার মাঠ। খেলার মাঠে বিভিন্ন পরিবার থেকে, ভিন্ন পরিবেশ থেকে আসা শিশু-কিশোরদের সম্মিলন ঘটে। এতে পরস্পরের পারিবারিক সংস্কৃতি চেনাজানা হয়। বন্ধন হয় বন্ধুত্বের। পরস্পরকে জানার বা বোঝার ফলে তারা পারস্পারিক সহযোগিতা, সমঝোতা, সহমর্মিতা শেখে। অন্যের সঙ্গে মিলেমিশে বড় হওয়ার কারণে অন্যের দুঃখ বোঝে। অন্যের দুঃখ লাঘবে এগিয়ে আসার মানসিকতার জন্ম হয়। ত্যাগের শিক্ষা শেখে। প্রাপ্তিতে শুধু নয়, ত্যাগেও যে সুখ আছে তা জানতে শেখে। আসলে একজন শিশুর শিক্ষাস্থান শুধু বিদ্যালয় বা পরিবার নয়, পরিবেশও তার শিক্ষার উপযুক্ত স্থান। পরিবেশ থেকে পাওয়া শিক্ষাই একজন মানুষকে প্রকৃত শিক্ষিত করে তোলে। কিন্তু বর্তমানে শিশুর জন্য সে পরিবেশ কোথায়? খেলার মাঠ যদিও বা কারও ভাগ্যে জোটে, তার খেলার সময় কোথায়? নিরাপত্তা কোথায়?

বর্তমানে একটি শিশু একটু বুদ্ধি হওয়ার পরই দেখে চারদিকে শুধু প্রতিযোগিতা আর প্রতিযোগিতা। মাত্র পাঁচ-ছয় বছর বয়সেই স্কুলে ভর্তিযুদ্ধ নামক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে তার মতোই কোমলমতি অন্য শিশুকে পরাজিত করে যুদ্ধ জয়ের নিষ্ঠুর আনন্দের স্বাদ নিতে হয়। আর পরাজিত শিশু পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে জীবনের শুরুতেই হোঁচট খায়। দেখে দুনিয়াটা কত নিমর্ম। আবার স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর তার বয়সের চেয়েও দ্বিগুণ বইয়ের ভারে সে পিষ্ট হতে থাকে। কয়েক বছর যেতে না যেতেই শুরু হয় প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা নামের মহাযুদ্ধ। এ মহাযুদ্ধ তো প্রতিটি শিশুর জন্য একটা আতঙ্ক।

একটি শিশুর বিকাশের জন্য, মানুষ হওয়ার জন্য কি এত বইয়ের প্রয়োজন? প্রয়োজন থাকলেই কি এত চাপ নেয়ার ক্ষমতা তার হয়েছে? এত অল্প বয়সেই কি এত বিশাল প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের মানসিকতা রয়েছে? চতুর্মুখী চাপে বা বড়দের প্রত্যাশার চাপে তার মনোজগত কি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না? তারা কি হারিয়ে ফেলছে না তাদের শিশুসুলভ স্বকীয়তা? বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা কি বাস্তবমুখী? আশা করি, এসব প্রশ্নের উত্তর বা সমাধান দেবেন মনোবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

শিশুরা নিজেরাই একেকটা সুন্দর প্রকৃতি। সময় পেলেই তাদের প্রকৃতির কাছে বেড়াতে নিয়ে যান। খেলাধুলা করার ব্যবস্থা করুন। তাদের সময় ও সঙ্গ দিন। প্রত্যাশার চাপ না দিয়ে স্বপ্নের বীজ বপন করুন। মুক্তভাবে বিকশিত হওয়ার সুযোগ করে দিন। তাহলেই দেখবেন সতেজ, সবল এবং প্রকৃত শিক্ষিত একজন মানুষের জন্ম হয়েছে।

ছবি: অয়ন

মডেল: অহনা ও অগ্নিলা

প্রকাশিত : ১ জুন ২০১৫

০১/০৬/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: