মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

দই এখন টক মিষ্টির বাঁধা গ-িতে নেই ॥ রয়েছে নানা স্বাদে নানা বর্ণে

প্রকাশিত : ৩০ মে ২০১৫

রসনা বিলাসীদের কাছে অন্যতম উপাদেয় খাবার হচ্ছে দই। নানা কিছু খাবারের পর দই না খেলে যেন তৃপ্তি আসে না। আর তাই যুগ যুগ ধরে রয়েছে দইয়ের কদর। যতদূর জানা যায়, আঠারো শ’ শতকের শেষ দিকে ময়মনসিংহে প্রথম গোয়ালাদের দোকানে দইয়ের প্রচলন শুরু হয়েছিল। দোকান মালিক ও কারিগররাই দই তৈরি ও বেচাবিক্রি করতেন। তবে এই বেচাবিক্রি ছিল একেবারেই সীমিত পর্যায়ে। উনিশ শতকের গোড়ার দিকে ব্রিটিশ আমলে স্থানীয় জমিদারদের চাহিদার ওপর ভর করে ময়মনসিংহ শহরে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে দইয়ের প্রচলন করে লক্ষ্মী নারায়ণ মিষ্টান্ন ভা-ার। এ জন্য প্রয়োজনীয় দুধ আনা হয়েছে ত্রিশাল থেকে।

ময়মনসিংহের প্রসিদ্ধ মিষ্টি ও দই ব্যবসায়ী সুধীর চন্দ্র ঘোষ জানান, শহরের বর্তমান অলকা নদী বাংলা ও সাবেক অলকা সিনেমা হলের পাশেই ছিল ঐতিহ্যবাহী লক্ষ্মী নারায়ণ মিষ্টান্ন ভা-ার। ময়মনসিংহ শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরের ত্রিশাল উপজেলার কালীরবাজার সংলগ্ন নারায়ণপুর গ্রাম থেকে আনা গাভীর খাঁটি দুধ দিয়ে তৈরি করা হতো হালকা মিষ্টির সুস্বাদু এই দই। মূলত মিষ্টির পাশাপাশি টক দই, হালকা মিষ্টি দই ও মাঠা বিক্রি হতো লক্ষ্মী নারায়ণ মিষ্টান্ন ভা-ারে। ময়মনসিংহ শহর, মুক্তাগাছা, গৌরীপুর, রামগোপালপুর ও ঈশ্বরগঞ্জের আঠারবাড়ির জমিদারসহ স্থানীয় রাজপরিবারে এই দইয়ের চাহিদা ছিল ব্যাপক। বিশেষ করে পূজা পার্বণ ও বিয়েশাদির অনুষ্ঠানাদিতে দইয়ের অর্ডার পেত লক্ষ্মী নারায়ণ মিষ্টান্ন ভা-ার। কখনও নিজ দোকানে আবার কখনও রাজবাড়ীতে কারিগর নিয়ে গিয়ে তৈরি করে দেয়া হতো চাহিদার দই। এর বাইরে দোকান থেকে শৌখিন ও অভিজাত পরিবারসহ উচ্চবিত্তরা দই কিনে নিতেন লক্ষ্মী নারায়ণ মিষ্টান্ন ভা-ার থেকে। পরবর্তীতে অবশ্য মিষ্টির সঙ্গে এই দইয়ের ব্যবসা ছড়িয়ে পড়ে সবখানে। ব্যবসা গুটিয়ে লক্ষ্মী নারায়ণ মিষ্টান্ন ভা-ারের মালিক ভারতের কলকাতায় চলে যাওয়ার পর ১৯২০ সালের দিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে শহরের রাজু ঘোষ, সুধীর ঘোষ, জানকি নাগ, কৃষ্ণা কেবিন, শ্রী কৃষ্ণ মিষ্টান্ন ভা-ারসহ বেশকিছু প্রসিদ্ধ মিষ্টান্ন ও দইয়ের দোকান গড়ে ওঠে। আর বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অনেকেই টক, মিষ্টিসহ নানা রকমের দই তৈরি করছে। স্থানীয় বাজারে এর চাহিদাও রয়েছে ব্যাপক। তবে স্বাদ আর মানে নেই আগের মতোÑ এমন অভিযোগ ভোজন রসিকদের। প্রসিদ্ধ দোকানের কারিগররাও অকপটে একথা স্বীকার করে জানান, খাঁটি দুধের সঙ্কটের কারণেই এমনটি হচ্ছে। বাবা স্বগীঁয় সাধু চরণ ঘোষ ও জ্যাঠা অশ্বিনী কুমার ঘোষের ব্যবসার সূত্র ধরে ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ আসেন সুধীর চন্দ্র ঘোষ মাত্র ছয়/সাত বছর বয়সে ১৯২০ সালের দিকে। পড়ালেখার পাঠ চুকিয়ে পারিবারিক দই মিষ্টির ব্যবসায় বসেন সুধীর ঘোষ ১৯৫৯ সালের দিকে। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগেই দই মিষ্টি ব্যবসার জগতে নামফাটান শহরের স্বদেশী বাজার এলাকার সুধীর ঘোষ। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বড় প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক ভোজে সুধীর ঘোষের দই সরবরাহ দিয়ে ন্যায্য মূলের সঙ্গে মিলত বাড়তি বখশিশ। দোকানে পদ্মপাতায় দই খেতে হতো ক্রেতাদের। আর সরবরাহের জন্য ছিল বাঁশ বেত দিয়ে তৈরি এক ধরনের চৌকোণাকৃতির ছোট্ট খাঁচা।

সুধীর ঘোষ জানান, ওই সময়ের দই ছিল পাতলা ও কম মিষ্টির। আর এখন টক, মিষ্টি ছাড়াও একসঙ্গে টক-মিষ্টিসহ হরেক রকমের দই তৈরি হচ্ছে। মাটির হাঁড়ি পাতিলের জায়গায় এখন দই করা হচ্ছে প্লাস্টিকের বাক্সে। দইকে আকর্ষণীয় ও ঘন জমাট করতে দেয়া হচ্ছে গরম জলের স্যাঁকা-জানান কারিগররা। দইয়ের মূল উপাদান দুধ নিয়ে কারিগরদের মধ্যে রয়েছে নানা মত। আগে চার লিটার দুধ থেকে এক লিটার ছানা ছাড়াও মাখন পাওয়া যেত। আর এখন পাঁচ লিটার দুধ থেকে মিলছে এক লিটার ছানা। এজন্য গাভীর পরিচর্যাকে দায়ী করা হচ্ছে।

কাঁচা সবুজ ঘাষের সঙ্গে কালাই খাওয়ানো হতো দুধের গাভীকে। আর এখন খড়ের সঙ্গে গাভীকে খাওয়ানো হচ্ছে ভুসিসহ নানা ভিটামিনজাতীয় খাবার। ফলে বাড়তি দুধ মিললেও এই দুধের ঘনত্ব কম থাকায় দই মিষ্টিতে ব্যবহারে চাহিদার ছানা মিলছে না। স্বাদে ও মানেও হেরফের হচ্ছে বলে দাবি কারিগরদের। ত্রিশালের সেনবাড়ি এলাকার গোয়ালা মোতালেব জানান, একসময় ময়মনসিংহে চাহিদার সিংহভাগ দুধের যোগান আসত ত্রিশাল থেকে। এখন এর পরিমাণ সিকিভাগে নেমে এসেছে। তারপরও দেশ স্বাধীনের পর ময়মনসিংহ শহর, শহরতলী এর আশপাশে বেশ কিছু দইয়ের দোকান গড়ে উঠেছে।

শহরের নামকরা দইয়ের কারিগর গোপাল চন্দ্র জানান, একসময় টাঙ্গাইল, পাবনা, সিরাজগঞ্জসহ বগুড়া থেকে দই আনা হলেও এখন ওইসব দইয়ের আদল বদলে এসব দোকান ভিন্ন স্বাদ ও মানের দই তৈরি করা হচ্ছে। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদা দই ইতোমধ্যে পরিচিতি পেয়েছে। ব্যবসা টিকিয়ে রাখার প্রতিযোগিতায় পুরনো প্রসিদ্ধ অনেক দোকান যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তৈরি করছে চাহিদার দই।

Ñবাবুল হোসেন

ময়মনসিংহ থেকে

প্রকাশিত : ৩০ মে ২০১৫

৩০/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: