রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

কলতাবাজারের পটল

প্রকাশিত : ৩০ মে ২০১৫
  • মাহবুব রেজা

কারও নাম এ রকম হয়!

যে শোনে সে-ই বলে, কীরে তোর নামটা তো বড় খিটমিটে আর অদ্ভুতুড়ে রে-

একদিন স্কুলের টিফিন পিরিয়ডের সময় অংকের টিচার আমাকে টিচার রুমে ডেকে নিয়ে বেশ গম্ভীর গলায় বললেন, শোন পটল, আমি বলি কী তুই তোর বাবাকে বলে তোর নামটা চেঞ্জ করে ফেল। দেখিস না তোকে নিয়ে সবাই কেমন ঠাট্টা-রসিকতা করে।

ঘটনাটা আসলেই সত্যি। পটলকে নিয়ে মানে ওর পিতৃ-প্রদত্ত নামকে নিয়ে স্কুলে, মহল্লায় এ রকম ঠাট্টা-মশকরা চলছে। বেশ ভাল রকমেরই চলছে। স্কুলের বন্ধুরা তো বটেই এলাকার বন্ধুরাও পটলকে নিয়ে দুষ্টুমি করে। হাসাহাসি করে। হাসতে হাসতে এ ওর গায়ে, ও এর গায়ে হেলে পড়ে। পটল নামটা যেন ওদের কাছে হাসির উৎস। আনন্দের খোরাক। পটল মানেই, আহা কী আনন্দ আকাশে বাতাসে-

পটল অংকের টিচারকে বলল, স্যার নিজের নাম বদলানোর বিষয়টা আমি বাবাকে বলতে পারব না-

কেন বলতে পারবি না? অংকের টিচার চোখ বড় বড় করে বলে পটলের দিকে তাকায়।

আমার বাবা খুব রাগী-

শোন সব বাবারা তোর বাপের মতো ও রকম রাগী-ই হয়।

স্যার আপনি জানেন না, আমার বাবা হলো পৃথিবীর সেরাদের সেরা রাগী বাবা। বাবাকে বলব নাম বদলানোর কথা? ও এমজি-

ও এমজি মানে কী! অংকের টিচার বেশ কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইলেন পটলের কাছে।

ও মাই গড-

পটলের কথায় অংকের টিচার হেসে উঠলেন। টিচার রুমের অন্যরা অংক টিচারের দিকে এমনভাবে তাকালেন যে মনে হলো এইমাত্র তিনি বেশ অদ্ভুত এক কা- ঘটিয়েছেন।

টিচার রুম থেকে বেরিয়ে পটল ক্লাসে এসে চুপ করে বসে থাকল। পটল বাকি ক্লাসগুলো শেষ করে বিকেলবেলা সোজা ঘরে ফিরে এলো। খেলার জন্য ধূপখোলা মাঠেও গেল না। মন খারাপ থাকলে কী কারও খেলতে ভাল লাগে! হাসতে ভাল লাগে! মোটেও না। পটল ঘরে ফিরে মুখ কালো করে পড়ার ঘরে বসে রইল। মা ঘরে এসে পটলকে অমন করে বসে থাকতে দেখে বললেন, কীরে পটল, তুই এই অবেলায় ঘরে বসে কী করিস-

ছিপ দিয়ে মাছ ধরি- পটল রেগে বলল।

ছিপ দিয়ে মাছ ধরি! চোখ বড় বড় করে মা তাকালেন, দেখো দেখো ছেলে আমার কী কথা বলে!

আজ বাবা আসুক, বাবাকে বলব কি ফালতু একটা নাম রেখেছে আমার।

ও এই কথা বলে মা হেসে গড়িয়ে পড়েন।

সন্ধ্যার পর বাবা ঘরে ফিরলেন।

রাতে ভাত খাওয়ার সময় বাবা পড়ার ঘরে এসে রানু আর পটলকে বলল, খেতে আয়।

রানু পড়া ছেড়ে ভেতরের ঘরে চলে গেল। যাওয়ার আগে রানু বাবাকে বলল, বাবা কী নিয়ে যেন খুব মন খারাপ পটলার। হি উড লাইক টু টক উইথ য়ুÑবলে রানু পটলের দিকে তাকিয়ে হিহি করে হেসে উঠল।

বাবা পটলের পাশে বসল, কীরে তোর মন খুব খারাপ! কী হয়েছে? পটল মিন মিন করে বাবাকে বলল, আমার নাম নিয়ে সবাই হাসাহাসি করেÑ আমাকে রাগায়। বাবা পটলকে বললেন, তোকে নিয়ে তোর বন্ধু-বান্ধবরা কী বলেÑ

বন্ধু-বান্ধবরা আমাকে দেখলেই বলা শুরু করে, কীরে পটলা তোর কেজি কত? পটল স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। তাই আসুন আমরা ভাতের ওপর চাপ কমাই পটলের ওপর চাপ বাড়াইÑ

পটলের কথা শুনে বাবার মুখে হাসির রেখা ফুটে উঠল, কিন্তু বাবা হাসলেন না, বরং আগের চেয়ে বেশি গম্ভীর হয়ে গেলেন, শোন, পটল, তোকে আজ আমি কিছু কথা বলব। কথাগুলো সবসময় মনে রাখবি।

বলোÑ

মানুষের নাম কখনও আজব হয় না, হাসির হয় না।

তাহলে আমার নাম নিয়ে বন্ধুরা যে হাসাহাসি করে?

ওরা কী তোর মুখ দিয়ে হাসে, না ওদের মুখ দিয়ে হাসে?

কেন ওদের মুখ দিয়েÑ

তাহলে তুই এটাকে সিরিয়াসলি নিচ্ছিস কেন? ফরগেট ইটÑ

বাবার কথায় পটল চুপ করে রইল। বাবা বলে যাচ্ছেন, তুই আমাকে বল, পৃথিবীতে নাম দিয়ে কী কেউ কখনও বিখ্যাত হয়েছে? শোন, বিখ্যাত হতে হয় কাজ দিয়ে, মেধা দিয়ে, যোগ্যতা দিয়েÑ

পটল চুপ করে থাকে। কোন কথা বলে না।

কীরে চুপ করে আছিস কেন? আমার কথার জবাব দেÑ

পটল মাথা ঝাঁকিয়ে বাবার কথাকে সমর্থন জানাল।

এখন ধর আজ থেকে আমি তোর নাম বদলে রাখলাম নিউটন কিংবা কাজী নজরুল ইসলাম আর অমনি কী তুই রাতারাতি ওদের মতো বিখ্যাত হয়ে যাবি?

পটল মাথা নেড়ে বলল, তা-ই কী কখনও হয়!

বাবা একটু হেসে বললেন, এখন তুই যদি নিজের যোগ্যতা দিয়ে ভাল কিছু করে দেখাতে পারিস, তাহলে তোর এই বন্ধু-বান্ধবরাই গর্বে বুক ফুলিয়ে গলা উঁচু করে দশজনকে বলবে, দেখেন, দেখেন, আমাদের কলতাবাজারের পটল কী সাংঘাতিক কাজ করে দেশের সম্মান বাড়িয়ে দিয়েছে।

তাহলে তুই তোর নাম নিয়ে অযথা মন খারাপ করছিস কেন? বোকা ছেলে কোথাকার, বলে বাবা ঘর ফাটিয়ে হো হো অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন।

বাবার কথায় পটলের মন আস্তে আস্তে ভাল হতে

শুরু করল।

প্রকাশিত : ৩০ মে ২০১৫

৩০/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: