মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ব্যাঙ্ককে সতেরো দেশের সম্মেলন শেষ হলো সিদ্ধান্ত ছাড়াই

প্রকাশিত : ৩০ মে ২০১৫
  • মানবপাচার শূন্যের কোঠায় নামাতে চায় বাংলাদেশ
  • এ সমস্যা সমাধানে আঞ্চলিক সহযোগিতা চায় থাইল্যান্ড
  • অভিবাসন সমস্যা নিয়ে পাল্টা আঘাত করল মিয়ানমার

স্টাফ রিপোর্টার ॥ মানবপাচার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে বাংলাদেশ বদ্ধপরিকর। সমুদ্রপথে মানবপাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এছাড়া সমুদ্রপথে মানবপাচার বন্ধে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে লিয়াজোঁ অফিস খোলার প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ। শুক্রবার দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় অঞ্চলে অভিবাসী সমস্যা সমাধানে থাইল্যান্ডের ব্যাঙ্ককে অনুষ্ঠিত এক আলোচনায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব এম শহীদুল হক এসব কথা বলেন। ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়।

বাংলাদেশ ছাড়াও অস্ট্রেলিয়া, কম্বোডিয়া, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, লাওস, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, ফিলিপিন্স, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, পাপুয়া নিউগিনি, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরানের প্রতিনিধিরা এই ব্যাঙ্ককের এই সম্মেলনে যোগ দেন। এছাড়া সম্মেলনে যোগ দেয় জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর, আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থা আইওএম, জাতিসংঘের অফিস অন ড্রাগস এ্যান্ড ক্রাইমের (ইউএনওডিসি) প্রতিনিধিরাও।

সম্মেলনে মানবপাচার প্রতিরোধে সরকারের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের পাশাপাশি মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ায় উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশীদের দেশে ফেরানো বিষয়ে বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন পররাষ্ট্র সচিব এম শহীদুল হক। তিনি বলেন, অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণভাবে সমুদ্রে গমন নিয়ে আমরা বেশ উদ্বিগ্ন। এরই মধ্যে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা সমুদ্র সীমানার নিরাপত্তা রক্ষার পাশাপাশি অবৈধভাবে গমনকারীদের উদ্ধার করেছে। বাংলাদেশের কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনী এ ধরনের ঘটনায় জড়িত অপরাধীদের ধরতে বেশ সজাগ রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন শহীদুল হক।

শহীদুল হক বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মানবপাচার প্রতিরোধকে একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। সে কারণে আমরা মানবপাচার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে চাই। এছাড়া অবৈধভাবে সমুদ্রপথে যাত্রা বন্ধে আন্তর্জাতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করছে বাংলাদেশ। এছাড়া প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গেও যৌথভাবে কাজ করা হচ্ছে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ সফলভাবে মানবপাচার বিরোধী যৌথ কর্মসূচী বাস্তবায়ন করা হয়েছে উল্লেখ করেন তিনি।

পররাষ্ট্র সচিব বলেন, মিয়ানমারের সঙ্গেও আমাদের সীমানা রয়েছে। এই সীমানাজুড়ে একটি ‘বর্ডার লিয়াজোঁ’ অফিস স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু করেছি। অস্ত্র চোরাচালান, মাদকদ্রব্য পাচার ও মানবপাচার প্রতিহত করতে তাদের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা ও সংলাপের জন্য একটি সমঝোতা স্মারকের প্রস্তাব করছি।

সমুদ্রপথ দিয়ে পাচার হওয়া বাংলাদেশী নাগরিকদের ফেরাতে ইতিমধ্যেই বিভিন্ন মিশনকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, পাচার হওয়া নাগরিকদের পরিচয় নিশ্চিত হতে তাদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। আমাদের দূতরা তাদের পরিচয় শনাক্তে কাজ শুরু করেছেন।

এদিকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জানায়, সম্মেলনে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় অঞ্চলে মানবপাচার ভীতিকর পর্যায়ে চলে গেছে মন্তব্য করে এ সমস্যা সমাধানে আঞ্চলিক সহযোগিতা কামনা করেন থাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী থানাসাক পাতিমাপ্রাকর্ন। তিনি বলেন, কোন দেশই একা এই সমস্যা সমাধান করতে পারবে না। আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে এ সমস্যা নিরসন করতে হবে। মানবপাচারের মূল উপড়ে ফেলতে হবে।

সম্মেলনের শুরুতেই পাল্টা আঘাত করে মিয়ানমার। সবাই যখন এশিয়ার অভিবাসন সমস্যার জন্য মিয়ানমারের দিকে আঙুল তুলছে, তখন এ বিষয়ে নিজেদের দোষ দিতে অপারগ দেশটি। সম্মেলনে মিয়ানমারের প্রতিনিধিরা জানান, পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ। ঠিক কতজন অভিবাসী এখনও সাগরে আটকে আছেন তা জানা যায়নি। মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রধান হেইন লিন বলেন, তার দেশ মানবপাচার রোধে সবার সঙ্গে কাজ করবে। তবে এজন্য শুধুমাত্র মিয়ানমারকে দোষ দেয়া যাবে না। তিনি বলেন, দোষারোপ কোন ফল বয়ে নিয়ে আসবে না। এটা আমাদের গন্তব্যে পৌঁছতে বাধা দেবে।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের অবৈধভাবে নৌপথে থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া এবং মালয়েশিয়া যাওয়ার বিষয়টি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজরে আসে। থাইল্যান্ডের গহীন অরণ্যে শত শত গণকবর পাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের পক্ষ থেকে অভিবাসন সমস্যা সমাধানে চাপ আসে। এরপর সাগরে ভাসমান হাজার হাজার অভিবাসীকে উদ্ধারে তৎপর হয় থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া।

একদিনের এ সম্মেলন সমাপ্ত হয় কোন রকমের সিদ্ধান্ত ছাড়াই। সম্মেলনে অভিবাসন সমস্যা নিয়ে রোহিঙ্গা ইস্যুতে আরও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করা হবে বলে জানান দিয়েছে মিয়ানমার। এ সঙ্কটের দায় নিতেও অস্বীকার করে তারা। সম্মেলনে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক ও প্রতিনিধি দলের প্রধান হেইন লিন স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, রোহিঙ্গাদের নিয়ে মিয়ানমারকে কোনরূপ দোষারোপ করা হলে তা মেনে নেয়া হবে না। তবে তিনি বলেন, মানবপাচার রোধে তার দেশ সহযোগিতা করবে। কিন্তু আন্দামান সাগরে ভাসমান অবৈধ অভিবাসী সঙ্কটের জন্য মিয়ানমারকে দোষারোপ করার অঙ্গুলি নির্দেশে কাজের কাজ কিছুই হবে না। হেইন লিন বৈঠকের উদ্বোধনী বক্তব্যে বলেন, ‘আপনারা আমার দেশকে দোষারোপ করতে পারেন না। কারণ, অভিবাসী সঙ্কটে মিয়ানমারই একমাত্র দেশ নয়। গোটা অঞ্চলটি মানবপাচারের সমস্যায় জর্জরিত উল্লেখ করে হেইন লিন বলেন, এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মিয়ানমার অন্যান্য আঞ্চলিক দেশের সঙ্গে এবং আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টায় সহযোগিতা করে যাবে।’

আঞ্চলিক এ বৈঠকে উঠে আসে বঙ্গোপসাগর হয়ে আন্দামান সাগর এলাকাজুড়ে মানবপাচার চলছে। চলতি মাসে থাইল্যান্ড মানবপাচারের বিরুদ্ধে অভিযানের পর থেকে ৩ হাজারেরও বেশি অভিবাসী মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু এখনও ২৬শয়েরও বেশি অভিবাসী সাগরে ভাসমান বলে তথ্য দিয়েছে ত্রাণ সংস্থাগুলো। এ অভিবাসীগুলোর কিছু কিছু বাংলাদেশী। বাকিরা সব মিয়ানমারের নির্যাতিত নিপীড়িত রোহিঙ্গা মুসলমান।

সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা বলেন, পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। প্রতিনিধিরা বলেন, রোহিঙ্গারা বহু বছর ধরে মিয়ানমারে বাস করে এলেও তাদের মৌলিক অধিকার ও নাগরিকত্ব দিতে অস্বীকার করে আসছে দেশটি। রোহিঙ্গা মুসলমানরা রাষ্ট্রীয়ভাবে বৈষম্যেরও শিকার হচ্ছে। এসব সমস্যার মূল কারণ উদঘাটন করে সমন্বিত উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন বলে জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থা ইতোপূর্বে বিশ্বের অনেক দেশের নেতৃবৃন্দ মিয়ানমারকে এ সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানিয়ে আসছে। বৈঠকে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দিতে মিয়ানমার সরকারকে আবারও আহ্বান জানান ইউএনএইচসিআর প্রতিনিধি। জবাবে মিয়ানমারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, অবৈধ বিদেশগামীদের নিয়ে যেখানে আলোচনা চলছে সেখানে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত (রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব প্রসঙ্গ) নিয়ে কোন কথা উঠতে পারে না।

ব্যাঙ্ককে অনুষ্ঠিত এ সম্মেলন শেষে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে বলা হয়েছে, অভিবাসন সমস্যা নিয়ে মিয়ানমার পাল্টা আঘাত করেছে। সবাই যখন এশিয়ার অভিবাসন সমস্যার জন্য মিয়ানমারের দিকে আঙ্গুল তুলেছে তখন এ ব্যাপারে কোন ধরনের দায়ভার নিতে অপারগ দেশটি। তবে মিয়ানমার স্বীকার করেছে, পরিস্থিতি খুব ভয়াবহ। সাগরে ঠিক কত অভিবাসী ভাসমান তা তাদের জানা নেই। তবে জাতিসংঘ জানিয়েছে সাগরে আটকা পড়ে আছে এখনও ২ হাজার ৬শ’ অভিবাসী প্রত্যাশী।

বঙ্গোপসাগর হয়ে আন্দামান সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল সাগর এলাকায় অবৈধ পথে অভিবাসী প্রত্যাশীদের গমনাগমন চলে আসছে গত কয়েক বছর ধরে। এসব অভিবাসীদের বেশিরভাগ মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশের সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ। সাগরপথে মালয়েশিয়ায় গিয়ে রোহিঙ্গারা দেশান্তরি হচ্ছে। আর এদের সঙ্গে অধিক উপার্জনের আশায় যোগ দিয়েছে বাংলাদেশী কিছু নাগরিক। গত ১ মে থাইল্যান্ডের শংখলা প্রদেশে অভিবাসীদের বন্দী শিবির ও গণকবরের তথ্য ফাঁস হয়ে গেলে ২ মে থেকে শুরু হয় পুলিশ ও সেনা অভিযান। এ অভিযানে এর সত্যতা মিললে বিশ্বজুড়ে হৈ চৈ পড়ে যায়। থাইল্যান্ডে গণকবর ও বন্দী শিবির উদ্ধার তৎপরতা চলা অবস্থায় গত ২৩ মে মালয়েশিয়ার পেরলিস প্রদেশে আবিষ্কৃৃত হয় গণকবর ও বন্দী শিবির। যা এ পর্যন্ত ১৪০-এ উন্নীত হয়েছে। লাশ মিলেছে ১৩৯টি। এ নিয়ে বিশ্ব বিবেক স্তম্ভিত হয়ে যায়। মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও মিয়ানমার তাদের স্ব স্ব জলসীমায় নৌ ও কোস্টগার্ডের টহল জোরদার করলে হাজার হাজার অভিবাসী বোঝাই বিভিন্ন ধরনের নৌযান আন্দামান সাগরের মালাক্কা প্রণালীমুখী হয়। এ অবস্থায় ইন্দোনেশিয়া সরকার এসব অভিবাসীদের বিতাড়নে যুদ্ধ জাহাজ ও যুদ্ধ বিমান প্রেরণের ঘোষণা দিলে জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের শক্তিশালী দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের পক্ষ থকে প্রচ- চাপ সৃষ্টি করা হয়। ফলে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া সরকার তাদের গৃহীত সিদ্ধান্ত থেকে পিছ টান দেয়। উল্টো অভিবাসীদের তল্লাশি চালিয়ে উদ্ধারের তৎপরতায় নামে। ইতোমধ্যে ইন্দোনেশিয়ায় প্রায় ২ হাজার অবৈধ অভিবাসী প্রত্যাশীদের আশ্রয় দেয়া হয়েছে। থাইল্যান্ড উপকূলে দুদফায় উদ্ধার হয়েছে ৯৩৫ অভিবাসী প্রত্যাশী। এদের বেশিরভাগই মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমান। সঙ্গে রয়েছে কিছু বাংলাদেশী নাগরিক।

প্রকাশিত : ৩০ মে ২০১৫

৩০/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: