রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

কার্নিশে শিহরণ

প্রকাশিত : ২৯ মে ২০১৫

তরুণ কবি ও কথাসাহিত্যিক জাবেদ আমিনের সাম্প্রতিক উপন্যাস ‘কার্নিশে শিহরণ’। গত বছর বইমেলায় প্রকাশিত প্রথম উপন্যাস ‘এই ভ্রান্ত মৌনতায়’ পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলো। বর্তমান উপন্যাসটি সমকালীন প্রেক্ষাপটে টানটান নাটকীয়তায় পূর্ণ কাহিনি নিয়ে। উপন্যাসের প্রধান দুই পাত্র-পাত্রী রেহান ও নবনীতা যেন আমাদের চেনাজগতেরই দুই তরুণ-তরুণী। আর দশটা মধ্যবিত্ত পরিবারের আর্দশবান মানুষ হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বেড়ে ওঠা দুই প্রাণোচ্ছল প্রতিনিধি। যদিও বিনষ্ট সময়ের অপ্রত্যাশিত আঘাতে উভয়ে ক্ষতবিক্ষত। তাদের আগামীর স্বপ্ন বারবার বিপন্ন ও বিপর্যস্ত হয়ে ওঠে প্রতিষ্ঠিত প্রভাবশালী কতিপয় নীতিহীন ব্যক্তির কারণে। স্বপ্ন সাধ চুরমার হয়ে যায়। জীবন উপন্যাসের চাইতেও অভাবিত ঘটনাবহুল হয়ে উঠতে পারে। আবার জীবনের বাস্তবতার শাঁস থেকেই উপন্যাসের রসদ সংগৃহিত হয়ে থাকে। লেখক জাবেদ আমিন জীবনকে দেখেন ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। উপন্যাসের উপাদান, উৎস ও গন্তব্য এবং তার মধ্যকার উৎকণ্ঠা ও উত্তেজনা সম্পর্কে যথোচিত জ্ঞান রাখেন। একটির পর আরেকটি দৃশ্য এমনভাবে যোজনা করেন যাতে পরবর্তী ঘটনা জানার জন্য পাঠকের আগ্রহ বজায় থাকে। আবার চরিত্রের অবলোকনের ভেতর দিয়ে তিনি সমাজের হালচাল শিল্পীর তুলির আঁচড়ের মতো কয়েকটি বাক্যে সুন্দরভাবে তুলে ধরেন। শিক্ষার্থী তরুণ প্রজন্মের ভেতর সেলফোনে অনলাইনচর্চার বিষয়টি যেমন তুলে ধরেছেন কয়েকটি বাক্যে : “রেহানর মনে হলো এই পাঁচ ছয় জনের দল একসাথে বসে আছে ঠিকই কিন্তু এরা আড্ডা দিচ্ছে অনলাইনে। অন্য কারো সাথে। এর মানে হচ্ছে, এরা এদের সাথে থেকেও নেই। শুধুমাত্র নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত এরা। এদের এই একসাথে যে ফিজিক্যাল এক্সিসটেন্স এটাই যেন মিথ্যা। ভার্চুয়াল জগতটাই যেন একমাত্র সত্য।”

আবার সমাজে নারীর বিপন্ন অবস্থানের বিষয়টিও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে তুলে ধরেছেন লেখক। অন্তরঙ্গ সম্পর্কের সুযোগ নিয়ে মোবাইল ফোনে শারীরিক ঘনিষ্ঠতার ছবি ধারণ করে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিয়ে একজন নারীকে অপদস্থ ও নির্যাতন করার বহুল আলোচিত বিষয়টি উপন্যাসে তুলে ধরা হয়েছে। রেহান ছাত্রজীবনে সুস্থ রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। ক্যাম্পাসে প্রতিপক্ষের মারণাস্ত্রের নিশানা হয় সে। পরবর্তীকালে তার নেতার স্খলন তাকে ব্যথিত করে তোলে। নীতিবর্জিত রাজনীতিকের হিপোক্রেসি আর অনৈতিকভাবে টাকার পাহাড় গড়ে তোলার বাস্তবতার বিপরীতে রেহান আদর্শ জীবনই বেছে নিতে চায়। এই চরিত্রটি লেখক এমনভাবে এঁকেছেন যার ফলে তারুণ্যশক্তির স্বচ্ছ সুন্দর কল্যাণকর জীবনের প্রতি পক্ষপাতই প্রধান হয়ে উঠেছে। রেহান পরিশ্রমী ও সংগ্রামী। শিক্ষাজীবন সম্পন্নের পর টিউশনি করে চললেও রক্তদান কর্মসূচির মতো মানবিক ও সেবাধর্মী একটি কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এক বঞ্চিতা বিবাহিতা নারীর প্রেমপিপাসা ও অর্থসম্পদের প্রলোভনকে সে সহজে পাশ কাটিয়ে যায়। অথচ সেই মহিলার খুনের দায় মাথায় নিয়ে তাকে একপর্যায়ে দেশান্তরী হতে হয়। তার স্বপ্নকন্যা নবনীতার জীবনও বয়ে চলে নানা টানাপোড়েনের ভেতর বিহ্বল তরণীর মতো। অভাবিত আকস্মিক ঘটনার শিকার হয়ে সে প্রভাবশালীর মুঠোবন্দি হয়ে পড়ে। চলচ্চিত্রের মতো প্রায় অসম্ভব সব ঘটনার ভেতর দিয়ে এক ক্রান্তিলগ্নে দুজন দুজনের মুখোমুখি চলে আসে। পেছনে অতিক্রান্ত অনেক দ্বন্দ্বের ও দহনের টুকরো ছবি। সব কিছু ছাপিয়ে এটি শেষ পর্যন্ত মিষ্টি প্রেমেরই উপন্যাস।

সততা ও অনৈতিকতার সংঘাত শেষে বিজয়ী হয় শেষ পর্যন্ত ইতিবাচকতাই। অঢেল অর্থ দিয়ে ঢেকে ফেলা সম্ভব হয় না পাপ। সমাজে নীতিনিষ্ঠ মানুষ যথাযথ কর্তব্য পালনের মাধ্যমে রচনা করতে পারে সুন্দর সকাল। জাবেদ আমিনের উপন্যাসে কয়েকজন নারী-পুরুষের মুখ ও মুখোশ বাস্তবসম্মতভাবে উপস্থাপিত। এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলার মতো উপন্যাসটিতে রয়েছে নাটকীয় উপাদান যা পাঠককে ঘটনার পরিণতি জানার জন্য আকৃষ্ট করে রাখে। সহজ সরল ভাষা ও স্বাভাবিক বর্ণনারীতির কারণে উপন্যাসটি পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করবে বলে ধারণা করা যায়। লেখকের পরবর্তী উপন্যাসের প্রতীক্ষায় থাকা যায়।

কার্নিশে শিহরণ। জাবেদ আমিন। অনন্যা। প্রকাশ বইমেলা ২০১৫। প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ। মূল্য ১৫০ টাকা।

মাহমুদ হক

প্রকাশিত : ২৯ মে ২০১৫

২৯/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: