রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

ঢেউ

প্রকাশিত : ২৯ মে ২০১৫
  • জেসমিন নাহার

বিশ্রী বাদলের রাত, ঝুপাঝাঁপ বৃষ্টি পড়ছে। টিনের চালের ঝমাঝম শব্দে রুপার দুশ্চিন্তার ঝাঁকগুলো হারিয়ে গিয়ে দু’চোখে নেমে আসছে প্রগাঢ় ঘুমের সারি। সোঁদাস্যাঁতা তেল চিটচিটে শক্ত বালিশটাকে খানিকক্ষণ আগে পাথরখ- মনে হলেও এখন মনে হচ্ছে, নরম তুলতুলে সাদা, সাদা তুলোর মাঝে তার মাথাটা ডুবে আছে। হিমেল বাতাসে শরীরে শিরশিরে ভাব জাগায়। গায়ে একটা কাঁথা হলে বেশ হতো। কিন্তু এমন নেশারু ঘুম ভেঙ্গে কাঁথা নেয়ার চেয়ে ঘুমানোটাকেই ভাল লাগছে তার। কিন্তু ভাললাগাটাকে বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারল না রুপা, মাতৃত্বের পরম মমতার কাছে হার মেনে উঠে বসে, অন্ধকারে হাতড়িয়ে দুটো কাঁথা টেনে আনে। পরম যতেœ একটি কাঁথার ভাঁজ খুলে ছেলে তিনটির গায়ে জড়িয়ে দেয়, বাকি কাঁথাটা কোলের ছেলেটার সঙ্গে নিজের গায়ে জড়িয়ে নেয়। হিমেল হাওয়া আর কাঁথার উষ্ণতায় গভীর ঘুমে তলিয়ে যায় ঘরের পাঁচটি প্রাণী। একটানা বৃষ্টির শব্দ আর মাঝেমধ্যে বিদ্যুতের আলোর ঝলকানির সঙ্গে গুড়ুম গুড়ুম আওয়াজ ছাড়া আর কোন শব্দ নেই কোথাও।

রাত কত হয়েছে সঠিক আন্দাজ না করতে পারলেও রুপা বুঝতে পারে এখন মধ্যরাত। এমন দুর্যোগপূর্ণ রাতে এই অসময়ে ঘরের বাইরে কাদের যেন চলাচলের শব্দ পেয়ে কান খাড়া করে কিছু বুঝতে চেষ্টা করে। কিন্তু কিছু বুঝে উঠার আগেই শব্দটা হারিয়ে যায়। রুপার তলপেট ভারি হয়ে চিনচিন করে ওঠে, বাইরে যাওয়া দরকার, কিন্তু টয়লেটটা অনেক দূরে। তার উপরে দশ ঘরের একটা টয়লেট, যেমনি দুর্গন্ধ তেমনি নোংরা, মনে পড়লেই পেটের নাড়িভুঁড়ি উল্টে আসতে চায়। কলতলায় যদিও যাওয়া যায় সেটার দূরত্বও কম নয়, যেতে যেতে ভিজে সপসপে হয়ে যাবে, ঘরে একটা ছাতা তো দূরের কথা, এক টুকরো বাড়তি কাপড় পর্যন্ত নেই যে, মাথা বাঁচিয়ে বাইরে যাবে। নানা ভাবনা ভাবতে ভাবতে বাইরে যাওয়ার চিন্তা মাথা থেকে ছেঁটে ফেলে গভীর ঘুমে তলিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পরে শুনতে পায় আবার সেই শব্দ। শব্দটা ক্রমশ গাঢ় হতে থাকে এবং ভিন্ন রূপ নেয়। খসখস করে কেউ কিছু কাটছে বোধ হয়। রুপার গা শিউরে উঠে। ঝট করে ঘুম পালিয়ে যায় বহু দূরে, রুপা ধীরে ধীরে বিছানায় উঠে বসে। চারদিকে চেয়ে দেখার চেষ্টা করে। অবিশ্রান্ত বর্ষণ ধরণীমুখর অন্ধকারে দেখা যায় একটি মানব ছায়া। দৃষ্টিভ্রম ভেবে রুপা দু’হাতে চোখ কচলে আবার দৃষ্টি প্রসারিত করে। গুড়ুম গুড়ুম ডাকে বিদ্যুত চমকায়। বিদ্যুতের আলোতে রুপা স্পষ্ট দেখতে পায় বেড়ার বাঁধন কেটে একজন সেটা উঁচু করে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। আর বাকিরা বর্ষার ব্যাঙের মতো টপাটপ ঘরে ঢুকে আসছে।

রুপা ভয় জড়ানো কম্পিত কণ্ঠে বলে, ক্যাডা আফনেরা এত রাইতে আমার ঘরে ঢুকছেন কিসের লাইগা?

একটি পুরুষ কণ্ঠ চাপাস্বরে বলে, চুপ গলা করবি না; একটা শব্দ করবি তো গলাটিপা মাইরা ফালামু।

রুপা মিনতি জড়ানো কণ্ঠে বলে, দেহেন ভাইজানেরা আমি গরিব মানুষ। চাইরটা শিশুসন্তান লইয়া বড় কষ্টে আছি। আমার কাছে এমন কিছু নাই যে, আপনেরা চুরি-ডাহাতি কইরা নিবেন! টর্চলাইটের আলো রুপার শরীরে সাপের মতো এঁকেবেঁকে ঘুরে ঘুরে পায়ে এসে থামল। তারপরই আবার সেই চাপাস্বর। ক্যাডা কইছে তুমার কাছে কিছু নাই? এত রুপ, যৌবন থাকতে নাই নাই করতে হয় না। এইগুলো উজাড় কইরা দেও, দেখবা ট্যাকা-পয়সায় সাঁতার কাটবা।

ভয়ার্ত কণ্ঠে রুপার আহাজারিÑ আপনেরা এমন কথা কইয়েন না, আপনেগো পায়ে পড়ি আপনেরা চইলা যান। ঢাকা শহরে আপনেগো মতো মাইনষের লাইগা ওই সমস্ত জায়গার অভাব নাই। আমি ভদ্রঘরের মাইয়া, আমার ইজ্জতে হাত দিয়েন না। কুটকুট করে হাসতে হাসতে আরেকটি কণ্ঠ সামনে এসে বলে, আহ-হা বেশি প্যাটর প্যাটর না কইরা চুপ কইরা পইড়া থাক। আমরা আমগো কাম কইরা চইলা যাই। তাছাড়া তুমি তো আর কচি ছেঁড়ি না যে পয়লা পরথম। চাইরটা যহন... সমস্যার তো কারণ দেখতাছি না।

Ñএবার রুপার হাত-পা অসাড় হয়ে আসে, ভো ভো করে মাথা ঘুরতে থাকে। গুড়ুম গুড়ুম শব্দে বিদ্যুত চমকায়। রুপা দেখতে পায় ওরা নেহাতই বাচ্চা ছেলে, বয়স বিশ কি বাইশ! প্রাণপণে দেহে মনে শক্তি সঞ্চয় করে বলে, তোমরা আমার ছেলের মতো, আমার দিকে কুনজর দিও না। দেশের বাড়িত আমার স্বামী আছে, তার সন্তান আমার পেটে, আমি পাঁচ মাসের গর্ভবতী। তুমগো চাহিদা মিটানোর সাইধ্য আমার নাই। তোমরা এইহান থিকা চইলা যাও।

আবার টর্চ জ্বলে ওঠে, সেই আলোতে রুপা দেখতে পায়, ওদের চোখে শয়তানীর কামনা জ্বলজ্বল করছে। কুৎসিত হাসিতে চেহারা বীভৎস হয়ে উঠেছে। টর্চের আলো নিভে যায়। একটি ভারি দেহ তাকে জাপটে ধরে। রুপা তার সমস্ত শক্তি দিয়ে নিজেকে মুক্ত করতে আপ্রাণ চেষ্টা চালাতে থাকে। এবার একসঙ্গে অনেকগুলো টর্চ জ্বলে উঠে, রুপার এলোচুল মাটিতে লুটায়। শরীরের অবরণ অসংযত হয়ে ধবধবে সাদা মাংসল দেহটা বেরিয়ে আসে।

পেতি কুকুরের মতো কেউ কেউ স্বরে একজন বলে উঠে, আমরা যদি তুমারে ছাইড়া দেই, অন্যের খোরাক তুমি ঠিকই হইবা। খালি খালি আমাগো বাড়া ভাতে ছাই দিয়া তোমার লাভ কী?

অন্য আরেকটি কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে আসে, আহারে খালি তো রূপের বন্যা, চটক আছে জব্বর, ওস্তাদ তাড়াতাড়ি ... লোকজন আইসা পড়ব। রুপা হার মানে না, নিজেকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালায়।

ঘুমন্ত বাচ্চাগুলো জেগে ওঠে, চিৎকার করে কাঁদতে লাগল। ওদের কান্নার ওপর ভর করে যেন রুপার দেহ মনে সহস্র শক্তি ফিরে এলো, সে ক্ষণিকের জন্য নিজেকে পিশাচটার হাতে ছেড়ে দিয়ে সময় ও সুযোগ করে দিল। আর সেই সুযোগটার সদ্ব্যবহার সে নিজেই করল। পিশাচটার নিম্নাঙ্গে চেপে ধরে কণ্ঠের সকল জোর উগড়ে চিৎকার করে উঠল বাঁচাওÑ খালা আমারে বাঁ-চা-ও।

রুপার হাতের ভয়ঙ্কর চাপে, প্রচ- কষ্টে পিশাচটাও প্রাণফাটা চিৎকার করে উঠল। বাচ্চাদের, রুপার আর শয়তানটারÑ তিন চিৎকারের ভয়ঙ্কর আওয়াজে আশপাশের মানুষজন ছুটে আসতে লাগল। দশ-বারোজনের শয়তানের দলটা ফাটা বেড় দিয়ে দুদ্দাড় পালিয়ে গেল।

সর্বস্ব হারাতে-হারাতেও বেঁচে গেল রুপা। পাশের ঘর থেকে মধ্যবয়সী মোমেনা বেগম এসে টকাটক সুইচ টিপে বলতে লাগল, দুর মরার কারেনও গেছেগা। কী অইছেরে তোর, কারা আইছিল, কারাইবা দৌড়াইয়া পলাইলো?

অন্ধকারে রুপা কম্পিত হাতে গায়ের কাপড় সংযত করতে করতে বলল, মোমডা ধর খালা।

মোমেনার মোম জ্বালানোর আগেই হুড়মুড় করে ঘরের মধ্যে লোকজন ঢুকে টর্চের আলো ফেলে বলতে লাগল, কী অইছে এত চেঁচামেচি কীসের, কী অইছে শুনি?

কাটা মুরগির মতো কাঁপতে কাঁপতে রুপা বলে, চোর আইছিল, চোর। ধমকের সুরে এক প্রতিবেশী মধ্যবয়সের লোক বলে উঠল, চোর আইছে সেই জন্য এত জোরে চিল্লাইছো মাতারী? এই বাদলা দিনে সব মাইনষের আরামের ঘুমডারে হারাম কইরা ছাড়ছো, কী এমুন সোনা-দানা, সাতরাজার ধন আছে যে, মাঝ রাইতে গলা ফাটাইলা? চোর আইছিলো, আইছিলো, চুপ কইরা পইড়া থাকবা, কিছু না পাইলে তো এমনি এমনিই চইলা যাইত। যত্তসব ঝুট-ঝামেলা।

অন্য আরেকজনের গলা শোনা গেল, ‘চোর না অন্য কোন ব্যাপার-স্যাপার? দেহ মাতারী স্বামী ছাড়া জোয়ান মাইয়ালোকের একলা থাকা ঠিক না, যদি স্বামী লইয়া থাকবার পারো তাইলে এই মহল্লায় থাকবা, নইলে ঘর ছাইড়া চইলা যাবা। আমরা বাল-বাচ্চা, স্ত্রী-পরিজন লইয়া থাকি, তুমগো মানসম্মান না থাকবার পারে, আমগো তো আছে নাকি কও তুমরা?

এই কথার সুরের সঙ্গে সুর মিশিয়ে আরও আধ ঘণ্টা পর্যন্ত নানাজনে নানা কথা বলে চলে যেতে রুপা কেঁদে কেঁদে বলল, খালাগো চোর আইছিল, আমারে চুরি করবার লাইগা। এই পোড়া রূপ-যৌবন লইয়া কেমনে টিকমু আমি, কেমনে বাঁচামু এই পোলাপানডিরে আমারে কইয়া দেও তুমি খালা, কইয়া দেও।

মোমেনা মোম জ্বালিয়ে ম্যাচ ধরে বসেছিল এতক্ষণ। রুপার কথা শুনে হাত থেকে ম্যাচ রেখে মাথায় হাত দিয়ে বসে বলতে লাগল, হায়রে কপাল দুইন্যাত আর মানুষ রইল না, সব অমানুষ, কুত্তা অইয়া গ্যাছে, ছিঃ ছিঃ ছিঃ চাইর বাচ্চার মা হ্যার লগেও বদমাইশি। আল্লা ওগো তুমি ঠাডা ফালাইয়া মারতে পারো না, গজব দিবার পার না? যত ঠাডা, যত গজব খালি অসহায় গরিব মাইনষের লাইগাই? রুপার পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে বলে, কান্দিস না মা, তুই আমার দেশের মাইয়া, তোর যাতে ভালা অয় হের লাইগা তরে আমি আমার পাশের ঘরে ঘর ভাড়া লইয়া দিছি। বেশি কিছু না পারলেও টুকটাক এইডা সেইডা দিয়া সাহায্য করার চেষ্টা করি। কিন্তু তোর এই রূপ-যৌবনতো আমি আগলাইয়া রাখবার পারুম না। ঢাহার শহরে আইছোস কামকাইজ কইরাই খাওন পিন্দন লাগব, ঘর ভাড়া দেওন লাগব। যেই কয়ডা ট্যাহা আনছোস বইয়া আর কয়দিন খাবি? হায়রে পোড়া কপাল আর কারে কয়! বাসাবাড়িত যাইবার পারোস না, ঘরেও থাকবার পারোস না, চাইরদিকে খালি শকুন আর শকুন। যেই রূপের লাইগা তোর এই জ্বালা, হেই রূপ পায়ে ঠেইলা তোর সোয়ামি ক্যামনে তিন বিয়ান্ত কুরছা মুরগি লইয়া সংসার করতাছে। আর করব নাইবা ক্যা? আজকাইলকার পুরুষগুলার আলা-ভোলা নারী আলুনী লাগে। রঙ্গে ঢঙ্গে ছলাকলায় যারা ভুলাইবার পারে ওই সমস্ত মাইয়া লইয়া কইরা আডুপানিত ডুইবা মরে। তোর মতো ঘর-গেরস্তবাড়ির লেহাপড়া জানা সুন্দরী মাইয়া ফালাইয়া ওই বারোদুয়ারী মাগী লইয়া কয়দিন সংসার করব? দেহিছ তোর লাইগা কপাল চাপড়াইয়া আতে গা-ও তুলব।

রুপা চোখ মুছে কোলের বাচ্চাটার কান্না থামাতে ব্লাউজের বোতাম খুলতে গিয়ে দেখে, ব্লাউজের বোতাম তো দূরের কথা কাপড়ই নেই। রুপা ঝরঝর করে কেঁদে বুক ভাসায়।

মোমেনা বেগম রুপার বাকি তিনটি ছেলেকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে বলে, হুন ছেমড়ি কান্দিস না, তোর উপরে বদমাইনষের নজর পড়ছে, আজকাবান বাঁইচা গেলি, আরেকদিন যদি না বাঁচতে পারস? একটা কথা কই, আমার চিনাজানা একটা বস্তি আছে সেই হানে সস্তায় ঘর ভাড়া পাবি। এই হানে দেওন লাগে আডারো শ’ ট্যাহা আর বস্তিত হাজার ট্যাহায়ই পাবি, আর বস্তির আশপাশে ভালা ভালা বাড়িঘর আছে হ্যাগো বাসায় হাত নাইড়া খাইলেও ভাত-কাপড়ের অভাব তোর হইব না। আজকাইল কামের মাইনষের বড় আকাল, বান্ধা কাম না পাইলেও ছুডা কাম তোর অইবোই। তা অপোড়াকপালী তোর তো গ্যাদা, গ্যাদা চাইরডা পুলা তার উপরে আবার কিয়ের লাইগা পোয়াতি অইছোস?

রুপা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, তুমগো জামাইর একটা মাইয়ার বড় সখ, হের লাইগাই তো বছরের এই মাথায় আর হেই মাথায় একটা কইরাই এই অবস্থা।

মোমেনা বেগম ঝাঁজালো কণ্ঠে বলে, থো ফালাইয়া ওই শয়তানের কথা, কামড়ানি উঠছে বিয়ার, উছিলা অইছে পোলামাইয়ার। বাড়িরথন বাইর অইছস বালা কথা, ওর পুলাপানডিরে লইয়া বাইরোইছস ক্যা? পোলাপানডিরে

লইয়া তুই কষ্ট কইরা মরবি আর খালি বাড়িঘরে ওরা নাইচা, গাইয়া, রহিম-রূপবানের পাট কইরা বেড়াইব, রাত পুহাইলেই বাড়ির দিক রওনা দিবি। বান্দরের পোলাপান বান্দরের কাছে রাইখা আইবি, তোরে আমি বহাইয়া বহাইয়া খাওয়ামু, এক মুখ সোনা দিয়া ভরানো যায় আর পাঁচ মুখ তো ছাই দিয়াও ভরানো যাইব না।

রুপা করুণভাবে শুকনো হাসির রেখা ঠোঁটে টেনে বলে, কিযে কও খালা, মা না থাকলে বাপ কি আর বাপ থাহে যে হ্যার কাছে রাইহা আমু? যত কষ্টই হোক অগো আমার বুকছাড়া করতে পারমু না।

পরদিন বস্তির ভেতরে হাজার টাকায় ঘর ভাড়া করে দিল মোমেনা। তিন-চারটা বাসায় ছুটা কাজ করে কোন রকমে খোঁড়া ঘোড়ার মতো খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে দিন পার করতে লাগল। যদিও ভবিষ্যতে কী হবে ভেবে পায় না রুপা।

ক্রমে ক্রমে ফুলেফেঁপে ভরভরান্ত হয়ে উঠেছে বুক, পেট, কোমর। নড়াচড়া করতেও হাঁসফাঁস শুরু হয়ে যায়। ক’দিন ধরে ঠিকমতো কাজেও যেতে পারে না। শরীরটা বড় দুর্বল হয়ে পড়েছে। সারা শরীর হলুদবর্ণ হয়ে গেছে। হাতে-পায়ে পানি এসে টুপটুপা হয়েছে। মুখে খাবার দিলেই বমি হয়ে যায়। শরীরে এত কষ্ট, যন্ত্রণা চেপে রেখে দিব্যি হাসিমুখে থাকে রুপা।

ধুপধাপ করে দ্রুতপায়ে রুপার ঘরে এসে বসে মোমেনা বেগম। বলে, কিরে এই অবেলায় শুইয়া আছোস ক্যান, কামে যাস নাই?

দুর্বল স্বরে টেনে টেনে রুপা বলে, নাগো খালা শইলডা কয়দিন ধইরা বালা যাইতাছে না। চাইছিলাম তুমারে খবর দিমু আবার মনে আইল আর কত কষ্ট দিমু তোমারে।

মোমেনা রুপার দিকে চেয়ে আঁতকে উঠে বলে, একি তোর দেহি জলপা-ু অইছে, ডাক্তার দেহাস নাই?

খালায় যে কী কও, মরবার পারলে বাঁচি, বাঁইচা থাইহা মরবার চাই না। খালা আমি মইরা গেলে আমার পোলাপানডিরে তুমি ভালা বাসা দেইহা দিয়া দিও। ওর বাপে আইলেও যাইবার দিও না। তাইলে আমি মইরা গিয়াও শান্তি পামু না।

বালাই ষাট, মরবি ক্যা বাঁইচা থাক। আর আমি কালকা একজন দাইরে লইয়া আমু, আজকা যাই।

রুপা বাচ্চাগুলোকে কাছে ডেকে পাশে বসিয়ে বলে, তোমরা বাইরে যাইও না মারামারি কইরো না। আট বছরের বড় ছেলেটাকে দেখিয়ে বলে, ভাইয়ের কথা শুইনো, আর বাপ তুইও ছোড ভাইগো দেইহা রাহিছ। বড় ছেলে রনি বলে, ক্যা মা তুমি কই যাইবা?

কুনোহানে যামু না, কওন তো যায় না, অসুখ শইল কুনুসুম মইরা-টইরা যাই যদি।

রনির চোখ দুটো ছলছল করে উঠল, মুখে কিছু বলতে পারল না। পরদিন মোমেনা বেগম দাই রহিমা বেগমকে নিয়ে এসে বলে, এই যে মা রুপা হে বড় ভালা পুরাইনা দাই, বড় বড় ডাক্তারও হের কাছে ফেল। তোর যহন সময় অইব খবর দিছ, আমি না থাকলেও হে তোর কাছে চইলা আইব। আর রহিমা বু বাসা তো চিন্যাই গ্যালা নাকি কও?

রহিমা বেগম মুখের থেকে পানের ছোবা হাতের তালুতে নিয়ে ঘরের কোণে ফেলতে ফেলতে বলে, হ, সময়মতো খবর দিও। হেইডা ছাড়াও আমি মাঝেমইধ্যে আইসা তোমারে দেইখা যামুনে।

মোমেনা বেগম হাতের পুটলি খুলে একটা গাছন্ত মালা বের করে বলে, নে ধর মাথায় পইরা রাখ, বড় কবিরাজের কাছ থেইকা পড়াইয়া আনছি। এই মালা শুকাইতে শুকাইতে যহন গলায় নামব, তহন দেখবি তোর পা-ু ব্যারাম ভালা অইয়া গ্যাছে।

দু’দিন পর মোমেনা আর রহিমা এসে এ কথা, সে কথা বলার পর একপর্যায় রহিমাই বলতে থাকে, শুন মা, তুমি তো কইতাছো তুমার পোলাপানডিরে ভালা বাসা দেইহা দিয়া দিতে, আমি কই কী, ওরা তো বড় হইছে, মা চিনে কুনোহানে যাইতে চাইব না। তাই কই কী যেই বাচ্চাডা নতুন অইব হেইডারে দিয়া দিও। চাইর বাচ্চা লইয়াই তো কত ছিদ্রত। তার ওপরে নতুন বাচ্চাডারে দুইন্যাত আইন্যা কষ্ট ছাড়া কী দিবার পারবা? তাই কইছিলাম আমার পরিচিত একজন মানুষ আছে, পুলাপান হয় না বন্ধ্যা, তারে না হয় বাচ্চাডারে পালক দিও, সে তুমার থেইকা অনেক যতেœ মানুষ করব। রুপার বুকের ভেতর কষ্টের ঢেউ আছড়ে আছড়ে পড়ে। রুপা তাৎক্ষণিক না-না বললেও অনেক ভেবেচিন্তে দু’দিন পরে হ্যাঁ বলে দিয়েছে। বাচ্চার কথা শুনে নিঃসঙ্গ দম্পতি রুপার বস্তির ঘরে এসে বলে, আপনি নিশ্চিন্তে থাকেন আমরা আপনার বাচ্চাকে নিজেদের বাচ্চা ভেবেই লালন-পালন করব। পুত্রসন্তান হলে দুই হাজার টাকা দেব আর কন্যাসন্তান হলে এক হাজার। কারণ কিনে নিলে আপনি চিরতরে দাবি ছাড়তে পারবেন, তা না হলে যদি কখনও দাবি করে বসেন তখন একটা সমস্যা হয়ে যাবে। বিছানায় শুনে নীরব কান্না কেঁদে বুক ভাসিয়ে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করে রুপা, হে আল্লাহ আমার এই বাচ্চাডারে জন্মের আগেই তোমার কাছে লইয়া যাইও। মা হইয়া কেমনে আমি বাচ্চা বিক্রির টাকা খামু? বাড়িওয়ালীর মাত্র এক মাসের বাড়ি ভাড়া দেয়া হয়েছে। বাকি তিন মাসের টাকাই বাকি পড়ে আছে। তাই সে আগেই বলে দিয়েছে বাচ্চা বিক্রির টাকা হতে তিন মাসের ভাড়া না হলেও দুই মাসের ভাড়া আমাকে দিতে হবে। আমারও তো সংসার, ছেলেপেলে আছে। আমি তো অত তালেবর বাড়িওয়ালী না যে, পুরো মাস বিনি ভাড়ায় থাকতে দেব। তবুও আমি যেটুকুই করছি অন্যে তো তা-ও করছে না। খারাপ ভাবলে ভাবো, আমার করার কিছুই নেই।

দু’দিন পরেই প্রসব বেদনায় ছটফট করতে করতে মরণাপন্ন অবস্থায় একটি মৃত পুত্রসন্তানের জন্ম দিয়ে প্রসান্তির হাসি হেসে রুপা বলল, আল্লাহ তুমি তাইলে সত্য সত্যই আছ!

বাচ্চাটার জন্মের পরেও রুপা ভাল হলো না আর। দুই দিন, দুই রাত্রি ঘরের ভেতর পড়ে রইল নিশ্চলভাবে। ছেলেগুলোকে সবাই ডেকে খাবার-দাবার দিলেও রুপার সাধ্য হলো না চোখ মেলে তাকাবার। অতি কষ্টে ক্ষণিকের জন্য নিরীহ চোখে চেয়ে অস্ফুট আর্তনাদ করে বলল, বাবারা আমার বাবারা, চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল ফোঁটায় ফোঁটায় পানি। পরক্ষণেই ঘোর ঘোর আচ্ছন্নতায় তলিয়ে গেল, গলার ভেতর ঘড়ঘড় শব্দ হতে হতে নাক-মুখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল দুর্গন্ধময় কালো রক্তের ধারা। পাড়ার ছেলেরা মিলে নিয়ে গেল ঢাকা মেডিক্যালে। পিতৃ-মাতৃহীন অনাথ বালকেরা নগ্নপায়ে নগ্নগায়ে এদিক-ওদিকে ঘুরে বেড়াতে লাগল। কেউ তাদের কাছে গেলে ক্ষীণস্বরে জিজ্ঞেস করে, আমার মা কহন আইবো?

মেডিক্যালে নেয়ার ঘণ্টা দুই পরেই চাটাইয়ে পেঁচিয়ে সিএনজির মধ্যে করে শুইয়ে নিয়ে এলো তাদের মাকে। বাচ্চাগুলো ছুটে এসে মা, মা বলে ডাকে। সাড়া না পেয়ে চাটাই ফাঁক করে মুখ দেখে দু’হাতে তালি দিয়ে ছয় বছরের ছেলেটা বলে, মা আইছো মা, উডো ঘরে চল খিদা লাগছে ভাত দিবা, আমগো ঘরে কত ভাত-তরকারি দিছে মাইনষে, লও মা তুমিও খাইবা, উড না মা উড।

কোলের দু’বছরের ছেলেটা পায়ের কাছে এসে নগ্ন পা দু’খানা ধরে ডাকেÑ মা, মা দুদু খামু, মা দুদু খামু। চার বছরের ছেলেটা মায়ের দেহের চাটাই টানতে টানতে বলে, মা তুমি পলাইয়া নইছো, আমি তোমারে দেখছি, এইবার কথা কও, মা আমি তো তোমারে খুঁইজা পাইছি, এইবার কথা কও না মা।

ছোট ভাইদের এরূপ দেখে আট বছরের বড় ছেলে রনি ওদের বুকে জড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে, মায় আর ওঠবোনারে, মায় তো মইরা গ্যাছে। মা, মাগো হুন ওরা কী কইতাছে। আমগো কার কাছে রাইহা গেলা? ওগো লইয়া আমি অহন কই যামু, কী করমু, আমারে কইয়া গেলা না মা? তুমি যে মইরা আমগো ছাইড়া গেলা, আমি তো বুঝি, ওগো বুঝাই ক্যামনে? একবার উইডা আমারে কইয়া যাও মা, মাগো-ও-ও-ও। বড় ভাইয়ের কান্না দেখে ছোট তিনটিও অঝরে কান্না জুড়ে দেয়। চারটি অনাথ ছেলের কান্নার হাহাকার কষ্টের ঢেউ সবার হৃদয় কাঁপিয়ে, কাঁদিয়ে, ভাসিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে গিয়েও ফিরে এসে আছড়ে পড়ে প্রতিটি মানুষের মনের মাঝে।

প্রকাশিত : ২৯ মে ২০১৫

২৯/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: