আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

জাল ও জলনির্ভর জীবনের উপাখ্যান

প্রকাশিত : ২৯ মে ২০১৫
  • খালেক বিন জয়েনউদদীন

বই

আলোচ্য বইটির কাহিনী বা ঘটনা সুহৃদয় পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য সারবস্তু ফ্ল্যাপে আঁটা হয়েছে। উপন্যাসে সাধারণত এ জাতীয় ভূমিকা আগে পত্রস্থ হতো না। আধুনিককালে পাঠককে আগেভাগেই উপন্যাসের সংক্ষিপ্ত বিবরণ জানিয়ে দেয়া আজকাল রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে পাঠকবৃন্দ আখ্যানবাগ সহজেই অনুধাবন করতে পারবেন। আলোচ্য উপন্যাসের প্রথম ফ্ল্যাপে লেখা হয়েছে : ‘জাল থেকে জালে’ জাল জলনির্ভর প্রান্তিক জনজীবনের উপাখ্যান। বাঙালীর জীবন আর সংস্কৃতির সঙ্গে যেমন মাছ তেমনি জেলেজীবনও বাঙালী সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাঙালীর অপরিহার্য আহার্য, মাছের জন্য বাঙালী মূলত জেলেদের ওপর নির্ভলশীল। এদেশের জেলেরা নদী, খাল, বিল আর প্রাকৃতিক জলাশয়ের ওপর নির্ভর করেই তাদের সনাতনজীবন বাঁচিয়ে রাখার জন্য সংগ্রামরত। নদী-খাল-বিল আর অন্যসব প্রাকৃতিক জলাশয়ের মতোই জেলেদের জীবনও আজ সঙ্কটাপন্ন। এই সঙ্কট যতটা না প্রাকৃতিক, তার চাইতে বেশি রাজনৈতিক। এ দেশের সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার প্রাকৃতিক অবলম্বনসমূহ কিভাবে তাদের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে আর কোন রাজনৈতিক আবহে এদেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বেঁচে থাকার অধিকার ক্রমান্বয়ে হারাতে বসেছে ‘জাল থেকে জালে’ উপন্যাস তারই নিরাবেগ ও বস্তুনিষ্ঠ বয়ান। এই উপন্যাসে কেবল জেলেজীবনের অতীত আর তাদের সংস্কৃতি নয়, নতুন পুঁজি আর ক্ষমতা নতুন শোষণের জালে আটকে প্রান্তিক জনপদের সনাতন জীবনকে কতটা দুর্বিষহ করে তোলে সে বিবরণের পাশাপাশি খেটে খাওয়া মানুষের সমাজ থেকে উঠে আসা নেতৃত্বও যে তার শ্রেণীগত অবস্থান পরিবর্তনের মধ্যদিয়ে সমাজস্বার্থ রক্ষার পরিবর্তে শোষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়Ñ বিশেষ দক্ষতার সঙ্গে লেখক সেদিকটি উপন্যাসে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। জেলেজীবন নিয়ে গল্প-উপন্যাস বাংলাসাহিত্যে নতুন নয়। তবু জাল থেকে জালে উপন্যাসকে এক নতুন গল্প বলতে হবে। কারণ, এ গল্প কেবল ক্ষয়িষ্ণু জেলেজীবনের চিত্র নয়, এ উপন্যাসে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর শ্রেণী শোষণের বিচিত্র কৌশলসমূহ একই সঙ্গে বাস্তব আর শৈল্পিক চেতনায় চিহ্নিত হয়েছে, যা প্রগতিশীল বাংলাসাহিত্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে বলে প্রতীয়মান হয়।

আমারও ‘জাল থেকে জালে’ উপন্যাসটি পড়ে উপর্যুক্ত কথাগুলোর সঙ্গে একমত পোষণ করতে হয়েছে। আমাদের সমাজের একটি অংশ জেলে। তারা আবদ্ধ জলাশয় বা পুকুরে কিংবা নদী-নালায় মাছ চাষ করে জীবন নির্বাহ করে। কিন্তু সেখানেও শ্রেণিশত্রু, দালাল ও শোষকের অভাব নেই। ‘জাল যার জলা তার’ এই সেøাগান তাদের ক্ষেত্রে বেমানান ঠেকে। গ্রন্থটির লেখক তাই ঠিকই বলেছেনÑ ‘জাল থেকে জালে’। অর্থাৎ অন্য এক জালে জড়িয়ে তাদের জীবন অচল, সচল নয়। জাল ছিঁড়ে তারা বেরুতে পারছে না। এমনই এক কঠিন জীবনে বন্দী। এই বইয়ের ঘটনা সম্পূর্ণ হাল আমলের, তিতাস পাড়ের জীবন, মেঘনা পাড়ের জীবন কিংবা গঙ্গা পাড়ের জীবন ও জীবনচিত্র থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। বইটির এক নম্বর ক্রমিকটি উপন্যাসটির অংশ হয়ে ওঠেনি। কৈবর্ত্যদের পূর্ব কাহিনীর বিবরণের কারণে। দুই নম্বর ক্রমিক থেকেই উপন্যাসের কাহিনী বুনন শুরু। মরাডাঙির জেলের এ কাহিনীতে বর্ণনা করা হয়েছে আফজাল বেপারী, শরীফউদ্দিন, তহশিলদার রুস্তম কাজী, রোকসানা, ধনু, আলী এবং কৃষ্ণপুর এলাকার স্থানীয় এমপির জেলেদের ঘিরে নানা ঘটনা। কাহিনীর সুবিন্যাসে ধারাবাহিকতা কোথাও ক্ষুণœ হয়নি। রাজনীতি জীবনের বাইরে নয়, শ্রেণিবিভক্ত সমাজে কোন না কোনভাবে প্রতিটি ঘটনায় রাজনীতির স্পর্শ লেগে থাকেই। তাই রাজনীতির আঁধারে লালিত এ উপন্যাসের ঘটনাগুলো উপন্যাসের বিষয়ই বটে। লেখক জেলের জীবন কাহিনী বিধৃত করতে গিয়ে জল সংস্কৃতির একটি চমৎকার গল্প বলেছেন। যা ভাষায় নিটোল এবং আমাদের সমাজজীবনের প্রামাণ্য ঘটনা।

চব্বিশ ক্রমিকে উপন্যাসটি শেষ হয়েছে এবং শেষ ক্রমিকে এমপি এবং ইউএনও আলীর প্রসঙ্গ। এমপির লোকেরা খালবিল জবরদখল করছে। ইউএনও আলী জেলেদের প্রতি হৃদয়বান। জলের স্বার্থ তিনি রক্ষা করতে অপারগ। কেননা প্রশাসনের নির্দেশে তিনি বিল থেকে ফিরে আসেন। চলতে চলতে গত রাতের স্বপ্নটার কথা আলীর মনে পড়ল। ভয়ঙ্কর স্বপ্নগুলো ধীরে ধীরে তার চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠল। ‘তিনি জলের তলে তলিয়ে যাচ্ছেন আর তারা দাঁত বের করে হেসে সেতুর ওপর থেকে তাকে উদ্দেশ্য করে বলছে, জাল থেকে মানুষকে বাঁচাবেন কি, নিজে যে জালে আটকা পড়েছেন সেটা কী করে ছাড়াবেন? কাউকে বাঁচাতেও পারবেন না, আর বাঁচতেও পারবেন না। কিন্তু আলী এখন আর দুঃস্বপ্নে বিশ্বাস করেন না। তিনি ইতিহাস বিশ্বাস করেন। ইতিহাস বলে, মানুষের সামনে পাতা জাল, অন্য কেউ নয়, একসময় তারা নিজেরাই ছিঁড়ে ফেলে।’

এভাবেই জালে জড়ানো জেলেদের কাহিনী শেষ। কথাশিল্পী নূরুদ্দিন জাহাঙ্গীর মানুষের পাতা জাল ছেঁড়ার স্বপ্ন দেখিয়েছেন। যে স্বপ্ন মানুষের জীবনকে সমানে এগিয়ে নিয়ে যায়। উপন্যাসটি আমার ভীষণ ভালো লেগেছে।

প্রকাশিত : ২৯ মে ২০১৫

২৯/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: