আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

নির্মলেন্দু গুণের প্রকৃতি ও প্রেমের কবিতা

প্রকাশিত : ২৯ মে ২০১৫
  • জহিরুল হক

কবি নির্মলেন্দু গুণের ‘প্রকৃতি ও প্রেমের কবিতাসমগ্র’ বেরোয় ১৯৯৮ সালের একুশের বইমেলায়। এই কাব্যের প্রথমে রয়েছে প্রকৃতির কবিতা, পরে প্রেমের কবিতা। কবির কাব্যসমগ্র প্রকাশের আগে বাজারে ‘প্রেমের কবিতা’ শিরোনামে একখানা বই ছিল। সে বইয়ের কবিতাগুলো এ কবিতাসমগ্রে সংকলিত করা হয়। কবি এ কবিতাসমগ্র সম্পর্কে বলেন : ‘আমি কিভাবে নারীর ভিতর দিয়ে প্রকৃতির কাছে এবং প্রকৃতির ভিতর দিয়ে নারীর কাছে পৌঁছতে চেয়েছিলাম, আমার কাব্যোপলব্ধিতে নারী ও প্রকৃতি মিলিমিশে কিভাবে একটি অভিন্ন সত্তায় পরিণত হয়েছিল, এ বিষয়টি পাঠকের কাছে স্পষ্ট হবে।’

তাঁর প্রকৃতির কবিতা ‘ভেনাস’-এ ফুটে উঠেছে রূপপিপাসু মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি। কবিতাটি তিনি নামকরণ করেছেন পাশ্চাত্যের চিরায়ত পুরাণের রোমানদের ভালোবাসার দেবী অপরিসীম রূপসী ভেনাসের নামে। কবিতাটিতে দেখতে পাই, একটি মেয়ে হেঁটে যাচ্ছে। মেয়েটি যেন প্রলম্বিত চাঁদের মোহিনী। পথের সৌন্দর্যপিপাসু মানুষেরা মেয়েটির ভুবন ভরা দীর্ঘ কালো চুলে রেখেছে তাদের দৃষ্টি, দেখেছে মুখের আশ্চর্য গড়ন, ঢেউ খেলানো ঊরুর উত্থান, পুরুষ কাঁপানো চোখ, গ্রীবার গর্ব, দেহে সূর্যোদয়ের বিভা, মানানসই মেদে কালো তিলের নগ্ন অহঙ্কার। সব কিছু মিলিয়ে সাড়ে পাঁচ ফুট দীর্ঘ এক অদ্ভুত ভালো লাগা। যেমন :

‘মেয়েটি হেঁটে যাচ্ছে,

আমাদের কল্পনার ফুটপাত ধরে।

আমরা কেউ-ই তার নাম জানি না,

সবাই বলি: ‘ভেনাস।’

শীত প্রকৃতিকে করে যায় রিক্ত। সবকিছু বিবর্ণ হয়ে পড়ে। ‘তোমার অমৃতফল’ কবিতায় কবি মনে করেন, শীত সব কিছু নিয়ে গেলও সৌন্দর্যপিপাসু মানুষকে রিক্ত করতে পারবে না। প্রকৃতির মাতৃরূপ নারী সত্তার মাঝে শাশ্বত সুন্দরকে প্রকৃতিপ্রেমিক খুঁজে পাবে। তা-ই সে অবুঝ শিশুর মতো আঁকড়ে ধরে থাকবে।

‘বরফমাখা ক্লান্ত হাতে তবুও এই মধ্যরাতে

দুগ্ধধন্য শিশুর মতো তোমার দুটি কৃতজ্ঞ-স্তন

আঁকড়ে ধরে আছি। যাবার যা যাক,

তোমার দুটো অমৃতফল আমার হাতে থাক।’

‘রবীন্দ্র সংগীত’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথের গানকে তিনি প্রকৃতির সাথে মিলিয়ে দেখেছেন। রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শময় পৃথিবীতে একজন সংবেদনশীল মানুষ তো তেমনি করেই দেখে। কবি নির্জনে-নিভৃতে বসে অপ্রকাশ্যে রবীন্দ্র সংগীত গেয়ে যান। রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়ে তিনি ভালো থাকেন। স্বপ্নহারানো কবি রবীন্দ্রনাথের শুশ্রƒষা নিয়ে সেরে ওঠেন। রবীন্দ্রনাথকে তিনি পাখি, ফুল ও নদীর সাথে তুলনা করেছেন। স্বপ্নহারা বিরূপ বিশ্বে রবীন্দ্রনাথের গান তাঁকে সজীব ও সচল রাখে। কবিতার পঙ্ক্তিতে :

‘তোমার কবিতা পড়ে ভালো থাকি, গান শুনে দিন যায়।

স্বপ্নভ্রষ্ট ক্ষতবিশ্বে সেরে উঠি তোমার সুরের শুশ্রƒষায়।’

‘সূর্যমুখী’ নিয়ে কবি লিখেছেন একটি অসাধারণ কবিতা। যেভাবে গাছের নিচে মাটি জাল পেতে থাকে, তেমনি প্রেমিক প্রিয়তমার পায়ের তলে জাল পেতে বসে থাকে, কখন তার প্রিয়তমার ফুল থেকে ঝরে পড়ে রেণু কিংবা পরাগ বা রাতে ঝরে পড়ে পাতার শিশির বা পাপড়ি। প্রিয়তমার যৌবনপুষ্প ট্র্যাজিক উল্লাসে ঝরে যায়। প্রিয়তমার যৌবনপুষ্প ঝরে যাবার চিত্রকল্পের সঙ্গে জীবনানন্দ দাশের ‘অবসরের গান’ কবিতার নিম্নোক্ত পঙ্ক্তিগুচ্ছ তুলনীয় :

‘আমি সেই সুন্দরীরে দেখে লইÑনুয়ে আছে নদীর এ-পাড়ে

বিয়োবার দেরি নাইÑরূপ ঝ’রে পড়ে তারÑ

শীত এসে নষ্ট ক’রে দিয়ে যাবে তাঁরে;’

প্রিয়তমার সান্নিধ্য বা অনুরাগ লাভের আশায় প্রেমিক রাত কাটিয়ে দিনের আলোর প্রতীক্ষায় থাকে। যেমন :

‘রাত্রি শেষে কখন আবার

তোমার বাগানজুড়ে ফোটে সূর্যমুখী!’

‘একজন কবির সাক্ষাৎকার’ কবিতায় কবি কবিতা বলতে মানুষকেই বোঝেন। তাঁর কবিতার বিষয় মানুষ। মানুষ বলতে তিনি বুঝেন সমাজবদ্ধ শ্রমজীবী। মানুষই এই পৃথিবীকে নতুন করে গড়ে তুলেছে। কবি নজরুল ‘জীবন-বন্দনা’ কবিতায় যেমন বলেছেন :

‘গাহি সাম্যের গানÑ

ধরনীর হাতে দিল যারা আনি ফসলের ফরমান।’

আলোচ্য কবিতায় কবি নির্মলেন্দু গুণের তেমন ভাবনারই বহির্প্রকাশ ঘটেছে।

‘আকাশ’ কবিতায় কবি লিখেছেন কিছু চমৎকার পঙ্ক্তি। প্রেমিকের সব ভাবনা যখন তার প্রেমিকাকে ছোঁয়, তখন মৌন মন্ত্রের মতো উচ্চারিত হয় একটি শব্দ, ‘আকাশ।’ প্রেমিকা যেন আকাশে মিলিয়ে গেছে কিংবা প্রেমিক ও প্রেমিকার মাঝে আছে এক আকাশ দূরত্ব। তাই আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা ব্যর্থ প্রেমিকের পঙ্ক্তিগুচ্ছই কবি উচ্চারণ করেন কবিতায় :

‘তোমার আমার মাঝে

আছে একরকম বক্ষফাটা অনেক আকাশ।

আমি ব্যর্থ প্রেমিকের মতো মুগ্ধমূর্খচোখে

কেবল তাকিয়ে থাকি আকাশের দিকে।’

পৃথিবীকে জানার পরে এ পৃথিবী আর মানুষের কাছে কোনো বিস্ময় ছড়াতে পারে না। বিস্ময় সন্ধানী মানুষকে তাই বেরুতে হবে পৃথিবী থেকে। কবি ‘করতলগত গোলাপের মধ্যে আমি কোনো সৌন্দর্য দেখি না’ কবিতায় বলেন :

‘করতলগত গোলাপের মধ্যে আমি কোনো সৌন্দর্য দেখি না;

হে অপৃথিবীর গোলাপ, আমাকে বিদ্ধ করো তোমার কাঁটায়।’

কবির আকাশসিরিজের কবিতাগুলোও অত্যন্ত চমৎকার। এই কবিতায় তিনি অসম্ভবকে ছুঁতে চান। যা সহজে পাওয়া যায়, তা ছুঁয়ে তো কোনো অহঙ্কার নেই। প্রেমিকা রূপ অসম্ভবকে ছুঁয়েই প্রেমিকের কেটে যবে সহস্ত্র জীবন। একবার ছোঁবার অহঙ্কারে তাঁর সব দীনতা মুছে যাবে। একবার ছোঁবার স্পর্শসুখে প্রেমিক লিখে ফেলবে অজস্র কবিতা। একবার ছুঁয়েই প্রেমিক পেতে চায় অমৃতের আস্বাদ। যা আবিষ্কার করা হয়ে যায়, তা আর নতুন করে আবিষ্কার করার প্রয়োজন পড়ে না। সৃজনশীল মানুষের স্বপ্ন থাকে নতুন কিছু আবিষ্কারের। অধরাকে ধরার স্বপ্নই কবিতায় প্রকাশ পেয়েছে :

‘শুধু একবার তোমাকে ছোঁব,

অমরত্ব বন্দী হবে হাতের মুঠোয়।

শুধু একবার তোমাকে ছোঁব,

তারপর হবো ইতিহাস।’

‘তোমার সম্মতি চাই’ কবিতায় প্রেমিক প্রেমিকাকে চুম্বন করতে চায়। এখানে প্রেমিকাকে প্রকৃতির সাথে তুলনা করা হয়েছে। প্রেমিকের কোনো কিছুতেই অসম্মতি নেই। পেঙ্গুইন পাখির পালকে, বা চুলে, নাভিমূলের গঙ্গাপদ্মায় কোথাও তার চুমু খেতে বাধা নেই। কবিতায় রূপকে বলা হয়েছে, সুন্দরবনে কিংবা চাঁদপুরে বা বরিশালে বা বঙ্গোপসাগরে কোথাও চুমু খেতে প্রেমিকের বাধা নেই। এই কবিতার প্রেমিক একজন অসাম্প্রদায়িক মানুষ। নারীর সবকিছুই তার কাছে প্রিয়। মৌলবাদীর মতো পবিত্র-অপবিত্রতার সংস্কার তার মধ্যে নেই। সবকিছুর সঙ্গে মিলেই প্রেমিক বাঁচতে পারে। প্রকৃতপক্ষে সুন্দরের সবকিছুই সুন্দর, তা যেমন করে, যেভাবে দেখা হোক না কেন। প্রকৃতির রূপকে কবি নারীর কথা বললেও এই কবিতার নানা অর্থ হতে পারে। যেমন :

‘কোথায় চুম্বন করবো, বলো।

পেঙ্গুইন পাখির পালকে? চুলে?

চোখে? নাকি নাভিমূলে গঙ্গাপদ্মা

যেখানে মিলেছে সেইখানে?’

কবির ‘যুদ্ধ’ প্রেমের কবিতাটি অত্যন্ত সুন্দর। কবিতাটি মাত্র তিনটি পঙ্ক্তির। প্রকৃত যুদ্ধ অন্য কথা। সেখানে শত্রুতা থাকে বাস্তব। তার মধ্যে মজার কিছু নেই, থাকে নিষ্ঠুরতা। কিন্তু প্রেমিকার সঙ্গে যুদ্ধ সে তো শত্রু শত্রু খেলা, তা যে মধুর লড়াই। তা সত্যিকার যুদ্ধ নয়। আর এই বিরোধ শুরু হয় একের প্রতি অন্যের অবহেলার মাধ্যমে। কবিতায় :

‘যুদ্ধ মানে শত্রু শত্রু খেলা,

যুদ্ধ মানেই

আমার প্রতি তোমার অবহেলা।’

প্রিয়া চলে গেলে প্রেমিক এলোমেলো হয়ে যায়। প্রেমিক প্রেমিকাকে তার মনের কথাটি বোঝাতে পেরেছে নাকি পারেনি। এ নিয়ে প্রেমিকের শঙ্কা। প্রেমিকা চলে গেলেই বুদ্ধি আসে। তখন প্রেমিক উচ্চারণ করে, ‘হায় রে নিয়তি!’ এ পঙ্ক্তিটি যেন আবেগাক্রান্ত কিংকর্তব্যবিমূঢ় হাজারো প্রেমিকের সত্যিকার মনের কথা।

মানুষের জীবনে প্রতিটি প্রেমই নতুন প্রেম। মানুষ পুরাতনকে ভুলে নতুনের প্রেমে পড়ে। নতুনকেই মানুষের অতি প্রিয় বলে মনে হয়। সেই মনোভাবই প্রকাশ পেয়েছে ‘আষাঢ়ষ্য প্রথম দিবসে’ কবিতায় :

‘গোলাপ-শেফালি-বেলি আর কৃষ্ণচূড়া ভালবেসে কেটেছে জীবন;

এবারই প্রথম মনে হলো, ভুল আমার প্রকৃত প্রিয়-ফুল তুমি,

তুমি নবধারা জলে-ভেজা আষাঢ়প্রাতের প্রথম কদম ফুল।’

‘চুম্বন-স্তবক’ কবিতায় প্রেমিকাকে অপূর্ব কায়দায় চুম্বন দিয়ে প্রেমিক দূরে চলে যাবে। ‘তোমার অমৃতফল ও ‘তোমার সম্মতি চাই’ কবিতা দুটোর মতো ‘চুম্বন-স্তবক’ কবিতায় প্রথাবিরোধী লেখক হুমায়ুন আজাদের কবিতার ভাষিক মিল নির্মলেন্দু গুণের কবিতায় পাওয়া যায়। ‘চুম্বন-স্তবক’ কবিতায় পাই অভাবনীয় শ্রদ্ধা-ভালোবাসার অভাবনীয় পঙ্ক্তিগুচ্ছ :

‘সামরিক কায়দায় রাষ্ট্রপতি যেমন

সাভার স্মৃতিসৌধে স্থাপন করেন

তাজা ফুলে সাজানো পুষ্পস্তবক :

আমিও তেমনি তোমার নিমীলিত

চোখে চুম্বন-স্তবক স্থাপন করে

এই দেশ ছেড়ে দূরে চলে যাবো।’

প্রেমিকার প্রতি এরূপ শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণের পর আর কিছু বলার থাকে না। উল্লিখিত পঙ্ক্তিগুচ্ছ ভালোবাসার মানুষটির মর্যাদা দিয়ে রূপকার্থেই লেখা হয়েছে।

প্রেমিকেরা মানুষকে যে ভালোবাসার কথা বলে, তার পেছনে মানবতাবাদী চিন্তা-ভাবনাও থাকে। এগুলো অবশ্য বই পড়ে শেখা বুলি। নারীর প্রতি পুরুষের আগ্রহ থাকাই স্বাভাবিক। তাই কবিতাটিতে প্রকাশ পেয়েছে নারীর প্রতি পুরুষের সহজাত আগ্রহের কারণ। নি¤েœাক্ত পঙ্ক্তিগুচ্ছে প্রেমিকের দ্বিধাহীন চিত্তের উচ্চারণ ফুটে উঠেছে :

‘আমি তো তাদের ভালোবেসেছি আনন্দের জন্য

আমি তো তাদের ভালোবেসেছি আমার বেদনার জন্য।’

সমকালীন শক্তিমান কবি নির্মলেন্দু গুণের প্রকৃতি ও প্রেমের কবিতা পড়ে বোঝা যায়, নারী ও প্রকৃতি একে অন্যের পরিপূরক। জীবনানন্দ দাশের মতো কবি নির্মলেন্দু গুণ মানুষ ও উদ্ভিদজগতকে একটি সজীব অনুভূতিতে একাকার করে দেখেছেন। এই বিশিষ্টতাই তাঁর প্রকৃতি ও প্রেমের কবিতায় ফুটে উঠেছে।

প্রকাশিত : ২৯ মে ২০১৫

২৯/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: