রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

নিরাপদ মাতৃত্ব নিরাপদ জাতি

প্রকাশিত : ২৯ মে ২০১৫
  • রহিমা আক্তার

বিশেষজ্ঞ ও অভিজ্ঞদের মতে, ‘দরিদ্রতা, বাল্যবিবাহ, গর্ভকালীন পর্যাপ্ত পুষ্টির অভাব, অসচেতনতা, অনুন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে দায়িত্বরতদের অবহেলা ও অজ্ঞতা, কুসংস্কারের কারণে পর্যাপ্ত হারে এখনও মাতৃমৃত্যুর হার কমছে না।’ ২৮ মে পালিত হল বিশ্ব নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস। ‘প্রসূতি মায়ের যতœ নিন, মাতৃমৃত্যু হার রোধ করুন’, ‘কুসংস্কার দূর করুন, মাতৃমৃত্যুর হার কমান, ‘নিরাপদ মা পারবে জাতিকে নিরাপদ শিশু উপহার দিতে’- এমন সব সেøাগানকে সামনে রেখে প্রতিবছর পালিত হয় বিশ্ব নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস।

গর্ভবতী হওয়া থেকে মাতৃকালীন পর্যন্ত মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে জেলায় জেলায়, থানায় থানায় কমিউনিটি ক্লিনিক এবং ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র চালু রয়েছে। গাইনি রোগী ও সন্তানসম্ভবাদের জন্য প্রতিটি কমিউনিটি ক্লিনিকে একজন করে সিএইচসিপি, একজন করে এফডব্লিউভি এবং একজন করে স্বাস্থ্য সহকারী কাজ করেন। এছাড়া প্রতিটি কমিউনিটি ক্লিনিকে পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ করা হয় নিয়মিত। তারপরও আঞ্চলিক এলাকা ভিত্তিতে অনেক স্থানে মাতৃমৃত্যুর হার কমানো যাচ্ছে না। এজন্য পরিবার ও সেবাদানকর্মীদের দায়ী করা হচ্ছে।

নেপোলিয়ান বলেছিলেন, ‘আমাকে তোমরা শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের শিক্ষিত জাতি উপহার দেব।’ বর্তমান সময়ে চিকিৎসাব্যবস্থায় অনেক অগ্রগতি হয়েছে। অজ্ঞতা, কুসংস্কার কমেছে। কিন্তু নিরাপদ জাতির জন্য এখন নিরাপদ মা ও নিরাপদ মাতৃত্ব খুব বেশি প্রয়োজন। গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস গর্ভবতী মা ও সন্তানের জন্য বিপদের। গর্ভাবস্থায় হরমোনের প্রভাবে মায়ের রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। ডায়াবেটিস নেই এমন মায়ের গর্ভাবস্থায়ও ডায়াবেটিস দেখা দিতে পারে। সেজন্য প্রতিটি গর্ভবতী মায়ের নিয়ম অনুযায়ী রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষা করা উচিত। গর্ভবতী মায়ের শরীরে ডায়াবেটিস আছে কিনা, তা দেখা জরুরী। গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস ধরা পড়লে তাকে বলা হয় গ্যাস্টেশনাল ডায়াবেটিস, যা সাধারণত গর্ভাবস্থার ২৪তম সপ্তাহে গ্লুকোজ স্ক্রিনিং টেস্ট করালে ধরা পড়ে। অনেকক্ষেত্রে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মায়ের নবজাতক শিশু স্বাভাবিকের চেয়ে আকারে ছোট জন্ম নেয়। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মায়ের শিশুর ফুসফুসের বিকাশ ও পরিপূর্ণতা দেরি করে হয়। ফলে প্রসবের পর শিশুর শ্বাসকষ্ট হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। অনেকক্ষেত্রে জন্মগত ত্রুটি নিয়ে শিশু জন্মগ্রহণ করে। শিশুমৃত্যুর হারও বেড়ে যায়। তাই গর্ভবতী মায়ের নিরাপত্তার দিকে বিশেষ নজর দেয়া পরিবার ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর দায়িত্ব।

একটি জাতি ও সভ্যতার জন্য যেমন সুস্থ সমাজ চাই, সুস্থ সন্তান চাই; তার সঙ্গে সবার আগে সুস্থ ও সবল মা প্রয়োজন, প্রয়োজন সুস্থ-স্বাভাবিক মাতৃত্ব। মায়ের স্বাস্থ্য নিশ্চিত হলে সুস্থ শিশুর স্বাস্থ্য নিরাপত্তাও নিশ্চিত হবে। স্বাস্থ্যবান শিশু ও স্বাস্থ্যবান নাগরিক স্বাস্থ্যবান জাতি গঠন করে। মেরি স্টোপসের জিএম সার্ভিসেসের ড. মোহাম্মদ হোসাইন চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের প্রধান কাজ হলো ঝুঁকিপূর্ণ মাকে চিহ্নিত করা। পরিবার পরিকল্পনার প্রচার বাড়াতে হবে। প্রসূতিদের সেবাকেন্দ্রে আসার জন্য উৎসাহ দিতে হবে। তাদের এবং তাদের পরিবারকে জানাতে ও বোঝাতে হবে যে, সেবাকেন্দ্রে এলে মা এবং সন্তানের জীবনের নিরাপত্তা বাড়বে। একই সঙ্গে সেবার মান বাড়াতে ও কাজ করতে হবে। মাতৃস্বাস্থ্য ও নিরাপদ মাতৃত্বের জন্য যে সব দিকের প্রতি অধিক সচেতন হতে হবে, তাদের মধ্যে একটি হলো চিকিৎসা বিষয়ক, অন্যটি সামাজিক অর্থনৈতিক নির্ধারক। বাংলাদেশে মেয়েদের শিক্ষার হার অনেক বেড়েছে। তবে বাল্যবিবাহের হার আশানুরূপ হারে কমেনি। এখনও পরিবারের চাপে পড়ে অনেক মেয়েকে অল্প বয়সে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়। এরপর অল্প বয়সে মা হওয়া, কম বয়সে মাতৃত্বের জন্য শিশু ও মা দু’জনের জন্য বিপদ সন্নিকটে এসে দাঁড়ায়। প্রসবকালে মায়ের মেডিক্যাল ইস্যুর মধ্যে এসবিএর উপস্থিতির বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মাতৃমৃত্যুর হার কমিয়ে আনার সঙ্গে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যেহেতু প্রতিটি গর্ভই ঝুঁকিপূর্ণ, তাই নারীরা যত কম সন্তান নেবেন, প্রসূতি অবস্থায় তত কম মারা যাবেন। নারীদের জন্য স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা প্রস্তুত রাখতে হবে, যাতে মায়েরা নিরাপদ ও সুস্থ সন্তান জন্ম দিতে পারেন।

আমাদের জনসংখ্যার বড় একটি অংশই তরুণ। ৩৪ শতাংশ মানুষ ১৪ বছরের কম বয়সী। ৬৫ শতাংশ জনসংখ্যা ৩০ বছরের কম বয়সী। ৮০+ শতাংশ ৪০ বছরের কম বয়সী। ১৫-৪০ বছরের নারীদের প্রজননক্ষম ধরলে জনসংখ্যার ৪০+ শতাংশেরও বেশি সেই বয়সসীমার মধ্যে পড়ে। এই তরুণ জনসংখ্য আমাদের সমাজ-অর্থনীতির জন্য সুবিধাজনক হতে পারে। কিন্তু সে জন্য তাদের স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে হবে এবং কর্মরত রাখতে হবে। উপজেলা পর্যায়ে সেকেন্ডারি কেয়ার ভাল থাকার পরও নিরাপদ প্রসবের জন্য গাইনোকলজিস্ট চিকিৎসক, দক্ষ নার্স এবং এ্যানেসথেসিস্টের অভাব রয়েছে। তার সঙ্গে অভাব রয়েছে দক্ষ নার্সের। গত কিছুদিন আগে বিপুল পরিমাণ নার্স প্রশিক্ষণ ও নিয়োগের ঘোষণা দেয়া হয়। এখন তা কতটা বাস্তবায়ন হয়, তা দেখার বিষয়।

ব্র্যাকের হেলথ ডিরেক্টর কাওসার আফসানা বলেন, ২০১৫ সালের পর আমাদের নীতিগত দিকনির্দেশনা কী হবে, সেটা এখনই ভাবা দরকার। আগের তুলনায় মাতৃমৃত্যুর হার কমলেও, এখনও ৩০ শতাংশ মৃত্যু হয়। জন্ডিস, হাইপারটেনশন ও ডায়াবেটিসের কারণে অধিকাংশ মাতৃমৃত্যু হয়। এসব বিষয়ে প্রায় কেউ কাজ করে না। প্রসূতিরা হাসপাতালে ভর্তি হলেও বাড়ি ফিরে যান। কারণ বাংলাদেশে এ রকম অবস্থার কোন চিকিৎসা নেই।

তারা বাড়ি গিয়ে অন্যদের বলেন, হাসপাতালে গিয়ে লাভ নেই। গরিব মানুষ হাসপাতালে গিয়ে মানুষের সম্মান পায় না। এ বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদেরও ভালভাবে দক্ষ হতে হবে। কারণ তারাই বেশিরভাগ সময় রোগীর পাশাপাশি থাকেন।

আমাদের দেশে মাতৃমৃত্যুর হার কমেছে, কিন্তু মোটেও তা সন্তোষজনক নয়। তবে দিন দিন এর সংখ্যা কমে আসছে। গণসচেতনতা বাড়ছে, অধিক সন্তান জন্ম দেয়ার প্রবণতা কমছে।

২০১৫ সাল নাগাদ এই মৃত্যুর হার ২৫-৩০ শতাংশ কমিয়ে আনার লক্ষ্যে এমডিজি লক্ষ্যপূরণে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতি বছর ৩০ লাখ শিশু জন্ম নেয়। প্রতিটি জেলায় জন্মে ৬০ হাজার। প্রতিটি উপজেলায় ৪ হাজার ও প্রতিটি ইউনিয়নে ৬০০। বছরে মাতৃমৃত্যুর হার কমিয়ে আনার লক্ষেই কাজ চলছে। এই হার নামিয়ে ৪ হাজারে আনার জন্যই কাজ চলছে। পরিবার পরিকল্পনা খাতে এনজিওগুলো কাজ করছে ৪৩ বছর ধরে। এখনও জন্ম নিয়ন্ত্রণে তাদের অবদান মাত্র ৫ শতাংশের কিছু বেশি। তাই সরকারের এসব ক্ষেত্রেও সেবার মান বাড়াতে হবে। শুধুমাত্র বাল্যবিবাহ বন্ধ হলেই বছরে প্রায় ১০ লাখ শিশুর জন্ম কমবে। কমবে মাতৃমৃত্যুর হারও। তাই জাতি গঠনের জন্য আগামী প্রজন্মের যেমন প্রয়োজন রয়েছে, সেই বলিষ্ঠ প্রজন্ম উপহার পেতে হলে মায়েদের সেবার মানও বাড়াতে হবে। সুদৃষ্টি দিতে হবে মাতৃত্বকালীন সময়ের দিকে। পরিবার ও সমাজ ব্যবস্থার দিকে। তার পাশাপাশি সরকারের সুনির্দিষ্ট প্রচেষ্টা। বাংলাদেশের সব নারীরই সন্তানধারণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়ার অধিকার যেমন আছে, তেমনি নিরাপদ প্রসব এবং বেঁচে থাকারও অধিকার রয়েছে।

somsrahima@yahoo.com

প্রকাশিত : ২৯ মে ২০১৫

২৯/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: