মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

স্বপ্নযাত্রার প্রযুক্তি

প্রকাশিত : ২৯ মে ২০১৫
  • ইব্রাহিম নোমান

গাড়ি চালনা প্রতিযোগিতা ফর্মুলা ওয়ানে একটি গাড়ির গতি হতে পারে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২৪০ মাইল। বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুততম মানব উসাইন বোল্ট দৌড়াতে পারেন ঘণ্টায় ২৩ মাইল গতিতে, তাও সেটা প্রথম এক শ’ মিটারে। কিন্তু কত দ্রুত ছুটতে পারে একটি গাড়ি বা কোন ট্রেন?

দ্রুতগতিতে ট্রেন চলার যে বিশ্বরেকর্ড, তা জাপানের একটি ট্রেন সম্প্রতি ভেঙ্গে দিয়েছে। ট্রেনটির সর্বোচ্চ গতি ছিল ঘণ্টায় ৬০৩ কিলোমিটার বা ৩৭৪ মাইল। যে প্রযুক্তির সাহায্যে এই ট্রেনটি চালানো হয়েছে, তাকে বলা হয় ম্যাগনেটিক লেভিটেশন বা ম্যাগলেভ।

ট্রেনের উচ্চগতির প্রযুক্তিতে জাপান বিশ্বের অন্যান্য দেশের চেয়ে বেশ এগিয়ে। প্রতিদিন দেশটিতে কয়েক শ’ উচ্চগতির ট্রেন চলে। আর ট্রেনের লেট হওয়ার বিষয়টি জাপানে নেই বললেই চলে।

পাখি না বিমান, কী বলবেন একে! এইমাত্র শুধু দেখলেন একটি দীর্ঘ অবয়ব। আর মুহূর্তেই কোথায় যেন হাওয়া, যেন স্বপ্নযাত্রার প্রযুক্তি। বলা হচ্ছে, বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুতগতির ট্রেনের কথা। জাপানের এ ট্রেনটি ঘণ্টায় ৬০৩ কিলোমিটার গতি তুলে নতুন বিশ্বরেকর্ড গড়েছে। একই সঙ্গে ট্রেনটি তার নিজের করা আগের রেকর্ডটি ভেঙ্গেছে। পরীক্ষামূলকভাবে মাউন্ট ফুজির কাছে ট্রেনটির গতি পরীক্ষা করা হয়। ম্যাগনেটিক লেভিটেশন বা সংক্ষেপে ম্যাগলেভ প্রযুক্তির এ ট্রেনের চলার জন্য কোন ধাতব ট্র্যাক বা রেলপথের প্রয়োজন হয় না। ঘর্ষণমুক্তভাবে চলার জন্য ট্রেনটি ব্যবহার করে বিদ্যুতায়িত চুম্বক এবং ট্র্যাকের ওপর ভেসে থেকেই দ্রুতবেগে ছুটতে থাকে। এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, মাত্র ১০ দশমিক ৮ সেকেন্ডে ট্রেনটি ৬০০ কিলোমিটারের বেশি গতি তুলেছে। এ সময়ে ট্রেনটি ১ দশমিক ৮ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছে।

সেন্ট্রাল জাপান রেলওয়ে নামের একটি প্রতিষ্ঠান ওই দ্রুতগামী ট্রেনটি পরিচালনা করে। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, ট্রেনটি প্রায় ১১ সেকেন্ড ছুটে ঘণ্টায় ৬০০ কিলোমিটারের বেশি গতি অর্জন করতে সমর্থ হয়। এটি এক সপ্তাহেরও কম সময় আগে ঘণ্টায় ৫৯০ কিলোমিটার গতিতে চলে ২০০৩ সালের রেকর্ড (ঘণ্টায় ৫৮১ কিলোমিটার) ভেঙ্গেছিল।

ম্যাগনেটিক লেভিটেশন

এক ধরনের পদ্ধতি যাতে চৌম্বক ক্ষেত্রের সাহায্যে কোন বস্তুকে অবলম্বন ছাড়া শূন্যে ভাসিয়ে রাখা হয়। এক্ষেত্রে বস্তুর প্রতি মাধ্যাকর্ষণজনিত প্রভাবকে চৌম্বকীয় চাপ দিয়ে প্রতিহত করা হয়। আর্নশতত্ত্ব প্রমাণ করে যে, কেবল ফেরোচুম্বকত্ত্ব কোন বস্তুকে মাধ্যাকর্ষণের প্রভাব হতে মুক্ত রেখে তাকে শূন্যে ভাসিয়ে রাখতে সক্ষম। কিন্তু ডায়াচুম্বকজাতীয় পদার্থের অতিপরিবাহিতা এই ঘটনায় বাধা প্রদান করে। যদিও ম্যাগনেটিক লেভিটেশনে চৌম্বক শক্তির মাধ্যমে বস্তুকে উত্তোলিত করা হয়, তথাপি কোন কোন ক্ষেত্রে বস্তুকে সামান্য পরিমাণে অবলম্বন প্রদানের উদ্দেশ্যে যান্ত্রিক পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়। একে বলা হয় সুডো লেভিটেশন। ম্যাগনেটিক লেভিটেশন ম্যাগলেভ ট্রেন, ম্যাগনেটিক বিয়ারিং এবং অন্যান্য যান্ত্রিক কাজে ব্যবহৃত হয়। চৌম্বকক্ষেত্র ব্যবহার করে ভাসিয়ে রাখা (ম্যাগনেটিক লেভিটেশন) ট্রেনকেই বলা হয় ম্যাগলেভ ট্রেন। একে ম্যাগনেটিক ট্রেনও বলে। গতানুগতিক বুলেট ট্রেনের চেয়ে এ ধরনের ট্রেনের চলার পদ্ধতি কিছুটা ভিন্ন। বুলেট ট্রেন চলে স্টিলের রেললাইনের ওপর দিয়ে। অন্যদিকে ম্যাগনেটিক ট্রেন চলার সময় রেললাইনকে স্পর্শ করে না। শক্তিশালী চুম্বক ট্রেনকে রেললাইনের ওপরে ভাসমান রাখে।

গবেষণা

জাপানের রাজধানী টোকিওর ফুজি পর্বতের নিটকবর্তী ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি রেললাইনে ম্যাগলেভ ট্রেন নিয়ে গবেষণা করা হয়। ২০১৪ সালে শুরু হওয়া সাত হাজার ৬০০ কোটি মার্কিন ডলারের এই গবেষণার লক্ষ্য হলো ট্রেনে ভ্রমণের সময় কমানো। টোকিও ও আসাকার মধ্যে ভ্রমণের সময় এক ঘণ্টার কাছাকাছি নিয়ে আসা। বর্তমানে গতানুগতিক বুলেট ট্রেনে এই দূরত্ব অতিক্রম করতে সময় লাগে প্রায় তিন ঘণ্টা।

আগামী ২০২০ সাল নাগাদ টোকিও থেকে ওসাকার মধ্যে উচ্চগতির ম্যাগলেভিক ট্রেন চালু হবে বলে ধারণা করা হয়।

ম্যাগলেভে রয়েছে সাতটি কামরা। বৈদ্যুতিক প্রক্রিয়ায় চার্জ করা চুম্বকের শক্তির সাহায্যে তীব্রবেগে ছুটে চলার সময় এটি রেললাইন থেকে প্রায় ১০ সেন্টিমিটার ওপরে ভেসে থাকে। নতুন রেকর্ড গড়া যাত্রাটি উপভোগ করতে প্রায় ২০০ দর্শক উপস্থিত ছিলেন। ম্যাগলেভ ট্রেনটি ঘণ্টায় ৬০০ কিলোমিটারের বেশি গতি তোলার পর তাঁরা হর্ষধ্বনি দিয়ে স্বাগত জানান। একজন বৃদ্ধা দর্শক স্থানীয় গণমাধ্যম এনএইচকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘আমি ইতিহাসের সাক্ষী হয়েছি। সত্যি আমি ট্রেনটিতে চড়তে চাই।’

অতি দ্রুতগামী ট্রেনে চড়ার অভিজ্ঞতা অনেকটা উড়োজাহাজে চড়ার মতোইÑ এএফপির একজন প্রতিবেদক এ ধরনের একটি ট্রেনে চড়ার অনুভূতি জানিয়ে মন্তব্য করেন। জাপানের রাজধানী টোকিওর দক্ষিণ-পশ্চিমে ম্যাগলেভ ট্রেনটির পরীক্ষামূলক চালনায় যুক্ত বিশেষজ্ঞদের প্রধান ইয়াসুকাজু এন্ডো বলেন, দ্রুতগামী ট্রেন যত দ্রুত ছুটে চলে, তত স্থিতিশীলতা অর্জন করে। তিনি মনে করেন, ম্যাগলেভের মান আগের চেয়ে উন্নত হয়েছে।

সাধারণ যাত্রীরা অবশ্য ম্যাগলেভে চড়ে ঘণ্টায় ৬০৩ কিলোমিটার গতিতে চলার অভিজ্ঞতা নিতে পারবেন না। কারণ এটি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৫০৫ কিলোমিটারের বেশি গতিতে চালানো হবে না। এখন জাপানে যে ‘বুলেট ট্রেন’ বা শিনকানসেন ট্রেন চলে, তার গতি ঘণ্টায় ৩২০ কিলোমিটার।

সেন্ট্রাল জাপান রেলওয়ে টোকিও থেকে মধ্যাঞ্চলীয় শহর নাগোয়া পর্যন্ত ২৮৬ কিলোমিটার পথে ২০২৭ সালের মধ্যে ম্যাগলেভ ট্রেনটি নিয়মিত চালাতে চায়। তখন ঘণ্টায় ৫০০ কিলোমিটার গতিতে ট্রেনটি দুই শহরের মধ্যে মাত্র ৪০ মিনিটে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারবে। এক্ষেত্রে এখন জাপানে যেসব বুলেট ট্রেন চলে, সেগুলোর চেয়ে অর্ধেকেরও কম সময় নেবে ম্যাগলেভ।

২০৪৫ সালের মধ্যে জাপানের টোকিও থেকে ওসাকায় যেতে ম্যাগলেভে সময় লাগবে মাত্র এক ঘণ্টা সাত মিনিট। এতে ওই দীর্ঘপথে যাত্রার সময় এখনকার চেয়ে অর্ধেকে নেমে আসবে। তবে দ্রুতগামী ওই ট্রেনের জন্য রাস্তা বা রেললাইন তৈরির খরচ পড়বে অনেক, যা অনেকটা মহাকাশযানের ব্যয়ের সঙ্গে তুলনীয়। নাগোয়া পর্যন্ত লাইন স্থাপন করতেই আনুমানিক ব্যয় হবে প্রায় ১০ হাজার কোটি মার্কিন ডলার।

প্রকাশিত : ২৯ মে ২০১৫

২৯/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: