মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

মুক্তচিন্তার শত্রুমিত্র

প্রকাশিত : ২৯ মে ২০১৫
  • সিরাজুল এহসান

‘...ওই যে প্রবীণ, ওই যে পরম পাকা

চক্ষুকর্ণ দুইটি ডানায় ঢাকা,

ঝিমায় যেন চিত্রপটে আঁকা

অন্ধকারের বন্ধ খাঁচায়।...’

-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

সক্রেটিস গ্রীসের প্রাচীন, জেঁকে বসা, পশ্চাৎপদ ধ্যানধারণার বিরুদ্ধে গণকল্যাণকামী প্রগতির কথা বলেছিলেন। তা ওই সময়ের প্রেক্ষাপটে ছিল একেবারে নতুন ও রাজশক্তির কাছে অসহনীয়। চিন্তার মুক্তিতে দেয়াল ভাঙার সংগ্রাম ছিল তাঁর। মুক্তচিন্তার দর্শন কাল হয়ে দাঁড়ায়। সমাজ যায় তাঁর বিপক্ষে, রাষ্ট্র হয় প্রতিপক্ষ। পরিশেষে হেমলক পানের মাধ্যমে বাধ্য করা হয় জীবনাবসানের। দৃশ্যত শারীরিকভাবে তাঁর প্রস্থান ঘটে পৃথিবী থেকে, তবে কার্যত নয়।

সক্রেটিসের হাজার হাজার বছর পরে এ ভূখ-ে অন্যতম বিশ্বসন্তান রবীন্দ্রনাথ কূপম-ূকদের হাতে হয়েছিলেন নাজেহাল, যদিও তা শারীরিকভাবে নয়। সাম্প্রদায়িক পাকিস্তান রাষ্ট্রে তিনি সাম্প্রদায়িকতার শিকার হন, বর্জন করা হয় তাঁর সৃষ্টিকর্ম।

কাজী নজরুল শুধু রাষ্ট্র কর্তৃকই নয়, সমাজ থেকেও হয়েছেন আক্রমণের শিকার। মানুষে মানুষে ভেদাভেদ, শ্রেণী বৈষম্য, ধর্মে অনুপ্রবেশকৃত কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা, বকধার্মিক, রাষ্ট্র ও সমাজপতিদের শোষণ-ত্রাসনের বিরুদ্ধে ছিল তাঁর অবস্থান। মুক্তচিন্তাময় তাঁর এ অবস্থান সে সময় রাষ্ট্র ও সমাজের কাছে হয় চক্ষুঃশূল। রাষ্ট্র তাঁর সৃষ্টিকর্ম নিষিদ্ধ করেই ক্ষান্ত হয়নি ব্যক্তি নজরুলকে করেছে কারারুদ্ধ।

প্রাচীন গ্রীসে সক্রেটিসের পর কালের গর্ভে বিলীন হয়েছে অনেকদিন। সভ্যতারও ঘটেছে পরিবর্তন। ক্রম বিবর্তনের মাধ্যমে সমাজ এগিয়েছে বলে আমরা দাবি করি। আরও দাবি করি প্রগতির মাধ্যমে সভ্যতার এখন চরম উৎকর্ষের সময়। সভ্যতার হাত ধরে এগিয়েছে চিন্তার ইতিহাস। নানা মত নানা দর্শন মানুষকে গেঁথেছে এক সুতোয়, আবার বিভক্তও করেছে। গাঁথা এবং বিচ্ছিন্নকরণ কোন দর্শনই সঙ্কীর্ণতার ঊর্ধে নয়। মুক্তচিন্তার পরিপন্থী হয়ে উঠেছে বাস্তবতা। মুক্তচিন্তা মানবকল্যাণকামী হলেও যুগে যুগে এ চিন্তার রোধ করতে পশ্চাতমুখী, কিছু অপশক্তি বার বার হামলে পড়েছে। লালন মানুষের ভেদবুদ্ধি থেকে মুক্তি দিতে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। সঙ্কীর্ণতার ঊর্ধেŸ ওঠে মুক্তচিন্তার মাধ্যমে গেয়েছেন মানুষের জয়গান। সবার ওপরে মানুষের স্থান দিয়েছেন। ‘সর্ব সাধন সিদ্ধ হয় তার/মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার (ভবে)’Ñ এভাবে সবকিছুর ওপরে মানুষকে তুলে ধরে বলতে চেয়েছেন মানুষই সাধন, মানুষই সাধক, মানুষই সাধনের লক্ষ্য। এ কথা বলতে গিয়ে, মানুষে মানুষে সম্মিলিন ঘটাতে গিয়ে শিকার হয়েছেন সাম্প্রদায়িকতার। সমাজের তথাকথিত পতিদের সঙ্কীর্ণতার তীরে বিদ্ধ হয়েছেন এই সুফি সাধক বাউল সম্রাট। তোলা হয়েছে জাতপাত, ধর্ম ও তার জন্মবৃত্তান্ত সম্পর্কে প্রশ্ন। তাঁর আখড়া ও অনুসারীদের ওপর হামলা চালিয়ে ভাংচুর আর আহত করা হয়েছে। দেড় শতাধিক বছর আগে যা ঘটেছিল তাঁর সময়ে বর্তমানও কি তাঁর মানবপ্রেমী অনুসারীরা নিরাপদ? এই তো বছর কয়েক আগে লালন অনুসারীদের ওপর হলো হামলা। চুল কেটে করা হলো সমাজচ্যুত, একঘরে। লালনের ভাস্কর্যের ওপর হামলে পড়ল কূপমন্ডূকতা, হলো বিধ্বস্ত। এমন অনেকেই আছেন বিশ্বের ইতিহাসে। ধর্মীয় ইতিহাসেও কম নয়। সামাজিকভাবে এমন দৃষ্টান্তও আমাদের সমাজে কম নয়। সময়ের অগ্রগামী চিন্তাশীল কিছু মুক্তচিন্তার মানুষের জীবনের কিছু খ-াংশের ওপর একটু আলোকপাত করা যাক।

মাওলানা ভাই গিরিশচন্দ্র সেনের আকাশ

সচেতন পাঠক মাত্রই জানেন বাংলায় সর্বপ্রথম পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআন শরীফ অনুবাদ করেন মাওলানা ভাই গিরিশচন্দ্র সেন। ১৮ শতকের প্রায় শেষার্ধের সমাজ বাস্তবতায় তাঁর যে কী দুঃসহ জীবন কাটাতে হয়েছে এখন তা কল্পনাও করা যায় না। জন্মগতভাবে সনাতন ধর্মের অনুসারী। পরে তা ত্যাগ করে ব্রাহ্ম সমাজের অনুসারী হন। আরবি- ফার্সি শেখেন। অনুবাদ করেন আল-কোরআন। ত্রিশ পারা তিন খ-ে প্রকাশ করেন। প্রথম দশ পারা প্রকাশিত হয় ১৮৮১ সালে। আর পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ প্রকাশের কাজ শেষ হয় ১৮৯৮ সালে। প্রথম খ-ে কোনো নাম প্রকাশ করেননি। পরবর্তী সময়ে যখন নামসহ প্রকাশিত হয় তখন হইচই পড়ে যায়। সনাতন ধর্ম ত্যাগ করার কারণে কিছু হিন্দু তার ওপর যে চটে ছিল তা উল্লেখের প্রয়োজন পড়ে না। সামাজিকভাবে তাকে নাজেহাল করা হয়, অন্যদিকে কতিপয় ধর্মান্ধ মোল্লা-মৌলবি ক্ষেপে যান অন্যধর্মের মানুষ কোরআন অনুবাদ করল বলে। গিরিশচন্দ্রের শিরোñেদ করার ঘোষণাও দেওয়া হয়। আবার কিছু উদার ও সংস্কারমুক্ত মুসলমান স্বাগতও জানান। গিরিশচন্দ্র সেনের মৃত্যুর অনেক পরে কোরআন শরীফের বাংলা অনুবাদের চতুর্থ সংষ্কারণ বের হয়। ওই সংস্কারণের ভূমিকায় কিংবদন্তিতুল্য প্রখ্যাত সাংবাদিক মাওলানা আকরম খাঁ (১৮৬৮-১৯৬৮) লেখেন-

“তিন কোটি মোছলমানের মাতৃভাষা যে বাংলা তাহাতে কোরআনের অনুবাদ প্রকাশের কল্পনা ১৮৭৬ খৃঃ পর্যন্ত এদেশের কোনো মনীষীর দৃষ্টি আকর্ষণ করিতে পারে নাই। তখন আরবী পার্শী ভাষায় সুপ-িত মোছলমানের অভাব বাংলাদেশে ছিল না। তাঁহাদের মধ্যকার কাহারও কাহারও যে বাংলা সাহিত্যের উপরও যথেষ্ট অধিকার ছিল, তাঁহাদের রচিত বা অনুবাদিত বিভিন্ন পুস্তক হইতে তাহার অনেক প্রমাণ পাওয়া যায়। কিন্তু এদিকে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগে তাঁহাদের একজনেরও ঘটিয়া উঠে নাই। এই গুরু কর্তব্যভার বহন করার জন্য সুদৃঢ় সংকল্প নিয়া, সর্বপ্রথমে প্রস্তুত হইলেন বাংলার একজন হিন্দুসন্তান, ভাই গিরিশচন্দ্র সেন।... গিরিশচন্দ্র সেনের এই অসাধারণ, সাধন ও অনুপম সিদ্ধিকে জগতের অষ্টম আশ্চর্য বলিয়া উল্লেখ করা যাইতে পারে।”

বর্তমান নরসিংদী জেলার পাঁচদোনা গ্রামের এই মহৎ মানুষটি মুক্তচিন্তার মূর্ত প্রতীক। অসাম্প্রদায়িকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে ইতিহাসের পাতায় তিনি ভাস্বর স্বমহিমায়।

আরজ আলী মাতব্বরের আরজি

বরিশালের লামচরির আরজ আলী মাতব্বর। মাত্র দ্বিতীয় শ্রেণী পর্যন্ত তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। প্রচলিত সামাজিক রীতিনীতি, ধর্মে প্রবেশকৃত কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আজীবন লড়াই করে গেছেন। হয়ে উঠেছেন স্বশিক্ষিত এক দার্শনিক। যুক্তি ও বিজ্ঞানের মাধ্যমে নানা অপরীতি, কুসংস্কার খ-ন করেছেন। পাহাড়-বনে দেবদেবীর অবস্থান, সাত আসমানের অস্তিত্ব, গরুর শিঙের ওপর পৃথিবীর অবস্থানহেতু ভূমিকম্প, জিন-ভূত, দেও-দৈত্য, বজ্রপাত সম্পর্কে প্রচলিত ‘গল্প’কে তিনি প্রশ্নবিদ্ধ করেই ক্ষান্ত হননি, ব্যাখ্যা দিয়েছেন যুক্তি ও বিজ্ঞানভিত্তিক। এই মানুষটি এমন যুক্তিবাদী ও দার্শনিক হয়ে ওঠার নেপথ্য অনুষঙ্গ কিন্তু সমাজব্যবস্থা ও ধর্মের অপব্যাখ্যাই এগিয়ে দিয়েছে। সে কাহিনী মন ছুঁয়ে যায়। একটু ফিরে দেখা যাক তার বয়ানেÑ

‘১৯৩৯ সালে আমার মা মারা গেলে আমি মৃত মায়ের ফটো তুলেছিলাম। আমার মাকে দাফন করার উদ্দেশে যে সমস্ত মুন্সি, মৌলভী ও মুসল্লিরা এসেছিলেন, ‘ফটো তোলা হারাম’ বলে তারা আমার মা’র জানাজা ও দাফন করা ত্যাগ করে লাশ ফেলে চলে যান। অগত্যা কতিপয় অমুসল্লি নিয়ে জানাজা ছাড়াই আমার মাকে সৃষ্টিকর্তার হাতে সোপর্দ করতে হয় কবরে। ধর্মীয় দৃষ্টিতে ছবি তোলা দোষণীয় হলেও সে দোষে দোষী স্বয়ং আমিই আমার মা নন। তথাপি কেন যে আমার মায়ের অবমাননা করা হলো, তা ভেবে না পেয়ে আমি বিমূঢ় মা’র শিয়রে দাঁড়িয়ে তাঁর বিদেহী আত্মাকে উদ্দেশ করে এই বলে সেদিন প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, মা, আজীবন ছিলে তুমি ধর্মের একনিষ্ঠ সাধিকা। আর আজ সেই ধর্মের নামেই হলে তুমি শেয়াল কুকুরের ভক্ষ্য। সমাজে বিরাজ করছে এখন ধর্মের নামে অসংখ্য অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার। তুমি আমায় আশীর্বাদ কর, আমার জীবনের ব্রত হয় যেন কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস দূরীকরণ অভিযান।’...

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক অভিভাষণে তিনি উপরোক্ত কথা বলেন। তিনি যখন মুক্তবুদ্ধির চর্চা করেন, সামাজিকভাবে তা প্রয়োগ করতে গিয়ে নানা রকম সামাজিক বাধা নিষেধের মুখে পড়েন। প্রতি পদে পদে সামাজিক শৃঙ্খল তাঁকে বেঁধে রাখার চেষ্টা করে। তাঁর জীবন একাধিকবার হুমকির মধ্যে পড়ে সে কথা বলে গেছেন বিভিন্ন রচনায়।

হুমায়ুন আজাদের হরফের আগুন

ধর্ম ব্যবসায়ী, একাত্তরের পরাজিত শক্তির উত্থান, তাদের কর্মকা-, নোংরামি, ছদ্মবেশে একাত্তরের ভূমিকায় ফিরে যাওয়ার নিটোল চিত্র ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’। উপন্যাসটির প্রতিটি অক্ষর ওদের গায়ে ধরিয়ে দেয় আগুন। হুমায়ুন আজাদের পা-িত্য, সত্যের সঙ্গে বসবাস, মিথ্যা আর অপশক্তির বিরুদ্ধে নিরন্তর যুদ্ধ অনেকেরই গাত্রদাহের কারণ ছিল। বিশেষত তাঁর আলোচিত উপন্যাসটিতে জামায়াত-শিবির, তাদের নেপথ্য মদদদাতা, মিত্রশক্তিদের স্বরূপ উন্মোচিত হলে একযোগে হামলে পড়ে তাঁর ওপর। মুক্তচিন্তার শত্রুমিত্র হয় চিহ্নিত। মহান একুশের বইমেলা থেকে ফেরার পথে ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি তাঁকে চাপাতির কোপে ক্ষত-বিক্ষত করা হয়। দেশের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ স্তম্ভিত হয়ে পড়ে। তাদের ভালোবাসা, ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় তিনি ফিরে আসেন সুস্থ হয়ে, বিদেশে দীর্ঘ চিকিৎসার পর। নিষিদ্ধ জঙ্গী-মৌলবাদী সংগঠন জামায়াতুল মুজাহেদিনের শীর্ষনেতা শায়খ আবদুর রহমান অবশ্য স্বীকার করেন হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল শিক্ষক এম ইউসুফকে হত্যার কথা।

হুমায়ুন আজাদ সুস্থ হয়ে উঠলেও পিশাচরা তাঁর পিছু ছাড়েনি। জার্মানিতে গবেষণার কাজে গেলে রহস্যজনকভাবে ১১ আগস্ট তাঁর হোটেল কক্ষে মৃত্যু হয়। যেদিন তিনি জার্মানির উদ্দেশে দেশত্যাগ করেন বিমানবন্দর ও সম্ভবত একই ফ্লাইটে একাত্তরের গণহত্যাকারী, বুদ্ধিজীবী হত্যার অন্যতম রূপকার, জামায়াত নেতা, বর্তমান মানবতাবিরোধী অপরাধে দ-িত কারাগারে আটক নিজামীর উপস্থিতি নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছিল। হুমায়ুন আজাদের স্ত্রীও প্রশ্ন তুলেছিলেন। সেই প্রশ্নের উত্তর মেলেনি আজও।

সক্রেটিস, মাওলানা ভাই গিরিশচন্দ্র সেন, রবীন্দ্র, লালন, নজরুল, আরজ আলী মাতব্বর কিংবা হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলা, অত্যাচার-নির্যাতনকারীদের স্মরণ করা হয় বটে তবে তা ঘৃণাভরে। তাদের ঠাঁই এখন ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে। ইতিহাসের স্বাভাবিক নিয়ম করে না কাউকে ক্ষমা । ওদেরও করেনি। যুগে যুগে জয় হয়েছে মুক্তমনা, মুক্তচিন্তা ও মানবকল্যাণে নিবেদিত প্রাণদের। তাঁরা স্মরণীয়, বরণীয়, অনুসরণীয় হয়ে আছেন সশ্রদ্ধ ভালোবাসায়, স্বমহিমায়।

মুক্তচিন্তার প্রবাহ কোনদিন থেমে থাকে না, দমিয়ে রাখা যায় না। সময়ের বিবর্তনে বা চাহিদায় প্রযুক্তির উন্নতি ঘটেছে। ইন্টারনেটের কল্যাণে দুনিয়া এখন হাতের মুঠোয়। ডায়েরি লেখার কথা আমরা জানি। নিজের চিন্তা, অনুভূতি, সময়ের চিত্র, ব্যক্তিগত কথন সেখানে লিপিবদ্ধ হয়। এখন তরুণ প্রজন্ম বা বয়সীরাও কাগজ-কলমে তা না লিখে লিখছেন অন্তর্জালে। যা ব্লগিং নামে পরিচিতি পাচ্ছে। যাঁরা লিখছেন তাঁরা ব্লগার নামে পরিচিত। এগুলো আর ডায়েরির মতো ঘরে বা নিজের টেবিল-ড্রয়ারে থাকছে না। মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বময়। যেহেতু এটা জীবদ্দশায়ই অন্য দশজন দেখতে পাচ্ছেন, পড়তে পারছেন সেহেতু ব্লগারের কিছু দায়িত্ব থেকেই যায়, যেন কারও দর্শন বা অনুভূতিতে আঘাত না লাগে সেদিকে সতর্ক থাকা বাঞ্ছনীয়। মুক্তচিন্তা বা মুক্ত আলোচনার অর্থ এই নয় যে, অন্যের অধিকারকে ক্ষুণœ করে, ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যের ওপর আঘাত করা। আবার যারা পড়ছেন তাদেরও সহনশীলতা, উদারতা, অন্যের মতকে শ্রদ্ধা করা কর্তব্য। গ্রহণযোগ্য না হলে বর্জন করা যেতে পারে। এটাই ভদ্রতা, এটাই সভ্য মানুষের পরিচয়।

ব্লগার মানে কি নাস্তিক?

ডায়েরি লিখলে যদি নাস্তিক না হয়, তবে ব্লগে লিখলে বা ব্লগার হলে তিনি নাস্তিক হবেন কেন? ব্লগের বিরুদ্ধে এমন অপপ্রচার করা হয়েছে যে, ব্লগে লিখলেই তিনি নাস্তিক। নাস্তিক আর ব্লগারকে সমার্থক করার অপচেষ্টা করা হচ্ছে। ২০১৩ সালে একাত্তরের মানবতাবিরোধীদের শাস্তির দাবিতে গড়ে ওঠা শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরের গণজাগরণ মঞ্চের বিরুদ্ধে হেফাজতে ইসলাম নামে যে সংগঠনটির তৎপরতা দেখা গিয়েছিল সেখানেই মূলত কথা ওঠে ব্লগারদের বিরুদ্ধে। গণমাধ্যম সাক্ষ্য দিচ্ছে হাজার হাজার নিরীহ, শিশু মাদ্রাসা ছাত্রকে ভুল বুঝিয়ে ওই বছর ৫ মে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে জমায়েত করা হয় ঢাকা ঘেরাওয়ের উদ্দেশ্যে। গণমাধ্যম কর্মীরা অনেকেই সমবেতদের জিজ্ঞাসা করেছিল ব্লগার কী? অনেকেই সদুত্তর তো দিতে পারেইনি; কোনদিন কম্পিউটার বা ইন্টারনেট ব্যবহারের অভিজ্ঞতা পর্যন্ত ছিল না তাদের। তবে কেন এমন মিথ্যা আশ্রয় বা অপপ্রচার? ওই আন্দোলনকে চাঙ্গা রাখতে বা অন্তর্জালে অপপ্রচার করতেও কিন্তু ব্যবহার করছে কয়েকটি জঙ্গী ও মৌলবাদী গোষ্ঠী। যারা পবিত্র ইসলামের নামে মানুষ হত্যার ইন্ধন জোগাচ্ছে। ব্লগিং করলে যদি নাস্তিক বা ধর্মবিরোধী হয় তবে ওই একই কাজ করে তারাও কি একই অপরাধে অপরাধী নন? তারা আসলে যুক্তি মানেন না, বিশ্বাস করেন না বিজ্ঞানে। যে ’কজন ব্লগারকে হত্যা করা হয়েছে তাদের ব্লগে অধিকাংশই যুক্তি ও বিজ্ঞান নিয়ে লেখা। ওই পক্ষ বিজ্ঞানের আলোকে কেন ভয় পায় তা স্পষ্ট। মানুষের সরলতা ও কুসংস্কারকে পুঁজি করে তারা ব্যবসা ফাঁদে। বিজ্ঞান ও যুক্তি সেসব খোলাসা করে দেয় বলেই তাদের ভয়। সর্বশেষ ওদের হাতে নিহত অনন্ত ছিলেন ‘যুক্তি’ নামে পত্রিকার সম্পাদক। লিখতেন বিজ্ঞান বিষয়ে। বিজ্ঞানকে যদি এতই ভয় তবে কেন বিজ্ঞানের অবদান কলম, কালি, কাগজ, মুদ্রণযন্ত্রের মাধ্যমে পুস্তক কেন তারা পড়েন? বিজ্ঞানের অবদান মোবাইল ফোনকে কেন নাজায়েজ বলছে না? যে ব্লগিং নিয়ে এত হইচই সেই ব্লগ পড়তে বা লিখতে কম্পিউটার, ট্যাব, ল্যাপটপ, মোবাইল প্রয়োজন। সেগুলো তো বিজ্ঞানের উৎকৃষ্ট অবদান, তা কেন ব্যবহার করা হচ্ছে? আসলে ‘বন্ধ খাঁচায়’ থাকলে এমনই হয়।

মানুষকে বিভ্রান্তির মাধ্যমে যেসব ব্লগ, সাইট ও ফেসবুক পেজে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে সেগুলোর মধ্যে কিছু উল্লেখ করা যেতে পারেÑ বাঁশের কেল্লা, সোনার বাংলা, তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা, আওয়ামী ট্রাইব্যুনাল, বাকশাল নিপাত যাক, আই এ্যাম বাংলাদেশী, ডিজিটালরূপে বাকশাল, বাঁশখালী নিউজ টুয়েন্টিফোর, ইসলামী অনলাইন এ্যাক্টিভিস্ট, তরুণ প্রজন্ম, মুক্ত খবর বিডি, নতুন বাঁশের কেল্লা, ইসলামী কেল্লা, স্টোরি অব বাংলাদেশ, বায়তুল মাল, মাইক, মতিঝিল স্কোয়ার, এসো আলোর পথে, আসলে আমরা সবাই পারি প্রভৃতি।

মসির বিরুদ্ধে অসি

যারা এহেন অপকর্ম করে মানুষের প্রাণসংহার করছে তারা যে অশিক্ষিত বা মূর্খ তা ভাবার কোন কারণ নেই। বরং তারা সার্টিফিকেটধারী উচ্চশিক্ষিত। তবে সুশিক্ষিত নয়। তারাও জানে সেই ইংরেজী প্রবাদÑ চবহ রং সরমযঃবৎ ঃযধহ ংড়িৎফ. অসির চেয়ে মসি বড়। তবে সমস্যা হলো সেখানেই এরা এ প্রবাদ উল্টে ফেলেছে। এদের কাছে এখন ‘মসির চেয়ে অসি বড়’। ব্লগে যদি কারও বিরুদ্ধে কোন কিছু লেখা হয়েই থাকে তবে লেখা দিয়েই তা মোকাবিলা করতে হবে এটাই নিয়ম। আর তা যদি সম্ভব না হয়, যদি ব্লগের মন্তব্য সহনীয় পর্যায়ের বাইরে গিয়ে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায় তার জন্য আছে যথাযথ কর্তৃপক্ষ। পুলিশের সহায়তা নেয়া যেতে পারে। তা না হয়ে হচ্ছে সরাসরি প্রাণসংহার। আইনকে শুধু হাতে তুলে নেয়া নয় সরাসরি রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া হচ্ছে। এ ধৃষ্টতা আসে কোত্থেকে সেটা এক প্রশ্ন বটে।

বইমেলার পবিত্রতা ও উদ্দেশ্য বিনষ্টের পাঁয়তারা

ফেব্রুয়ারির ১ তারিখ থেকে সারা দেশের সব পথ গিয়ে মেশে বাংলা একাডেমি আয়োজিত বই মেলায়। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, একুশের বইমেলা এখন বাঙালীর সবচেয়ে বড় মিলনক্ষেত্র। এ মিলনমেলা অর দশটা মেলার মতো নয়। এর নেপথ্যে কাজ করে ভাষা, স্বাধীনতা-মুক্তিযুদ্ধ, দেশপ্রেম, বাঙালী জাতীয়তবাদের চেতনা ও মুক্তচিন্তার বিষয়আশয়। এটা বুদ্ধিবৃত্তিক, নান্দনিক ও সৃষ্টিশীলতার সম্মিলন। এসবের প্রত্যেকটি অনুষঙ্গ ধর্মান্ধ, পেছনবাদী, মৌলবাদী গৌষ্ঠীর গাত্রদাহের কারণ। যাতে মানুষের সমাগম কমে, ভীতি সৃষ্টি হয়, প্রগতিশীল শক্তি একত্রিত হতে না পারে সেজন্য এরা বইমেলাকে রক্তাক্ত করছে বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে। হুময়ুন আজাদ, অভিজিৎ রায় কি সাক্ষী দিচ্ছেন না এর পক্ষে? রাজিবকেও হত্যা করা হয় বইমেলা চলাকালীন ২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি। তাহলে কি নিজস্ব ও প্রকৃত পরিচয়ের ওপর আঘাত দিতে ওরা সচেষ্ট নয়?

হত্যার প্রকৌশল এবং পরবর্তী টার্গেট

অপরাধ নিয়ে গবেষণা করেন বা এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা গণমাধ্যমে বলছেনÑ এসব হত্যাকা- ঘটানো হচ্ছে খুব সূক্ষ্মভাবে, সুকৌশলে। মিশন নিয়ন্ত্রণ করেন একজন। হত্যাকারী একাধিক হলেও কেউ কাউকে চেনে না। শুধু টার্গেককে চেনানো হয় সুকৌশলে। হত্যাকারীরা সংঘবদ্ধ হলেও কেউ কাউকে না চেনা বা পরিচয়হীনতাই বলে দেয় অপরাধারে অভিনবত্ব। এটা নিশ্চয় দুর্বল বা অনুর্বর মস্তিষ্কপ্রসূত নয়।

এ যাবত যে ক’জন ব্লগার নিহত হয়েছেন কেউ আগ্নেয়াস্ত্রের মাধ্যমে হয়েছে বলে জানা যায় না। সবই চাপাতির কোপে নিহত বা আহত হয়েছেন। দেখা যাচ্ছে ঘাতক নির্ভয়ে অতি সন্তর্পণে টার্গেটের খুব কাছে যেতে পারছে। আবার মিশন দ্রুত শেষ করে নিরাপদে যেতে পারছে কেননা আগ্নেয়াস্ত্রের শব্দের ভয় নেই যে তাকে কেউ ধরে ফেলবে। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর সিøপার টিম। এ টিমে মাত্র একজন থাকে। টার্গেটের কাছে যেতে পারে সহজে। মিশন শেষে অস্ত্র ফেলে দ্রুত ছদ্মবেশ ধারণ করতে পারে।

মিশন শেষে ইন্টারনেটে হত্যার দায় স্বীকার করে বিভিন্ন সময় বিবৃতি দেয়া হয়। এই বিবৃতি নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। পরিস্থিতি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিভ্রান্ত করতে এ পন্থা কিনা তা খতিয়ে দেখার দাবি রাখে। সর্বশেষ সিলেটের অনন্ত বিজয় দাশকে হত্যার পর আনসার বাংলা এইট নামে এক জঙ্গি সংগঠন টুইটে বলে, ‘আলহামদুলিল্লাহ! আমরা আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে আল কায়েদা উপমহাদেশের (অছওঝ) ভাইরা আরও এক ইসলাম বিদ্বেষী নাস্তিক ব্লগারকে জাহান্নামে পাঠিয়েছেন! সে নাস্তিকদের আখড়া মুক্তমনার এডমিন ও নিয়মিত বিভিন্ন নামে আল্লাহ ও তার রসুল (সা.) এবং ইসলাম নিয়ে ব্যঙ্গ করত।’ আবার ইংরেজীতে ওই বার্তায় লেখা হয় ‘ডব ধিহঃ ঃড় ংধু ঃড় ধঃযরংঃ নষড়মমবৎং! বি ফড়হ’ঃ ভড়ৎমবঃ ধহফ বি রিষষ হড়ঃ ভড়ৎমবঃ ড়ঃযবৎং যিড় রহংঁষঃ ড়ঁৎ নবষড়াবফ ঢ়ৎড়ঢ়যবঃ গঁযধসসধফ (চইটঐ) ধহফ অষষধয (ঝ.) অহড়ঃযবৎ ভরষব পষড়ংবফ! ংঃধু ঃঁহবফ ভড়ৎ হবীঃ ঃধৎমবঃ... .’ এখন প্রশ্ন হলো এর পরবর্তী টার্গেট কে? কার জীবন ফাইল ক্লোজ হবে? ধর্মমতেই বলা যাকÑ যিনি জীবনদাতা, তিনিই মৃত্যুদাতা। ওরা যেহেতু জীবনদাতা নয়, মৃত্যুদূত বা দাতা; তাহলে কার প্রতিদ্বন্দ্বী, কার চেয়ে শক্তিশালী তারা? তাহলে কে নাস্তিক, কে ধর্মবিরোধী? পরবর্তী টার্গেট কি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দেয়া ৮৪ জনের মধ্যে কেউ নাকি তার বাইরে?

ওঁরা ১১ জন কেন চক্ষুঃশূল?

অতি সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচটি ইমাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল, গণজাগরণ মঞ্চের ইমরান এইচ সরকারসহ ১১ জনকে ঢালাওভাবে ব্লগার, ইসলামবিরোধী আখ্যায়িত করে হত্যার হুমকি দিয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে। আর এ চিঠি পাঠিয়েছে আল কায়দা আনসারুল্লাহ বাংলা টিম : ১৩ নামে একটি জঙ্গী সংগঠন। হুমকিপ্রাপ্তদের মধ্যে কয়েকজন নারীও আছেন, আছেন মানবতাবিরোধী ট্রাইব্যুনালের এক মাননীয় বিচারকের আত্মীয়। নারী দু’জন বিভিন্ন সময়ে টকশো ও সংবাদপত্রে নারী নির্যাতন, মৌলবাদ, যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। এইচটি ইমাম, আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, মুহম্মদ জাফর ইকবালসহ অন্যরা অসাম্প্রদায়িক, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী পরীক্ষিত মানুষ। তাঁরা সব রকমের অপশক্তির বিরুদ্ধে সোচ্চার। তাহলে কি একাত্তরের পরাজয়ের শোধ নিতেই জামায়াত-শিবিরের আন্ডারগ্রাউন্ড পক্ষ এমন তৎপরতা চালাচ্ছে?

ব্লগার হত্যা, বিশিষ্ট নাগরিকদের হত্যার হুমকি একাত্তরের পরাজিত শক্তির কর্মকা- বা এসব একই সূত্রে গাঁথা কিনা জানতে চাইলে বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, হ্যাঁ, একই সূত্রে গাঁথা মনে করার কারণ আছে। একই ধরনের তৎপরতা তারা চালাচ্ছে। তবে কথা হচ্ছে একের পর অপতৎপরতা চালাচ্ছে, ঘোষণা দিয়ে যাচ্ছে তাদের কেন ধরা হচ্ছে না? ওদের দুর্গ কি এতই দুর্ভেদ্য? ওদের নেটওয়ার্ক যদি ভেঙ্গে দেয়া যেত তাহলে একের পর একটা ঘটনা ঘটাতে দুঃসাহস পেত না।

তবে আশার কথা এই যে, দেশের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ সোচ্চার। তারা পথে নেমে এসেছেন। সরকারের সদিচ্ছা রয়েছে এদের প্রতিরোধ ও নির্মূলে। সেটা দৃশ্যমান হচ্ছে ক্রমান্বয়ে। সরকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে আনসারুল্লাহ টিমকে। দেশের মূল মেরুদ- তরুণ সমাজও রয়েছে সদা তৎপর। সেটাই বড় আশা। লেখাটি শুরু হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের কবিতার উদ্ধৃতি দিয়ে। শেষ করা যাক ওই কবিতারই অন্য পঙ্ক্তির মাধ্যমে-

‘...লাগবে লড়াই মিথ্যা এবং সাঁচায়/আয় প্রচ-, আয়রে আমার কাঁচা/... আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা...’

প্রকাশিত : ২৯ মে ২০১৫

২৯/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: