রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

‘এ্যা বিউটিফুল মাইন্ড’ -এর বিদায়

প্রকাশিত : ২৮ মে ২০১৫

উপন্যাসের মতো উত্থান-পতন সমৃদ্ধ জীবনের অধিকারী ন্যাশ। পুরো নাম জন ফোর্বস ন্যাশ। সাধারণ মানুষ তাঁকে চেনে বিভিন্ন পরিচয়ে। তিনি অর্থনীতিতে নোবেলজয়ী, তিনি বিখ্যাত গণিতবিদ, তিনি ‘গেম থিওরি’র উদ্ভাবক, তিনি সিজোফ্রেনিয়াকে সঙ্গে নিয়ে চলা এক মহান মানুষ। আরও কত যে কী!

ন্যাশের জন্ম ১৯২৮ সালের ১৩ জুন। ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার ব্লুফিল্ড শহরে। বাবা ইলেক্ট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ার, মা ল্যাটিন ভাষার শিক্ষিকা। ছোটবেলা থেকেই ন্যাশ দারুণ মেধাবী। ফলে ডাকনাম জুটে গিয়েছিল একটা- ‘বড় মাথা’। বাবাকে দেখে ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার শখ, তাই সে সময়কার বিখ্যাত শিক্ষায়তন কার্নেগি টেক-এ ভর্তি। প্রযুক্তিবিদ্যার পাঠক্রম ভাল লাগল না। তাই কোর্স বদলে রসায়ন। তা-ও ভাল নয়। শেষমেশ গণিত। কারণ, ততদিনে পড়া হয়ে গিয়েছে এরিক টেম্পল বেল রচিত ‘মেন অব ম্যাথমেটিক্স’।

গণিতের পীঠস্থান তখন প্রিন্সটনে, ইনস্টিটিউট ফর এ্যাডভান্স স্টাডিস। যেখানে তখন আলো করে বসে আছেন এ্যালবার্ট আইনস্টাইন, জন ফন নয়ম্যান, রবার্ট ওপেনহাইমার, কুর্ট গোয়েডেলসহ অনেক বিখ্যাত মানুষরা। ন্যাশ পিএইচডি করতেন ওখানে। তাঁর অধ্যাপক বলেছিলেন, ‘দিস ম্যান ইজ আ জিনিয়াস’।

সত্যিই কিন্তু তাই। ক্লাসে দেখা যেত না ন্যাশকে। তিনি বরং সহপাঠীদের সঙ্গে আড্ডায় ব্যস্ত, আর দেখা হলে অধ্যাপকদের চোখা-চোখা প্রশ্নে বিব্রত করতে তৎপর। কমনরুমে বন্ধুদের সঙ্গে নিজের আবিষ্কৃত এক বোর্ডগেমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। গেমের নাম? বন্ধুরা বলে, ‘ন্যাশ’। ওই গেম পরে অন্য নামে বিক্রি করে লাখ লাখ ডলার কামিয়েছে এক বহুজাতিক কোম্পানি। এই পৃথিবীতে বিখ্যাত অর্থনীতিবিদের অভাব নেই। তাঁদের মধ্যে নোবেল বিজেতাও ডজন-ডজন। এত ডজনের ভিড়ে ন্যাশ এক ব্যতিক্রমী চরিত্র। ১৯৯৪ সালে যখন নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়েছিল ন্যাশকে; সেটা শুধু এক বিরাট আবিষ্কারের স্বীকৃতিই ছিল না, ব্যক্তিগত জীবনে এক গভীর খাদ থেকে উত্তরণের স্বীকৃতিও ছিল।

বয়স মাত্র ২১। পিএইচডি থিসিস মাত্র ২৭ পৃষ্ঠার। ওই থিসিসের জন্যই পরে নোবেল প্রাইজ! বিষয়? তা বলতে গেলে চলে আসবে সময়ের কথা। তখন দু-দু’টো পরমাণু বোমা ধ্বংস করেছে জাপানের দুই শহর। সে মরণাস্ত্র আবার বানিয়ে ফেলেছেন আমেরিকার শত্রু, সোভিয়েত নেতা জোসেফ স্তালিন। আমেরিকা করবে কী? হাত গুটিয়ে বসে থাকবে, নাকি স্তালিনকে টেক্কা দিতে বানাবে আরও ভয়ঙ্কর হাইড্রোজেন বোমা? প্রশ্ন নীতির, কিন্তু পর্যালোচনায় কাজে এলো বেশ কিছুকাল আগের গণিতের এক তত্ত্ব। পোশাকি নাম ‘গেম থিওরি’। নাক পছন্দ নাকি নরুন, নির্ধারণের যুক্তিনির্ভর পন্থা। তত্ত্বটার কথা বিশদে বলা হয়েছিল এক বইতে। ফন নয়ম্যান এবং অস্কার মরগ্যানস্টার্ন রচিত ‘থিওরি অব গেমস এ্যান্ড ইকনমিক বিহেভিয়ার’। এই বই সাহায্য করে সিদ্ধান্ত নিতে, হাইড্রোজেন বোমা বানাতে হবে। আমেরিকা বানিয়ে ফেলে তা। ন্যাশ পরে এই তত্ত্বকেই আরও এগিয়ে নিয়ে যান। যার গুরুত্ব প্রসঙ্গে এক গণিতজ্ঞ বলেন, ‘জীববিদ্যায় ডিএনএ-র গঠন আবিষ্কার যেমন যুগান্তকারী, অর্থনীতিতে ন্যাশ সাম্যও তাই’। দর্শন, জীববিদ্যাতেও তার প্রয়োগ।

কিন্তু তারপর? ন্যাশের জীবনে অন্ধকার। একের পর এক প্রেমিকা বদল। সমকামী সম্পর্কও একাধিক। একবার গ্রেফতার হলেন পরুষদের শৌচাগার থেকে। ক্রমে মানসিক জীবন বিপর্যস্ত। ন্যাশ তখন উ™£ান্ত, মানসিক বিকারগ্রস্ত। চাকরি খুইয়ে বেকার। প্রায় বদ্ধ পাগল হিসেবে ঘুরে বেড়ান প্যারিস কিংবা লন্ডন। কখনও ভাবেন তিনি এ্যান্টার্কটিকার প্রেসিডেন্ট, কখনও শোনেন তাঁকে পাঠানো এক্সট্রা-টেরেস্ট্রিয়ালদের গোপন বার্তা। হায়, একদা যিনি যুক্তির শ্রেষ্ঠ পূজারি, তিনিই কি না আবোল তাবোলের সম্রাট! ফল মারাত্মক। বার বার মানসিক হাসপাতালে ভর্তি।

সেই ঘোর দুঃসময়ে সর্বক্ষণ তাঁর পাশে ছিলেন একজনই। স্ত্রী এ্যালিসিয়া। জীবনের এই চরম উত্থান-পতনের মুহূর্তে ন্যাশকে তিনি আগলে রেখেছেন ভালবেসে। তাঁকে রেখে কি যাওয়া যায় মৃত্যুর মতো এতটা দূরান্তে? নাহ্। ন্যাশও পারেননি। দুজন একসঙ্গেই চলে গেলেন ট্যাক্সি এ্যাক্সিডেন্টের উপর দায় চাপিয়ে। সংবাদ মাধ্যম ‘সিএনএন’ জানিয়েছে, দুুজনের কেউই সিটবেল্ট বাঁধা অবস্থায় ছিলেন

প্রকাশিত : ২৮ মে ২০১৫

২৮/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: